বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

পুষ্টিগুণে ভরা তাল

ম সাজ্জাদ হোসেন শাওন
  ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০
পাকা তালের রস দিয়ে নানা রকম পিঠা-পায়েস তৈরি হয় বাঙালির ঘরে ঘরে। কচি অবস্থায় তালের বীজও খাওয়া যায়। যা তালশাঁস নামে পরিচিত। তালগাছের কান্ড থেকে রস সংগ্রহ করে তা দিয়ে পায়েস, গুড়, পাটালি, মিছরি ইত্যাদি তৈরি হয়। পুষ্টিগুণে ভরা তাল। তালে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস আছে যা দাঁত ও হাড়ের ক্ষয় প্রতিরোধে সহায়তা করে। এন্টি-অক্সিডেন্ট গুণসমৃদ্ধ হওয়ায় তাল ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম। এছাড়া স্বাস্থ্য রক্ষায় ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও তাল বেশ উপকারী। তালে আছে ভিটামিন-বি, তাই ভিটামিন-বি এর অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধে তাল ভূমিকা রাখে। \হপাকা তাল যেমন উপকারী, তেমনি কাচা তালের শাঁস খেতেও ভারী মজা এবং উপকারি। তালগাছ দিয়ে নৌকা ও আসবাবপত্র তৈরি হয়। তাল গাছ পরিবেশবান্ধব। তাল গাছ বজ্রনিরোধ করে থাকে। ভাদ্র মাসে মূলত দেশে তাল পাকে। তবে আশ্বিন মাস পর্যন্ত তাল পাওয়া যায়। আমাদের দেশে তাল অতিপরিচিত একটি ফল। এই সময়ে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ তালে রয়েছে ভিটামিন এ, বি, সি, জিংক, পটাশিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়ামসহ আরও অনেক খনিজ উপাদান। এর সঙ্গে আরও আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি উপাদান। পাকা তালের প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যযোগ্য অংশে রয়েছে খাদ্যশক্তি ৮৭ কিলোক্যালরি, জলীয় অংশ ৭৭.৫ গ্রাম, আমিষ .৮ গ্রাম, চর্বি .১ গ্রাম, শর্করা ১০.৯ গ্রাম, খাদ্য আঁশ ১ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৭ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৩০ মিলিগ্রাম, আয়রন ১ মিলিগ্রাম, থায়ামিন .০৪ মিলিগ্রাম, রিবোফ্লাভিন .০২ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন .৩ মিলিগ্রাম ও ভিটামিন সি ৫ মিলিগ্রাম। তাল খাওয়ার নানা উপায় আছে। তবে পাকা তালের রস জ্বাল দিয়ে ঘন করে খেয়ে থাকেন অনেকে। এর সঙ্গে নারিকেল, দুধ, চিনি, কলা ইত্যাদি মিশিয়ে আরও নানা স্বাদের খাবার তৈরি হয়। তালের রস ও চিনি দিয়ে বানানো হয় তালসত্ত্ব। এটি রোদে শুকিয়ে সারা বছর খাওয়া যায়। অনেকে ভাত ও দুধের সঙ্গে এই তালসত্ত্ব খেয়ে থাকেন। তালের রস দুধ, চিনি দিয়ে জুস বানানো যায়। তাল যেহেতু ভাদ্র মাসে পাকে, সেই সময়ের গরমে এই জুস খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। তালের ঘন নির্যাসের সঙ্গে ডিম, চালের গুঁড়া, গুড় বা চিনি এবং কখনো নারিকেল দিয়ে তালের পিঠা তৈরি করা হয়। গ্রামগঞ্জে এই পিঠার ঐতিহ্য রয়েছে। তালের পিঠার সুন্দর সুবাস রয়েছে। কেকের সব উপকরণের সঙ্গে তালের রস মিশিয়ে কেক বানানো হয়। এর রং খুবই আকর্ষণীয় হয়। তালের কেকের মধ্যে চিনি কম এবং ডিমের সাদা অংশ ব্যবহার করলে ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌ রোগীদের জন্য ভালো খাবার হতে পারে। চিনি, দুধ, নারিকেল যোগ করে তালের রস জ্বাল দিয়ে তার সঙ্গে চালের গুঁড়া বা আটা মিশিয়ে কলাপাতায় খামির রেখে চুলায় সেকে নিয়েও খেতে দেখা যায়। এ ছাড়া তালের রুটিও একটি মজাদার নাশতা। তাল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণসমৃদ্ধ হওয়ায় ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম। এ ছাড়া স্বাস্থ্য রক্ষায়ও তাল ভূমিকা রাখে। স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে। তাল ভিটামিন-বি এর আধার। তাই ভিটামিন-বি এর অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধে তাল ভূমিকা রাখে। কোষ্ঠকাঠিন্য ও অন্ত্রের রোগ ভালো করতে তাল ভালো ভূমিকা রাখে। কচি অবস্থায়ও তাল খাওয়া যায়, যাকে বলে তালের শাঁস। কচি তালের শাঁস খেতেও ভারী মজা, উপকারিতাও কম নয়। আবার শীতের শুরুতে তাল গাছের কান্ড থেকে রস সংগ্রহ করেও তৈরি করা পায়েস, গুড়, পাটালি ইত্যাদি। কচি তালের শাঁস বা পাকা তালের রস, ২ অবস্থায়ই তালের পুষ্টিগুণ অনেক। পাকা তালের রস থেকে তৈরি তালমিছরি সর্দি কাশির মহৌষধ, যকৃতের দোষ নিবারক ও পিত্তনাশক। কচি তালের শাঁসের ১০০ গ্রাম খাদ্যযোগ্য অংশে আছে, খাদ্যশক্তি ২৯ কিলোক্যালরি, জলীয় অংশ ৯২ দশমিক ৩ গ্রাম, শর্করা ৬ দশমিক ৫ গ্রাম, খাদ্য আঁশ শূন্য দশমিক ২ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৪৩ গ্রাম, ভিটামিন-সি ৪ মিলিগ্রাম। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে আমাদের খাদ্য তালিকা ঠিক রাখতে হবে- কারণ খাদ্যাভ্যাস আমাদের শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করে। কচি তালের শাঁসে আছে প্রায় ৯৩ শতাংশ জলীয় অংশ। এছাড়াও এতে আছে জেলাটিন, যা খাওয়ার পর পেট ভরে যাওয়ার মতো অনুভূতি দেয় এবং ক্ষুধাভাব কমিয়ে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শরীরের কোষের মধ্যে ইলোকট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখতে কচি তালের শাঁস খুবই উপকারী। বমি ভাব বা ডায়রিয়ায় আক্রান্তদের জন্য এটি বেশ উপকারী একটি খাবার। বাতের ব্যথা দূর করতে তালের রস বেশ উপকারী। আপনি যদি প্রতিদিন ১০০ গ্রাম তাল কোনো চিনি ও পানি না মিশিয়ে খান তবে আপনার বাতের ব্যথা ধীরে ধীরে অনেকাংশে উপশম হবে। লো গস্নাইসেমিক ইনডেক্স হওয়ার কারণে তালের রস কৃত্রিম চিনির একটা স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে। যা ডায়াবেটিসের সূত্রপাত প্রতিরোধে সাহায্য করে। খেজুরের গুড় খাওয়ার ফলে রক্তে খুব বেশি মাত্রায় শর্করা বৃদ্ধি পায় না বলে জানা গেছে। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের কম মাত্রায় খেজুরের চিনি বা গুড় খাওয়া উচিত। অনেকের বুক ধড়ফড়ের সমস্যা রয়েছে। ৩ বা ৪ চামচ তালের রস দুধের সঙ্গে মিশিয়ে সকাল বিকাল কয়েকদিন খেলে বুক ধড়ফড়ানি কমে যায়। ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে তাল অনেক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে এই গরমে ঘামাচির সমস্যায় তালের রস অনেক উপকারী। এছাড়াও তাল আমাদের চুলকানি এবং চিকেন পক্স নিরাময়ে কাজ করে। একই সঙ্গে তালের রস খেলে আমাদের ত্বকের ব্রণ এবং অ্যালার্জিজনিত সমস্যা কমে যায় এবং ত্বককে উজ্জ্বল করে তোলে। তালে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় এটি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে থাকে। একই সঙ্গে এটি ক্যানসারের মতো মরণ ব্যাধি রোগ থেকে আমাদের বাঁচায়। তাল আমাদের স্মৃতিশক্তি ভালো রাখে এবং শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষা করে থাকে। তাল আমাদের হজম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে এবং হজমে সহায়ক বিভিন্ন এসিড ক্ষরণে সাহায্য করে। এতে আমাদের মল নরম হয় এবং সহজেই শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। পেটের জ্বালাপোড়া দূর করতে ভীষণ কার্যকরী পাকা তালের রস। গরমে হাইট্রেড থাকতে ভালো কাজ করে তাল। এছাড়াও এসিডিটির সমস্যা দূর করতে তালের রস খুবই উপকারী।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে