logo
রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৫ আশ্বিন ১৪২৭

  আহমদ মতিউর রহমান   ২৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০  

আইনের শাসন ও মানবাধিকার

আইনের শাসন ও মানবাধিকার বিষয়টি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা রয়েছে ও ভিন্ন ভিন্ন পারস্পেকটিভে বিষয়টিকে দেখাও হচ্ছে। কারণ সব দেশের অবস্থা এক রকম নয়। বহু দেশেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে আর বলতেই হচ্ছে সেসব দেশে রয়েছে আইনের শাসনের অভাব। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের বিষয়টি এখন আরও প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে, যখন আমরা দেখছি, মানুষের অধিকারগুলো আঞ্চলিক যুদ্ধ, সংঘাত, হানাহানির কারণে বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

আইনের শাসন ও মানবাধিকার

আগেই বলে নেওয়া ভালো, আইনের শাসন ও মানবাধিকার বিষয়টি এখনকার সময়ে খুবই তাৎপর্যবহ। বিষয়ের গভীরে ঢোকার আগে দুটো বিষয়ই স্পষ্ট হওয়া দরকার। পাঠকের বোঝার সুবিধার জন্য উল্টো দিক থেকে শুরু করি। 'ল লেসনেস' অর্থাৎ আইনের শাসনহীনতা না থাকাই হচ্ছে আইনের শাসন। ল লেসনেস এমন একটা অবস্থা যেখানে কারও জীবন নিরাপদ নয়, ধরুন শত্রম্নপক্ষ একজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলল অথবা চুরির দায়ে যে কেউ একজনের জীবন নিয়ে নিল, কথা পছন্দ হয়নি বলে শক্তিধর ব্যক্তি দুর্বলকে জনসমক্ষে চড় মেরে বসল। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এ বিষয়ে কোনো প্রতিকার কারও কাছ থেকেই পাচ্ছে না। এটা ল লেসনেস, আইনের শাসনহীন অবস্থা। এর বিপরীত অবস্থাটা অর্থাৎ তার প্রতি যে অন্যায় হয়েছে তার প্রবিবিধান পাওয়াই হচ্ছে আইনের শাসন। আর দ্বিতীয় বিষয় মানবাধিবার। মানুষ হিসেবে যে কারও স্বাধীনভাবে চলার, সম্পদ ক্রয় ও ভোগ করার অধিকার, মৌলিক অধিকার- ভাত, কাপড়, বাসস্থান ও চিকিৎসা গ্রহণের অধিকার যদি কেউ কারও বাধার কারণে ভোগ করতে না পারেন, সেই অবস্থার বিপরীত অবস্থার নাম মানবাধিকার। প্রশ্ন উঠতে পারে উল্টো করে কেন বোঝাচ্ছি। বহু দেশে এই পরিস্থিতি বিরাজমান আর ওই যে বলেছিলাম বুঝতে সুবিধার জন্য। এর পর আমরা দুটো বিষয়ের আলোকপাত করে মূল আলোচনায় যাব, আর সেটা করব বিষয়টিকে ভালো করে বোঝার জন্য। এখানে বলে নেওয়া ভালো, আইনের শাসন ও মানবাধিকার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তাই ঘুরে-ফিরে দুটি বিষয়ই কখনো এককভাবে বা কখনো পৃথকভাবে আলোচনায় আসবে। আইনের শাসন বলতে আইনের চোখে সবাই সমান এবং সবকিছুর উপরে আইনের প্রাধান্যের স্বীকৃতিকে বোঝায়। আইনের শাসনের অর্থ হচ্ছে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি এবং ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাই আইনের কাছে সমান। যে কেউ আইন ভঙ্গ করলে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে এটা আইনের শাসনের বিধান। আইনের শাসন ব্যক্তির সাম্য ও স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। আইনের শাসন বলতে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি বোঝাচ্ছে : ঞযব ৎঁষব ড়ভ ষধ িরং 'ঞযব ধঁঃযড়ৎরঃু ধহফ রহভষঁবহপব ড়ভ ষধ িরহ ংড়পরবঃু, বংঢ়বপরধষষু যিবহ ারববিফ ধং ধ পড়হংঃৎধরহঃ ড়হ রহফরারফঁধষ ধহফ রহংঃরঃঁঃরড়হধষ নবযধারড়ৎ; (যবহপব) :যব ঢ়ৎরহপরঢ়ষব যিবৎবনু ধষষ সবসনবৎং ড়ভ ধ ংড়পরবঃু (রহপষঁফরহম :যড়ংব রহ মড়াবৎহসবহঃ) ধৎব পড়হংরফবৎবফ বয়ঁধষষু ংঁনলবপঃ :ড় ঢ়ঁনষরপষু ফরংপষড়ংবফ ষবমধষ পড়ফবং ধহফ ঢ়ৎড়পবংংবং.' ঞযব :বৎস 'ৎঁষব ড়ভ ষধ'ি রং পষড়ংবষু ৎবষধঃবফ :ড় 'পড়হংঃরঃঁঃরড়হধষরংস' . . ., ধহফ ৎবভবৎং :ড় ধ ঢ়ড়ষরঃরপধষ ংরঃঁধঃরড়হ, হড়ঃ :ড় ধহু ংঢ়বপরভরপ ষবমধষ ৎঁষব. আর রুল অব ল কথাটির ব্যবহার কখন শুরু সে প্রসঙ্গে তাতেই বলা হচ্ছে : \হটংব ড়ভ :যব ঢ়যৎধংব পধহ নব :ৎধপবফ :ড় ১৬:য-পবহঃঁৎু ইৎরঃধরহ, ধহফ রহ :যব ভড়ষষড়রিহম পবহঃঁৎু :যব ঝপড়ঃঃরংয :যবড়ষড়মরধহ ঝধসঁবষ জঁঃযবৎভড়ৎফ বসঢ়ষড়ুবফ রঃ রহ ধৎমঁরহম ধমধরহংঃ :যব ফরারহব ৎরমযঃ ড়ভ শরহমং. ঔড়যহ খড়পশব ৎিড়ঃব :যধঃ ভৎববফড়স রহ ংড়পরবঃু সবধহং নবরহম ংঁনলবপঃ ড়হষু :ড় ষধংি সধফব নু ধ ষবমরংষধঃঁৎব :যধঃ ধঢ়ঢ়ষু :ড় বাবৎুড়হব, রিঃয ধ ঢ়বৎংড়হ নবরহম ড়ঃযবৎরিংব ভৎবব ভৎড়স নড়ঃয মড়াবৎহসবহঃধষ ধহফ ঢ়ৎরাধঃব ৎবংঃৎরপঃরড়হং ঁঢ়ড়হ ষরনবৎঃু. "ঞযব ৎঁষব ড়ভ ষধ"ি ধিং ভঁৎঃযবৎ ঢ়ড়ঢ়ঁষধৎরুবফ রহ :যব ১৯:য পবহঃঁৎু নু ইৎরঃরংয লঁৎরংঃ অ. ঠ. উরপবু. ঐড়বিাবৎ, :যব ঢ়ৎরহপরঢ়ষব, রভ হড়ঃ :যব ঢ়যৎধংব রঃংবষভ, ধিং ৎবপড়মহরুবফ নু ধহপরবহঃ :যরহশবৎং; ভড়ৎ বীধসঢ়ষব, অৎরংঃড়ঃষব ৎিড়ঃব: 'ওঃ রং সড়ৎব ঢ়ৎড়ঢ়বৎ :যধঃ ষধি ংযড়ঁষফ মড়াবৎহ :যধহ ধহু ড়হব ড়ভ :যব পরঃরুবহং'. সহজ ইংরেজি তাই অনুবাদ দিলাম না। আপাতত আমাদের আলোচনা বোঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট, রাশভারি করতে চাচ্ছি না। আর মানবাধিকার হচ্ছে কতগুলো সংবিধিবদ্ধ আইন বা নিয়মের সমষ্টি, যা মানবজাতির সদস্যদের আচার-আচরণ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে বোঝায় এবং যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক আইন সমষ্টি দ্বারা সুরক্ষিত যা মৌলিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধর্তব্য। এতে কোনো মানুষ এজন্য সংশ্লিষ্ট অধিকার ভোগ করবে যে, সে জন্মগতভাবে একজন মানুষ। অন্য কথায় বলা যায়, দৈনন্দিন জীবনে চলার জন্য মানুষের যে সব অধিকার রাষ্ট্রের সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত তাদের মানবাধিকার বলে। জাতিসংঘের  টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং এর প্রথম অনুচ্ছেদে লেখা রয়েছে, অষষ যঁসধহ নবরহমং ধৎব নড়ৎহ ভৎবব ধহফ বয়ঁধষ রহ ফরমহরঃু ধহফ ৎরমযঃং. মানব পরিবারের সব সদস্যের জন্য সার্বজনীন, সহজাত, হস্তান্তরযোগ্য নয় এমন এবং অলঙ্ঘনীয় অধিকারই হলো মানবাধিকার। মানবাধিকার প্রতিটি মানুষের এক ধরনের অধিকার যেটা তার জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য। মানুষ এ অধিকার ভোগ করবে এবং চর্চা করবে। তবে এ চর্চা অন্যের ক্ষতিসাধন ও শান্তি বিনষ্টের কারণ হতে পারবে না। মানবাধিকার সব জায়গায় এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এ অধিকার একই সঙ্গে সহজাত ও আইনগত অধিকার। স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম দায়িত্ব হলো এসব অধিকার রক্ষণাবেক্ষণ করা। দেখা যাচ্ছে মানবাধিকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিকতাও জড়িয়ে আছে। তা না হলে এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়ে অধিকারগুলো ভোগ করা কঠিন হয়ে পড়ত। আইনের শাসন রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিবিশেষ, যেখানে সরকারের সব ক্রিয়াকর্ম আইনের অধীনে পরিচালিত হয় এবং যেখানে আইনের স্থান সবকিছুর ঊর্ধ্বে। ব্যবহারিক ভাষায় আইনের শাসনের অর্থ এই যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকার সর্বদা আইন অনুযায়ী কাজ করবে, যার ফলে রাষ্ট্রের যে কোনো নাগরিকের কোনো অধিকার লঙ্ঘিত হলে সে তার প্রতিকার পাবে। আইনের শাসন তখনই বিদ্যমান থাকে, যখন সরকারি ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অনুশীলন সাধারণ আদালতের পর্যালোচনাধীন থাকে, যে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার সব নাগরিকের সমান। দেশভেদে আইনের শাসনের বিভিন্ন প্রকারভেদ লক্ষ্য করা যায়। ইংল্যান্ডে যেসব সাধারণ নীতি দ্বারা আইনের শাসন নিশ্চিত হয়েছে তার অধিকাংশই সেখানকার নাগরিকদের আদালতে উত্থাপিত বিভিন্ন মামলার বিচার বিভাগীয় রায়ের ফসল। ওইসব রায়ে নাগরিকদের ব্যক্তিগত অধিকার নির্ধারিত হয়েছে। এ ছাড়া ম্যাগনা কার্টা (১২১৫), দ্য পিটিশন অব রাইটস (১৬২৮) এবং বিল অব রাইটসে (১৬৮৯) ইংরেজদের স্বাভাবিক অধিকারগুলো ঘোষিত হয়েছে, যা ওই দেশের আইনের শাসন নিশ্চিত করে। ইংরেজ জাতির ঐতিহ্য, রীতিনীতি, ব্যবহারবিধি এবং তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশের দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যদিয়ে ব্যক্তিগত অধিকার সম্পর্কে ইংরেজদের সচেতনতা গড়ে উঠেছে। সেগুলো পরে সৃষ্ট অনেক নতুন রাষ্ট্রের লিখিত সাংবিধানিক দলিলের মতোই পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়। অধিকাংশ নতুন রাষ্ট্রের সংবিধানে ইংরেজদের ওইসব অলিখিত নীতিমালা সন্নিবেশিত হয়েছে। এখন দেখি বাংলাদেশের অবস্থা। বাংলাদেশের সংবিধান জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি এবং সংবিধান মতে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। সেই জনগণের অধিকারই হচ্ছে মানবাধিকার। আমাদের দেশ এমনিতে প্রায় সমপ্রকৃতির একটি সমতাবাদী, সামাজিক সচেতনতাসম্পন্ন এবং উদারনৈতিক দেশ। মানবাধিকারের সূক্ষ্ণ ধারণাগুলো কার্যত এ দেশে এখনো গভীরভাবে বিবেচনা করা হয় না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উলেস্নখযোগ্য উন্নতি এবং গতিশীলতা অর্জন করলেও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে দেশ কতটুকু অগ্রগতি অর্জন করেছে সে বিষয়টি নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। এটা এখনকার জন্য যেমন সত্য গত বিশ বা ত্রিশ বছরের ইতিহাস ঘাটলেও এমনটাই মিলবে। আইন গরিব আর ধনীর সঙ্গে সমান আচরণ করে না, এমন বিশ্বাস সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচলিত। তা থাকলেও প্রত্যেক সমাজের জনগণ প্রত্যাশা করে আইন সবাইকে সমান দৃষ্টিতে বিবেচনা করবে। শুধু তাই নয় বরং সবাই আইনের সমান আশ্রয় গ্রহণ করার সুযোগও পাবে। আর বাস্তব সত্যি হচ্ছে, আইনের নিজের কোনো শক্তি নেই। আইন নিজে থেকে কোনো কাজই করতে পারে না। সত্যিকারের আইনের শাসনের জন্য দক্ষ চালিকাশক্তি প্রয়োজন। এমনি এমনি আইনের শাসন বাস্তবায়িত হতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় 'আইনের শাসন' কথা দুটো উলেস্নখ আছে, বাস্তবায়ন প্রশ্নাতিত নয়। আগেই বলেছি আইনের শাসনের সঙ্গে মানবাধিকারের প্রসঙ্গটি জড়িত। বর্তমানে আইনের শাসন মানবাধিকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত। আইনের শাসন আনুষ্ঠানিক দলিলের চেয়ে বড়, সরকারি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সমাজের সব সদস্যের জন্য এটি হচ্ছে ন্যায়বিচার এবং আশ্রয় গ্রহণের বিধান। সহজ করে বলা যেতে পারে, সরকার তার ক্ষমতা আইনের বিধান মেনে প্রয়োগ এবং ব্যবহার করবে। আর যদি সরকার আইন মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং ক্ষমতার অপব্যহার না করে তবে রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বেচ্ছাচারিতার বলি হতে হবে না। যেখানে দেশের নাগরিকরা স্বেচ্ছায় আইন মেনে চলে না, যেখানে ব্যক্তির নিরাপত্তা নেই, সন্ত্রাস, ভয়প্রদর্শন, গুম, হত্যা নৈমিত্তিক বিষয় এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নাজুক সেখানে আইনের শাসনের আবহাওয়া গড়ে ওঠা কঠিন। বাংলাদেশে আজকাল ছোট-বড় নানা মামলাই আদালতে আসে। আর এ প্রক্রিয়ায় আমরা প্রতিনিয়ত আদালত, আইন এবং সংবিধানের দ্বারস্থ হচ্ছি। ফলে এ বিষয়ে তেমন কোনো সন্দেহ নেই, বাংলাদেশে এক ধরনের আইনের শাসন বলবৎ রয়েছে। তবে কিছু কিছু ব্যত্যয় যে নেই তা বলা যাবে না। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়- সব দেশের বেলায়ই প্রযোজ্য। যেখানে আইন থাকবে মানবাধিকার থাকবে সেখানে কিছু কিছু ব্যত্যয়ও থাকবে। দেখতে হবে মানবাধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা। এটা পাঠক বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানটা ধারণা করে নিতে পারেন। আমাদের দেশের আইনের শাসন ঠিক কী পর্যায়ে রয়েছে সে বিষয়টি অনুমানের জন্য মানবাধিকারের অবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখতে পাই আইন মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বা হচ্ছে। সারা দেশে যে হত্যা, গুম ও ধর্ষণের মতো ঘটনা চলছে তার সঠিক প্রতিবিধান হচ্ছে বলে মনে হয় না। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও এই বক্তব্যকে সমর্থন করে। তবে আমরা সেদিকটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। কার্যকারিতার দিক থেকে বিবেচনা করলে মানবাধিকার একটি আইনি প্রশ্ন। সঙ্গত কারণেই মানবাধিকার বিষয়ে নানা প্রশ্ন যেমন রয়েছে ঠিক তেমনি নানা মতও রয়েছে। যেখানে অধিকার সেখানেই লঙ্ঘন ও বঞ্চনার প্রশ্ন ওঠে। অধিকার লঙ্ঘন বা বঞ্চনার বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করা যাবে। আইনের শাসন ও মানবাধিকার বিষয়টি কেবল একটি দায়সারা বিষয় না ভেবে নিত্যদায়িত্ব এবং অপরিহার্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এই আদর্শ অধিক জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশের সমাজের বিভিন্ন বর্ণ, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার একমাত্র শান্তিপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখা উচিত। সরকারের এখানে দায় অনেক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অবস্থান তুলে ধরার ব্যবস্থা রয়েছে। এ থেকে আমরা তুলনা করতে পারি কার কি অবস্থান। আইনের শাসন পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা দি ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডবিস্নউজেপি) রুল অব ল ইনডেক্স প্রতিবেদনে প্রতি বছর এসব তথ্য পাওয়া যায়। ২০২০ সালের এই ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান দুই ধাপ নিচে নেমে হয়েছে ১১৫তম। ১২৮টি দেশের অবস্থান তুলে ধরে ডবিস্নউজেপি রুল অব ল ইনডেক্স ২০২০ প্রকাশিত হয় গত ১১ মার্চ। ১ লাখ ৩০ হাজার খানা জরিপ ও চার হাজার লিগ্যাল প্রাকটিশনারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবারের ইনডেক্স তৈরি করা হয়েছে। আশপাশের দেশগুলোর অবস্থান একটু দেখে নিই। সবচেয়ে ভালো ৬১ নম্বর অবস্থানে আছে নেপাল। আছে আগের অবস্থানেই। শ্রীলংকা আছে ৬৬ নম্বর অবস্থানে; অবনতি হয়েছে দুই ধাপ। ভারতের অবস্থান আগের মতোই ৬৯ নম্বরে। পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের নিচে ১২০ নম্বরে; অবনতি হয়েছে একধাপ। আফগানিস্তানের আরও খারাপ অবস্থা, ১২২ নম্বরে অবস্থান। তবে দেশটি ৩ ধাপ এগিয়েছে। এবার শীর্ষে থাকা দেশগুলোর অবস্থান একটু দেখে নেওয়া যাক। ইনডেক্সে শীর্ষস্থান ১ নম্বরে আছে ডেনমার্ক; আছে আগের অবস্থানে। আগের অবস্থান ধরে রেখে পরবর্তী স্থানগুলোতে আছে নরওয়ে (২), ফিনল্যান্ড (৩), সুইডেন (৪) ও নেদারল্যান্ডস (৫)। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা অর্থাৎ তালিকার একেবারে শেষে ১২৮ নম্বরে আছে ভেনিজুয়েলা, ধরে রেখেছে আগের অবস্থান। উন্নত ও গণতন্ত্রের পীঠস্থান বলে পরিচিত যুক্তরাজ্যের অবস্থান একধাপ পিছিয়ে ১৩ নম্বরে আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একধাপ পিছিয়ে আছে ২১ নম্বরে। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অবস্থান ২০১৯ সাল থেকে দুই ধাপ অবনতি হয়েছে। সে বছর অবস্থান ছিল ১১৩তম। আর ২০১৮ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১১৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০২তম স্থানে ছিল। সে বছর দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ। মধ্য আয়ের ৩০ দেশের মধ্যে ছিল ২২তম। ২০১৭ সালে অবস্থান ছিল ১০৪তম। খানা জরিপ ও আইন বিশেষজ্ঞের মতামত ও আইনের শাসনবিষয়ক আটটি সূচকের ভিত্তিতে ডবিস্নউজেপি রুল অব ল ইনডেস্ক জরিপটি করা হয়। সরকারি ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, নিয়ম ও নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতার প্রয়োগ, নাগরিক ন্যায়বিচার ও ফৌজদারি অপরাধের বিচার- এই আটটি সূচকের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় প্রতিবেদন। দেখা যাচ্ছে, গত চার বছরে বাংলাদেশের অবস্থার অবনতি হয়েছে। তবে এসব প্রতিবেদনের বক্তব্য প্রসঙ্গে সরকারগুলোকে ভিন্নমত পোষণ করতে দেখা যায়। ডবিস্নউজেপি নামের ওই প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাডেলিন অলব্রাইট। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী গিউলিয়ানো আমাতো, ফ্রান্সের সাবেক আইনমন্ত্রী রবার্ট বাদিনটার এবং ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি বেস্নয়ারের পত্নী ব্যারিস্টার চেরি বেস্নয়ার সংস্থাটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। আইনের শাসন ও মানবাধিকার বিষয়টি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা রয়েছে ও ভিন্ন ভিন্ন পারস্পেকটিভে বিষয়টিকে দেখাও হচ্ছে। কারণ সব দেশের অবস্থা এক রকম নয়। বহু দেশেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে আর বলতেই হচ্ছে সেসব দেশে রয়েছে আইনের শাসনের অভাব। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের বিষয়টি এখন আরও প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে, যখন আমরা দেখছি, মানুষের অধিকারগুলো আঞ্চলিক যুদ্ধ, সংঘাত, হানাহানির কারণে বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। \হপ্রথমত একটি পরিবার ও সমাজের কর্তারা তাদের অধিনদের অধিকার রক্ষা করবে। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্র এবং তৃতীয়ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানবাধিকার রক্ষায় রক্ষাকবচ হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। তা যে করা হচ্ছে না আমরা সংবাদপত্রের খবরে প্রতিদিনই দেখতে পাই। প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকারের প্রবক্তা দেশগুলোর সহায়তায় তা কতখানি অর্জিত হতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে