শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

আউশ ধানের উৎপাদন বাড়াতে দরকার উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন

ইমরান ছিদ্দিকি
  ১২ মে ২০২৪, ০০:০০
আউশ ধানের উৎপাদন বাড়াতে দরকার উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন

বাজারে চালের দাম কমাতে বৃষ্টিনির্ভর আউশ ধানের উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে তিন মৌসুমে ধানের চাষ করা হয়- আউশ, আমন ও বোরো ধান। বোরো ধান চাষে প্রচুর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহৃত হয়। এতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর দিনে দিনে নিচে নামছে। আউশ ধানের আবাদ বৃষ্টিনির্ভর, এ ধান উৎপাদনে সেচ খরচ সাশ্রয় হয়। উচ্চফলনশীল আউশের (উফশী) জাতের ধান চাষ করলে অধিক ফলন পাওয়া যায়। এ বছর কৃষি মন্ত্রণালয় আউশ ধানের চাষাবাদ বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ও ভর্তুকি প্রদান করছে। এতে অধিকসংখ্যক কৃষক আউশ ধান চাষে উৎসাহী হবেন বলে আশা করা যায়। চলতি আউশের আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ৬৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার প্রণোদনা দিয়েছে। সারাদেশের ৯ লাখ ৪০ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এ প্রণোদনার আওতায় বিনামূল্যে বীজ ও সার পেয়েছেন। উচ্চফলনশীল আউশ ধানের উৎপাদন বাড়াতে এ প্রণোদনার আওতায় একজন কৃষক এক বিঘা জমিতে চাষের জন্য প্রয়োজনীয় ৫ কেজি বীজ, ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার বিনামূল্যে পেয়েছেন। অধিক ফলনশীল ব্রিধান-৪৮, ব্রিধান-৮২, ব্রিধান-৮৫, ব্রিধান-৯৮, বিনাধান-১৯ ও বিনাধান-২১ এর বীজ দেওয়া হয়। স্থানীয় জাতের আউশ ধানের জাত যেমন- ভইরা, কালা মানিক, শঙ্কপটি, সাইটা, শনি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিটের উদ্ভাবিত জাতের চেয়ে বৃষ্টিনিভর্র আবাদে বেশি ফলন দেয়। এছাড়া আরও দেখা যায় যে, স্থানীয় আউশ ধানের জাতগুলো ভালোভাবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে পারে। ভইরা, কালা মানিক, এবং শঙ্কপটী হেক্টরপ্রতি ৪.১ টন ধান ফলন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি স্থানে আবাদ করা হয় পরাঙ্গী, কালামানিক, সূর্যমুখী, ষাইট্টা, মাটিচাক, পঙ্খীরাজ, লক্ষ্ণীলতা, নরই, বটেশ্বর, কটকি, কইয়াজুরি ইত্যাদি। এসব ছাড়াও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট আউশের বেশ কিছু জাত উদ্ভাবন করেছে। উলেস্নখযোগ্য হলো: বিরি-২৮, বিআর-২১, বিআর-২৬, বিআর-২৭, বিআর-৪৮, বিআর-৫৫ ইত্যাদি। আউশ ধান দুইভাবে চাষ করা হয়। বোনা আউশ এবং রোপা আউশ। বোনা আউশের জনপ্রিয় আধুনিক জাতসমূহ : ব্রিধান-৪৩, ব্রিধান-৬৫, ব্রিধান-৮৩ এবং বিনাধান-১৯। রোপা আউশ ধানের আধুনিক জাতসমূহ: ব্রিধান-৪৮, ব্রিধান-৮২, ব্রিধান-৮৫, বিনাধান-১৯ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান-৭। বিনাধান-১৯ প্রচন্ড খরা সহিষ্ণু হওয়ায় খরা মাটি পছন্দ করে। বোনা ও রোপা উভয় পদ্ধতিতে চাষ উপযোগী। গাছ হেলে পড়ে না। জীবনকাল ৯৫-১০০ দিন। চাল সরু ও লম্বা। ফলন ৪-৫ টন হেক্টরে। ব্রিধান-৪৩ জাতটি বৃষ্টিপ্রবণ এবং খরাপ্রবণ উভয় অঞ্চলের জন্য উপযোগী। আগাম জাত, জীবন কাল ১০০ দিন। খরা সহিষ্ণু। কান্ড বেশ শক্ত বলে সহজে হেলে পড়ে না। ফলন ৩.৫ টন হেক্টরে। ব্রিধান ৪৮ অধিক ফলনশীল এ জাতটি রোপা আউশ মৌসুমের জন্য উপযোগী। জীবনকাল ১১০ দিন। কান্ড বা ডাল শক্ত হয়। চাল মাঝারি মোটা ও সাদা। ফলন ৫.০ টন হেক্টরে হয়। ব্রিধান ৬৫ : বোনা আউশ মৌসুমের খরা সহনশীল জাত। গাছ খাটো ও কান্ড শক্ত হওয়ায় হেলে পড়ে না। শীষ থেকে ধান সহজে ঝরে পড়ে না। চাল মাঝারি চিকন ও সাদা এবং ভাত ঝরঝরে। জীবনকাল ১০০ দিন। ফলন ৩.৫-৪ টন হেক্টরে। ব্রিধান-৮২ অধিক ফলনশীল হয়। এ জাতটি রোপা আউশ মৌসুমের জন্য উপযোগী। গাছের উচ্চতা ১১০ সেমি.। জীবনকাল ১০০-১০৫ দিন। কান্ড শক্ত। চাল মাঝারি মোটা ও ভাত ঝরঝরে। ফলন ৪.৫-৫.০ টন হেক্টরে। ব্রিধান-৮৩ : বোনা আউশ মৌসুমের খরা সহনশীল জাত। গাছের উচ্চতা ১০০-১০৫ সেমি। কান্ড শক্ত হওয়ায় হেলে পড়ে না এমনকি ধান পাকার পরও গাছ হেলে পড়ে না। দানার রং লালচে যা স্থানীয় কটকতারা জাতের অনুরুপ। চাল মাঝারি মোটা ও সাদা এবং ভাত ঝরঝরে। জীবনকাল ১০৫ দিন। ফলন ৪-৫ টন হেক্টরে। ব্রিধান-৮৫ অধিক ফলনশীল এ জাতটি কুমিলস্না অঞ্চলসহ দেশের পূর্বাঞ্চলে রোপা আউশ মৌসুমের জন্য উপযোগী। জলাবদ্ধতা সহনশীল হওয়ায় আউশ মৌসুমে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকাতেও চাষ করা সম্ভব। গাছের উচ্চতা ১১০ সেমি.। জীবনকাল ১০৮-১১০ দিন। কান্ড শক্ত। চাল মাঝারি লম্বা ও চিকন এবং ভাত ঝরঝরে। ফলন ৪.৫-৫.০ টন হেক্টরে। ব্রি হাইব্রিড ধান ৭ : আউশ মৌসুমে চাষযোগ্য একমাত্র হাইব্রিড ধানের জাত। রোপা আউশ মৌসুমে প্রচলিত অন্যান্য জাতের চেয়ে অধিক ফলনশীন, ফলন ৬.৫-৭০ টন হেক্টরে। বোনা আউশের মূল জমিতে বীজবপন ২৫ মার্চ হতে ২০ এপ্রিল, রোপা আউশের বীজতলায় বীজবপন ৩০ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত উপযুক্ত সময়। বীজ ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে ১০ কেজি বিঘা প্রতি। চারা রোপণ করতে হবে ১৫ এপ্রিল হতে ১০ মে পর্যন্ত। প্রতি গোছায় ২টি করে ৮ ইঞ্চি ৬ ইঞ্চি দূরত্বে চারা রোপণ করতে হবে। ইউরিয়া-১৫ কেজি, ডিএপি-৭ কেজি, এমপি-১০ কেজি, জিপসাম-৫ কেজি এবং দস্তা ০.৭ কেজি। শেষ চাষের সময় ১ থেকে ৩ ভাগ ইউরিয়া এবং অন্যান্য সব সার প্রয়োগ করতে হবে। ২য় কিস্তি ইউরিয়া ৪-৫টি কুশি দেখা দিলে (সাধারণত রোপণের ১৫-১৮ দিন পর) এবং ৩য় কিস্তি কাইচথোড় আসার ৫-৬ দিন পূর্বে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে গন্ধক এবং দস্তার অভাব থাকলে শুধু জিপসাম এবং দস্তা প্রয়োগ করতে হবে। অন্যদিকে, বোনা আউশের ক্ষেত্রে ইউরিয়া সমান দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। ১ম কিস্তি শেষ চাষের সময় এবং ২য় কিস্তি ধান বপনের ৩০-৩৫ দিন পর উপরি প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণত হাত দিয়ে বা নিড়ানি যন্ত্রের সাহায্যে অথবা আগাছানাশক ব্যবহারের মাধ্যমে ৩০-৩৫ দিন পর্যন্ত আগাছামুক্ত রাখতে হবে। রোপা আউশ ধানের ক্ষেত্রে প্রি-ইমারজেন্স আগাছানাশক হিসেবে বেনসালফিউরান মিথাইল+এসিটাক্লোর, মেফেনেসেট+বেনসালফিউরান মিথাইল ইত্যাদি প্রয়োগ করতে হবে। বোনা আউশের জন্য প্রি-ইমারজেন্স আগাছানাশক হিসেবে পেনডামিথাইলিন, অক্সাডায়ারজিল এবং অক্সাডায়াজন আগাছানাশক বপনের ২/৩ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। চারা লাগানোর সময় বা বীজবপনের সময় বৃষ্টিপাত না হলে সময়মতো চারা রোপণ/বপনের জন্য সম্পূরক সেচ দিতে হবে। সরাসরি বীজ বপনের ক্ষেত্রে জমিতে জো অবস্থা বিরাজমান না থাকলে অঙ্করিত বীজ জমিতে কাদা করে লাইনে ছিটিয়ে বীজ বপন করতে হবে। আউশ মৌসুমে সাধারণত খোলপোড়া রোগ, ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ, টুংরো এবং বাকানি রোগের প্রকোপ দেখা যায়। খোলপোড়া রোগ দমনের জন্য জমির পানি বের করে দিয়ে বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। আউশের মুখ্য পোকাগুলো- মাজরা পোকা, পামরি পোকা, থ্রিপস, গান্ধি পোকা, সবুজ পাতা ফড়িং এবং বাদামি গাছ ফড়িং। পোকা দমনে আলোর ফাঁদ এবং পার্চিং ব্যবহার করতে হবে। মাজরা এবং বাদামি ঘাসফড়িং পোকা দমনের জন্য প্রয়োজনে কীটনাশক সানটাপ ৫০ পাউডার এবং থ্রিপস, সবুজ পাতা ফড়িং ও গান্ধি পোকা দমনের জন্য কার্বোসালফান কীটনাশক মারশাল ২০ ইসি ব্যবহার করা যেতে পারে। ৮০ ভাগ ধান পাকলে ধান কাটতে হবে। তাড়াতাড়ি মাড়াইয়ের জন্য ধান মাড়াই যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। বাদলা দিনে ধান মাড়াই করে সাধ্যমত ঝেরে বৃষ্টিমুক্ত (চালার নীচে) স্থানে ছড়িয়ে দিয়ে শুকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ভালো ফলন পেতে হলে ভালো বীজের প্রয়োজন। এজন্য যে জমির ধান ভালোভাবে পেকেছে, রোগ ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ হয়নি এবং আগাছামুক্ত সেসব জমির ধান বীজ হিসেবে রাখা। ধান কাটার আগেই বিজাতীয় গাছ সরিয়ে ফেলতে হবে। যেসব গাছের আকার-আকৃতি, শিষের ধরন, ধানের আকার-আকৃতি, রং ও শুঙ এবং ধান পাকার সময় জমির অধিকাংশ গাছ থেকে একটু আলাদা সেগুলোই বিজাতীয় গাছ। সব রোগাক্রান্ত গাছও অপসারণ করতে হবে। এরপর ফসল কেটে মাঠে শুকনো স্থানে রাখতে হবে এবং আলাদা মাড়াই, ঝাড়াই করে ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে মজুত করতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে