logo
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৬ আশ্বিন ১৪২৭

  অধ্যক্ষ ডা. হাফিজ উদ্দীন আহমদ   ২৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

করোনা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা

কোভিড রোগে কেউ মারা গেলে সতর্ক থাকতে হবে। অনেকে প্রচার করছে কেউ মরে গেলে ভাইরাসও মরে যাবে কথাটা ঠিক নয়। মানুষ মরে গেলেও তার শরীরের কোষগুলো সঙ্গে সঙ্গে মরে না। পরিচিত কোনো নিখুঁত দাড়ি কামানো ব্যক্তি মারা গেলে তাকে যদি সেদিন দাফন না করা হয়ে থাকে দেখবেন পরদিন তার গালে দাড়ি গজিয়েছে। কোষের মৃতু্য হয়নি বলেই এটা ঘটে।

করোনা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা
বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগে তিনজনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল ৮ মার্চ ২০২০। তারপর তা বেড়ে চলেছে। বেড়ে চলেছে মৃতু্যর সংখ্যাও। কোথায় গিয়ে শেষ হবে জানা নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে ১৮ জুন ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্বে করোনা থাকবে আরও ২-৩ বছর। আপাতঃ দৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকটি দেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলেও মুক্ত হচ্ছে না পুরোপুরি। এমনকি নিয়ন্ত্রণে আসা উৎপত্তিস্থল চীনে দ্বিতীয় দফা আঘাত হানার সংবাদ এসেছে। তাই কোরোনার সঙ্গে মানিয়েই সহাবস্থান করে সাবধানভাবে আমাদের চলতে হবে।

স্পেনিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, সোয়াইন ফ্লু, সার্স ভাইরাস, বর্তমানের কোভিড-১৯ সবই আরএনএ ভাইরাস। এগুলো সবই শ্বাসতন্ত্র সংক্রমণ করে, পরস্পর সম্পর্কিত, তারপরও এক নয়। ফেব্রম্নয়ারি ১৯১৮ সালে অ ঐ১ঘ১ সৃষ্ট স্পেনিশ ফ্লুতে বিশ্বে ৫০০ মিলিয়ন লোক আক্রান্ত হয় এবং ৪০-৫০ মিলিয়ন লোক মারা যায়। প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এবং স্পেনের রাজা আলফনসো ১৩ ও আক্রান্ত হন। রোগটি এপ্রিল ১৯২০ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সুতরাং করোনাও সহজে যাবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে আমেরিকা এর ভ্যাকসিন বের করেছিল ২০ বছর পর ১৯৪০ সালে। তাই এখনই দেশ-বিদেশে যারা ভ্যাকসিন বের করে ফেলেছেন বলছেন সেগুলো কার্যকর কিনা তা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। একটি প্রতিষেধক বহুবছর ধরে বহু রোগীর ওপর সফল ও ব্যর্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষা তথা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অনুপস্থিতি দ্বারা নির্ণীত হয়। তা ছাড়া দীর্ঘ দিনে করোনাভাইরাসের গতি ও প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে যেমন করোনাভাইরাস চীন ছড়িয়েছে না আমেরিকা ছড়িয়েছে এসব নিয়ে পস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করে তেমনি স্পেনিশ ফ্লুর সময় স্পেন প্রচার করে ভাইরাসটি ফ্রান্স ছড়িয়েছে এবং তারা তার নাম দেয় ফ্রেঞ্চ ফ্লু। একই ভাইরাস দ্বারা সোয়াইন ফ্লুও ঘটে। ঐ১ঘ১,ঐ১ঘ২,ঐ৩ঘ১ এবং ঐ৩ঘ৩ উপবিভাগ এর জন্য দায়ী। ১৯৩০ সালে প্রথম শূকরের রোগের জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসকে দায়ী করা হয়। পাখি বা মানুষের ইনফ্লয়েঞ্জা দ্বারা শূকর সংক্রমিত হয় এবং তা ৩ মাস ভাইরাসের আধার হিসেবে কাজ করে। তখন সরাসরি সংস্পর্শে বা পশুটির হাঁচি, কাশি দ্বারা বাতাসের মাধ্যমে মানুষ ও অন্য পশুর দেহে ছড়ায়। ২০০৯ সালের ১৯ জুন প্রথম আমেরিকা হতে প্রত্যাগত এক প্রবাসী বাংলাদেশির দেহে সোয়াইন ফ্লু ধরা পড়ে। বার্ডস ফ্লুও একই প্রকার, ঘটে ঐ৫ঘ১ উপবিভাগ দ্বারা। ২০০২-৩ সালের সার্স (সিভিয়ার একটু রেস্পিরেটরি সিনড্রোম )এবং বর্তমানের কোভিড-১৯ রোগও করোনাভাইরাস দিয়ে সংঘটিত। কোভিড রোগটিও বাদুড় ও প্যাঙ্গোলিন (পিপীলিকা ভুক) দ্বারা ছড়িয়েছে প্রচার হয়েছিল কিন্তু প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা আর উপরোক্ত রোগগুলোর প্রাথমিক উপসর্গগুলো একই রকম যেমন- শীত শীত লাগা, জ্বর, গলাব্যথা, পেশিব্যথা, মাথাব্যথা, কাশি, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করা, উদরাময় ইত্যাদি। সব রোগেই খাবারে অরুচি ঘটে তবে স্বাদ ও ঘ্রাণ চলে যাওয়া কোভিডে প্রকট থাকে। কোভিডে ঘ্রাণ চলে যাওয়াকে অনেকে মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়েছে ভাবেন, আসলে সেরকম কিছু নয়। নাসিকা গহ্বরের পিছন অংশে ঘ্রাণের স্নায়ু কোষ থাকে, সেগুলো শ্লেষ্মাতে ঢাকা পড়ে যায় বলেই মস্তিষ্কে এ ব্যাপারে কোনো বার্তা পৌঁছে না। রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করলে প্রতি ক্ষেত্রেই ফুসফুস প্রদাহ ও শ্বসনতন্ত্রের অকার্যকারিতায় অনেকে মারা যায়। এমনকি বৃক্ক বিকলতা অর্থাৎ রেনাল ফেইলর বা হৃৎপিন্ড প্রদাহও ঘটতে পারে। কোভিড মানুষের নাক, মুখ, চোখ দিয়ে ঢোকে তাই বারবার হাত ধুতে হয় ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত সাবান দিয়ে বা স্যানিটাইজার লাগাতে হয় কেননা মনের অজান্তে ঘন ঘন আমরা এসব স্থান স্পর্শ করি। সন্দেহজনক কিছু ধরলেও হাত ধুতে হবে। বাইরে গেলে মাস্ক (সার্জিকাল হলে ভালো) ছাড়াও গস্নাভস পরতে হবে। যাদের হাতে চর্ম রোগ বা রাবারের প্রতি এলার্জি আছে তাদের পক্ষে তা সম্ভব না হলে হাত প্যান্টের দুই পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে হবে ফলে মনের অজান্তে কিছু স্পর্শ করবেন না বা কথা বলতে গিয়ে কারও হাত ধরে ফেলবেন না। বাজারে গেলে কিছু হাত দিয়ে বাছাবাছি না করে যেটা চাই সেটা বিক্রেতাকে ইশারায় দেখিয়ে দিন। সে আপনার ব্যাগে ভরে দেবে। ঘরে এসে সাবানে হাত ধুয়ে ফেলবেন আর সবজি ও ফলগুলো কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে শুধু পানিতে ধুলেই চলবে।

ভাইরাস রক্তনালি ও হৃৎপিন্ডের ভিতরের দেয়াল মুড়ে রাখা অন্তর্ঝিলিস্নক বা অ্যান্ডোথেলিয়াল কোষগুলোকে আক্রমণ করে। ফুসফুসের ধমনিগুলো প্রদাহ হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের দেয়ালজুড়ে রক্ত জমাট বাঁধে। তার ছোট ছোট বায়ুথলিগুলোও এর শিকার হয়। স্বাভাবিকভাবেই রক্তে অস্স্নজান বা অক্সিজেন প্রবেশ করতে পারে না। তাই শরীরের অন্যান্য অংশগুলোতেও তা যেতে পারে না। ফলে হৃৎপিন্ড প্রদাহ বা মায়োকার্ডাইটিস, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও প্রদাহের কারণে জ্বর হয়। বায়ুথলি ধ্বংসের কারণেও তাতে আমিষ সমৃদ্ধ তরল পদার্থ জমে ফুসফুসীয় প্রদাহ হয়। শ্বাসকষ্ট আরও তীব্র হয়। কখনো আন্ত্রিক প্রদাহ বা কলাইটিস দেখা দেয়। জমাট বাঁধা চলমান রক্তপিন্ড রক্তস্রোতে ভেসে ভেসে ফুসফুসের ধমনিতে আটকে পালমোনারি আম্বোলিজম বা মস্তিষ্কের ধমনিতে আটকে স্ট্রোক ঘটাতে পারে। এমনকি বৃক্কে অম্স্নজানের অভাব ঘটিয়ে রেনাল ফেইলওর সৃষ্টি করতে সক্ষম। শরীর যখন জমাটবদ্ধতাকে ভাঙে তখন ডি-ডাইমার নামে একটি আমিষ তৈরি হয় এবং রক্তে তার মাননির্ণয় করে রোগীর অবস্থা কতটা মারাত্মক তা টের পাওয়া যায়। তবে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ঘটিত ফুসফুসপ্রদাহ ও কোভিড রোগের মধ্যে পার্থক্য ধরার জন্য কেবল ফুসফুস প্রদাহের তীব্রতা দেখা ছাড়া এ মুহূর্তে বাহ্যিকভাবে চিকিৎসকদের আর কোনো উপায় জানা নেই। নিশ্চিত রোগ নির্ণয় করতে নাক ও গলবিলের শ্লেষ্মা, মুখের লালা বা রক্তের নমুনা নিয়ে রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ পলিমারেজ চেন রিয়্যাকশন (এ ছাড়া বুকের এক্সরে, রক্তের পূর্ণ গণনা) পরীক্ষা করা হয়। তবে জন হপকিন্স হাসপাতাল একটি গবেষণায় জানিয়েছে সংক্রমণের পরপরই পিসিআর পরীক্ষা করলে তা না বোধক হবে। চার দিন পর করলে ৬৭% না বোধক হবে। এমনকি এক সপ্তাহ পর করলেও প্রতি ৫ জনে এক জন না বোধক হবে। তখন তারা একটা মিথ্যা নিরাপত্তাবোধ অনুভব করে অবাধ মেলামেশা করবেন ও সবার মধ্যে রোগ ছড়াবেন। তাই সাবধান কমপক্ষে সংক্রমিত হওয়ার আট দিন পর পরীক্ষা করবেন অর্থাৎ উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার কমপক্ষে তিন দিন পর পরীক্ষা করবেন। নিগেটিভ থাকলে অথবা চিকিৎসা করে নিগেটিভ হওয়ার এক সপ্তাহ পর আবারও পরীক্ষা করান। পজিটিভ ক্ষেত্রে হা বোধক পিসিআর ছাড়া অন্যান্য যা থাকে তা হলো শ্বেত কণিকা, এলডিএইচ, ফেরিটিন ও সি-প্রতিক্রিয়াশীল আমিষ বৃদ্ধি এবং লসিকা কোষ হ্রাস তথা সিটি স্ক্যান বা বুকের এক্সরেতে ফুসফুসে ঘষা কাচের মতো অস্বচ্ছতা। অবশ্য উপসর্গ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে বিলম্ব করবেন না। কোভিডের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই তাই উপসর্গ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমানে দেশে প্যারাসিটামল, ইভারভেকটিন (১২ মিগ্রা) এক মাত্রা, ডক্সিসাইক্লিন (বা এজিথ্রোমাইসিন), ফেক্সোফেনাডিন, ভিটামিন সি, ডি (৬০০ আন্তর্জাতিক একক), এবং জিঙ্ক দ্বারা চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সংকটাপন্ন ক্ষেত্রে অক্সিজেন, স্টেরয়েড ও ভেন্টিলেটর এবং কখনো পস্নাজমা থেরাপি, কড়া এন্টিবায়োটিক, ভাইরাসবিরোধী ফ্লাভিপিরাভির বা রেমডেসিভির ব্যবহৃত হচ্ছে। শুরু থেকেই রক্ত বাঁধার ঝুঁকি পরীক্ষা করে রক্ত পাতলা করার ওষুধ ও দরকার হলে জমাট নিরোধী হেপারিন বা এনেক্সপেরিন সাবধানতার সঙ্গে দিলে পরবর্তী জটিলতা এড়ানো যেতে পারে। স্টেরয়েড ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় সতর্ক থাকতে হবে যাতে অপপ্রয়োগ না হয় কেননা এটা যেমনি প্রদাহ কমায় তেমনি আমাদের অনাক্রম্যতা ব্যবস্থা বা ইমিউনিটিকে দাবিয়ে দেয়।

হাসপাতালে যেহেতু শয্যা স্বল্পতা রয়েছে তাই উপসর্গ দেখা দিলে উৎকণ্ঠিত হয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে না ছুটে বাড়িতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা নিন। অবস্থা খারাপ বা শ্বাসকষ্ট হলে কোভিড চিকিৎসা দেয় এমন হাসপাতালে যেতে হবে বিশেষত ৬০ বা তার বেশি যাদের বয়স ও বহুমূত্র, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা শ্বসন রোগে ভুগছেন বা বাইপাস করেছেন তাদের ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। হাসপাতালে স্থানান্তরের আগে প্রয়োজনে বাড়িতে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য উপসর্গ শুরুর পর পরই সম্ভব হলে তা জোগাড় করে রাখা ভালো। সাধারণভাবে পরিত্যাজ্য পলিথিন মুখোশ পরিয়ে রোগীকে প্রতি মিনিটে ৪-৬ লিটার অক্সিজেন দেওয়া হয়। অক্সিজেনের নিরাপদ ঘনত্ব হলো ২৭% যা পরিত্যাজ্য ভেন্ট্রিমাস্ক দিয়ে মিনিটে ৪ লিটার হিসাবে দেওয়া নিয়ম। পূর্ণবয়স্ককে ৪০%-এর বেশি ঘন অক্সিজেন ২৪ ঘণ্টার বেশি দিলে ফুসফুসে শোথ তথা অক্সিজেন বিষাক্ততা হতে পারে। তবে শ্বসন অক্ষমতা বা রেসপিরেটরি ফেইলরে সামান্য কিছুক্ষণ উচ্চ ঘনত্ব যথা ৬০% অক্সিজেন দেওয়া যায়। হাসপাতালে শ্বাসকষ্টে অসুস্থ অবস্থায় যাওয়ার পর রোগীর অনেক আত্মীয় ভেন্টিলেটর বা কৃত্রিম শ্বসন যন্ত্র লাগাবার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। ব্যাপারটা আইসিইউর দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞের মতামতের ওপর ছেড়ে দেওয়া ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ৮০% কোভিড রোগীর চিকিৎসায় এ যন্ত্র প্রয়োজন হয় না। ভেন্টিলেটর লাগাবার জন্য রোগীর শ্বসন নলে টিউব ঢুকিয়ে বাতাসের আর্দ্রতা বজায় রেখে নিশ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্রের মাধ্যমে চালানো হয়। রোগী যাতে এ কষ্টকর নলের অস্তিত্ব টের না পায় তাই তাকে গভীর ব্যথানাশক ও শ্বসন নলের পেশি শিথিল করার ওষুধ দেওয়া হয়। দেখা গেছে, রক্তে অত্যন্ত কম মাত্রার অক্সিজেন নিয়েও কেউ কেউ মোটামুটি শ্বাস-প্রশ্বাস চালাচ্ছেন এবং ফুসফুসের স্থিতিস্থাপকতা বজায় আছে। কিন্তু একবার যন্ত্রের মাধ্যমে শ্বসনক্রিয়া শুরু করলে এই ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে যেতে পারে। নিউইয়র্কের এক গবেষণায় জানানো হয়েছে খুব তাড়াতাড়ি এবং উচ্চ চাপে ভেন্টিলেটর ব্যবহারে রোগীর ক্ষতি হয় ও ৮০% ক্ষেত্রে মৃতু্য ঘটে। নিউইয়র্ক সিটি ইমার্জেন্সি ফিজিশিয়ান ডা. ক্যামেরুন কাইল মত প্রকাশ করেছেন কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভেন্টিলেটর যতটা না উপকার করছে অপকার করছে তার বেশি। অবশ্য এ নিয়ে মতভেদ আছে। টরেন্টো ইউনিভার্সিটি হেলথ নেটওয়ার্ক অ্যান্ড মাউন্ট সিনাই ভেন্টিলেটর ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছেন। জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন মৃতু্য হার ২৬% বলেছেন। চীনের উহানের এক গবেষণায় জানানো হয়েছে ভেন্টিলেটরে থাকা ৩৭ জন গুরুতর অসুস্থ রোগী ভালো হয়ে যাওয়ার পর এক মাস সময়ের মধ্যে ৩০ জনই মারা গেছেন। তা ছাড়া এ যন্ত্র ব্যবহারে ফুসফুসে জীবাণু ঢুকতে পারে এবং যন্ত্রজনিত ফুসফুস প্রদাহ বা নিউমোনিয়া হয়। একবার যন্ত্রটি লাগালে দু-একদিন পর পরই তা সাময়িক বন্ধ করে দেখার প্রয়োজন পরে রোগী নিজে থেকে শ্বাস নিতে পারছে কিনা। দীর্ঘদিন ধরে কেউ ভেন্টিলেটরে থাকলে এমন এক অবস্থায় চলে যেতে পারে যখন জীবিত থাকলেও পারিপার্শিক কোনো কিছু সম্পর্কে তার জ্ঞান থাকবে না। ডাক্তারি ভাষায় এটাকে ভেজিটেটিভ স্টেট বলে। আর এটা না ঘটলেও বৃদ্ধলোকদের বেলা ভালো হয়ে যাওয়ার পর বিচার-বুদ্ধি ও শারীরিক ক্ষমতা হ্রাসের আশঙ্কা থাকে সুতরাং এ যন্ত্র ব্যবহার ও ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত দক্ষতার ও জ্ঞানের ব্যাপার। তবে এটা ঠিক- যথা সময়ে এ যন্ত্র ব্যবহারে শুধু প্রাণ রক্ষা পায় না তার দেহস্থ ফুসফুস, হৃৎপিন্ড, বৃক্ক সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে বেঁচে যায়।

কোভিড রোগে কেউ মারা গেলে সতর্ক থাকতে হবে। অনেকে প্রচার করছে কেউ মরে গেলে ভাইরাসও মরে যাবে কথাটা ঠিক নয়। মানুষ মরে গেলেও তার শরীরের কোষগুলো সঙ্গে সঙ্গে মরে না। পরিচিত কোনো নিখুঁত দাড়ি কামানো ব্যক্তি মারা গেলে তাকে যদি সেদিন দাফন না করা হয়ে থাকে দেখবেন পরদিন তার গালে দাড়ি গজিয়েছে। কোষের মৃতু্য হয়নি বলেই এটা ঘটে।

আমরা জানি ভাইরাস একটি প্রাণহীন বস্তু। জীবিত কোষের ভিতরে ঢুকতে পারলেই তা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং কোষ মৃতু্য না ঘটা পর্যন্ত ভাইরাস জীবিত থাকবে। সাধারণত বৃক্কের কোষ তাড়াতাড়ি মারা যায়। পেশির কোষ কয়েক ঘণ্টা জীবিত থাকে। কোরবানির সময় খেয়াল করবেন,পশু মরে গেছে, মাংস কাটা হচ্ছে কিন্তু সে সময়ও কোনো মাংসের টুকরো নড়ছে। হৃৎপিন্ড ও ফুসফুসের কোষ মরতে দীর্ঘ সময় লাগে। হাড় এবং চর্মের কোষ কয়েকদিন জীবিত থাকে। তাই এ রোগে কেউ মারা গেলে যিনি গোসল দেবেন নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ বা পিপিই অর্থাৎ মাস্ক, গস্নাভস ও গাউন পরবেন। সাবান দিয়ে মৃতের শরীর ধুয়ে নিজেও ভালোভাবে গোসল করবেন। নিজের কাপড়-চোপড় অন্তত ত্রিশ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রেখে সাবান দিয়ে ধুতে হবে। সাবানের ক্ষার ভাইরাসটিকে মেরে ফেলবে। মৃত ব্যক্তিকে আত্মীয়রা গোসলের আগে বা পরে স্পর্শ না করে দেখতে পারেন। শরীর থেকে নির্গত রস থেকে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। গোসলের পর পস্নাস্টিকের প্যাকেটে লাশ মুড়ে সিল করে কফিনে দিয়ে পলিথিনসহ দাফন করতে হবে। লোকজন বেশি জড়ো না হওয়া এবং জানাজা ও দাফনের জায়গা এক হওয়া ভালো। সমবেত সবাইকে সামাজিক দূরত্ব (৩ ফুট) মেনে দাঁড়াতে হবে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা যার যার বিধান মেনে সরকারি সহায়তায় স্বাস্থ্য সম্মতভাবে সৎকার করবেন।

পরিশেষে বলি অতিরিক্ত মিডিয়া দেখে লকডাউনে থেকে চাকরি বা ব্যবসায় যেতে না পেরে ভয় ও দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়বেন না কেননা তা আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেবে এবং সহজেই আপনি করোনা আক্রান্ত হবেন। এ সময়টাকে বরং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্পগুজব, শিল্পকর্ম, লেখালেখি, পড়াশোনা বা বাড়িতে বসে অনলাইন দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকুন আর যাদের অফিসে যেতেই হবে তারা সার্বিক সাবধানতা অবলম্বন করে অফিসে যান ও কাজ করুন। বসের গাঘেঁষে দাঁড়াবেন না। দর্শনার্থী বা কর্মীকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরে বসতে দিন। লিফট এড়িয়ে চলুন। যদি উঠতেই হয় তবে যথা সম্ভব ফাঁকা অবস্থায় উঠুন। বোতামগুলো হাতের আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ না করে কনুই দিয়ে চাপুন। অফিস ১-২ মাইল দূরে হলে গণপরিবহণ এড়িয়ে হেঁটে যান। হাঁটার সময় ধাক্কা পরিহার করে ফাঁকা দেখে চলুন। স্বাস্থ্য ভালো থাকবে পয়সাও বাঁচবে। মিডিয়ার ভুয়া তথ্য ও উপদেশ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। রসুন, আদা, গরম পানির গড়গড়া, ভাঁপ ভাইরাসকে মারবে না, গলায় আরাম দিতে পারে। বলা হচ্ছে ছোট শিশুদের এ রোগ হয় না বা ভাইরাসটি গলায় আটকে থাকে ঘন ঘন পানি খেলে পেটে গিয়ে হজম হয়ে যাবে এসব মিথ্যা। জেমস বন্ডের একটা জনপ্রিয় ছবি দেখেছিলাম : লিভ অ্যান্ড লেট ডাই ষ নিজে বাঁচুন অন্যকে মেরে ফেলুন। কিন্তু আমাদের নীতি হবে লিভ অ্যান্ড লেট লিভ ষ নিজে বাঁচুন এবং অন্যকে বাঁচান। তাহলে যা করতে হবে তা হলো অসুস্থ হলে তথ্য গোপন রেখে চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করবেন না। এতে চিকিৎসক অসুস্থ হবেন, তিনি যেসব রোগী দেখবেন তারাও অসুস্থ হবেন, সর্বোপরি আপনার কোনো লাভ হবে না। আপনি যদি উপসর্গ বিহীন রোগী হন তবে সঙ্গ নিরোধ মেনে ঘরে চিকিৎসা নিন, মাস্ক পরুন। অযথা বাইরে ঘোরাফেরা করবেন না। গবেষণায় দেখা গেছে ৪০-৫০% রোগ উপসর্গহীন রোগীরা ছড়ায়। বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান কোভিড ধরা পড়লেও কর্মচারীকে ছুটি দেন না ও ছাঁটাই করার হুমকি দেন। অবিলম্বে এরকম আচরণ থেকে বিরত থাকুন। রোগ আরও ছড়াবে ও পরোক্ষভাবে আপনার প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে