'মৎস্য মারিব, খাইব সুখে'

'মৎস্য মারিব, খাইব সুখে'
ময়মনসিংহের কাশিনগরে ভাই ভাই খামারে মাছ ধরছে খামারিরা

'মৎস্য মারিব, খাইব সুখে' মধ্যযুগের এ শ্লোক আবার ফিরে এসেছে। 'মাছে-ভাতে বাঙালি' চাষের মাধ্যমে মাছের সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। শুধু চিংড়ি বা ইলিশ নয়, এখন মিঠা পানির মাছও রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। কয়েক বছরেই মাছ রপ্তানি বেড়েছে ৩৫ শতাংশ।

গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদীতে পনের বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ডিম ছেড়েছে মা মাছ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, হালদায় এবার সর্বোচ্চসংখ্যক ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। এক যুগের মধ্যে এত ডিম সংগ্রহ হয়নি। কার্প জাতীয় (রুই, কাতলা, মৃগেল,ও কালিবাউশ) মা মাছ বেশি ডিম ছাড়ে।

মাছের বাজারে মাছের অভাব না থাকলেও দাম কিন্তু কম নয়। পাবদা, গুলশা, টেংরা, মহাশোল ও ইলিশের দাম মগ ডালে, যেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের নাগালে পৌঁছায় না। পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প জাতীয় মাছেই ভরসা সাধারণের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাথাপিছু মাছ গ্রহণের চাহিদা ৬০ গ্রাম। দেশে মাছের উৎপাদন বেশি হওয়ায় মাছের প্রাপ্তি ৬২. ৫৮ গ্রাম, যা চাহিদার তুলনায় ২.৫৮ গ্রাম বেশি।

এফএও পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম দেশটি হবে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীনের অস্থান থাকবে। বর্তমানে বিশ্বে মাছ উৎপাদনে প্রথম দেশ চীন, দ্বিতীয় ভারত আর তৃতীয় দেশ হচ্ছে মিয়ানমার। মৎস্য গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতিবেশ ব্যবস্থা মিঠাপানির মাছ চাষের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। এখানকার সোয়া দুই লাখ হেক্টর উন্মুক্ত জলাশয় আর গ্রামীণ এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা লাখ লাখ পুকুরে মাছ চাষের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। সরকার যদি মাছ চাষে আরও মনোযোগী হয়, চাষিদের সহায়তা করে, তাহলে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে পারে।

এফএও'র হিসাব অনুযায়ী, ধারাবাহিকভাবে এক যুগ ধরেই বাংলাদেশ মাছ চাষে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে মাছের মোট উৎপাদন হয়েছে ৪১.৩৪ লাখ টন। এর মধ্যে চাষ করা মাছের পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ টন। জাটকা সংরক্ষণসহ নানা উদ্যোগের ফলে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৭ টন। দেশের জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান ১ শতাংশ। আর জিডিপিতে পুরো মৎস্য খাতের অবদান ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ষাটের দশকে আসা তেলাপিয়া দিয়ে তা শুরু হয় মাছ চাষের বিপস্নব। পরে থাই পাঙাশ, ভিয়েতনামের কই, থাই কই, আফ্রিকান মাগুর। এখন বাজারে পাওয়া ৯০ শতাংশ মাছই চাষের মাছ। দেশে বর্তমানে ৪৭৫টি সামুদ্রিক প্রজাতি, ৩৬০টি স্বাদু পানির প্রজাতি, ৩৬টি চিংড়ি প্রজাতির মাছ রয়েছে। বিপন্ন হয়ে যাওয়া ২০ প্রজাতির মাছ কৃত্রিম প্রজননে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের গবেষণায় দেখা গেছে, এক সময় দেশের নদনদী ও জলাশয়গুলোতে ২৬৬ প্রজাতির মিঠা ও ঈষৎ লোনা পানির মাছ পাওয়া যেত। এর মধ্যে ৬৬ প্রজাতির কোনো সন্ধান নেই এখন। অবশিষ্ট ২০০ প্রজাতির মধ্যে ৫৪টি বিপন্ন প্রায়। ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের মধ্যে চারটির অবস্থা নাজুক। প্রাকৃতিক ও মানুষের সৃষ্ট কারণে দেশি ছোট মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণায় দেশে বিপন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা শতাধিক বলে দাবি করা হয়েছে।

মৎস্য চাষ বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল ওয়াহাব আকন্দ বলেন, উন্মুক্ত জলাশয় পুনরুদ্ধার ও মৎস্য অভয়াশ্রম বাড়াতে হবে। দেশি ছোট মাছ রক্ষায় শিল্প কারখানার দূষণ ও কীটনাশক ব্যবহার কমাতে হবে। ইলিশ মাছের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ কর্মসূচি কঠোরভাবে পালন করতে হবে। সমুদ্রসীমা বিজয়ের সুফল ঘরে তুলতে হবে। সামুদ্রিক মাছ আহরণ বাড়াতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশ মাছচাষের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম যায়যায়দিনকে বলেন, বাংলাদেশের চাষের মাছের উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। প্রায় ৯ লাখ টন থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ২১ লাখ টন। উন্নত জাতের মাছ চাষের মাধ্যমে মাছে-ভাতে বাঙালির প্রবাদ ধরে রাখতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। মাছচাষে সরকার কম সুদে ঋণ দিচ্ছে। চিংড়ি ও ইলিশের রপ্তানি বাড়াতে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মৎস্য চাষিদের সব ধরনের সহায়তা করা হচ্ছে। মাছ ধরা নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের রেশন হিসেবে চাল বিতরণ করা হচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে