logo
শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২১ চৈত্র ১৪২৫

  তারার মেলা রিপোর্ট   ২৬ মার্চ ২০২০, ০০:০০  

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র কমে যাচ্ছে কেন?

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র কমে যাচ্ছে কেন?
'ভুবন মাঝি' চলচ্চিত্রের দৃশ্যে পরমব্রত ও অপর্ণা ঘোষ
দেখতে দেখতে স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক হয়ে এলো। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের এই পঞ্চাশ বছরে ৫০টিও মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি। যদিও স্বাধীনতার কিছুদিন পর মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের ওপর সরকারি খবরদারি চলেছিল দীর্ঘদিন। সামরিক শাসন শেষ হওয়ার পর থেকে অবরোধ মুক্ত হতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে সংখ্যাও। সবচেয়ে বেড়েছিল এই দশকেই। ২০১১ ও ২০১৭ সালে চারটি এবং ২০১৪ ও ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধের ছয়টি করে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। ২০১১ সালে মুক্তি পায় 'আমার বন্ধু রাশেদ', ' ওগরিলা', 'মেহেরজান' ও 'কারিগর'। ২০১৪ সালে 'মেঘমলস্নার', 'জীবনঢুলী', 'অনুক্রোশ', 'নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ', 'হৃদয়ে '৭১' ও 'একাত্তরের ক্ষুদিরাম' ২০১৫ সালে 'এইতো প্রেম', '৭১-এর মা জননী' 'অনিল বাগচীর একদিন', 'বাপজানের বায়োস্কোপ', 'হরিযুপিয়া' ও 'শোভনের স্বাধীনতা'। আর ২০১৭ সালে 'ভুবন মাঝি', 'রীনা ব্রাউন', 'লাল সবুজের সুর' ও '৫২ থেকে ৭১'।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংখ্যাটা আবার পড়তির দিকে। গত তিন বছরের মধ্যে দুই বছরে মুক্তি পেয়েছে মাত্র একটি করে! ২০১৬ সালে 'একাত্তরের নিশান' এবং ২০১৮ সালে 'পোস্টমাস্টার ৭১'। এরপর আর কোনো পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি। সম্প্রতি মাসুদ পথিকের 'মায়া দ্য লস্ট মাদার' নামের একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে অবশ্য- তবে সেটার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল অনেক আগে।

কিন্তু কেন কমে গেল মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের সংখ্যা? তানভীর মোকাম্মেল আঙুল তুললেন এফডিসি কেন্দ্রিক নির্মাতাদের প্রতি। 'নদীর নাম মধুমতি'র পরিচালক বলেন, 'যারা বিকল্প ধারার নির্মাতা তারা তবু চেষ্টা করছেন। কিন্তু ছবি বেশি নির্মিত হয় মূলধারায়ই। সেখানে সরকারি সুযোগ-সুবিধা যায়, ভর্তুকি যায়। তুলনায় সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র হয় না বললেই চলে। এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র হয়েছে, বেশির ভাগের নির্মাতাদেরই 'এফডিসির বাইরের মানুষ' মনে করা হয়।'

'খাঁচা'র পরিচালক আকরাম খান অবশ্য তাতে একটু দ্বিমত পোষণ করলেন। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র কখনোই আর্থিক সাফল্য লাভের উদ্দেশ্য সামনে রেখে করা উচিত নয়। আকরাম বলেন, 'কোনো চলচ্চিত্রের সাফল্য বিচার করা হয় আর্থিক সাফল্য বা শিল্পমান অর্জনের মাপকাঠিতে। কোনোটাই যদি না হয়, তার মানে চলচ্চিত্রটা চলচ্চিত্রাঙ্গনে কোনো ছাপই ফেলতে পারল না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র অবশ্যই শিল্প সফল হতে হবে। তাতে বাংলাদেশের ও মুক্তিযুদ্ধের উপস্থাপনটা বাস্তবসম্মত হতে হবে। নইলে সেটা বরং মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের ধারার ক্ষতিই করে। দর্শকও মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে।' এটাকে সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন 'মেঘমলস্নার' পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জনও, 'প্রতি বছর মুক্তিযুদ্ধের নামে যে ছবিগুলো মুক্তি পাচ্ছে, বেশির ভাগই অত্যন্ত নিম্নমানের। একঘেয়ে কাহিনি, সঙ্গে মঞ্চের মতো অতিনাটকীয় অভিনয়! শুধু সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই নয়, এমনটা একদম শুরু থেকেই হয়ে আসছে। তাই সংখ্যায় নয়, নজর দেওয়া উচিত মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রগুলোর শিল্পমানে।'

নিম্নমানের নির্মাণের জন্য আকরাম কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন নির্মাতাদেরই। বললেন, 'মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম যারা চলচ্চিত্র বানিয়েছিলেন, তাদের জন্য নির্মাণটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তখনকার বাস্তবতায় সেটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র হতে হবে নান্দনিক, শিল্পমানসম্মত। সে জন্য নির্মাতাকে আন্তরিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে হবে। বর্তমানের উপযোগী করে আধুনিক ও শাশ্বত রূপে উপস্থাপন করতে হবে।'

চলচ্চিত্রের অনেক সিনিয়র নির্মাতাদের মতে, নান্দনিক মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মাণের জন্য প্রয়োজন সত্যিকার মেধাসম্পন্ন পরিচালক। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি যার ইতিহাস ও সাহিত্যের দখল আছে এমন পরিচালকের সংখ্যা এখন খুবই কম। গভীর ভাবের ছবি বানানোর প্রবণতাটাও কমে গেছে। সরকারিভাবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হলেও তাতে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। ফলে সরকার মুক্তিযুদ্ধের ছবির জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা দিতে চাইলেও তা ঠিকঠাক কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আর বিপক্ষের শক্তির বিতর্ক আর মুক্তিযুদ্ধের নানা ইসু্যতে মত-বিভেদ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র তৈরির একটি বাধা বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম কিরণ বলেন, 'আমাদের এখানে রাজনীতিকরণ খুব বেশি। যে যখন ক্ষমতায় থাকে সে তাদের নিজেদের সম্পৃক্ততাকে উঁচু করে ধরে। যেমন ধরুন আমাদের দেশে একটা ওপেন বিতর্ক হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছে। এসব মতবিভেদ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আর বিপক্ষের শক্তির বিতর্কে পরিচালকরা জড়াতে চান না। যিনি বিএনপি করছেন তিনি একভাবে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা বানান আর যে আওয়ামী লীগ করেন, তার আদর্শ অনুযায়ী বানান। এমন অভিযোগও রয়েছে অনেক সময় সেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা সেন্সর বোর্ড থেকে ছাড় পায় না।'

কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের প্রধান শফিউল আলম ভূঁইয়া বলছেন, অনেকটা সময় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করা হয়েছে। ৪৭ বছরে মুক্তিযুদ্ধকে নানাভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে আমরা ক্ষমতায় থাকতে দেখেছি। তারা যখন ক্ষমতায় ছিল সেসময় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণকে অবহেলা করা হয়েছে। সেন্সর বোর্ড ছাড় দেয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি করেছে। তা ছাড়া আমি মনে করি, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ভেতর এমন ছবি তৈরির মেধা ও যোগ্যতা নেই।'

বাণিজ্যিক নির্মাতারা কেন এমন চলচ্চিত্রে অর্থ খরচ করেন না- এমন প্রশ্নের জবাবে চলচ্চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান বলেন, 'বিনিয়োগ ফেরত না আসার শঙ্কায় বাণিজ্যিক নির্মাতারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করেন না। যে টাকায় এখানে সিনেমা হয়, তা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা হয় না। অনেক বেশি টাকার দরকার হয়। যারা সিনেমা বানান তারা ব্যবসার জন্য তা করেন। যদি টাকা লগ্নি করে টাকা ফেরত না আসে তাহলে সে টাকা কেন খরচ করবে। কোন ছবিতেই টাকা ফেরত আসছে না?'।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে