বিশ্ববাজারে বাঁশ পণ্যের চাহিদা বাড়ছে রপ্তানিতে বিপুল আয়ের সম্ভাবনা

বিশ্ববাজারে বাঁশ পণ্যের চাহিদা বাড়ছে রপ্তানিতে বিপুল আয়ের সম্ভাবনা

বাঁশের তৈরি রকমারি পণ্য আমাদের আদি ঐতিহ্য। কখনো প্রয়োজন, কখনো শৈল্পিক সামগ্রী- দুই-ই মেটাতে সক্ষম বাঁশজাত পণ্য। বাঁশের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ৫০ ধরনের ফার্নিচার তৈরিতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। বিশ্ববাজারেও বাঁশের তৈরি পণ্যের চাহিদা রয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি শুরু করেছে দেশের বেশ কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠান। বাঁশের তৈরি বেড়া দিয়ে মরুভূমিতে ঘর তৈরি করা হচ্ছে। বাঁশ শিল্পের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। অবহেলায় বেড়ে ওঠা বাঁশের প্রতি একটু নজর দিলে এ থেকে বছরে কোটি কোটি ডলার আয় হতে পারে। চীন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঁশ ও বাঁশজাত পণ্য রপ্তানি করে বিপুল অর্থ আয় করছে। বাঁশের ফার্নিচার ও আসবাবপত্র পরিবেশবান্ধব।

বাংলাদেশে বাঁশের তৈরি নিত্যব্যবহার্য বিভিন্ন হস্তশিল্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। উত্তরা ইপিজেডে তৈরি হচ্ছে বাঁশের কফিন- যা রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপে। রপ্তানি হচ্ছে বাঁশের বাঁশি। কাগজ তৈরি হচ্ছে বাঁশ দিয়ে। বাঁশের তৈরি পণ্য পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই টেকসই বাঁশ উৎপাদনের মাধ্যমে কাঠের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে এগুলো রপ্তানির মাধ্যমে বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। টেকসই বাঁশ দিয়ে তৈরি আসবাবপত্র সহজে ঘুণে ধরে না। এটা কাঠের চেয়ে অনেক টেকসই এবং সুন্দর। এর বিকাশের জন্য প্রয়োজন টেকসই বাঁশের উদ্ভাবন এবং এর বাণিজ্যিক চাষাবাদ।

বিএফআরআই সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সাল থেকে বাঁশের নানামুখী ব্যবহার ও দৃষ্টিনন্দন ফার্নিচার তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করছে। দীর্ঘ একযুগ প্রচেষ্টার পর বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনের দরজা, আলমারি, ওয়্যারড্রোব, ডাইনিং সেট, খাট, শোকেস, সোফা সেট, ড্রেসিং টেবিল, পার্টিকেল বোর্ড, বেড, মেঝে ও দেয়ালের টাইলসসহ সব ধরনের ফার্নিচার বানাতে সক্ষমতা অর্জন করেছে বিএফআরআই।

সবচেয়ে লম্বা ঘাস, দ্রম্নত বর্ধনশীল চিরহরিৎ উদ্ভিদ হলো বাঁশ। বাঁশ মানুষের জন্ম থেকে মৃতু্য পর্যন্ত কাজে লাগে। গ্রামীণ গৃহের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান বাঁশ। বাঁশের শতাধিক প্রজাতি রয়েছে এবং পূর্ব, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অংশে বড় আকারে এরা বেড়ে ওঠে। বাঁশ গাছ সাধারণত একত্রে গুচ্ছ হিসেবে জন্মায়। এশিয়াতে ঐতিহাসিক কাল থেকে বাঁশের ব্যবহার শিকড় সংস্কৃতি ও সভ্যতায় বিসৃতি রয়েছে। বিশ্বে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ বাঁশের তৈরি বাড়িতে বাস করেন। বাঁশ উৎপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীতে অষ্টম। বাংলাদেশে ৩৩ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। ৫০০ প্রজাতির বাঁশ নিয়ে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে চীন। ২৩২ প্রজাতি নিয়ে ব্রাজিল রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। ১৩৯ প্রজাতি নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে জাপান।

বাঁশ প্রথম দিকের মানুষের দ্বারা তৈরি প্রথম উপকরণগুলোর মধ্যে একটি। সভ্যতার বিকাশ ঘনিষ্ঠভাবে বাঁশের উপকরণগুলোতে দক্ষতার বৃহত্তর মাত্রা বিকাশের সঙ্গে জড়িত ছিল। কাঠের কাজ করার মতোই বাঁশ মূলত বাঁশের নির্মাণ, বাঁশের টেক্সটাইল, বাঁশ এবং বাঁশের বাদ্যযন্ত্র, বাঁশের বুনন এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নানা কাজে ব্যবহার করা হয় বাঁশ। এমনকি, বাঁশ থেকে আচারসহ নানা ধরনের খাবারও তৈরি হয়। রাস্তা তৈরিতেও ব্যবহার করা হয় বাঁশ। বাঁশের তৈরি সেতুও রয়েছে। সেই সেতু ১৬ টন পর্যন্ত ভার নিতে সক্ষম।

বিভিন্ন রোগ সারাতেও ব্যবহার করা হয় বাঁশ। চীনে কিডনির রোগে আক্রান্তদের সুস্থ করে তুলতে ব্যবহার করা হয় বাঁশ। এমনকি, ক্যানসার আক্রান্তদের দেওয়া হয় বাঁশের পাতা ও শিকড় থেকে তৈরি ওষুধ। ইন্দোনেশিয়ায় হাড়ের রোগ সারাতে পানি করতে দেওয়া হয় বাঁশের ভেতরে জমে থাকা পানি। সদ্য অঙ্কুরিত বাঁশের চারাকে কোড়ল বলা হয়। হালকা হলুদ এবং সবুজের মিশ্রণে এটি দেখতেও বেশ। কোড়ল খুব নরম ও আর্দ্র। বাংলাদেশে সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি আদিবাসীরা এটি বেশি খেয়ে থাকেন। তবে ভারতের মেঘালয়, আসাম ও হিমাচল প্রদেশ, নেপাল, ভুটান, চীন, কোরিয়া ও জাপানে বাঁশের কোড়ল খুব জনপ্রিয়। বাঁশের কোড়লে রয়েছে উপকারী সব উপাদান- যা দেহের কোলেস্টরেলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। রক্তচাপ রাখে নিয়ন্ত্রণে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। হাঁপানি, ডায়াবেটিস, তীব্র জ্বর, মূর্ছা যাওয়া, মৃগী রোগ ইত্যাদি নিরাময়ে যথেষ্ট উপকার করে বাঁশ।

বাঁশ থেকে জামাকাপড়ও তৈরি করা যায়। বাঁশ থেকে তৈরি টি-শার্ট, মোজা, অন্তর্বাস বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। শুধু পোশাকই না, বাঁশের গয়নাও বেশ জনপ্রিয়। বাঁশ থেকে তৈরি হয় কানের দুল, হার, বালার মতো গয়না। বাঁশ ব্যবহার করে তৈরি নানা খাবারও বেশ জনপ্রিয়। শুধু চীন, জাপানের মতো দেশগুলোতেই নয়, ভারতেও বাঁশের তৈরি খাবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাঁশ অন্যান্য গাছপালার চেয়ে বেশি পরিমাণে অক্সিজেন উৎপন্ন করে এবং বেশি মাত্রায় কার্বন ডাই-অক্সসাইড নেয়। নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয় রোধে বাঁশের রয়েছে বিশাল ক্ষমতা।

বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় আসবাবপত্রও। বাঁশের তৈরি খাট, চেয়ার, টেবিল বেশ টেকসই। বাঁশ দিয়ে এখন ডায়াপারও তৈরি করা হচ্ছে। জাপানের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ৫০ বার ধোয়ার পরেও ভালো থাকে বাঁশ দিয়ে তৈরি ডায়াপার। বাঁশ দিয়ে বাচ্চাদের নানা খেলনাও তৈরি হয়। অনেকেই পস্নাস্টিকের খেলনার বদলে বাচ্চাদের বাঁশ দিয়ে তৈরি খেলনা উপহার দেন। জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবিলা ও ভূমিক্ষয় রোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বাঁশঝাড়। কম বিনিয়োগে বাঁশ চাষে বেশি লাভ হয়। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এই বাঁশ। জলবায়ুসহিষ্ণু ও দেশের আবহাওয়া উপযোগী এসব বাঁশ পাহাড়ধস, ভূমিক্ষয় ও নদীভাঙন রোধে কাজ করে।

জন্ম থেকে মৃতু্য পর্যন্ত কাজে লাগে বাঁশ। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই বাঁশ পাওয়া যায়। বাঁশের প্রতি একটু নজর দিলে এ থেকে বছরে কোটি কোটি ডলার আয় হতে পারে। মধ্য আমেরিকার ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র জ্যামাইকা টেকসই বাঁশ উৎপাদন ও বিপণনের মাধ্যমে করোনায় বিপর্যস্ত তাদের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। কাঠের বিকল্প হিসেবে বাঁশের সজ্জা এবং অন্যান্য সরঞ্জাম তৈরি করে দেশটি ইতোমধ্যে বছরে ১.৫ মিলিয়ন ডলার আয় করছে। আগামী এক দুই বছরের মধ্যে এ আয় তিনগুণ থেকে চারগুণে পৌঁছবে। এ ছাড়া চীনও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঁশ ও বাঁশজাত পণ্য রপ্তানি করে বিপুল অর্থ আয় করছে। বাঁশ যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি এটি অত্যন্ত অর্থকরীও বটে। গাছের ওপর চাপ কমানোর জন্য বাঁশের তৈরি ফার্নিচারে ঝুঁকছে উন্নত বিশ্ব।

বিএফআরআই বাঁশের নতুন নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন করছে। এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছে 'বাঁশের সংগ্রহশালা'। ৩৩ প্রজাতির বাঁশ নিয়ে গড়ে ওঠা এই বিশাল সংগ্রহশালায় জলবায়ু সহিষ্ণু আরও ৬টি নতুন প্রজাতির বাঁশের জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে বিএফআরআই। বাঁশের এই সংগ্রহশালায় গ্রামীণ ও পাহাড়ি বাঁশ মিলিয়ে মোট ৩৩ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি প্রজাতি গ্রামীণ এবং ৭টি পাহাড়ি বাঁশ। এই ৩৩ প্রজাতি হলো- বরাক, কাঁটা, বিষকাঁটা, মিরতিঙ্গা, বেথুয়া, কনক কাইচ, তেঁতুয়া, চৈই, মাকলা বা মিতিঙ্গা, ফারুয়া, করজবা, মিরতিঙ্গা, বাইজ্জ্যা, স্বর্ণ, ঘটি, হেজ, ব্রান্ডসি, ভুদুম, পেঁচা, ওরা, মেম্রবা, লাঠি, কালি, টেন্ডু, কালা, লতা, মুলী, ডলু, থাই, রেঙগুন, তলস্না প্রজাতি, ওয়াপ্পি এবং চায়না প্রজাতি। ঝোপঝাড়ে থাকলেও বাঁশের রয়েছে অনেক গুণ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে