আমড়া চাষে সহজেই স্বাবলম্বী

আমড়া চাষে সহজেই স্বাবলম্বী

আমড়া, আমড়া, মিষ্টি আমড়া; বরিশালের আমড়া। নৌ, সড়ক কিংবা রেলপথে রওয়ানা হলে হকারদের এসব শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে মাঝরাত পর্যন্ত চলে ওদের ডাকাডাকি। কিছুটা বিরক্ত লাগে। তবে কাঠিতে বসানো আমড়া নিয়ে যখন আশপাশে ছুটাছুটি করে তখন জিবে জল রাখা দায়। ফলগুলোকে ওরা বিশেষভাবে কেটে পরিবেশন করে। দেখতে দারুণ! এক বিশেষ আকর্ষণ। মনে হবে, এ যেন শিল্পীর কারুকাজ। লুফে নিতে ইচ্ছে করবে বার বার।

আমড়া বাঙালির অতি প্রিয় একটি ফলের নাম। টক-মিষ্টি মিশ্রণে ভিন্ন এক স্বাদ। কচি অবস্থায় টক। পরিপক্ব হলে খেতে বেশ লাগে। পাকা ফল খুবই মিষ্টি। আমড়ার সিংহভাগ কাঁচা খাওয়া হলেও ভর্তা, আচার, চাটনি আর পরিপক্ব ফল দিয়ে তৈরি করা যায় জুস, জেলি এবং মোরব্বার মতো লোভনীয় খাবার। গ্রামাঞ্চলের কেউ কেউ গোশতের সঙ্গে আমড়া রেঁধে খান। ডালের সঙ্গেও খাওয়া যায়। আমড়ার শাঁস সাদা। পাকলে হলুদ রঙ ধারণ করে। যে কারণে একে গোল্ডেন আপেল বলে। আমড়ায় তেমন কোনো রোগ বা পোকার আক্রমণ হয় না। উৎপাদন খরচ কম পড়ে। অন্য যে কোনো ফলের চেয়ে আমড়া বেশি সময় ধরে সংরক্ষণ করা যায়। এতে কোনো ধরনের রাসায়নিক পদার্থও ব্যবহার করতে হয় না। তাই এ ফল স্বাস্থ্যসম্মতও। কৃষকরা আমড়া চাষ করে সহজেই হতে পারেন স্বাবলম্বী।

আমড়া সারাদেশেই চাষ করা যায়। তবে বরিশালের আমড়া সারাদেশে নামকরা। দক্ষিণাঞ্চলের মাটি ও পানির জন্য এর ফলন ও গুণগতমান কাঙ্ক্ষিত হয়। আমড়া ল্যাটিন আমেরিকার স্থানীয় ফল হলেও বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চাষাবাদ বেশি হচ্ছে। প্রসিদ্ধ হিসেবে সবাই বরিশালের আমড়া বললেও আসলে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিকে (নেছারাবাদ) আমড়ার রাজধানী বলা যায়। কারণ, ওখানকার ফলন হয় সবচেয়ে বেশি। যদিও ঝালকাঠি সদরে রয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ আমড়ার বাগান। বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী এবং বরগুনায়ও আমড়া ভালো জন্মে। এসব এলাকায় পেয়ারার পাশাপাশি আমড়া চাষ হয় সমানতালে। বর্ষামৌসুমে ওখানকার নিচু জমিগুলো জোয়ারের পানিতে পস্নাবিত হওয়ার কারণে স্থানীয় কৃষকরা উঁচু করে কান্দি বা বেড তৈরি করেন। এ পদ্ধতিকে সর্জান বলে। দুই বেডের মাঝখানে প্রশস্ত নালা থাকে, যাতে ছোট নৌকাযোগে ফল সংগ্রহ করতে সহজ হয়। চাষিরা গাছ থেকে আমড়া সংগ্রহ করে নিয়ে যান ভাসমান হাটে। সেখানে আমড়া কেনার জন্য শত শত ট্রলারসহ পাইকারি বিক্রেতারা আসেন দলেদলে। ওখান থেকে সরবরাহ করা হয় সারাদেশে। এসব হাটের মধ্যে ঝালকাঠি সদরের ভিমরুলি, বাউকাঠি, নবগ্রাম এবং নেছারাবাদের আটঘর, কুড়িয়ানা, জিন্দাকাঠি, আদমকাঠি, ধলহার অন্যতম।

আমড়ায় পুষ্টিগুণে টইটম্বুর। ভিটামিন-সি'র পাশাপাশি রয়েছে প্রচুর পরিমাণ লৌহ। লৌহের অভাবে আমাদের রক্তস্বল্পতার সৃষ্টি হয়। যদিও প্রাথমিক অবস্থায় এ উপসর্গ দেখা দেয় না। অভাব বেশি হলেই কেবল শারীরিক দুর্বলতা, অল্প পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, ঘন ঘন অসুস্থতা এসবের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তখন বড়দের কর্মক্ষমতা কমে যায়। অপরদিকে, শিশুদের মস্তিষ্ক হয় বাঁধাপ্রাপ্ত। ফলে স্কুলের পড়া সহজে শিখতে পারে না। অথচ বাচ্চাসহ বড়রা লৌহসমৃদ্ধ অন্য খাবারের পাশাপাশি আমড়া খেলে এসব সমস্যা এড়ানো সম্ভব। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, এর প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে (আহারোপযোগী) শর্করা ১৫ গ্রাম, আমিষ ১ দশমিক ১ গ্রাম, চর্বি ০ দশমিক ১ গ্রাম, খনিজ পদার্থ ০ দশমিক ৬ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৫৫ মিলিগ্রাম, লৌহ ৩ দশমিক ৯ মিলিগ্রাম, ক্যারোটিন ৮০০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-'বি১' ১০ দশমিক ২৮ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-'বি২' ০ দশমিক ০৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-'সি' ৯২ মিলিগ্রাম এবং খাদ্যশক্তি রয়েছে ৬৬ কিলোক্যালরি।

কফ ও পিত্ত নিবারণের পাশাপাশি মুখে রুচি আনা এবং কণ্ঠস্বর পরিষ্কারে এর ভূমিকা রয়েছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, এমনকি ইনফ্লুয়েঞ্জার জীবাণুকে প্রতিরোধ করে। দাঁতের মাড়ি শক্ত রাখে। দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত ও পুঁজপড়া বাধা দেয়। স্ট্রোক এবং হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ করে। পেকটিনজাতীয় আঁশ থাকায় বদহজম, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্যে দূরীকরণে সহায়তা করে। মুখের রুচি বাড়ায়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় আমড়া ক্যান্সার প্রতিরোধক। ভাইরাল ইনফেকশনের বিরুদ্ধে কাজ করে। রক্ত আমাশয় হলে আধা কাপ পানিতে ৩/৪ গ্রাম আমড়ার কষ, সেই সঙ্গে ১ চা-চামচ গাছের রস এবং একটু চিনি মিশিয়ে খেতে হবে। ব্রণ, ফুস্কুড়ি কমাতে এবং ত্বক মোলায়েম ও উজ্জ্বল রাখতে এর অবদান বেশ। আমড়ার পাতা, ছাল, শিকড় এবং বীজে ঔষধিগুণ আছে। পাতার তৈরি 'চা' জ্বর ও শরীরের ব্যথা দূর হয়। চা বানানোর জন্য পাতাগুলো ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকানোর পর গুঁড়া করে ব্যবহার করতে হবে। গাছের ছাল ছত্রাকজনিত সংক্রমণ প্রতিহত করার উপাদান রয়েছে। ফলের বীজ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এর শিকড় প্রজননজনিত রোগ নিরাময়ে অবদান রয়েছে। আমড়ায় গর্ভপাত হওয়ার উপাদান থাকায় গর্ভবতী নারীদের এ ফল খাওয়া নিষেধ। ডায়াবেটিস রোগীরা কাঁচা আমড়া খেতে পারবেন।

বাংলাদেশে দু'প্রজাতির আমড়া চাষ হয়। দেশি এবং বিলাতি। বিলাতি আমড়ার অপর নাম বরিশালের আমড়া। দেশি আমড়ার আদিস্থান দেশের পূর্বাঞ্চল, ভারতের আসাম এবং মিয়ানমার। আর বিলাতি আমড়ার মাতৃভূমি ফিজি আইল্যান্ড। বিদেশ থেকে আনার হয়, তাই বিলাতি আমড়া। দেশি আমড়া খেতে টক, বিচি বড়। ফলন গাছপ্রতি ২০০-২৫০ কেজি। বিলাতি আমড়া খেতে মিষ্টি, বিচিও ছোট। ফলন হয় ৩০০-৪০০ কেজি। ভালো ফলনের জন্য আমড়ার উচ্ছফলনশীল জাত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বারি আমড়া-১ এবং বারি আমড়া-২। বারি আমড়া-১ বারোমাসি। গাছ বামনাকৃতির হয়। ফলের আকার ছোট। গড় ওজন ৬০ গ্রামের মতো। স্বাদ হালকা টক। তাই বাড়ির ছাদেও লাগানো যায়। স্বরূপকাঠির চাষিদের থেকে সংগ্রহ করে বারি আমড়া-২ উদ্ভাবন করা হয়েছে। গাছ বড় আকৃতির। খেতে সুস্বাদু। আকারেও বড়। ফল একবার ধরে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি জাত উদ্ভাবন করেছে। নাম এফটিআইপি বাউ আমড়া-১।

সাধারণত বীজের মাধ্যমে আমড়ার বংশবিস্তার হয়। চারা তৈরির জন্য পরিপক্ব ফলের শাঁস ছাড়িয়ে বালিতে রোপণ করতে হবে। চারা গজানোর পর টবে কিংবা পলিথিনের পাত্রে স্থানান্তর করতে হয়। টবের মাটি অবশ্যই জৈব সার মিশ্রিত হওয়া চাই। মাতৃগুণ বজায় রাখা, দ্রম্নত ফল ধরা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং অধিক ফলন পেতে অঙ্গজ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। আর তা হতে পারে জোড় কলমের মাধ্যমে।

যত্নই রত্ন মেলে। অন্য ফসলের ন্যায় আমড়ার ভালো ফলন পেতে যত্ন নেয়া দরকার। তাই গাছের গোড়া এবং আশপাশে আগাছামুক্ত রাখতে হবে। খাদ্য তৈরির জন্য পানি গাছের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। সেজন্য শীত মৌসুমে এবং অন্য সময় খরা দেখা দিলে গাছের গোড়ায় পানি দিতে হবে। তেমনি বর্ষায় পানিতে যাতে জলাবদ্ধতা না হয়, সেজন্য দ্রম্নত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। গাছের মরা ডাল কিংবা অবাঞ্ছিত অংশ ছেঁটে দিতে হয়। ডালের সংখ্যা অতিরিক্ত হলে কিছু কেটে পাতলা করতে হবে যেন পর্যাপ্ত আলো বাতাস পাওয়া যায়। গরু-ছাগলের আক্রমণ হতে রেহাই পাওয়ার জন্য চারা অবস্থায় গাছের চারদিকে বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশি আমড়ার গড় ফলন গাছপ্রতি ২০০-২৫০ কেজি। আর বিদেশি আমড়ার ফলন হয় ৩০০-৪০০ কেজি। আমড়া গাছ ৪-৫ বছর পর থেকে ফল দেয়া শুরু করে। একাধারে ২৫-৩০ বছর পর্যন্ত ভালো ফল দেয়। এরপর ফলন কমতে থাকে। বারোমাসি গাছের বয়স ২-৩ বছর হলেই ফল পাওয়া যায়। 'ফল খাই বল পাই' এ কথা সবাই জানি। তারপরও প্রয়োজনমতো খাওয়া হয় না। অসচেতনতা আর প্রাপ্তির অভাবই এর কারণ। তবে পর্যাপ্ত সুযোগ আছে। শুধু প্রয়োজন ইচ্ছেশক্তি এবং পরিকল্পনা। আপনার পছন্দমতো যে কোনো ফল বাগান তৈরি করতে পারেন। চাষাবাদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পাশে আছেন উপজেলা কৃষি অফিসার, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। তাই আসুন, প্রতিটি বসতবাড়িতে অন্য ফলের পাশাপাশি দু'একটি হলেও আমড়াগাছ লাগাই। অপরকেও করি উৎসাহিত।

লেখক :কৃষি তথ্য সার্ভিস ও পরিচালক, কৃষি বিষয়ক আঞ্চলিক অনুষ্ঠান, বাংলাদেশ বেতার, বরিশাল

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে