গণমাধ্যমের জন্মক্ষত

চতুর্থ শিল্প বিপস্নব-পরবর্তী সময়কালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কবলে গণমাধ্যম মোকাবিলা করছে নতুন আরেক বাস্তবতা। ফিরে যাচ্ছে প্রাক শিল্প-বিপস্নব যুগে। একে প্রযুক্তির এক চমৎকার 'রসিকতা' বলা যায় কিংবা আমরা বলতে পারি, গণমাধ্যম তার আবর্তন প্রক্রিয়া শেষ করে ফিরে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমের যুগে।
গণমাধ্যমের জন্মক্ষত

একটি সংবাদের মৃতু্যর ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বাস্তবতা বিচার করা যেতে পারে। কয়েক-বছর আগের কথা, মধ্যপ্রাচ্যে শিশু পাচার নিয়ে একটি সংবাদ ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে উটের জকি হিসেবে ব্যবহৃত শিশুদের নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখতে পায়নি। অংকের হিসাব খুব সহজ। প্রতিবেদনটি প্রচার করা হলে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। উটের দৌড়ের মস্তি উপভোগে অভ্যস্ত আরব শেখরা ক্ষুব্ধ হবেন। তাতে অন্তত কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এখানে যুক্তি থমকে দাঁড়ায় এবং বিবেক বন্দি হয়ে পড়ে। তাই হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে ২০০ শিশুর অধিকার বঞ্চনার খবরটিকে হত্যা করে।

এ রকম অজস্র সংবাদের মৃতু্য আমাদের চারপাশে ঘটে। আমার কোনো কোনো কলাম লেখারও মৃতু্য হয় এখন।

একটি সংবাদের মৃতু্যর মধ্য দিয়েই সাংবাদিকতার শেষকৃত্য হয়ে গেল এ সিদ্ধান্তে উপনীতি হওয়া যায় না। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যে টাল খায় তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আইন, নীতিমালা বা অধ্যাদেশ জারি করে এ পরিস্থিতি উত্তরণ সম্ভব নয়। ১৬৪৪ সালে জন মিল্টন প্রথমবারের মতো এ উপলব্ধির জের টেনেছিলেন তার লেখায় 'অবাধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ঊর্ধ্বে আমাকে স্বাধীনতা দাও নিজের বিবেক অনুযায়ী জানবার বলবার এবং অপ্রতিহতভাবে মতপ্রকাশের'। এ আকুতি আজও মুক্তির দিন দিশা খুঁজে পায়নি।

নানা কায়দায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এ যাবতকাল শাসকচক্রের হাতেই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। গণমাধ্যমের নীতি-নৈতিকতার সীমানা-পরিধিও তারাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। গণমাধ্যমে তা অনুসরণে ব্যর্থ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শাসকচক্রের বর্ম হয়েছে কখনো আইনি বেষ্টনি অথবা নৈতিকতার দোহাই, আবার পরিস্থিতিগত চাপেও গণমাধ্যম বাধ্য হয়েছে তাদের স্বাভাবিক প্রকাশের মৃতু্য ঘটাতে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যে কেবলই কেতাবি বুলি মাত্র, তা স্পষ্ট হয়েছে, মার্কিন-ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকায়। তারাই প্রমাণ করেছে সাংবাদিকতায় 'বস্তুনিষ্ঠতা' একটি একবগ্‌গা প্রচারণা মাত্র। আজকাল আর এ সব গালভরা কথামালার অসারতা অনুধাবনে বিভ্রমের কোনো অবকাশ নেই।

দুই.

একসময় পানি বিশুদ্ধকরণের একটা পদ্ধতি ছিল। ছাঁকন-পাতন পদ্ধতি। বিনে খরচায় পানি বিশুদ্ধ হতো। করপোরেটাইজেশনের কালে পদ্ধতিটি নানান নামে বাজার দখল করেছে। পদ্ধতি একই। কেবল যুক্ত হয়েছে চটকদার মোড়কাদি। তা হোক। লোকজ পদ্ধতি না হয় বিনে পয়সার ছিল। এখন সেটা কিনতে হবে। মাঝে-সাঝে তার পাথর-কয়লা-বালি বদলানোর জন্য বাড়তি পয়সা দিতে হবে।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও ওই রকম একটা ছাঁকন পাতন পদ্ধতি স্বীকৃত। তাতে সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতো। করপোরেট সাংবাদিকতা এখন সেই ছাঁকন-পাতন পদ্ধতির নতুন সংস্করণের মতো নতুন কৌশল বের করেছে। ব্যাপারটা 'করপোরেট ইম্প্রোভাইজেশন'। কৌশলে খুব কোনো মাজেজা নেই। সেখানে কেবল 'বায়বীয়' কিছু জিনিস (এই যেমন নীতি-নৈতিকতা-আদর্শ-দর্শন ইত্যাদি) একসাথে করে ঘুঁটা দিতে হয়। তাতে সাংবাদিকতা 'বিশ্বাসযোগ্যতা' হারায় কতখানি, জানি না। তবে ঘুঁটার বদৌলত করপোরেট পুঁজির জানালা ঘোলঘুলি হাট করে খুলে যায়। এ দেশে মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা কোন তলানিতে ঠেকেছে, তা বিচারের দায় পাঠক-দর্শক-শ্রোতাদেরই। করপোরেট মিডিয়ার ঘুঁটা তারা কতটা হজম করবেন সে বিবেচনার ভারও তাদের। নীতি-নৈতিকতা-আদর্শ-দর্শন এসব বায়বীয় বিষয় নিয়ে করপোরেট পুঁজির কোনো আগ্রহ নেই। সুতরাং করপোরেট মিডিয়া এখানে মুক্তই বলা যায়।

তিন.

করপোরেটোক্রেসির যুগে গণমাধ্যম আদতে একটা ব্যবসায়িক মডেল। আর দশটা ভোগ্যপণ্যের মতোই। বাজারে বিকোয়। যদিও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নানান গাল-গল্পের রেশ এখনো কাটেনি। ডেমোক্রেসির এক রকমভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা ছিল। রাষ্ট্রের 'চতুর্থ স্তম্ভ' হিসেবে দাঁড় করার জন্য একটা আখ্যান তৈরি করা হতো। গণতন্ত্রের প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। জনগণের অনুশাসন চলে গেছে করপোরেট শ্রেণির হাতে। নামকাওয়াস্তে ডেমোক্রেসির খোলসের আড়ালে চলছে করপোরেট শাসন। গণমাধ্যমের উপর করপোরেট গোষ্ঠীর এ আধিপত্যের মূলে রয়েছে প্রযুক্তির বাড়-বাড়ন্ত।

উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত গণমাধ্যম স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিশাল সংখ্যায় এবং পরিসরে জনগণের কাছে পৌঁছতে পারেনি। প্রাক-শিল্প বিপস্নব যুগে গণমাধ্যমে প্রকাশ প্রচার ও বিতরণ প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা ছিল ব্যাপক। মূলত ব্যক্তিগত সংযোগের মাধ্যমেই বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো। তা সত্ত্বেও গণমাধ্যমের প্রভাব বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বিস্তার লাভ করেছিল। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পুরোপুরি প্রতিফলন হয়ে উঠতে না পারলেও, ডেমোক্রেসির টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হয়ে উঠতে পেরেছিল। করপোরেটোক্রেসির যুগে গণমাধ্যমের টিকে থাকার পুরনো শর্তগুলো এখন মৃতপ্রায়।

চতুর্থ শিল্প-বিপস্নব পরবর্তী সময়কালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কবলে গণমাধ্যম মোকাবেলা করছে নতুন আরেক বাস্তবতা। ফিরে যাচ্ছে প্রাক শিল্প-বিপস্নব যুগে। একে প্রযুক্তির এক চমৎকার 'রসিকতা' বলা যায়। কিংবা আমরা বলতে পারি, গণমাধ্যম তার আবর্তন প্রক্রিয়া শেষ করে ফিরে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমের যুগে।

অর্থাৎ গণমাধ্যমের মৃতু্য ঘটেছে, তার জায়গা দখল করে নিচ্ছে সামাজিক মাধ্যম কিংবা নতুন মোড়ক 'প্রচারমাধ্যম'। এক সময় মানুষ যেমন মুখে মুখে খবর ছাড়াতো, হাট-বাজারে নিজেদের মতপ্রকাশ করত, নিজস্ব সামাজিক একটা বলয় তৈরি করে নিত। বর্তমান সময়কালে প্রযুক্তির সহায়তায় জনগণ একই কাজ করছেন। তফাৎ অবশ্য আছে। তা হলো, প্রাক-শিল্প বিপস্নব যুগে সামাজিক মাধ্যম ছিল মানুষে মানুষে সংযোগ স্থাপনের বিনে পয়সার উপায়। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে সামাজিক মাধ্যম তথা 'প্রচারমাধ্যম' গণমাধ্যমের প্রতি একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে তেমনি ভাগ বসাচ্ছে গণমাধ্যমের মুনাফায়। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সামাজিক মাধ্যম আমাদের সামনে হাজির করেছে ভিন্ন বাস্তবতা। অকল্পনীয় দ্রম্নততা এবং দক্ষতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন সম্ভবপর হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সংরক্ষিত হলেও সংযোগ দক্ষতা অপরিসীম। মানবিক সংযোগের ক্ষেত্রে প্রথমবারের গণমাধ্যমের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিবেশিত একরৈখিক তথ্যপ্রবাহের বাইরে জনগণের নিজস্ব তথ্যের জগৎকে প্রসারিত করেছে।

বস্নগ, ফেসবুক এবং টুইটার ক্যামেরা-ফোন সামাজিক মাধ্যম হিসেবে নতুন মনে হতে পারে। তবে অতীতে যেভাবে তথ্য সংগ্রহ এবং বিনিময় করা হতো এগুলো তারই প্রচ্ছায়া মাত্র। ক্রেগ নিউমার্ক বলছেন, 'সোশ্যাল মিডিয়া নতুন কিছু নয়, জন লক, থমাস পেইন এবং বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে আধুনিক বস্নগারদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলছেন, '...মিডিয়া এবং রাজনৈতিক হবে ভিন্নতর, কারণ ক্ষমতায় অভ্যস্ত লোকেরা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নেটওয়ার্ক দ্বারা পরিচালিত হবে।' জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বলেছেন, উইকিলিক্স ইংলিশ গৃহযুদ্ধেরর্ যাডিকাল পুস্তিকা প্রচারকারীদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে কাজ করেছেন। অ্যাসাঞ্জ জনগণের সামনে 'শোসকগোষ্ঠীর সব রহস্য এবং গোপনীয়তা' তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।

বিগত কয়েক দশকে হাফিংটন পোস্ট, উইকিলিকসের বিস্ময়কর উত্থানের মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠছে। উত্থান ঘটেছে লক্ষ লক্ষ বস্নগের। কিন্তু একই সঙ্গে করপোরেট নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের তথ্যপ্রবাহ আরও বেশি বিতর্কিত, এবং পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে উঠছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই, বিগত পৌনে ২০০ বছরে বেড়ে ওঠা গণমাধ্যমের যুগ দ্রম্নতই ফুরিয়ে আসছে। করপোরেটোক্রেসি তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় স্মরণ নিচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার।

চার.

প্রশ্ন হচ্ছে, করপোরেটোক্রেসির যুগে গণমাধ্যমের শক্তি বা সক্ষমতার সত্যি কি কোনো বাস্তবতা আছে? ক্ষমতা কাঠামোকে প্রভাবিত করার কোনোরকম সমর্থ্য কি গণমাধ্যমের রয়েছে? নাকি গণমাধ্যমের শক্তি-সক্ষমতা-সামর্থ্য নিয়ে আপ্তবাক্য অতিরঞ্জন মাত্র। প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। গণমাধ্যমের বিষয়বস্তু বিচিত্র ও বহুমুখীন। ক্ষমতা কাঠামোর ভরকেন্দ্র যেমন রাজনীতি। তেমনি রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে করপোরেট ব্যবসায়িক মডেল। গণমাধ্যম রাজনীতির উপরাপর বিষেয়াবলির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে, কদাচিৎ হয়তো গলিঘুঁজির সন্ধান খুঁজছে। কিন্তু করপোরেটোক্রেসির দাপটের সামনে তার শক্তি-সক্ষমতা-সামর্থ্য কেবল সীমিতই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে শূন্য। ফলে গণমাধ্যমকে সত্য প্রকাশের এক শূন্য গহ্বর হয়েই থাকতে হচ্ছে।

পরিস্থিতিভেদে রাজনৈতিক কার্যক্রমের নানান মাত্রা থাকে। সমাজে তার প্রভাবও সুদূর প্রসারী। গণমাধ্যমের পক্ষে রাজনৈতিক কার্যক্রমের এই ব্যাপক প্রভাব ধারণ করা অসম্ভবপ্রায়। গণমাধ্যম কেবল রাজনৈতিক কার্যক্রমের চলমানতাকে তুলে ধরতে পারে। ক্ষেত্র-বিশেষে খুব সামান্যমাত্রায় ব্যক্তিগত মতামত বা রাজনীতি পরিচালনার উপায়কে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু করপোরেটোক্রেসির মোকাবেলায় গণমাধ্যমের অসহায়ত্ব-অসারতা এখন আর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার দরকার পড়ে না। এটা এখন দিনের আলোর মতো বিদিত।

খ্যাতিমান মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওয়াল্টার লিপম্যান বলেছেন, 'গণমাধ্যম আয়নার বদলে টর্চলাইট দেখায়।' ফলে জনগণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটের এটা ঝলকানি পায় মাত্র। পরিপূর্ণ দৃশ্যের দেখা তারা কখনোই পায় না। উপরন্তু করপোরেটোক্রেসির আবর্তে গণমাধ্যম ডেমোক্রেসি সম্পর্কে জনসাধারণকে যৎসামান্যই ধারণা দিতে পারে, কখনোই আদ্যোপান্ত বিবরণ হাজির করতে পারে না।

গণমাধ্যমের পরিস্থিতি, বাস্তবতা এবং চরিত্র দেশভেদে আলাদা। করপোরেটোক্রেসির প্রভাবে গণমাধ্যম তার নিজস্ব বয়ান তৈরি করে। করপোরেটোক্রেসির উদ্দেশ্য এবং প্রয়োজন মাফিক জনমত তৈরি করে। মজার ব্যাপার হলো, তারপরও অনেকেই গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকার প্রতি আস্থা রাখতে চান। ডেমোক্রেসির কার্যকারিতা মাপেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিক্তিতে।

গণমাধ্যম তথ্যের সরবরাহকারী হিসাবে জনমতকে প্রভাবিত করে নিঃসন্দেহে। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অথবা ক্ষমতা কাঠামোর নাট-বল্টু কতটা নাড়াতে পারে তা নিয়ে তর্কের অবকাশ রয়েছে। ম্যাক্সওয়েল ই. ম্যাককমস এবং ডোনাল্ড এল শ'র মতো পন্ডিতদের মতে, গণমাধ্যম যদি জনগণের মনোযোগ নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে চালিত করতে পারে, তাদের চিন্তা-ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে ক্ষমতা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার জোরটাও তার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, করপোরেটোক্রেসি সেই জোরটার উপরই আঘাত হানে।

পাঁচ

বিশ শতকে এসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথাবার্তা হয়েছে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের ভরকেন্দ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এ শতকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংরক্ষণে সে দেশে বেশ কিছু পদক্ষেপও গৃহিত হয়েছে। ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে মার্কিনীদের নিয়ে আহাজারিও খানিকটা বৈধতার সুযোগ পেয়েছে। স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদপত্রের জন্য ডাকমাশুল রেয়াত করা হয় এবং কয়েকটি কাগজ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শাসকচক্রের দ্বিচারিতা প্রকাশিত হয়েছিল। শাসকচক্র চেয়েছিল ডাকমাশুল রেয়াতের মাধ্যমে গণমাধ্যমের নিরঙ্কুশ বশ্যতা। আবার যে কোনো পরিস্থিতিতে প্রতিস্পর্ধী ধারার গণমাধ্যমের বিকাশ শাসকচক্রের কাছে অসহনীয়। তারা চান বংশবদ গণমাধ্যম, যেখানে তাদের কীর্তিকলাপের বিবরণ থাকবে। সেখানে অবশ্য সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু তা হতে হবে 'গঠনমূলক'। গঠনমূলক সমালোচনা বলতে তারা যা বোঝাতে চান, সোজাসাপ্টা কথায় তা হলো-বিদ্যমান ব্যবস্থার তোষণ। এর ব্যত্যয় হলেই গণমাধ্যমের অপরাধ শাস্তিযোগ্য বলে ধরে নেওয়া হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর স্বাভাবিকভাবেই নেমেই আসে খড়গ।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ভাবতে হলে অন্য পথে এগোতে হবে। বর্তমান বিশ্বে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে যে বাজার, মুনাফা আর পুঁজির স্বাধীনতা, এ নিয়ে খুব বেশি দ্বিধা-দ্বৈরথের অবকাশ নেই।

ছয়.

হাইব্রিড মিডিয়ার প্রচার-প্রসার বেশি দূরে নয়। কেমন করে যেন শাক-সবজি ফল ফসলের মতো চলে গেল করপোরেটের দখলে।? আমরা সার-বীজ-কীটনাশকের দৌরাত্ম্যে, গায়ে-গতরে নাদুসনুদুস ফল-ফসল পেতে থাকলাম। প্রাকৃতিক স্বাদ-গন্ধ- গুণ-মান ভুলে হাইব্রিড ভক্ত হয়ে উঠলাম।

নব্বইয়ের শুরুর দিকে মিডিয়াকে হাইব্রিড করে তুলতে করপোরেটগুলো কতখানি পুঁজি ঢালল। আমরা একটার পর একটা তরতাজা মিডিয়া পেতে থাকলাম। আর সাংবাদিকতার নামে চলল করপোরেট দুর্নীতি আড়াল করার চেষ্টা। হাইব্রিড মিডিয়ার ঝলমলে উপস্থাপনায় ভূমি দখল, কর ফাঁকি, অবাধ দুর্নীতির উপর সহজেই পর্দা টানা যায়। দেরিতে হলেও করপোরেটরা তা বুঝেছে। কর্মসংস্থানের বেলায় তারা কি করেছে না করেছে তা অন্য আলোচনার বিষয়। তবে সাংবাদিকতার বারোটা তো এরমধ্যেই বেজে গেছে। লিফলেট আর খবরের কাগজে তফাৎ ঘুচিয়ে দিতে তারা সফল। হাইব্রিড করে তুলতে সার-বীজ-কীটনাশকের বদলে তারা খুব সযত্নে ব্যবহার করেছে: ১. হাইব্রিড আলু-মুলা-কলায় ছিটানো কীটনাশকের মতো মধ্যম সারির সাংবাদিকরা ব্যবহৃত হচ্ছেন, ২. সাংবাদিকরা পড়ছেন ত্রিশঙ্কু অবস্থায়, তারা না নিজেদের শ্রমিকের কাতারে ফেলতে পারে, না পারে করপোরেট কর্মকর্তা দাবি করতে? এখন উচ্চফলনশীল বীজ হওয়া ছাড়া সামনের কাতারের সাংবাদিক কর্মীরা উপায়হীন।

সাত.

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আমরা কথা চালাচালি করি। এ ধরনের আলোচনায় আমরা নিশ্চয় বাজার, মুনাফা আর পুঁজির বৃত্ত অতিক্রম করতে পারব না। সে বাস্তবতা আমাদের সামনে অনুপস্থিত। শাসকচক্র গণমাধ্যমের বিকাশের সূচনাকাল থেকেই দ্বিচারিতায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। শাসকচক্রের দ্বিচারিতার মধ্যে গণমাধ্যমগুলোর সামনে হাজির হয় দুটো বিকল্প। হয় তাদের সামনে ছুড়ে দেওয়া পচা মাংসের টুকরো তুলে নিয়ে ল্যাজ দোলানো, নয় প্রতিস্পর্ধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে শাসকের গঁ্যাড়াকলে জড়িয়ে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। এ ছাড়া শাসকচক্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের বোঝাপড়ার তৃতীয় কোনো পথ খোলা থাকে না। গণমাধ্যমের সঙ্গে শাসকচক্রের এ খেলা বহু পুরানো।

করপোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলো উদ্দেশ্য বাজার সম্প্রসারণ এবং মুনাফা অর্জনের মধ্যেই সীমিত বলে, জনমাধ্যমের স্বার্থ সেখানে উপেক্ষিত। সংবাদ বা তথ্যকে কেবল বিক্রয়যোগ্য তোলাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তাতে জনমানুষের কতটা ক্ষতি-বৃদ্ধি হলো, তা দেখার অবসর তাদের হাতে নেই। করপোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলোও তা ঢের জানে। মুনাফা যেহেতু তাদের একমাত্র লক্ষ্য, সংবাদ বা তথ্যের যাচাই-বাছাইও হয় মুনাফার নিক্তিতে। সেখানে অবশ্য প্রতিযোগিতা আছে। মুনাফা বৃদ্ধিও প্রতিযোগিতা। এক করপোরেট আরেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে এগিয়ে বা পিছিয়ে পড়ার প্রতিযোগিতা। মুনাফার এ প্রতিযোগিতায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের গাঁটছাড়া আবার ক্ষমতাবলয়ের সঙ্গে বাঁধা।

এখানে আবার আরেক ধাঁধা রয়েছে। যা কখনো দৃশ্যমান, কখনো অদৃশ্য। প্রচারমাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রণ যেমন করপোরেটদের হাতে একচ্ছত্র ঠিক ক্ষমতাবলয়ের নিয়ন্ত্রণ ততটা নয়। এখানে করপোরেট ও ক্ষমতাবলয়ের মাঝে একটা মজার খেলা চলে। খেলাটা টানটান উত্তেজনার হলেও এর শেষটা মধুর। আমরা আগাম অনুমান করে নিতে পারি, ঘটনা যাই ঘটুক এর পরিসমাপ্তিতে জেতে মুনাফাবৃদ্ধির কৌশলগুলোই।

জনমানুষ সেখানে অসহায়। তার কিছু বলার নেই। কিছু করার নেই। করপোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যম সেখানে একচেটিয়া দাপটের সঙ্গে খেলে যায়। মানুষকে যা গেলাতে চায়, দেখাতে চায়, শোনাতে চায়, বোঝাতে চায়। বাধ্যত মানুষকে তাই গিলতে হয়, দেখতে হয়, শুনতে হয়, বুঝতে হয়। মানুষ করপোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলোর সামনে হয়ে ওঠে খেলার পুতুল মাত্র। তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কোনো বাস্তবতা কি আজকের দুনিয়ায় অবশিষ্ট আছে? ক্ষমতার উৎস যেমন- রাজনীতি, তেমনই রাজনীতির নিয়ন্ত্রক কেনা-বেচার মডেল। এ কেনা-বেচার দাপটের সামনে বিকল্প শক্তি-সামর্থ্য কতখানি? প্রচার-মাধ্যমের চলমান ধারার বিপরীতে প্রান্তিকের রয়েছে নিজস্ব মূল্যবোধ, দর্শন এবং বিশ্বাস, ক্ষেত্র-বিশেষে নিজস্ব বাকভঙ্গি। যা কখনো আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। সেই সব প্রান্তজনের মূল্যবোধ, দর্শন, বিশ্বাস এবং বাকভঙ্গিটুকু তুলে ধরার পরিসর সৃষ্টিতে বিকল্প গণমাধ্যম নির্মাণ করা সম্ভব। হয়তো চকচকে মনকাড়া সব গণমাধ্যমের ভিড়ে বিকল্প গণমাধ্যম শুরুতে নিতান্তই সামান্য, অনুজ্জ্বল। সীমাবদ্ধতাগুলোকে নিয়েই প্রান্তিকীকরণের বিরুদ্ধে লড়াইটা গণমাধ্যমের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে। প্রান্তিকীকরণের বিপরীতে মানুষের অপার সম্ভাবনা, অদম্য সাহসে আস্থা রয়েছে। আবহমানকাল ধরে এ জনপদ একদিকে নদীবিধৌত পলিমাটির মতো অনমনীয়, অন্যদিকে নদীভাঙনের মতো রুদ্ধ। করপোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমের এ বৃত্তের বাইরে বিকল্প জনমাধ্যম গড়ে তোলার লড়াইটা সহজ নয়।

আট.

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা তৈরি বিভ্রম। শাসকচক্রের প্রচারণা কৌশলের দাপটে আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ব্যক্তির স্বাধীনতা থেকে আলাদা করে ভাবতে শুরু করেছি। এ এক রকম ফাঁদ। এ ফাঁদে পা দিয়ে আমরা বিস্মৃত হতে থাকি, ব্যক্তি হিসেবে আমাদের অধিকারের সীমানা চৌহদ্দি। এ সুযোগে শাসকচক্র আমাদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার রূপকথা শোনায়। স্বাধীনতার অমিয় স্বাদ পেতে আমরা অনায়াসে গলাধঃকরণ করতে গণমাধ্যমকে।

লেখক : কবি ও কলাম লেখক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে