হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি উৎপাদন বাড়িয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কৃষি বিভাগের

ফসলি জমি রক্ষা করতে গ্রামাঞ্চলেও সরকারি/বেসরকারিভাবে গৃহায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে পারলে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ঠিক রাখা যাবে। এছাড়া আর কোনো বিকল্প পদ্ধতিতে ফসলি জমি রক্ষা করা যাবে না। গ্রামাঞ্চলের ফসলি জমি রক্ষার জন্য সরকারের দ্রম্নত পদক্ষেপ নিতে হবে।
হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি উৎপাদন বাড়িয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কৃষি বিভাগের

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ কৃষি পেশার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অপরদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করে তোলার একটি প্রধান খাত হলো কৃষি। এই কৃষি পেশা অবহেলা করে অর্থনৈতিকভাবে দেশ কখনো এগুতে পারবে না। তাই সবার আগে দেশের কৃষি ও কৃষককে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষির উন্নয়ন হলে দেশ বাঁচবে, দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু আজ আমাদের দেশের কৃষি ও কৃষকের অবস্থা শোচনীয়। আমাদের অবহেলায় কৃষির অবস্থা তেমন ভালো না। প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে কৃষি জমি। যা আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য অশনিসংকেত।

বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মসজিদ-মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা নির্মাণে ব্যবহারের কারণে প্রতিদিনই কমছে কৃষি জমি। দিনে দুই হাজার বিঘা জমি কৃষি থেকে অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। একইভাবে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন ৯৬ বিঘা জলাভূমি। সেসব জলাভূমিও ভরাট করে ভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু দেশে কৃষি জমির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী কক্সবাজার, কুষ্টিয়া, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জ জেলায় কৃষি জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। রাজশাহী, নাটোর, রাঙামাটি ও হবিগঞ্জ বাণিজ্যিকভাবে কৃষি জমি ব্যবহারে মধ্যম অবস্থানে রয়েছে। আর কৃষি জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার অপেক্ষাকৃত কম সাতক্ষীরা, বরিশাল ও নেত্রকোনায়। তবে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াকেই 'ফসলি জমি হারানোর' প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ছোবলে বৈচিত্র্যও হারাচ্ছে কৃষি। ইটভাটার জন্যও প্রতি বছর হাজার হাজার একর আবাদি জমি অনাবাদিতে পরিণত হচ্ছে।

স্থানীয়রা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে ঘরবাড়ি তৈরির প্রয়োজন পড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে ফসলি জমির ওপর। এক বাবার চার সন্তান পৃথক হওয়ার পরক্ষণেই আবাদি জমিতে যার যার বাড়িঘর গড়ে তোলার উদ্যোগ দেখা যায়। অনেকে চাকরির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি জমির কোনো প্রয়োজনবোধ করছেন না। এর পরও আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছোবল। বছরে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে সহস্রাধিক হেক্টর জমি। আবাসন ও নির্মাণকাজে চলে যাচ্ছে কমবেশি আরও তিন হাজার হেক্টর।

মধুপুরের আদর্শ শিক্ষক (অবসরপ্রাপ্ত) মো. বাহাজ উদ্দিন ফকির বলেন, পরিকল্পনার অভাবে আমাদের দেশ থেকে কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের হীনমন্যতায় ভাইয়ে ভাইয়ে বিভক্ত হয়ে একাধিক বাড়িঘর নির্মাণ করছেন। যত্রতত্র কলকারখানায় অনেক কৃষি জমি চলে যাচ্ছে। মানুষ হিংসাবশত অনেক সমাজ বিভক্ত হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা গড়ে তুলছেন; যার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

মধুপুর কদিমহাতীল গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি মো. হামেদ আলী বলেন, বর্তমানে অনেক সমাজের মানুষ সামান্য ইসু্যকে কেন্দ্র করে কোন্দলে জড়িয়ে এক মসজিদ ভেঙে একাধিক নতুন মসজিদ নির্মাণ করছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, ইমামকে কেন্দ্র করে পাশের দড়িহাতীল গ্রামের পুরনো এক মসজিদ ভেঙে ৫০০ গজের মধ্যে আরও একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন। অনুরূপভাবে ঈদগাহ মাঠের গেটে নাম লেখাকে কেন্দ্র করে পাশের চাপড়ি গ্রামে পুরনো এক মসজিদ ভেঙে ৫০০ গজের মধ্যে আরও একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন।

এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গত ৩৭ বছরে শুধু ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে ৬৫ হাজার একর কৃষি জমিতে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বছরে যে পরিমাণ কৃষি জমি কমছে তার অর্ধেকই যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। অপরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে ৬৫ শতাংশ জমির উর্বরা শক্তিও হারিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় এখনই কৃষি জমি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের। কৃষি জমি কমে গিয়ে অনুৎপাদন খাতে চলে যেতে থাকলে জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুধু ব্যক্তিপর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে তা নয়, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কারণেও কমছে কৃষি জমি। কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্র ছাড়াও এলএনজি টার্মিনাল, এলএনজিভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, সাগরে জ্বালানি তেলের ভাসমান ডিপো ও পাইপলাইন (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) স্থাপন বাবদ আরও প্রায় ছয় হাজার একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত রয়েছে।

এটা নিয়ন্ত্রণের কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই। এ জন্য আইন পরিবর্তন করে উর্বর ও কৃষি উপযোগী জমির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বার বার বলা হয়েছে। 'জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি-২০১০' এবং 'কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন-২০১০' অনুযায়ী কৃষি জমি কৃষি কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো কৃষি জমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্পকারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা কোনোভাবেই নির্মাণ করা যাবে না উলেস্নখ করে একটি নামমাত্র আইন থাকলেও এর শাস্তির বিষয়টি স্পষ্ট নয়। গ্রামাঞ্চলে কৃষি জমির সবচেয়ে বড় সর্বনাশ ঘটাচ্ছে মাছের প্রজেক্ট আর ইটভাটাগুলো। ৮ থেকে ১০ একর জমি ধ্বংস করেই এসব ইটভাটা গড়ে ওঠে। ইটভাটার জন্য কাঁচামাল হিসেবে মাটিও কেটে নেওয়া হয় আবাদি জমি থেকে। এতে করে হাজার হাজার একর জমির উপরের পলি মাটি ইটভাটায় চলে যাওয়ার কারণে এসব জমিগুলোতে আর কোনো ফসল ফলানো যাচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে ইটখোলা আছে ৪ হাজার ৫১০টি। তবে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ইটখোলার সংখ্যা প্রায় ৬ হাজারের বেশি। এসব ইটভাটাগুলোতে বছরে অন্তত সাড়ে ১৩ কোটি টন মাটি লাগে, যে কারণে বছরে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমি ৩ - ৫ ফুট গভীর গর্ত করে মাটি কেটে নেওয়া হয়। অপরদিকে সারাদেশে বিভিন্ন জায়গায় ফসলের জমি নষ্ট করে মাছ চাষ করার জন্য হাজার হাজার একর জমিতে ৫-৭ ফুট গভীর করে মাছের মাছ চাষ করার জন্য প্রজেক্ট তৈরি করা হয়েছে বা হচ্ছে।

সরকারি আইন অনুযায়ী ফসলি জমি নষ্ট করা অপরাধমূলক কাজ হলেও একশ্রেণির অসাধু লোক সরকারের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে অহরহ এ কাজটি করে যাচ্ছে। মাছের এসব প্রজেক্ট তৈরি করতে তারা ব্যবহার করছে ড্রেজার মেশিন। ড্রেজার মেশিনে মাটি কাটার ফলে আশপাশের অনেক জমি ও বাড়িঘর ভেঙে পড়ছে। যার কারণে অনেক বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে প্রজেক্টের আশপাশের বাড়িঘর ও জমির মালিরা।

এরকম ভয়ংকর চিত্র বেশিরভাগ দেখা যাচ্ছে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন অঞ্চলে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফসলি জমি মাছের জন্য ভেকো মেশিনে মাটি কাটার ফলে নষ্ট হচ্ছে জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। মধুপুর ও ঘাটাইল উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইটভাটা ও মাছের প্রজেক্ট করা হচ্ছে ভেকোতে মাটি কেটে। এখানকার ফসলি জমি প্রায় নিঃস্ব হওয়ার পথে। যদিও মাছ চাষ একটা অর্থকরী প্রজেক্ট তারপরও ফসলি জমি নষ্ট করে মাছের প্রজেক্ট করা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ অসহায় ও অসচ্ছল মানুষগুলোর কারণে দ্রম্নত ফসলি জমি নিঃস্ব হতে চলছে। কারণ পরিবারে লোকসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে এক বাড়িতে সবলোক বসবাস করতে পারছে না। যার কারণে বাড়ির আশপাশের ফসলের জমিতে কোনো রকমে একটা ঘরবাড়ি বানিয়ে জীবনধারণ করে।

ফসলি জমি রক্ষা করতে গ্রামাঞ্চলেও সরকারি/বেসরকারিভাবে গৃহায়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে পারলে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ঠিক রাখা যাবে। এছাড়া আর কোনো বিকল্প পদ্ধতিতে ফসলি জমি রক্ষা করা যাবে না। গ্রামাঞ্চলের ফসলি জমি রক্ষার জন্য সরকারের দ্রম্নত পদক্ষেপ নিতে হবে।

মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন রাসেল যায়যায়দিনকে বলেন, হারিয়ে যাওয়া কৃষি জমির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষি বিভাগ কৃষিবান্ধব পদক্ষেপ নিচ্ছেন। একদিকে ফসলের অধিক উৎপাদন অপরদিকে এক ফসলি জমিকে একাধিক ফসলে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। সফল কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক অনাবাদি ও পতিত জমিতে পারিবারিক পুষ্টি বাগানের প্রকল্প হাতে নিয়ে একদিকে দেশে অনাবাদি জমিকে কৃষি জমিতে পরিণত করছেন অপরদিকে নিরাপদ শাকসবজি চাষ করে পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করছেন। মধুপুরে কফি ও কাজু বাদাম চাষ বৃদ্ধি করে অধিক লাভজনক ফসল উৎপাদনে সবাইকে উৎসাহিত করছেন।

লেখক : সাংবাদিক।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে