সংবাদপত্রের উপযোগিতা

এটা সত্য, আমাদের দেশে এখন অসংখ্য সাংবাদিক। বলা চলে, ঝাঁকে ঝাঁকে সাংবাদিক। যোগ্যতা-দক্ষতার কোনো বালাই নেই।
সংবাদপত্রের উপযোগিতা

সংবাদপত্রের সোনালি যুগ ছিল গত শতকের ষাটের দশক। সম্পাদকের তালিকা দেখুন : মওলানা আকরম খাঁ, মুজিবর রহমান খাঁ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবদুস সালাম, জহুর হোসেন চৌধুরী। জাঁদরেল বার্তা সম্পাদকের তালিকা সিরাজুদ্দীন হোসেন, এবিএম মূসা, তোয়াব খান, সন্তোষ গুপ্ত। সিনিয়র সাংবাদিক ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুলস্না কায়সার, আহমেদুর রহমান, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, কে জি মুস্তফা, হাসান হাফিজুর রহমান, নির্মল সেন, আহমেদ হুমায়ুন, বজলুর রহমান প্রমুখ। এরপর বার্তা সম্পাদক হিসেবে যারা খ্যাতি অর্জন করেন আসাফউদ্দৌলা রেজা, ফওজুল করিম, কামাল লোহানী। এটা কোনো গবেষণার তালিকা নয়। মোটামুটি এরাই সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক বা সাংবাদিক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি ও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

ষাটের দশকে (প্রকাশকাল: ১৯৬৪) দৈনিক পাকিস্তান (স্বাধীনতার পরে দৈনিক বাংলা) যে একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও আধুনিক বাংলা দৈনিকে পরিণত হয়েছিল এবং ব্যাপক পাঠক আকর্ষণ করতে পেরেছিল, তার পেছনে একটি দক্ষ টিমই প্রধানত কাজ করেছিল। আবুল কালাম শামসুদ্দীন, তোয়াব খান, ফওজুল করিম, আহমেদ হুমায়ুন, নির্মল সেন, খোন্দকার আলী আশরাফ, ফজলুল করিম, হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ। এদের নেতৃত্ব ও অবদান অপরিসীম। আমি অবদানের চেয়ে নেতৃত্বকে অনেক বড় বলে মনে করি। ফওজুল করিমের নেতৃত্বে দৈনিক পাকিস্তান প্রকাশ করে 'শেষের পাতা'। পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠা জুড়ে শুধু ফিচার। অচিরেই 'শেষের পাতা' পাঠকমহলে সাডা ফেলে দেয়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় 'শেষের পাতা' একটি বড় সৃজনশীল অবদান। সংবাদপত্র যে পাঠক শেষ পৃষ্ঠা থেকে পড়া শুরু করতে পারে তা দৈনিক পাকিস্তান প্রমাণ করেছে। এমনই আকর্ষণ ছিল শেষের পাতার।

পত্রিকায় রিপোর্টের জন্য কী ধরনের এক্সক্লুসিভ বিষয় হতে পারে, সেই রিপোর্টে কী কী তথ্য থাকা উচিত, রিপোর্টের জন্য কার কার সঙ্গে দেখা করা উচিত, কোন বইয়ে বা জার্নালে আরও তথ্য থাকতে পারে ইত্যাদি ফওজুল করিম বাড়ি থেকে নিজউপ্রিন্ট কাগজে লিখে আনতেন রিপোর্টারের জন্য। শুধু লেখাই নয়, নানাভাবে ব্রিফিং করতেন রিপোর্টারকে। শুধু রিপোর্ট নয়, ফিচারের জন্যও নানা বিষয় প্রস্তাব করতেন। রিপোর্ট বা ফিচারের আকর্ষণীয় হেডলাইন লেখার জন্য তার জুড়ি ছিল না। ছবি এডিটিং ছিল তার আরেকটি প্রিয় কাজ। এখনকার সাংবাদিকরা পেশার প্রতি তেমন মনোযোগী নয়। তারা ব্যক্তিগত আখের গোছাতে ব্যস্ত।

এটা সত্য, আমাদের দেশে এখন প্রচুর সাংবাদিক। বলা চলে ঝাঁকে ঝাঁকে সাংবাদিক। যোগ্যতা দক্ষতার কোনো বালাই নেই।

এখন যে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতা হয় তাই নয়, প্রচুর লোকজন আজকাল ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে যান, যেনতেন প্রেস কার্ড নিয়ে ঢুকে পড়েন, এতে আমাদের যে প্রাতিষ্ঠানিকতা, সেটা খুব লোপ পাচ্ছে। আবার সোশ্যাল মিডিয়ার নাম করেও কিছু লোকজন ভিড়ে যায়। এটাও একটা বড় সমস্যা। এই কারণে আমরা দেখছি, সাংবাদিকদের নৈতিক দিকগুলো খুবই হালকা হয়ে যাচ্ছে-? এতে সাংবাদিকতার মান বা ভাবমূর্তি সবকিছুই ক্ষুণ্ন হচ্ছে, নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য সাংবাদিকদের নিজেদেরই এদিকে তাকানো দরকার। এটাকে সুষ্ঠু-শোভনভাবে দাঁড় করানো তাদেরই দায়িত্ব।

আমার তো মনে হয় পেশার দিকে তাদের আরও একটু গুরুত্ব দেওয়া, পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য যে ভদ্রতা শেখানো, নৈতিক দিক থেকে এগুলো মেনে চলা- এগুলোর জন্য আমার মনে হয় প্রশিক্ষণ হওয়া দরকার- এগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা হওয়া দরকার, না হলে সার্বিক সাংবাদিকতায় নৈতিক দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ব বলেই আমার বিশ্বাস? ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭০ জন সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যম মালিক, মিডিয়া সাপোর্ট গ্রম্নপের সমন্বয়ে এই নেটওয়ার্কটি গড়ে উঠেছে-?বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকতার ধরন, নৈতিকতা কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে হালনাগাদ প্রকাশনা ও তথ্য আছে তাদের ওয়েবসাইটে, আছে প্রশিক্ষণের সুযোগ, রিপোর্টিং টুলকিটসহ অনেক কিছু। এটি একটি ভালো উদ্যোগ।

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। প্রসঙ্গটি হচ্ছে জনসংযোগ। জনসংযোগ হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য ইন্টার্নাল কর্মী এবং এক্সটার্নাল যে লোকজন থাকে, অর্থাৎ যাদের সঙ্গে কর্মকান্ড করে, তাদের জন্য কাজ করবে। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক লোকজনের কাছে সঠিক তথ্য তুলে ধরবে, যাতে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা পায় বা আরও উজ্জ্বল হয়; কিংবা কোনো সংকট থাকলেও জনসংযোগ কর্মকর্তারা সঠিক তথ্য উপস্থাপন করেন, আর প্রোপাগান্ডা হচ্ছে কোনো ঘটনা সত্যি হোক আর মিথ্যা হোক, সেটাকে প্রভাবিত করার জন্য তারা কাজ করে থাকেন, প্রোপাগান্ডার একটা উদ্দেশ্য থাকে। সেখানে সত্য-মিথ্যার বিচার বিশ্লেষণ হয় না। জনসংযোগ কর্মকর্তাদের প্রোপাগান্ডা করার প্রয়োজন নেই। জনসংযোগও এক ধরনের সাংবাদিকতা।

\হ

লেখক : সাংবাদিক গবেষক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে