সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার নানা দিক

উন্নত দেশগুলোতে যে কেউ ইচ্ছা করলেই সাংবাদিকতায় আসতে পারেন না। কারণ সাংবাদিক হওয়ার জন্য নূ্যনতম যোগ্যতা হচ্ছে- ভালো লেখাপড়া জানা, মাতৃভাষা ও ইংরেজি ভাষাটা রপ্ত করা। লেখা ও লেখা সম্পাদনার ক্ষমতা দক্ষতা থাকা। দেশ ও বিদেশের সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে চলা।
সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার নানা দিক

সংবাদপত্র, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা বিষয়ে দেশের অধিকাংশ মানুষেরই স্বচ্ছ ধারণা নেই। সংবাদপত্রকে কেউ কেউ ধর্মগ্রন্থের কাছাকাছি মনে করেন, সাংবাদিকতা কোনো পেশা নয়, চুক্তিভিত্তিক কোনো বাড়তি খন্ডকালীন কাজ- যার বিনিময়ে কেবল সামান্য কিছু সম্মানী জোটে, আর সাংবাদিক মানেই ধান্ধাবাজ, প্রতারক, বস্ন্যাকমেইলার ও ভীতিকর কোনো প্রাণী- এমন ধারণাই পোষণ করেন দেশের গরিষ্ঠ মানুষ। এমন ধরনের বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে ওই ত্রয়ী শব্দ যত না দায়ী তার চেয়ে বেশি দায়ী বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতি। এ দেশে যারা শিক্ষিত তাদের অধিকাংশই সংবাদপত্র পাঠ করেন না। এমনও উচ্চশিক্ষিত পরিবার রয়েছে যে বাসায় কোনো সংবাদপত্র রাখা হয় না। দেশ, সমাজ ও বিদেশের ঘটনাবলি তথ্য জানার কৌতূহল এবং জ্ঞান আহরণের জন্য সাধারণত মানুষ সংবাদপত্রের দিকে ঝোঁকে। যার কারণে প্রতিবেশী দেশ ভারতে একজন ট্যাক্সিচালক থেকে শুরু করে সবজি ও চা বিক্রেতা পর্যন্ত নিয়মিত সংবাদপত্র পড়েন ও রাখেন। আমাদের বড় ব্যর্থতা হচ্ছে সংবাদপত্র কয়েকগুণ বেড়েছে কিন্তু সে অনুযায়ী পাঠক তৈরি হয়নি। পাঠক তেমন বাড়েওনি। একটা নির্দিষ্টসংখ্যক পাঠকই ঘুরেফিরে রুচি বদলের জন্য এক পত্রিকা থেকে অন্য পত্রিকার গ্রাহক হয়। তাই সংবাদপত্রের পাঠক যেমন বাড়ে না ঠিক তেমনি বাড়ে না বইয়ের পাঠকও। পাঠাভ্যাস ব্যক্তিগত রুচি এবং নিজেকে সমসাময়িক ঘটনাবলি ও তথ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেই মানুষ প্রধানত সংবাদপত্র ও বইয়ের দিকে ঝোঁকে। যে শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানুষের মধ্যে এ বিষয়গুলো অনুপস্থিত তাদের পক্ষে সংবাদপত্র কিংবা বইয়ের পাঠক হওয়া সম্ভব নয়। সম্ভব নয় এ বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান অর্জনও। তাহলে পাঠক বাড়ানোর দায়িত্ব কার?

সংবাদপত্রের পাঠক কি এমনি এমনি বাড়বে? পৃথিবীতে এমনি এমনি কোনো কাজই হয় না। সংবাদপত্র শিল্পটি দেশের কোনো টাঁকশাল নয় যে, এ শিল্পের খুঁটিনাটি জানা যাবে না। পাঠক সকালবেলা একটি নতুন ঝকঝকে তকতকে পত্রিকা হাতে পায়- কিন্তু উৎপাদনের পেছনের ইতিহাস জানে না। এর সঙ্গে সারা দেশের শত শত মানুষের ঘাম-শ্রম ও জীবন-ঝুঁকি জড়িত। গভীর রাত পর্যন্ত ঘুমহীন কাজ করতে হয় সংবাদকর্মীদের। অনেকটা নিশাচরের ভূমিকা তাদের। সাংবাদিকদের পারিবারিক জীবন বলতে কিছু নেই। কিন্তু সাংবাদিকদের মূল্যায়ন সমাজে নেই বললেই চলে। এর নেপথ্য কারণ অনেক। কারণ না বলে অভিযোগের কথা বলি।

আমি যখন রায়েরবাজারের সোনাতন গড়ে থাকতাম তখন অফিসে যাওয়া-আসার পথে ঝিগাতলা বাজারে ঢুকতাম। ওই বাজারে একজন নিম্নমানের অশিক্ষিত ক্রাইম রিপোর্টার বাজার করতেন। আমি জেনে অবাক হলাম যে তার বাজার করতে কোনো টাকা লাগে না। সবকিছুই ফ্রি। মফস্বল সাংবাদিকদের কথা শুনেছি, তারা নাকি সকালবেলা খালি ব্যাগ নিয়ে বাজারের উদ্দেশে পকেটে টাকা না নিয়ে বের হন এবং ব্যাগভর্তি করে বাজার নিয়ে বাসায় ফেরেন। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি-অনিয়মের ওপর অগ্রিম রিপোর্ট করে রিপোর্টার নিজেই গিয়ে হাজির হন প্রতিষ্ঠানপ্রধানের কাছে এবং টাকাভর্তি হলুদ খাম নিয়ে ফিরে আসেন। সমাজে এই শ্রেণির সাংবাদিকই যে সব তা নয়, অনেক ত্যাগী, নির্লোভী, সৎ সাংবাদিক সমাজে রয়েছেন যারা কেবল মানবকল্যাণে, সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছেন। তারা হচ্ছেন আমাদের নমস্য।

একবার এক ইংরেজির অধ্যাপক আমার বাসায় এলেন। সংসারের নানা টানাপড়েনের কথা জানতে পেরে তিনি অবাক হলেন। তিনি বললেন, সাংবাদিকদের তো অভাব-অনটন থাকার কথা নয়। সাংবাদিকরা হচ্ছেন সমাজের সবচেয়ে সুবিধাভোগী শ্রেণি। এক কেজি পটল বাজার থেকে কিনতে গেলেও সুবিধা নেয়। সাংবাদিকদের তো হলুদ খামভর্তি চারদিক থেকে টাকা আসে। আপনার তো টানাপড়েন থাকার কথা নয়। ওই অধ্যাপকের কথায় অবাক হলেও তার কথার প্রতিবাদ করি না। সাংবাদিকদের সম্পর্কে এসব নেতিবাচক ধারণাই বাজারে চালু রয়েছে বেশি। ফলে ওই নেতিবাচক ধারণার আড়ালে একজন সাংবাদিকের নিষ্ঠা, শ্রম, সততা, আদর্শবাদিতা ও জীবন-ঝুঁকি অবলীলায় ঢাকা পড়ে যায়। নোবেল বিজয়ী বিশ্বখ্যাত ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বা গল্পকথক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তার এক লেখায় বলেছেন, সাংবাদিকতা হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পেশা। তিনি নিজে সাংবাদিক বলে হয়তো কথাটা বলেছেন। অথবা বলেছেন বিশ্ব প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওই মন্তব্য কতটা যৌক্তিক তা বিবেচনার দাবি রাখে।

উন্নত দেশগুলোতে যে কেউ ইচ্ছা করলেই সাংবাদিকতায় আসতে পারে না। কারণ সাংবাদিক হওয়ার জন্য নূ্যনতম যোগ্যতা হচ্ছে- ভালো লেখাপড়া জানা, মাতৃভাষা ও ইংরেজি ভাষাটা রপ্ত করা। লেখার ও লেখা সম্পাদনার ক্ষমতা দক্ষতা থাকা। দেশের ও বিদেশের সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে চলা।

অবাক ব্যাপার যে, ভাষা সম্পর্কে যার কোনো ধারণা নেই, এডিটিং সেন্স যার নেই, নিজের পত্রিকাটাও যিনি মনোযোগ দিয়ে পড়েন না, পৃথিবীর ৯৫ ভাগ যার অজানা তিনিই হচ্ছেন সবচেয়ে বড় সাংবাদিক। এই ধরনের সাংবাদিকরা আবার রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন এবং সমাজে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন।

ইতিহাস-দর্শন-অর্থনীতি, রাজনীতি-সমাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে গভীর জ্ঞান না হোক কাজ চালানোর ধারণা ছাড়াই যখন একজন বিখ্যাত সাংবাদিক বনে যান এবং যার চিন্তা থাকে কেবল টাকা কামানো- ওই সাংবাদিকের ব্যাপারে কেউ খারাপ ধারণা পোষণ করলে দোষের দেখি না। আমাদের চারিত্রিক কারণেই আমরা আজ পুলিশের কাতারে দাঁড়িয়ে গেছি। দেশের মানুষ পুলিশ ও সাংবাদিকের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পায় না। তাদের ভয় করে সম্মান শ্রদ্ধা করে না।

আমি নিজে যত্রতত্র সাংবাদিক পরিচয় দিতে লজ্জিতবোধ করি। পেশাগত কাজে কিংবা নিতান্ত প্রয়োজনে যদি কোথাও এই পরিচয়টা দিই তখন মানুষ সম্মান করে। কিন্তু আমার ধারণা, ওই সম্মানটা ভেতর থেকে হয় না। আমি সাংবাদিক হলেও হয়তো ব্যতিক্রম কেউ, এই ধারণা আমি তাদের ভেতরে জন্মাতে ব্যর্থ হই। তবুও আমি মনে করি, এই ব্যর্থতা আমার নিজের নয়, গোটা সাংবাদিক সমাজের। কারণ পেশাটাকে আমরা কেবল ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করছি এবং ওই ব্যর্থতার জায়গায় নিয়ে গেছি। যার কারণে পুলিশের পাশাপাশি এখন সাংবাদিকদের নামও উচ্চারিত হয়।

আমি শুরুতেই বলেছি, বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি এর জন্য দায়ী।

পুলিশ কিংবা সাংবাদিকরাই (সবাই নয়) যে ওই দোষে দুষ্ট তা নয়, যে কোনো পেশার দিকে আপনি তাকাবেন প্রায় একই দোষের মানুষ পাবেন। ধরুন শিক্ষকতা পেশার কথা। শিক্ষকদের এক সময় আদর্শবান বলা হতো। কিন্তু এখন ওই অভিধায় তাদের আর অভিহিত করা হয় না। দেখা হয় না শ্রদ্ধার চোখেও। আদর্শের ওই জায়গা থেকে অনেক শিক্ষকই এখন সরে এসেছেন। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তহবিল তছরুফের অভিযোগ থেকে শুরু করে ছাত্রী ধর্ষণ, যৌন নিপীড়নসহ এন্তার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে নকল পরিবেশন করারও। উকিলের কথা বাদই দিলাম। বিচারকরা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণের দায়ে অভিযুক্ত। খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও ঠিকমতো ক্লাস না নিয়ে এনজিওর কনসালটেন্সি করেন, গোপনে পড়ান অন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও। সুতরাং নীতি-আদর্শের জায়গাটা সব পেশাতেই হয় খোয়া গিয়েছে, না হয় টলটলায়মান।

বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় নীতি-আদর্শে টিকে থাকা হচ্ছে চব্বিশ ঘণ্টা আগুনে হাত রাখার মতো। লোভ-স্বার্থান্ধতা সবসময়ই আমাদের মধ্যে কাজ করে। তাই নীতি-আদর্শে টিকে থাকা খুবই কঠিন ব্যাপার। নীতি-আদর্শ ত্যাগ করার নাম আধুনিকতা কিংবা উত্তর-আধুনিকতা নয়।

তাই শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী কেউই নীতি-আদর্শে পুরোপুরি টিকে থাকতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে কেবল পুলিশ কিংবা সাংবাদিকের দোষ কী? ডাক্তার মিথ্যা সার্টিফিকেট দেন, সুযোগ বুঝে রোগীর শ্লীলতাহানি ঘটান, ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর মৃতু্যও ঘটান। কি খেলাধুলা, কি শিল্প-সাহিত্য, কি ব্যবসা-বাণিজ্য, কি চিকিৎসা যে কোনো একটি সেক্টরের দিকে তাকালেই বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র বোঝা যায়। আমরা কোনো কাজই মনোযোগ দিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে করি না। করলেও সততার চেয়ে দুর্নীতি ও ফাঁকিই সেখানে প্রাধান্য পায়।

এর জন্য মূলত রাজনৈতিক দলগুলোই দায়ী। তারা সবাই মিলে দেশ ঠিক করলে দেশের প্রতিটি সেক্টরের এমন করুণদশা হতো না। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নই দেশকে এমন অস্থিতিশীল, আদর্শহীন, দুর্নীতিপ্রবণ জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। তাই বাংলাদেশ পরপর পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করে। পুলিশ দুই টাকা, একটি সিগারেট অথবা এক খিলি পান পর্যন্ত ঘুষ খায়, সাংবাদিকরা অবলীলায় তার আদর্শের জায়গা থেকে সরে যায়, আর শিক্ষক, বিচারকরাও অভিযুক্ত হন ঘুষ-দুর্নীতিতে।

দেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা সুগম হলে, সামাজিক স্থিতিশীলতা থাকলে, অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হলে এ সব খিস্তিখেউড় হয়তো করা লাগত না। সংবাদপত্র সম্পর্কেও পাঠকের স্বচ্ছ ধারণা সৃষ্টি হতো। তাই গোড়ায় গলদ রেখে কোনো কিছুই ঠিক করা সম্ভব নয়। তাহলে কি ৪৯ বছর পর আমরা সবকিছু নতুন করে শুরু করব? হয়তো তাই। তারপরও আমি আশাবাদী। এই দেশ, দেশের মানুষ একদিন ঠিক হবে। সাংবাদিকদের দুর্নাম কুড়াতে হবে না, বাংলাদেশেও সাংবাদিকতা শ্রেষ্ঠ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। সৎ, মেধাবী, যোগ্য, তথ্যপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা এখন সংবাদপত্রে ঢুকছে। পরিস্থিতি একদিন পাল্টাবেই। তখন বাংলাদেশে বসে আমিই মার্কেসের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলব, সাংবাদিকতাই হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পেশা। আমরা নিঃস্বের কাতারে নেই, আমরাই শ্রেষ্ঠ।

\হ

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে