logo
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৭ আশ্বিন ১৪২৭

  সালেহা চৌধুরী   ২৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০  

আমাদের দেশ আমাদের মানুষ

আরেকটি সমস্যা বিষধর সাপের মতো। সে সমস্যার নাম দুর্নীতি। বঙ্গবন্ধু একবার বলেছিলেন- আমি তো চোরের খনি পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন- আমি যদি ওদের কাফনের কাপড় দিই ওরা তা দিয়ে পাঞ্জাবি বানাবে। এখন এসব ঘটনা যখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট, আশা করি এসব দমনও ঠিক সময়ে হয়ে যাবে। আর বিদেশে টাকা পাচার এমন একটি ব্যাপার যা আমাদের সব সম্পদ বাইরে নিয়ে যায়, আমাদের ব্যাংক খালি হয়ে যায়।

আমাদের দেশ আমাদের মানুষ
সবকিছু বলার আগে আমাদের দেশ নিয়ে কিছু বলতে হয়। কারণ আমাদের দেশ ভৌগোলিকতায় এই পৃথিবীর ভেতর একটি সংকটময় দেশ। এখানে বান, তুফানে, ঝড়ে ও সংকটে, অসহায়তায় আমাদের দিন কাটে। অনেক ভৌগোলিক বিশারদ বলেন হয়তো একদিন বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে যাবে। যখন যাবে তখন দেখা যাবে এখন দেখা যাক আমরা এই পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে কোন জায়গায় বিরাজ করি। এই পৃথিবীর যে দশটি দেশ উন্নত ও মানবতার চাষবাসের শীর্ষস্থানে আছে বলে মনে করা হয়। সেই দশটি দেশ- নেদারল্যান্ড, সুইডেন, কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইউকে, নিউজিল্যান্ড। বলা হয় সেখানে প্রতিটি মানুষের সুখ-সুবিধা ও নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়। সোজা কথায় দেশগুলোতে মানবতার চাষ হয়। তাহলে দেখা যাক, এই দেশগুলোতে কি আছে যা আমাদের নাই। কানাডাকে ২০২০ সালে এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী দেশ বলা হয়। এখানে অনেক কিছুর সঙ্গে আছে তেল যা আমাদের নেই। নেদারল্যান্ডেও তাই। ওখানেও আছে প্রচুর তেল। নরওয়তে তেল আছে। এ ছাড়া অন্য দেশগুলোতে তেল না থাকলেও অন্য নানা কিছু। যেসব বিদেশে রপ্তানি করে ওদের প্রচুর টাকা আসে। অস্ট্রেলিয়াতে অনেক কিছুর সঙ্গে আছে সোনা। ডেনমার্ক এ মাথাপিছু আয় এই পৃথিবীর ভেতর সবচেয়ে বেশি। দেখা যাক- ওদের কি আছে? উইন্ড টারবাইন, ওষুধপাতি, যন্ত্রপাতি, মাংস, দুধ এবং দুধের রপ্তানি। কাজেই এসব রপ্তানি করে প্রচুর টাকা আয় করে ডেনমার্ক। এরপর তাহলে বলি অন্য দেশগুলোতে মানুষের ঘনত্বের পরিমাণ। কানাডায় প্রতি কিলোমিটারে ৪ জন, অস্ট্রেলিয়ায় ৩ জনের একটু বেশি, সুইডেনে ২৪ জন, সুইজারল্যান্ডে ২১৯ জন, ফিনল্যান্ডে ১৯ জন, ইউকেতে ৫০ জন, নেদারল্যান্ডে একটু বেশি তাই ৪২৬ জন। আর নিউজিল্যান্ডে ১৮ জন। কাজেই যেসব দেশগুলোকে আমরা বলছি মানবতার চাষবাসে উন্নত তাদের আমাদের মতো সমস্যা নেই। আমাদের মানুষের ঘনত্ব এই পৃথিবীর ভেতরে সবচেয়ে বেশি। প্রতি কিলোমিটারে ১২৫২ জন। কোথায় একজন, দুজন, তিনজন চারজন আর কোথায় ১২৫২ জন। বাংলাদেশের পরে এই ঘনত্বে যার নাম সেটা লেবানন। ওদের প্রতি কিলোমিটারে লোকজনের সংখ্যা ৫৯৫। আমাদের দেশের অর্ধেকও নয়। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের অবস্থাও আমাদের চেয়ে ভালো। ওদের লোকসংখ্যার ঘনত্ব ৩৮২ জন। যে চীন লোকসংখ্যার ঘনত্ব নিয়ে কতসব নিয়ম করে তাদের প্রতি কিলোমিটারে লোকসংখ্যা ১৪৮ জন বর্তমানে। আমি যা বলতে চাই সে এই এক নম্বর আমাদের দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, দুই নম্বর রপ্তানি করার মতো তেল নেই আমাদের আছে কিছু পোশাক-আশাক, আর আমাদের আছে অনেক মানুষ। তেল না থেকেও অনেক দেশ মানবতার চাষে দশজনের ভেতর একজন। দশজনের ভেতর একজন না হয়েও অনেকে আমাদের চেয়ে ভালো আছে। আমাদের দেশ ঘনত্বের দিক দিয়ে একেবারে আকাশচুম্বি। এমন অবস্থায় আমাদের দেশের সমস্যা বেশি হবে, মানবতার চাষ পিছিয়ে থাকবে, প্রাণের দায়ে লোকজন এটা-সেটা করবে এ বোধহয় খুব বেশি অস্বাভাবিক নয়। এ ছাড়া যে সমস্যা তা হলো 'সোসাল ওয়েল ফেয়ার' সিস্টেম বলে কোনো সিস্টেম আমাদের নেই। মানে কারও চাকরি গেলে সে সরকারি ভাতা পাবে না, না খেয়ে থাকলেও নয়। বিশাল মানুষের সমারোহে সে চাষ যে কবে হবে কে বলবে। যে বাড়িতে দুজন থাকার কথা সেখানে আছে বিশজন বা তারও বেশি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন তিনি প্রত্যেকের জন্য বাড়ি দেবেন। খুবই ভালো কথা। যদি পারেন এ এক অলৌকিক সমাধান তিনি করলেন। এ ছাড়া এদের চিকিৎসার ব্যাপারেও কিছু করা হবে এমন কথাও আমরা শুনে থাকি। কিন্তু সেটা এখনো হয়নি। করোনাকালে আমরা জেনেছি মানুষের লোভ ও লালসা কোথায় তাদের নিয়ে গেছে। করোনা নিয়ে ব্যবসা পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয়েছে? চালচুরি, তেলচুরি, ভুয়া সার্টিফিকেট, ভুল চিকিৎসা, চিকিৎসার পর্বত প্রমাণ খরচ সবকিছুই আমাদের ভাবায়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন লোকজনকে বাড়িতে থাকতে বলা হচ্ছে কিন্তু অনেকের তো বাড়িই নেই। আবার বাড়ি থাকলে খাবার নেই। শক্তিশালী 'সোসাল নেটওয়ার্ক' সেসব তো নেই। কাজেই আমাদের দুর্গতির শেষ নেই। এসব আগে ঠিক করেন তারপর বাড়িতে থাকতে বলেন।

এবার তাহলে আসছি আমাদের দেশের মানুষজন কেমন? এক শ্রেণির মানুষের চাহিদা অনেক কম। একটু খাবার আর একটু আশ্রয়ের বেশি তারা কিছু চায় না। রোজার সময় ঝড় থেকে বাঁচতে এক জায়গার মানুষের শেল্টারে রাখা হয়েছিল। সন্ধ্যাবেলায় একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন- আপনারা কি খেয়েছেন? উত্তর দিলেন একজন নারী- খাইছি বাবা। কি খেয়েছেন? প্রশ্ন করলেন সাংবাদিক। উত্তর দিলেন নারী- মুড়ি আর জিলাপি। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম খালি এটুকু? তাতেই কত পরিতৃপ্ত এই নারী। মুড়ি আর জিলাপি। খালি মুড়ি পেলেও তিনি হয়তো অভিযোগ করতেন না। এর উল্টো পিঠে আমরা কাদের দেখতে পাই? যারা টেবিলে দশ-বারো রকম খাবার সাজিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন। পোস্ট না দিলেও এই তাদের স্বাভাবিক খাবারের তালিকা। এই যে বিশাল পার্থক্য এই হলো আমাদের সমস্যা। কারও বাড়ি নেই কারও দশটি-বিশটি বাড়ি। কারও কাপড় নেই, কারও কাপড়ের পর্বত। কেউ ঈদে কাপড় কিনতে পারেন না কেউ ঈদে গয়নাগাটি কিনে আনেন। এসব আমার লেখার দরকার নেই। সবাই জানে। অনেক আগে গান্ধীজী একটি কথা বলেছিলেন- এই পৃথিবীতে যে সম্পদ আছে তা আমাদের প্রয়োজনের জন্য অনেক কিন্তু লোভের জন্য নয়। তাই সরকারি সাহায্য লোভের কাছে হেরে যায়। গরিব যে তিমিরে ছিল সেখানেই থাকে।

আরেকটি সমস্যা বিষধর সাপের মতো। সে সমস্যার নাম দুর্নীতি। বঙ্গবন্ধু একবার বলেছিলেন- আমি তো চোরের খনি পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন- আমি যদি ওদের কাফনের কাপড় দিই ওরা তা দিয়ে পাঞ্জাবি বানাবে। এখন এসব ঘটনা যখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট, আশা করি এসব দমনও ঠিক সময়ে হয়ে যাবে। আর বিদেশে টাকা পাচার এমন একটি ব্যাপার যা আমাদের সব সম্পদ বাইরে নিয়ে যায়, আমাদের ব্যাংক খালি হয়ে যায়।

\হ'তবে ব্রেন পাচার' তো অনেকদিন থেকে শুরু হয়ে গেছে। আমরা যারা বিদেশ থেকে রেমিটান্স পাঠাই পাচারের তুলনায় তার পরিমাণ খুব বেশি নয়। আর আমাদের দেশে পোশাকশিল্পের মতো রেমিটান্সও একটি বড় আয়।

মানবতার চাষ করতে হলে যে শিক্ষা আমাদের দরকার তা আমাদের সবার আছে কি? কাগুজে বিদ্যা হয়তো অনেকের আছে কিন্তু সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত কতজন? এখন বড় আধুনিক দেশ বলে আমরা তো প্রতিবেশীরও খবর নিই না। মরে গেলেও জানি না কি হয়েছিল তার।

এবার অন্য এক প্রসঙ্গে আসছি। ঢাকায় আমার বাড়ির নিচে কয়েকজন দারোয়ান আছে। একদিন আমি লেখালেখি করি বলে তারা বলছিলেন- আম্মা আমাদের কষ্ট তো কেউ দেখে না। প্রশ্ন করি কি কষ্ট? ওরা বলে- আমরা অনেকে দুই শিফট কাজ করি মানে ষোল ঘণ্টা কিন্তু আমাদের একদিনও ছুটি নেই। এক শিফটে আমাদের দিন চলে না। ঈদের দিনেও আমাদের কাজ করতে হয়। মনে মনে বলি- এদের তো জীবন আছে। কাপড় ধোওয়া, বাজার করা এবং আরও কতকিছু। আমি বড় করে এই নিয়ে ফেসবুকে একটি স্টাটাস দিই। দারোয়ানদের সপ্তাহে একদিন ছুটি দেওয়া হোক। কিন্তু সে স্টাটাসে কোনো কাজ হয়নি। শুধু কি ওরা? আরও অনেকে আছে যাদের জীবনে সপ্তাহে একদিন ছুটি নেই। ঝাড়ুদার, কাজের লোক, বিন ফেলার লোকজন এবং আরও অসংখ্য শ্রমজীবী। মানবতার চাষ করতে গেলে আমাদের শুরু করতে হবে নিচ থেকে উপরে। উপর থেকে নিচে নয়। যখন নিচ দিকটায় কিছু মানবতার আলো পৌঁছাবে তা উপর পর্যন্ত আলোকিত করবে। কিন্তু উপরটা আলোকিত করলে সে আলো নিচে পৌঁছাবে না।

একজন বড় সাহেব আর একজন পিওনের বেতনে আকাশপাতাল পার্থক্য। হয়তো একদিন এই পার্থক্য কমে যাবে। হয়তো একদিন পিওনের একটা বাড়ি থাকবে। এবং আর সবার। সমস্যা হলো মানুষ আর মানুষ। এত মানুষ যাদের সবার সমস্যা দূর করা কঠিন। কিন্তু পৃথিবীতে অসম্ভব বলে তো কিছু নেই। লন্ডনের পুরো টেমস নদীর পানি শোধন করা হয়েছিল। যা এই পৃথিবীর মধ্যে আর কোনোখানে হয়নি। এখন ওখানে কিছু ফেলা মানে প্রচুর জরিমানা। আমাদের জীবনেও সুদিন আসতে পারে। আমাদের জীবনে একদিন সবাই মুক্তির আলো দেখবে। ম্যান নাকি পাওয়ার? যাকে বলা হয় 'ম্যান পাওয়ার কমিশন'। তারপরেও এসব 'পাওয়ার'-এর সব কি কাজে লাগছে?

তবে প্রথমে আমি যে সমস্যার কথা বলেছি তার সমাধান সবকি মানুষের হাতে? ভৌগোলিক সমস্যা। ঝড়-তুফান-খরা-বান।

দেশপ্রেম নামের বীজমন্ত্র যেদিন সবার মন্ত্র হবে হয়তো সুদিন আসতেও পারে। যখন প্রতিটি মানুষ হবে সম্পদ।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে