জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব

সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও পদক্ষেপ হওয়া উচিত গণমুখী। গণতন্ত্রের মূল সুর এটাই। জনকল্যাণ জনস্বার্থ ব্যাহত হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এটা হওয়া সঙ্গত ও যৌক্তিক নয়।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশের অনেক ক্ষেত্রে। এর প্রভাবে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম, বেড়েছে বাস ভাড়া ও পণ্য পরিবহণ ভাড়া। এমন কি রিকশা সিএনজি ভাড়াও বেড়ে গেছে। রাজধানীতে যাতায়াতজনিত সমস্যা দিনে দিনে জটিল হয়ে যাচ্ছে। মানুষের চাহিদা হচ্ছে উন্নত সেবা এবং স্বচ্ছন্দ যাতায়াত। দেশের গণপরিবহণের দিকে তাকালে সেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না। পরিবহণ খাতের নৈরাজ্য এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সরকারের পক্ষ থেকে বাস ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও নৈরাজ্য থেমে নেই। অধিকাংশ বাসেই নেই বর্ধিত ভাড়ার তালিকা আর তালিকা না থাকায় যাত্রীরা বুঝতে পারছেন না কোন গন্তব্যের ভাড়া কত। সুযোগ বুঝে তাদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। মাঠে যদিও বিভিন্ন সংস্থার ভ্রাম্যমাণ আদালত রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ বাসই থেকে যাচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের দৃষ্টির আড়ালে। প্রতিটি বাসেই ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কন্ডাক্টরদের বচসা হচ্ছে। যাত্রীরা বুঝতে পারছেন না কোন বাস ডিজেলে আর কোনটি সিএনজিতে চলছে। অবশ্য সিএনজি ও ডিজেলচালিত বাসের শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে স্টিকার লাগানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনা সবাই মানছে না। কিছু কিছু বাসের সামনে লেখা রয়েছে ডিজেল চালিত বাস। ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে 'সিটিং' ও 'গেটলক' বাস সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। 'সিটিং' ও 'গেটলক' বাস সার্ভিস উঠে গেলে ভাড়া কমার কথা। অথচ বেশি ভাড়া নেয়া হচ্ছে। যাত্রীরা ভাড়ার তালিকা দেখতে চাইলে, তা দেখানো হচ্ছে না। একদিকে যেমন যাত্রীসেবার মান কমেছে অন্যদিকে চার্ট অনুযায়ী ভাড়া নেয়া হচ্ছে না। \হসিটিং সার্ভিস তুলে দেয়ায় গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি, কমেনি ভাড়াও। প্রতিটি বাসে ভাড়ার তালিকা সুনির্দিষ্টভাবে টাঙিয়ে রাখার কথা বলা হলেও এটা মানছে না কেউ। ন্যায্য ভাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে গণপরিবহণে হয়তো বা শৃঙ্খলা ফিরে আসতো। মূলত জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণেই যাত্রী বিড়ম্বনা আগের চেয়ে বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে থাকায় 'লোকসান কমাতে' দেশের বাজারেও এই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। কেরোসিন ও ডিজেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে সারাদেশে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ধর্মঘট পালিত হয়েছে। এই ধর্মঘটে বিপাকে পড়েছিল সাধারণ মানুষ। জরুরি পণ্য পরিবহণ, জরুরি চিকিৎসা সেবার কাজে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষ গণপরিবহণ বন্ধ থাকায় বিকল্প পরিবহণের খোঁজে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশে এই চিত্র নতুন নয়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব এবং যে ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে জনদুর্ভোগের কারণে সর্বসাধারণের মধ্যে নাভিশ্বাস উঠেছিল। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য, পরিবহণ ব্যয় ও সেবা খাতের মূল্য বৃদ্ধি জনগণের জন্য বড় ধরনের বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে। করোনা মহামারিতে একদিকে ডেঙ্গুর ছোবল ও কাজ হারিয়ে বেকাত্বের অভিশাপ অন্যদিকে পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন এখন ওষ্ঠাগত। চাল, ডাল, আটা, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যেই দাম বাড়ার কারণে অসহায়, হতদরিদ্র ও কর্মহীন মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা রয়েছেন তারা কি এসব ভাবছেন? দেশের প্রত্যেকটি নাগরিককে নিরাপত্তায় রাখা সরকারের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব কতটুকু পালন করছে সরকার? ঊর্ধ্বমুখী নিত্যপণ্যের দামে সঙ্গে ডিজেলের নতুন দাম বৃদ্ধির ফলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা অবস্থা। মানুষের জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কেবল বাস ভাড়া নয়, দফায় দফায় পানি, গ্যাস ও বিদু্যতের দামও বেড়েছে। চালের দাম বেড়েছে কয়েক দফা। বাসা ভাড়া তো বাড়ছে প্রতি বছর। তা হলে বাকি থাকল কী? বিশেষজ্ঞরা এ সময় দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পক্ষপাতী নন। তারা বলেছেন, করোনার কারণে দেশের মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। তা ছাড়া বাজারে এখন নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ নিয়ে জাতীয় সংসদও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সাবেক এক প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, 'বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম কমার কারণে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ৭৫ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। বর্তমান সরকার যেহেতু নির্বাচিত সরকার। জনগণের কথা চিন্তা করলে কোভিডের অবস্থায় হঠাৎ করে এই মূল্যবৃদ্ধি না করে কি বিকল্প ব্যবস্থা করা যেত না? এমনিতেই বাজার নিয়ন্ত্রণে নেই। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে তেলের কারণে অন্যান্য পণ্যের মূল্য আরও বৃদ্ধি হচ্ছে।' প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, 'আলস্নাহর ওয়াস্তে দেশের মানুষ তেলের মূল্য বৃদ্ধির জন্য যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এজন্য হয় আপনি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন, না হয় বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মানুষকে বিপজ্জনক অবস্থা থেকে মুক্তি দেন।' আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমতে শুরু করেছে বলেও তিনি উলেস্নখ করেন। জাতীয় পার্টির এক নেতা বলেছেন, 'ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে চরমভাবে আঘাত করেছে। দ্রব্যমূল্যও বেড়ে গেছে। এ যেন জনগণের গোদের উপর বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারকে এটাও মনে রাখার দরকার এ খাতটি কোনো লাভজনক খাত নয়, সেবামূলক খাত। প্রতিবেশী দেশ স্পর্শকাতর এই জ্বালানির মূল্য না বাড়িয়ে ঠিক রেখেছে। আমাদের সরকার ইচ্ছা করলে এটা করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম কমে যায়, তখন কিন্তু আমাদের এখানে কমানো হয় না। অজুহাত দিয়ে দাম বাড়ানো হলে সেটা কত শতাংশ হতে পারে। আমাদের চিন্তা করা উচিত। আমরা কত পরিমাণ বাড়াতে পারি। বৃদ্ধির পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে গেছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ কেবিনেটের নতুন করে চিন্তা করা উচিত। কারণ, জনস্বার্থ অগ্রাধিকার। জনস্বার্থে এটা পুনর্বিচেনা করুন। হয় মূল্য কমান, না হয় ভর্তুকির ব্যবস্থা করুন।' এটা সত্য, পৃথিবীর সব দেশেই বিদু্যৎ-জ্বালানির মূল্য সমন্বয় একটি অজনপ্রিয় কাজ। কিন্তু দেশের সার্বিক অর্থনীতির গতিশীলতার স্বার্থে এই কাজটি করতে হয়। জ্বালানির ব্যবহারের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি সরাসরি সম্পর্ক আছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়া যাবে না। অথচ বিএনপি এটাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। বিএনপি-জামায়াত ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে মাত্র পাঁচ বছরে মোট আটবার ডিজেল-কেরোসিনসহ অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করেছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র পাঁচ বছরে মোট আটবার জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা আর কোনো সরকারের সময় হয়নি। জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিএনপি-জামায়াত রেকর্ড করেছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে সরকার গঠনের মাত্র সাত দিনের মাথায় ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে ডিজেল এবং কেরোসিনের মূল্য কমিয়েছিলেন। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য বৃদ্ধির কারণে আওয়ামী লীগ সরকার ৬ মে ২০১১, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১১, ১১ নভেম্বর ২০১১, ৩০ ডিসেম্বর ২০১১ এবং ৪ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে মোট পাঁচবার জ্বালানি মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে বৃদ্ধি করেছিল। আওয়ামী লীগের মেয়াদকালে ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে যখন মূলত জ্বালানি মূল্য সমন্বয় করা হয়েছিল, ওই সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অসহনীয়ভাবে ঊর্র্ধ্বমুখী ছিল। এবারও সমন্বয় করা হয়েছে। সরকার এটা করেছে যৌক্তিক অবস্থান থেকেই। তবে জনসেবামূলক খাতে যেহেতু ভর্তুকির সুযোগ রয়েছে, সে ক্ষেত্রে করোনাকালে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সহনীয় পর্যায়ে রাখাটাই সমীচীন ছিল। এর প্রভাবে কেবল বাস ভাড়াই বাড়েনি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়েছে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও পদক্ষেপ হওয়া উচিত গণমুখী। গণতন্ত্রের মূল সুর এটাই। জনকল্যাণ জনস্বার্থ ব্যাহত হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এটা হওয়া সঙ্গত ও যৌক্তিক নয়। সালাম সালেহ উদদীন : কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে