শীতের ঐতিহ্য খেজুরের রস

শীতের ঐতিহ্য খেজুরের রস

বাংলাদেশে সেই সুদূর অতীত থেকে খেজুর গাছের আধিক্য। বৃহত্তর গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকা অর্থাৎ যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও খুলনা জেলায় বরাবর খেজুরগাছ বেশি জন্মে। এক সময় অর্থকরী ফসল বলতে খেজুর গুড়ের বেশ কদর ছিল। ধান উৎপাদনে জমির ব্যবহার ছিল স্বল্প। পড়ে থাকত দিগন্তজোড়া মাঠ। বন-জঙ্গলে ভরা। আর সেখানে বিনা রোপণ ও বিনা পরিচর্যায় বুনোলতার সঙ্গে পালস্না দিয়ে বেড়ে উঠত খেজুরগাছ। তা থেকে রস বের করে তৈরি হতো উৎকৃষ্ট গুড়। প্রবাদে প্রচলিত কথা যশোরের যশ খেজুরের রস। যশোরের ঐতিহ্যবাহী পাটালি গুড়ের ইতিহাস অনেক প্রাচীন।

কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস, মন মাতানো ঘ্রাণ শহরে বিরল। শীতের সাকালে খেজুর রস, মিষ্টি রোদ, কৃষক-কৃষাণির হাসি দারুণ প্রাণশক্তি। খেজুরের রস মানবদেহের জন্য উপকারী বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ। প্রচলিত খাদ্য হিসেবে খেজুর রস বেশ সস্তা, পুষ্টিকর এবং উপাদেয়। খেজুর রসে অ্যাসপারটিক এসিড, নাইট্রিক এসিড এবং থায়ামিন বিদ্যমান।

পুরো শীতজুড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক খেজুরগাছ দৈনিক গড়ে ৫-৬ লিটার রস দিয়ে থাক। একটি গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে গড়ে ২৫-৩০ কেজি গুড় তৈরি করা যায়। প্রতি কেজি রসের মূল্য ৪০-৫০ টাকা আর খেজুর গুড়ের মূল্য প্রায় ১৫০-১৮০ টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী একবিঘা জমিতে প্রায় ১ থেকে ১৫০টি গাছ রোপণ করা সম্ভব। ১০০-২০০ খেজুর গাছ আছে এমন পরিবার পুরো বছরের সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে পারে। ১টি প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় চাষিরা প্রতি বছর ৮-১০ কোটি টাকা আয় করেন খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করেই।

ব্রিটিশ আমলে খেজুর গুড় থেকেই তৈরি হতো চিনি। এ চিনি 'ব্রাউন সুগার' নামে পরিচিত ছিল। খেজুরের রস থেকে উন্নতমানের মদও তৈরি করা হতো। এই চিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। বিলেত থেকে সাহেবরা দলে দলে যশোর অঞ্চলে এসে চিনির কারখানা স্থাপন করে চিনির ব্যবসায় নামেন। যশোরের ইতিহাস থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলের চৌগাছা এবং কোটচাঁদপুরের আশপাশে প্রায় ৫০০ চিনি কারখানা গড়ে উঠেছিল। তখন কলকাতা বন্দর দিয়ে খেজুর গুড় থেকে উৎপাদিত চিনি রপ্তানি করা হতো। মূলত ১৮৯০ সালের দিকে আখ থেকে সাদা চিনি উৎপাদন শুরু হলে খেজুর গুড় থেকে চিনির উৎপাদনে ধস নামে। একে একে কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। খেজুরের গুড় থেকে চিনি তৈরি না হলেও এখন পর্যন্ত বাঙালির কাছে খেজুরের পাটালির গুড়ের কদর কমেনি। তবে বিজ্ঞানের এই যুগে এখনো রস থেকে পাটালি গুড় তৈরিতে মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাটালি গুড় তৈরিতে আধুনিকতা আনা গেলে এটিও রপ্তানি পণ্যের তালিকায় স্থান পেতে পারে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শীত এলেই গাছিরা গাছ পরিষ্কার ও রস জ্বাল করার জায়গা ঠিক করাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। যশোরের চৌগাছার খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারের বন বিভাগের উদ্যোগে গত কয়েক বছর ধরে খেজুরগাছ রোপণের কাজ চলছে। 'বৃহত্তর যশোর জেলার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন' প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে রোপিত হয়েছে কয়েক লাখ খেজুরগাছের চারা। দেশীয় জাতের সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে আরবীয় খেজুরের চারাও বিভিন্ন নার্সারিতে তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে বন বিভাগের একটি সূত্র। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছে, সরকারিভাবে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ না করলে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে খেজুরগাছ হয়তো বা আরব্য উপন্যাসের গল্পই হয়ে যাবে।

\হশোনা যায়, আগেকার দিনে শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্য এলাকা থেকে যশোরে আসতেন গাছিরা। কারণ, যশোর এলাকার মানুষ অতীতে অলস ছিল। সেই গাছিরা গাছ তুলতেন, কাটতেন, রস বের করে গুড় বানাতেন। শীতের শেষে ফাল্গুনের সময় পারিশ্রমিক নিয়ে ফিরে যেতেন নিজেদের এলাকায়। এসব গাছিরা ছিলেন মূলত পেশাদার। কার্তিক থেকে ফাল্গুন- এ ৫ মাস তারা যুক্ত থাকতেন গাছকাটার কাজে। এখন দিন বদলেছে। ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের দরুন যশোর এলাকার মানুষও শিখে নিয়েছে গাছকাটা। গ্রামাঞ্চলের প্রায় পরিবারেই আছেন গাছি ও নিজ মালিকানায় আছে কিছু না কিছু খেজুরগাছ। এখন পেশাদার গাছিদের তেমন একটা দেখতে পাওয়া যায় না।

'গাঁও-গেরামের' অভাবের সংসারেও রস, গুড়, পিঠা-পায়েসের মৌ মৌ গন্ধে ভরে যায়। গত শতাব্দীতে শুধু গুড় বেচাকেনার জন্যই যশোরের বিভিন্ন নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য বাজার। নদীর পাটা শেওলা ব্যবহার করে তৈরি করা হতো হাজার হাজার মণ চিনি। যা রপ্তানি করা হতো ইউরোপের দেশে। সে সময় গাছিদের কদর ছিল দারুণ। খেজুরগাছ কাটা মৌসুমে খেজুর বাগানেই বাঁধা হতো ছোট কুঁড়েঘর। সেখানেই চলত গাছিদের খাওয়া-দাওয়া, রাত্রিযাপন। খেজুরগাছ কাটা শুরু হতো দুপুরের পর থেকেই। ভোর থেকে রসের ভাঁড় নামিয়ে তা বাইন বা চুলায় চড়িয়ে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি হতো। ৫ মাস গাছিরা পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কাটাতেন। রাতে অবসর বিনোদনের জন্য কুঁড়েঘরের পাশে আগুন জ্বালিয়ে বসতো কবিগানের আসর। গাছিদের ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ নিয়ে পুথিসাহিত্যেও কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিয়েছেন- শীতে খেজুরের রস অথবা পোকা-মাকড়ে বা বাদুড় বা পাখিতে আধ-খাওয়া ফল না খেতে। নিতান্ত যদি রস খেতে হয় তা ভালো করে ফুটিয়ে খেতে হবে। তারা আশঙ্কা করছেন, শীতে কাঁচা খেজুরের রস ও বাদুড় বা পাখিতে আধ-খাওয়া যে কোনো ফল খেলে বাংলাদেশ, ভারতসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে নিপাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। করোনার মধ্যে নিপাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে সেটি হবে আরো ভয়াবহ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ- খেজুরের রস কাঁচা খাওয়ার পরিবর্তে বাণিজ্যিকভাবে এ রসের গুড় উৎপাদনে নজরদারি বাড়াতে হবে।

লেখক: ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে