logo
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১০ আশ্বিন ১৪২৭

  হুরণ আজাদী   ১৫ মার্চ ২০২০, ০০:০০  

বহুগুণে গুণান্বিত মসলা গোলমরিচ

বহুগুণে গুণান্বিত মসলা গোলমরিচ
মসলার জগতে যত সুগন্ধ যুক্ত মসলা রয়েছে, তার মধ্যে গোলমরিচের ভূমিকা প্রথম সারিতে পড়ে। সারা বিশ্ব জুড়ে এটা একটি মূল্যবান এবং অতি প্রয়োজনীয় মসলা। গোলমরিচ মসলা বা স্বাদ বাড়ানোর জন্য খাবারে ব্যবহার করা হয়। শুকনো গোলমরিচের গুঁড়ো স্বাদের জন্য প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গোলমরিচ বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবসা সফল মসলা। সারা বিশ্বের রান্নার মসলার মধ্যে অন্যতম সাধারণ মসলা। রান্না করা খাবার সাজিয়ে তার উপরে গোলমরিচ ব্যবহৃত হয়। এর ফলেই খাবারের স্বাদ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। পাশ্চাত্যের নামি-দামি হোটেল, রেস্তোরাঁয় খাবারে গোলমরিচ দেওয়া হয় এর স্বাদ এবং সুগন্ধ বাড়ানোর জন্য। গোলমরিচের গুঁড়ো ভারতবর্ষে রকমারি খাবারে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। আমাদের দেশে রোস্ট, রেজালা, বোরহানি, কাবাব, মাংস, চটপটি ইত্যাদিতে গোলমরিচ ব্যবহার করা হয়। এটা ছাড়া বোরহানি আর কাবাবের কথা ভাবাই যায় না। এ ছাড়াও পাসটা, সু্যপ, নুডুলস, স্যেন্ডুইচ, অমলেট এবং বিভিন্ন রকম চাইনিজ খাবারে গোলমরিচের ব্যবহার করা হয়।

গোলমরিচের বৈজ্ঞানিক নাম পিপার নিগ্রাম (চরঢ়বৎ হরমৎঁস) এটা চরঢ়বৎধপবধব পরিবারের একটি লতাজাতীয় উদ্ভিদ। গোলমরিচের ইংরেজি নাম ইষধপশ ঢ়বঢ়ঢ়বৎ। সংস্কৃত ভাষার পিপালি শব্দ থেকে এসেছে শব্দটি যার অর্থ লম্বা মরিচ। গোলমরিচ বহুবর্ষজীবী লতা-জাতীয় গাছ। এই গাছ রোপণের ৪-৫ বছর পর থেকে ফল ধরা শুরু করে। ৮-৯ বছর বয়সে পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন হয় এই গাছ। গোলমরিচ ২০-২৫ বছর পর্যন্ত ভালো ফলন দেয়। এই গাছ থেকে ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত উপযুক্ত পরিচর্যার মাধ্যমে ফলন পাওয়া যেতে পারে। গোলমরিচ গাছ সাধারণত অন্য গাছকে আঁকড়িয়ে ধরে বেড়ে ওঠে। এটা এক ধরনের পরাশ্রয়ী গাছ। এই জন্য এদের অন্য গাছের আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। আম, সুপারি, কাঁঠাল, মান্দার, তেঁতুল, নারিকেল, তাল, খেজুর ইত্যাদি গাছ গোলমরিচের আশ্রয়ী গাছ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই গাছ সর্বোচ্চ ৩০-৩৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়, গাছের পাতা দেখতে অনেকটা পান পাতার মতো। গোলমরিচ চাষ করার জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার প্রয়োজন। বছরে ২০০-২৫০ সেমি. বৃষ্টিপাত হলে সাফল্যের সঙ্গে এর চাষ করা যায়। দিনের তাপমাত্রা ৩৫-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে গোলমরিচ চাষ ভালো হয়। উর্বর দো-আঁশ মাটিতে এর ফলন খুব ভালো হয়। পানি সহজে নিষ্কাশিত হওয়ার সুবিধা আছে এমন মাটিতে গোলমরিচের চাষ ভালো হয়। পাহাড়ি এলাকার মাটি এই ফসল চাষের জন্য খুব উপযোগী। বিভিন্ন জাতের গোলমরিচ রয়েছে যেমন- কারিমুন্ডা, বালনকাট্টা, কলস্নভেলি, আরকুলপাম মুন্ডা প্রভৃতি।

\হগোলমরিচে তিন ধরনের লতা ও কান্ড দেখা যায়। সাধারণত এই গাছের চারা ডালের কলম থেকে তৈরি করা হয়। এ গাছের গোড়ার অংশকে 'রানার' বলে। 'রানারে'র প্রতিটি গিঁট থেকে শিকড় বের হওয়ার স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে। ফেব্রম্নয়ারি থেকে মার্চ মাসে দুই থেকে তিনটি গিঁটযুক্ত কান্ড কাটিং হিসেবে পলিব্যাগে লাগানো হয়। পলিব্যাগ উর্বর মাটি দিয়ে ভরাট করে নিতে হয়। কাটিং এ ছায়ার ব্যবস্থা রাখতে হয় ও প্রয়োজনে সেচ দিতে হয়। পলিব্যাগে চারা রোপণের পূর্বে বাঁশের কাঠি দিয়ে পলিথিন ব্যাগের মাটিতে গর্ত করে শিকড়যুক্ত কাটিং লাগাতে হয়। ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে একটি সুন্দর চারা তৈরি হয়। মে থেকে জুন বা চৈত্র থেকে বৈশাখ মাসে কাটিং লাগানোর উপযোগী হয়। বীজ থেকেও এর বংশবৃদ্ধি করা যায়। কিন্তু এতে উৎপাদন পেতে অনেক বেশি সময় লাগে এবং গোলমরিচের গুণাগুণ মাতৃগাছের মতো নাও হতে পারে। সে জন্য সাধারণত অঙ্গজ প্রজননের দ্বারা গোলমরিচের বংশবৃদ্ধি করা হয়। গোলমরিচ যেই গাছে আশ্রয় নেয় সেই গাছের ছায়ায় লাগাতে হয়। সেই গাছ আগে থেকে ২ দশমিক ৫ মিটার দূরত্বে লাগিয়ে গোলমরিচের কাটিং লাগানো হয়। ২ থেকে ৩টি কাটিং এক গর্তে লাগানো যেতে পারে। ভালো জাতের চারা বৈশাখ থেকে আষাঢ়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত রোপণের উপযুক্ত সময়। সার সাধারণত বছরে দুইবার দিতে হয়। আগাছা জন্মালে পরিষ্কার করে দিতে হবে ও মাটিতে রসের অভাব হলে পানি সেচ দিতে হবে। ডগা বাড়তে থাকলে যেই গাছে বেয়ে উঠবে সেই গাছের সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে। গোলমরিচ গাছে পোকার আক্রমণে শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ক্ষতি হতে পারে। সে কারণে পোকা দেখামাত্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত গাছ ছাঁটাই করে বৃদ্ধি কমাতে হবে। অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে গাছে। একটি গাছ থেকে বছরে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি চারা উৎপাদন করা সম্ভব।

মে থেকে জুন মাসে গোলমরিচ গাছে ফুল আসে এবং ছয় থেকে আট মাস পর ফল পাকা শুরু করে, তখন ফল তোলা যায়। ফলের থোকায় ২/১ টি ফল উজ্জ্বল কমলা বা বেগুনি হলে সংগ্রহ করে ৭ থেকে ১০ দিন রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। প্রতি গাছ থেকে ৫-৬ কেজি কাঁচা গোলমরিচ উৎপাদিত হয়। কাঁচা গোলমরিচ থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ শুকনো গোলমরিচ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, একটি গাছ থেকে গড়ে দেড় থেকে দুই কেজি শুকনো গোলমরিচ পাওয়া যায়। গোলমরিচ গাছের সবুজ মরিচ থেকে কালো মরিচ উৎপাদিত হয়। সবুজ বেরির মতো ফলগুলো গরম পানিতে ১০/১৫ মিনিট ফুটিয়ে ভালো করে পানি ঝরিয়ে শুকানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়। ফুটানোর সময় তাপে মরিচের কোষের দেওয়ালগুলো ভেঙে যায়। এরপর কয়েক দিন রোদে বা মেশিনে শুকিয়ে নিতে হয়। শুকানোর সময় বীজের চারপাশের ত্বক সংকুচিত হয়ে একটি পাতলা কুঁচকানো কালো আবরণে পরিণত হয়। এভাবে শুকানো মরিচ কালো গোলমরিচ নামে পরিচিত। সাদা গোলমরিচ শুধুমাত্র গোলমরিচ গাছের পাকা ফলের বীজ থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় করা হয়। পাকা মরিচের বেরিগুলো প্রায় এক সপ্তাহ পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়, এতে মরিচের মাংশল অংশ নরম হয়ে যায় এবং পচে যায়। এরপর সেই পচা অংশ তুলে ফেলে শুধু বীজটা শুকিয়ে নিতে হয়। এ ছাড়া যান্ত্রিক বা রাসায়নিক পদ্ধতির মাধ্যমেও ফলের বাইরের মাংসল অংশ অপসারণ করে বীজ নেওয়া হয়। এটাই সাদা গোলমরিচ নামে পরিচিত। সাদা গোলমরিচ সাধারণত চাইনিজ, থাই এবং পর্তুগিজ খাবারগুলিতে ব্যবহার করা হয়। কালো গোলমরিচের থেকে সাদা গোলমরিচের ঝাঁজ একটু কম হয়, স্বাদে ও একটু ভিন্নতা আছে। লাল এবং সবুজ গোলমরিচ কিছু এশিয়ান খাবার, বিশেষত থাই রন্ধনশৈলীতে ব্যবহৃত হয়। লাল ও সবুজ মরিচ বেশি দিন সংরক্ষণ করে রাখা যায় না।

বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গোলমরিচ চাষ করা হয়। এখানকার নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীরা খাসিয়াপানের সঙ্গে অনেক দিন ধরেই চাষ করছেন গোলমরিচ। মাটি ও জলবায়ু বিবেচনায় বাংলাদেশের সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, পাবর্ত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলাগুলোর মাঝারি উঁচু জমি, চা বাগানের টিলা ও ঢালগুলোতে সাফল্যজনকভাবে গোলমরিচের চাষ করা সম্ভব। ২০১৫-১৬ সালের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে মোট ৫ হেক্টর জমিতে গোলমরিচের চাষ করা হয়, এর মধ্যে সিলেট, হবিগঞ্জ ও বগুড়া জেলা অন্যতম। যার মোট উৎপাদন ৬ মেট্রিক টন। গোলমরিচ চাষ অর্থনৈতিক দিক দিয়েও লাভজনক। পরিকল্পিতভাবে গোলমরিচ চাষ করে নিজের দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যায়। কৃষকদের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় ও কম সময়ে অধিক উপার্জন করতে হলে গোলমরিচ এক অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত হয়।

গোলমরিচে পাইপারিন নামের রাসায়নিক উপাদান রয়েছে- যা থেকে এর ঝাঁজালো স্বাদটি এসেছে। গোলমরিচ শুধু রান্নার স্বাদই বৃদ্ধি করে না, এটা রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিষেধক হিসেবেও ভূমিকা রাখে। স্বাদ ছাড়াও এর রয়েছে অসাধারণ পুষ্টিগুণ। গোলমরিচে আছে উপকারী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। যা জীবাণু ধ্বংস করে। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট অন্ত্রনালিকে সুস্থ রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গোলমরিচে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাংগানিজ, জিঙ্ক, ক্রোমিয়াম, ভিটামিন এ ও সি এবং অন্যান্য উপাদানে ভরপুর। গবেষণায় জানা গেছে, গোলমরিচে রয়েছে অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা। হজমের সমস্যা হলে কোনো খাবারই শরীরের কাজে লাগে না। গোলমরিচে প্রচুর পরিমাণ হাইড্রোক্লোরিক এসিড- যা পাকস্থলীর প্রোটিনের অংশ ভেঙে ফেলার মাধ্যমে হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখে। আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় গোলমরিচের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আর্য়ুবেদ মতে, গোলমরিচ খাবারের রুচি বৃদ্ধি করে, দাঁত এবং মাড়ির সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে। এটা শরীর থেকে অতিরিক্ত টক্সিন বের করতে সাহায্য করে। কালো গোলমরিচ থেকে তেল তৈরি করা হয়। এই তেল ঔষধি গুণে ভরপুর। চিকিৎসায় এই তেল ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে