শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

হরীতকীর যতগুণ

হরীতকীর স্বাদ তিতা হলেও গুণে অনন্য। এটি ট্যানিন, ফ্রুক্টোজ, বিটা সাইটোস্টেরল, অ্যামাইনো এসিড এবং সাকসিনিক এসিডসমৃদ্ধ ফল। হরীতকীতে এনথ্রাইকুইনোন উপাদান থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে কাজ করে। আখের গুড়ের সঙ্গে হরীতকীর গুঁড়ার শরবত বানিয়ে নিয়মিত খেলে বাত রোগের উপকার পাওয়া যায়। দেহের রক্ত পরিষ্কার করে উচ্চচাপ নিয়ন্ত্রণে আনে
ম নাহিদ বিন রফিক
  ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০
ত্রিফলার মধ্যে হরীতকীর স্থান শীর্ষে। কেউ আবার একে মায়ের সঙ্গে তুলনা করেন। যদিও গর্ভধারিণী মা অতুলনীয়। এর প্রচলিত নাম হওকী। হরীতকী পাতাঝরা সপুষ্পক উদ্ভিদ। গাছের উচ্চতা সাধারণত ৬০ থেকে ৮০ ফুট। কমবেশিও হতে পারে। পাতার বর্ণ সবুজ, আকার লম্বা-চ্যাপ্টা এবং কিনারা চোখা। গাছের বাকল গাঢ় বাদামি রঙের হয়। ফেব্রম্নয়ারি-মার্চে গাছে ফুল ফোটে আর পরিপক্ব হয় ডিসেম্বর-মে মাসে। ফুলের রং সাদাটে। আকার ছোট। কাঁচা ফল দেখতে সবুজ, তবে পাকলে হালকা হলুদ হয়। শুকালে কালচে খয়েরি রং ধারণ করে। ফলের ত্বক খুব শক্ত এবং কুঁচকানো থাকে। বাংলাদেশ ও ভারতে এর আদি নিবাস। আমাদের দেশে প্রায় সব গ্রামাঞ্চলে এ গাছ দেখা যায়। বিভিন্ন জাতের হরীতকীর মধ্যে রোহিনী, অমৃতা, বিজয়া এবং জাবন্তী অন্যতম। রোহিনীর ফল আকারে গোল এবং ছোট, তবে সে অনুপাতে বিচি বা দানা বড়। ওজনেও ভারী। অমৃতার ভেতরে শাঁসে ভরা থাকে। দানার আকার ছোট হয়। বিজয়া দেখতে লাউয়ের মতো। আর জাবন্তী খুব ছোট আকারের হয়। এর শরীরে ৩টি শিরা থাকে। হরীতকীর ফল পরিপক্ব হলে গাছতলা থেকে ঝরা ফল সংগ্রহ করা যায়। বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতার হার কম। হরীতকীর স্বাদ তিতা হলেও গুণে অনন্য। এটি ট্যানিন, ফ্রুক্টোজ, বিটা সাইটোস্টেরল, অ্যামাইনো এসিড এবং সাকসিনিক এসিডসমৃদ্ধ ফল। হরীতকীতে এনথ্রাইকুইনোন উপাদান থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে কাজ করে। এজন্য ২ চা চামচ হরীতকীর গুঁড়া সে সঙ্গে ২ গ্রাম দারুচিনি কিংবা লবঙ্গগুঁড়া এবং পরিমাণমতো বিট লবণ এক গস্নাস পানির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে রাতে ঘুমানোর আগে খেতে হবে। আখের গুড়ের সঙ্গে হরীতকীর গুঁড়ার শরবত বানিয়ে নিয়মিত খেলে বাত রোগের উপকার পাওয়া যায়। দেহের রক্ত পরিষ্কার করে উচ্চচাপ নিয়ন্ত্রণে আনে। সে সঙ্গে অন্ত্রের খিঁচুনি কমায়। এলার্জি সারাতে হরীতকী ভালো কাজ করে। এজন্য হরীতকী চূর্ণ পানিতে ফুটিয়ে নিয়মিত পান করতে হবে। হরীতকীর গুঁড়া এক সপ্তাহ খেলে অর্শরোগ ভালো হয়। মুখ ফুলে গেলে কিংবা গলা ব্যথা হলে এর চূর্ণ গরম পানিতে ফুটিয়ে মুখে 'গড়গড়া' করলে আরাম পাওয়া যায়। এছাড়া হাঁপানি, কফজ্বর, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, অধিক ওজন, দাঁতের ব্যথা, পাইলস ও ক্ষত রোগের জন্য হিতকর। শুধু কী তাই! রূপচর্যায়ও অবদান কম নয়। খাঁটি ঘি গরম করে, সে সঙ্গে হরীতকী চূর্ণ মিশিয়ে নিয়মিত খেলে দেহে লাবণ্য বাড়ে। নারকেলতেলের সঙ্গে এর গুঁড়া মিশ্রণ করেও শরীরে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা যায় স্বাদের মোরব্বা। এক্ষেত্রে কাঁচা ফল ভালোভাবে পরিষ্কার করে পানিসহ সিদ্ধ করতে হয়। এ কাজ পরপর ৫ থেকে ৬ বার করা দরকার। এতে ফলের কষ বেরিয়ে যাবে। পরে পরিমাণমতো চিনির সঙ্গে পানি মিশিয়ে ঘন করে জ্বাল দিতে হবে। এরপর এগুলো ৩ থেকে ৪ দিন রেখে দিলেই হয়ে যাবে হরীতকীর মোরব্বা। এবার রুচিমতো খাওয়া এবং অপরকে পরিবেশন। শরীরের রোগ নিরাময়ে আমরা ওষুধ সেবন করি। এতে উপকারের পাশাপাশি কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকে। তবে ভেষজপণ্যের পুরোটাই হিতকর। তাই আসুন, রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য বসতবাড়িতে অন্যান্য ভেষজবৃক্ষের পাশাপাশি অন্তত একটি করে হরীতকী গাছ লাগাই। এই কাজে অপরকেও করি উৎসাহিত। লেখক: টেকনিক্যাল পার্টিসিপেন্ট, কৃষি তথ্য সার্ভিস ও পরিচালক, কৃষি বিষয়ক আঞ্চলিক অনুষ্ঠান, বাংলাদেশ বেতার, বরিশাল।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে