logo
রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৫ আশ্বিন ১৪২৭

  হারুন হাবীব   ২৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০  

মানবতাবিরোধী অপরাধ

এমনকি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর যে সদস্যরা বাংলাদেশের মাটিতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, যাদের বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধী বলে চিহ্নিত করেছিল, তাদের বিচারের কী হয়েছে সেটিও জানাতে হবে বৈকি। যদি এসব না করা হয় তাহলে বলতেই হবে, সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিষয়টি অধরাই থেকে যাবে।

মানবতাবিরোধী অপরাধ
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে- এতে দ্বিমত থাকবে কেন। তবে দেশটি পাকিস্তান বলেই কিছু পূর্বশর্ত আছে। সে সম্পর্ক হতে হবে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে নির্বিচারে বাঙালি গণহত্যার প্রকাশ্য দায় স্বীকার করে, অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, ধর্মীয় অজুহাত না দেখিয়ে বাংলাদেশকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে, পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকে সঠিক ইতিহাস সন্নিবেশিত করে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর অভ্যাস বাদ দিয়ে জুলাই মাসের প্রথমে পাকিস্তানের নয়া রাষ্ট্রদূত ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন তার পরপরই ঢাকা-ইসলামাবাদের 'নতুন সম্পর্ক' নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত। এরপর মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বললেন। তখন থেকে দুই দেশের সম্পর্কের 'নতুন দিগন্ত' উন্মোচিত হতে যাচ্ছে বলে লেখালেখি শুরু হলো। পাকিস্তানের পত্রপত্রিকা এবং নানা প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে উলেস্নখযোগ্যভাবে এগিয়ে থাকল। ভারতেরও কিছু পত্রিকা এমন বিশ্লেষণ দিতে থাকল যাতে মনে হতে পারে ঢাকা-ইসলামাবাদের মধ্যে অতীতের সব বিদ্বেষ-সংকট কাটিয়ে নয়া যুগের সূচনা হতে চলেছে। বলা বাহুল্য, এই 'নতুন সম্পর্ক-এর' আলোচনাটি আবার এমন সময়ে শুরু হয়েছে যখন লাদাখের গালওয়ান ভেলিতে চীনের সৈন্যদের হাতে একজন কর্নেলসহ ২০ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হওয়ায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং প্রায় একই সঙ্গে নেপালও আকস্মিকভাবে ভারতবিমুখী নীতি অবলম্বন করে।

যে কোনো স্বাধীন দেশের বহির্বিশ্ব নীতি পরিচালিত হয় সে দেশের নিজস্ব প্রয়োজন বা জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায়। বাংলাদেশও তার নিজস্ব প্রয়োজনে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করার সার্বভৌম অধিকার রাখে। তবে যেহেতু এ ক্ষেত্রে দেশটি পাকিস্তান সেহেতু নানামুখী জনপ্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা গেছে। প্রথমত, যারা মনে করেন অতীতের তিক্ততা কাটিয়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া উচিত; দ্বিতীয়ত, যারা ভাবেন দেশ থেকে, তাদের দৃষ্টিতে, 'ভারতের প্রভাব' কমাতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক মধুর হওয়া বাঞ্ছনীয়; এবং তৃতীয়ত, যারা সাম্প্রদায়িক তত্ত্বে বিশ্বাসী তারা সবাই এ খবরে বেশ পুলকিতও বোধ করতে থাকেন। আরও পুলকিত বোধ করে সেই শ্রেণিটি, যাদের পূর্বপুরুষ ১৯৭১-এর যুদ্ধে পাকিস্তানের পতন ঠেকাতে পারেনি বা ৪৯ বছরেও যারা পাকিস্তানপ্রীতি বজায় রেখেছে। অন্যদিকে একাত্তরের রণাঙ্গনের সৈনিকসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী ব্যাপকসংখ্যক মানুষ এ ধরনের আলোচনায় বিস্মিত হয়েছেন। অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দলের পক্ষে এমন পদক্ষেপ নেওয়া আদৌ কি সম্ভব? এই শ্রেণির নাগরিকদের ধারণা, সত্যি সত্যি যদি এমন সিদ্ধান্ত হয়- তা আত্মঘাতী হতে পারে। প্রতিক্রিয়া যাই থাক না কেন, প্রশ্ন হচ্ছে, আদৌ কি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্কের 'নতুন দিগন্ত' উন্মোচিত হতে যাচ্ছে, যেমনটা পাকিস্তানের সরকার বা গণমাধ্যমগুলো আশা করছে? নাকি বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় মনমানসিকতায় এমন সম্পর্ক হওয়া বাস্তবসম্মত হবে?

সেদিনকার পশ্চিম পাকিস্তান বা পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি কেবল ১৯৭১ থেকে নয়, কার্যত ১৯৪৭-এর ভারত উপমহাদেশের উপনিবেশমুক্তি হওয়ার পর থেকেই। তারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষাকে হরণ করতে গিয়ে প্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদী উন্মেষ ঘটিয়েছিল। অতএব তিক্ততা গোড়া থেকেই। এরপর পূর্ব বাংলার ওপর চলেছে প্রায় দুই যুগের ঔপনিবেশিক শাসন। বারবার তারা গণতন্ত্রের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করেছে। বাঙালি জনগোষ্ঠীকে শাসন-শোষণ করেছে ধর্মের নাম ভাঙিয়ে। এরপর তারা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা ও নারী নির্যাতন চাপিয়ে দিয়েছে। এরই ফলে ঘটেছে সর্বাত্মক এক গণযুদ্ধ; গণহত্যা ও নারী নির্যাতনকারী সৈন্যদের বিরুদ্ধে বাঙালি হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে, ঘটেছে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের যুদ্ধশেষে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এসব ঘটনা কল্পকাহিনি নয়, রক্তে লেখা ইতিহাস। এরপরও স্বীকার করতে হবে পৃথিবী কখনও এক জায়গায় বসে থাকে না, সময়ের দাবিতে অতীতের দুঃখ-বেদনার বিপরীতে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, নতুন যুগের সূচনা হয়। যেমন হয়েছে জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের, ভিয়েতনামের, যেমন অপরাধের ক্ষমা চেয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে জাপান। সময়ের চাহিদার পূরণেই মুক্তিযুদ্ধের তিন বছরের মাথায় পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান সফর করেছেন। গণহত্যার অন্যতম হোতা জুলফিকার আলী ভুট্টোও এসেছেন বাংলাদেশে। অতএব সময়ের চাহিদায় ঢাকা-ইসলামাবাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কিন্তু কার্যত তা হয়নি। হয়নি, তার প্রধান কারণ, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পরেও পাকিস্তান বাংলাদেশকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেনি, বরং তারা কৌশলী ভূমিকা অবলম্বন করে কার্যত ১৯৭১-এর যুদ্ধক্ষেত্রের ভূত জিইয়ে রেখেছে। তারা বারবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়েছে, কূটনৈতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করেছে, বাঙালির জাতীয় যুদ্ধের তিক্ততা কাটতে না কাটতেই নতুন তিক্ততা সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বাংলাদেশের মাটিতে যে গণহত্যা ও নির্বিচার নারী নির্যাতন ঘটেছে- তার জন্য আজও অনুতপ্ত হয়নি পাকিস্তান, ক্ষমা প্রার্থনা করেনি, যদিও দেশটির বিবেচক অনেক বুদ্ধিজীবী সে দাবি তুলেছিলেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের নিজস্ব আইনে অনুষ্ঠিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে বাধা সৃষ্টি করেছে তারা। মন্ত্রিসভার সদস্যরাই শুধু নন, পাকিস্তানের খোদ জাতীয় সংসদে বাংলাদেশবিরোধী প্রস্তাব পাস করা হয়েছে! বলা হয়েছে, যাদের দন্ডিত করা হয়েছে তারা 'সাচ্চা পাকিস্তানি'। তাহলে কি এটিই বলতে হবে- এখনো বাংলাদেশের মাটিতে কিছু ছিটমহল রেখে চলেছে পাকিস্তান? এ ছাড়া বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রতিষ্ঠায় মদদ দেওয়ার অভিযোগও বর্তেছে দেশটির ওপর।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আগেও কথা বলেছেন। অতএব এবারের ফোনালাপের বিষয়ে কারও আপত্তি থাকার সংগত যুক্তি নেই। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ ধরনের ফোনালাপ আন্তর্জাতিক কূটনীতিরই অংশ। জানা গেছে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও এ ব্যাপারে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেননি, বরং বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং সময়ের দ্বারা পরীক্ষিত। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপের পর থেকে কাশ্মীরের সংকট কমেছে ভাবার কারণ নেই। রাজনীতিবিদদের অন্ত্যরীণ করা এবং সেখানকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়গুলো খোদ ভারত এবং বহির্বিশ্বে বহুল আলোচিত-সমালোচিত। তবে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশ বিষয়টিকে শুরু থেকেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় মনে করে আসছে।

ইতিহাসের সত্য হচ্ছে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণমানুষের যে জাতীয় যুদ্ধ তার প্রধানতম মিত্র ভারত, যে দেশে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে এক কোটি মানুষ আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। সত্য আরও আছে, শরণার্থীদের জন্য কেবল নিরাপদ আশ্রয় নয়, ভারতের সরকার ও গণমানুষের পূর্ণ সমর্থনে সে দেশের মাটিতেই প্রশিক্ষিত হয়েছে বাঙালির মুক্তিবাহিনী, এমনকি ভারতীয় বাহিনীরও বহুসংখ্যকের রক্ত ঝরেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে। অতএব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বুনিয়াদ ১৯৭১, যে একাত্তর দুই দেশের সম্পর্কের অমোচনীয় অধ্যায়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ লাগোয়া সীমান্ত এবং এই সীমান্ত তৈরি হয়েছে ব্রিটিশের হাতে ১৯৪৭ সালে, যাতে গোড়া থেকেই সংকটের বীজ পোঁতা আছে। ইতোমধ্যে দুই দেশ কিছু বড় দ্বিপক্ষীয় সংকটের সুরাহা করার সাফল্য দেখিয়েছে বটে, কিন্তু অনেকই আজও ঝুলে আছে। এসবের মধ্যে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ও সীমান্ত হত্যাকান্ডের মতো বিষয় পীড়াদায়ক। বলা বাহুল্য, এই অমীমাংসিত বিষয়গুলো বছরের পর বছর ডালপালা বিস্তার করে জনমনে প্রভাব ফেলছে। এখানে আরও একটি কথা বলা সংগত বিবেচনা করি। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের হাতে যদি কট্টর ধর্মনীতি নির্ধারিত হতে থাকে, তাদের ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ যদি (হোক তা দলীয় রাজনীতির স্বার্থে) প্রবল বিতর্কিত বক্তব্য প্রদান করতে থাকেন, তখন লাগোয়া সীমান্তের কারণেই তার প্রভাব ছুঁয়ে যাবে বাংলাদেশে। এতে ১৯৪৭-এর ধর্মরাজনীতির অনুসারীরা পুনর্জাগরিত হওয়ার উপলক্ষ খুঁজে পায়, বাংলাদেশেও ধর্মীয় উগ্রবাদ বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরি হয়। কারণ বাংলাদেশ যে দ্বি-জাতিতত্ত্বকে ব্যর্থ প্রমাণ করেছে ১৯৭১-এর রক্তস্নানে, সেই তত্ত্ব পুনর্জন্ম লাভ করুক- তা মেনে নিতে পারে না তারা।

পরিশেষে বলি, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে- এতে দ্বিমত থাকবে কেন। তবে দেশটি পাকিস্তান বলেই কিছু পূর্বশর্ত আছে। সে সম্পর্ক হতে হবে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে নির্বিচারে বাঙালি গণহত্যার প্রকাশ্য দায় স্বীকার করে, অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, ধর্মীয় অজুহাত না দেখিয়ে বাংলাদেশকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে, পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকে সঠিক ইতিহাস সন্নিবেশিত করে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর অভ্যাস বাদ দিয়ে।

এমনকি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর যে সদস্যরা বাংলাদেশের মাটিতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, যাদের বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধী বলে চিহ্নিত করেছিল, তাদের বিচারের কী হয়েছে সেটিও জানাতে হবে বৈকি। যদি এসব না করা হয় তাহলে বলতেই হবে, সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিষয়টি অধরাই থেকে যাবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে