কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন

ম কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে কৃষির গুরুত্ব সীমাহীন। আমাদের রয়েছে উর্বর মাটি, প্রকৃতি প্রদত্ত অফুরন্ত সম্পদ, আর পরিশ্রমী জনগণ। এগুলোর সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা অসাধ্য সাধন করে ফেলতে পারি। গড়তে পারব বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা, সুখে থাকবে বাংলার মানুষ, সুখে থাকবে বাংলাদেশ। ম
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন

সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামল খ্যাত এই বাংলাদেশে এক দিন 'পুকুর ভরা মাছ' 'গোয়াল ভরা গরু' আর গোলা ভরা ধান ছিল। সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল ভরপুর। বাংলাদেশের গ্রামগুলো ছিল স্বনির্ভর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। কোনো অভাব-অনটন ছিল না; ছিল না বৈষম্য। যার যতটুকু প্রয়োজন জমি চাষ করত। ফসল ফলাত।

পশু-পাখি, হাঁসমুরগি পালন করত, মাছ ধরত। মানুষের চাহিদাও ছিল সীমিত। আদিযুগ, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং মুসলিম শাসনামল পর্যন্ত গ্রামীণ জীবন ছিল স্বচ্ছল। কৃষি ছিল জীবিকার প্রধান উৎস। এরই পাশাপাশি গড়ে উঠেছিল কুটির শিল্প, তাঁত ও ক্ষুদ্র পাটশিল্প। গ্রামে কামার-কুমার ও তাঁতীরা বিভিন্ন প্রসাধনী উৎপাদনে নিয়োজিত ছিল। বিনোদন ও খেলাধুলায় অধিকাংশ সময় পার করত।

তখন গ্রাম্য সমাজ ও পঞ্চায়েতের ভিত্তিতে ছিল গ্রামীণ জীবন বাঁধা। ইংরেজ আমলে কৃষক বাঁধা পড়ে গেল জমিদারদের জোয়ালে। ফলে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ল পুরনো গ্রামীণ সমাজ, গ্রামসভা ও পঞ্চায়েত। ভেঙে গেল স্বনির্ভরতা ও মনোবল। পরে পশ্চিম পাকিস্তানের অপশাসনের ফলে ক্রমে দেশের কৃষিব্যবস্থা ভেঙে দেশটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে বিশ্বে অন্যতম প্রধান একটি দরিদ্র দেশে পরিণত হয়। এ ছাড়াও প্রতিকূল উৎপাদন সম্পর্ক, বৈরী আবহাওয়া, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং উৎপাদিত পণ্যের অবনমিত মূল্য অভাব ও দারিদ্র্য বাড়িয়ে দেয় কৃষকের। তারা ঋণগ্রস্ত ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তীতে দেশের খাদ্য সংকট ছিল প্রকট। দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। রাস্তা-ঘাট ছিল ভাঙা ও বিধ্বস্ত। কল-কারখানা ছিল বন্ধ। যোগাযোগব্যবস্থা ছিল বিচ্ছিন্ন। বিদু্যৎ ও গ্যাসের প্রয়োজনীয় সংযোগ ছিল না। লাখ লাখ যুবক ছিল বেকার। দেশে অর্থাভাব ছিল চরম। শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ ছিল অপ্রতুল। বিপর্যস্ত ছিল গ্রামীণ জনজীবন।

গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের মুক্তির লক্ষ্যেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনের শুরু থেকেই আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলেন। এই বাংলার মানুষের ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অভাব-শোষণ-বঞ্চনা, দুমুঠো ভাতের জন্য কান্না, অসহায় মানুষের আর্তনাদই তাকে স্বাধীনতাকামী করতে উৎসাহিত করেছে। একটি প্রবৃদ্ধি সহায়ক অর্থনীতি প্রণয়ন করে, অর্থনীতিতেও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এই কিংবদন্তি। দেশের জনগণকে এই বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রামীণ উন্নয়নের পথ বেছে নেন। সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন কৃষি উন্নয়নের ওপর। তিনি সামাজিক বৈষম্য দূর করে সমাজতন্ত্র কায়েমের প্রতিশ্রম্নতি দেন। স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন দেশের অর্থনীতিকে।

বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রণীত দেশের সংবিধানে ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপস্নবের বিকাশ, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূর, গ্রামাঞ্চল বৈদু্যতিকীকরণের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থা ও জনগণের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের অমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।

\হস্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ১৯৭২ সালের ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ বেতারে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেন, 'আজকে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। সে জন্য কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন রয়েছে। আমি চাই, আমার দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক এবং সে জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।' স্বনির্ভর কর্মসূচি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন, 'যেখানে খাল কাটলে পানি হবে, সেখানে সেচের পানি দিন। সেই পানি দিয়ে ফসল ফলান। পাম্প যদি পাওয়া যায়, ভালো। যদি না পাওয়া যায়, তবে স্বনির্ভর হন। বাঁধ বেঁধে পানি আটকান, সেই পানি দিয়ে ফসল ফলান। আমাদের দেশে আগে কি পাম্প ছিল? দরকার হয় কুয়া কেটে পানি আনুন। আমাদের দেশে পাঁচ হাত, সাত হাত, আট হাত কাটলেই পানি ওঠে। সেখানে অসুবিধা কী আছে? যে দেশে পানি আটকে রাখলে পানি থাকে, সেখানে ফসল করার জন্য চিন্তার কী আছে? (১৯৭৫ সালের ২১ জুলাই বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্নরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ)। বঙ্গবন্ধু স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে কর্মীদের উপদেশ দিয়েছেন, নিজে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে জনগণকে উৎসাহ জুগিয়েছেন।

জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির কান্ডারি বঙ্গবন্ধু দেশের জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বহু খাল খনন, রাস্তা নির্মাণ- এমন অনেক কর্মসূচিতে সরাসরি অংশগ্রহণের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। বঙ্গবন্ধু বাঁশকে বিদেশি খাম্বার বদলে বিদু্যতের খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে স্বদেশ প্রেমের নজির তুলে ধরেছেন।

বঙ্গবন্ধু দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে সবার আগে কৃষি উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। আধুনিক কৃষি উপকরণ ও অধিক উৎপাদনশীল বীজ ব্যবহারকে উৎসাহিত করেছেন। অনাবাদি জমিকে চাষের উপযোগী করে ফসল ফলানোর জোর তাগিদ দিয়েছেন। শীতকালীন শস্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। পানি সেচের জন্য গভীর নলকূপ ও পাওয়ার পাম্প স্থাপন ও সেচের নালা নির্মাণের জন্য কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সব উন্নয়ন কর্মকান্ড স্থবির। তাই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ, কৃষককে যান্ত্রিক চাষে উদ্বুদ্ধকরণ, উৎপাদিত কৃষি পণ্যের সুষম বণ্টন এবং দেশের বেকার যুবসমাজকে কৃষি-সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিতকরণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সমবায় ব্যবস্থা চালু করার প্রতিশ্রম্নতি ব্যক্ত করেন। সমবায়কে তিনি বেছে নেন সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পথ হিসেবে। তার লক্ষ্য ছিল- গ্রামভিত্তিক বহুমুখী কৃষি সমবায় গড়ে তোলা। এতে উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তবে তিনি জমির মালিকানা কেড়ে নেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না। বরং জমির মালিকানা কৃষকেরই থাকবে বলে তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন। তবে তিনি কৃষকের ছোট ছোট খন্ডে বিভক্ত জমি একসঙ্গে করে যৌথ কৃষি খামার গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, যাতে আধুনিক চাষাবাদ সম্ভব হয়। যান্ত্রিকীকরণ সহজ হয়। এতে একদিকে কৃষিতে বৈপস্নবিক পরিবর্তন আসবে এবং গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা মান উন্নত হবে।

গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে ১৯৭৩ সালে ১৩ ফেব্রম্নয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহে বঙ্গবন্ধু বিশেষ ভাষণ দিয়েছিলেন। সে ভাষণে তিনি কৃষি বিপস্নবের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে। কেননা, গ্রামই সব উন্নয়নের মূল কেন্দ্র। গ্রামের উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যখন বেগবান হবে তখন গোটা বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে সম্মুখপানে। তার অদম্য ইচ্ছা ছিল- যেকোনো উপায়ে কৃষকের স্বার্থরক্ষা করা। কেননা, কৃষকই এ দেশের আসল নায়ক, যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের সবার অন্ন জোগায়। কৃষকের চলমান চাহিদা যথোপযুক্তভাবে নিশ্চিত করতে পারলে কৃষক অনেক আগ্রহে স্বতঃস্ফূর্ততায় কৃষিতে নিজেকে বিনিয়োগ করতে পারবে, উন্নয়নের জোয়ার বইবে। কৃষকের উন্নয়ন হলে দেশের উন্নয়ন সময়ের ব্যাপার। বঙ্গবন্ধু ভাবতেন, এতদিন আমরা শোষণে নিষ্পেষণে আমাদের মেধা প্রতিভাকে কাজে লাগাতে পারিনি, এখন সময় এসেছে নিজেদের দেশে নিজেদের জ্ঞান, মেধা দক্ষতাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। আমরা তখন গর্বের সঙ্গে বলতে পারব, এই তো আমার স্বনির্ভর সোনার বাংলাদেশ।

তিনি কৃষিবিদদের উদ্দেশ্যে আরও বলেছেন, আপনারা যারা কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন, আপনাদের গ্রামে গিয়ে কৃষকের সঙ্গে মিশে যেতে হবে, মনোযোগ দিতে হবে তাদের চাহিদা আর কর্মের ওপর, তবেই তারা সাহসী হবে, আগ্রহী হবে, উন্নতি করবে। ফলবে সোনার ফসল, ক্ষেত ভরে। আপনারা এখন শহরমুখো হওয়ার কথা ভুলে যান। গ্রাম উন্নত হলে দেশ উন্নত হবে, তখন আপনারা আপনা-আপনি উন্নত হয়ে যাবেন। গ্রামভিত্তিক বাংলার উন্নতি মানে দেশের উন্নতি, আর আপনাদের উন্নতি তখন সময়ের ব্যাপার। শহরের ভদ্রলোকদের দিকে তাকিয়ে আপনাদের চিন্তা বা আফসোস করার কোনো কারণ নেই। কেননা, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের দিকে আমাদের সবার ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কৃষক বাঁচাতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে, তা না হলে বাংলাদেশ বাঁচতে পারবে না।

সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর বৃহৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, সবার আগে দরকার আমাদের টোটাল জরিপ। জরিপের ওপর ভিত্তি করে আমাদের সার্বিক পরিকল্পনা করতে হবে। আমাদের আর্থসামাজিক কারণে দেশে দিন দিন জমির বিভাজন বেড়ে চলছে। যদি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলা না যায়, তাহলে আমাদের কৃষি উন্নয়ন ব্যাহত হবে, আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারব না। আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ব। কোঅপারেটিভ সোসাইটির মাধ্যমে আগাতে পারলে আমাদের কৃষির উৎপাদন এবং সার্বিক উন্নয়ন দুটিই মাত্রা পাবে সমৃদ্ধ হবে। বেশি শস্য উৎপাদনের জন্য আমাদের সবার সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মাঠের ফসল, গবাদিপশু, মাছ পরিবেশ সবকিছুর মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় করেত হবে। তা না হলে আমরা কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোতে পারব না।

স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমবায়ী উদ্যোগকে পৃঙষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন। সমবায়ী মালিকানাকে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় মালিকানা খাত হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। সংবিধানের ১৩ (খ) অনুচ্ছেদে উৎপাদন খাত, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনব্যবস্থা সমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হিসেবে সদস্যদের পক্ষে সমবায়সমূহের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু তার বিভিন্ন বক্তৃতায় সমবায়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং দেশের জনগণকে সমবায়ের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। ১৯৭২ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন আয়োজিত সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ আমার স্বপ্ন, ধ্যান, ধারণা ও আরাধনার ধন। আর সেই সোনার বাংলা ঘুমিয়ে আছে চির অবহেলিত গ্রামের আনাচে-কানাচে, চির উপেক্ষিত পলস্নীর কন্দরে কন্দরে, বিস্তীর্ণ জলাভূমির আশপাশে আর অরণ্যের গভীরে। ভাইয়েরা আমার, আসুন সমবায়ের জাদুস্পর্শে সুপ্ত গ্রামবাংলাকে জাগিয়ে তুলি।'

গ্রাম সমবায়ের রূপরেখা বর্ণনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আরও বলেছেন, 'রাষ্ট্র তোমাকে ঋণ দেবে, টাকা দেবে, ইনপুটস দেবে, তোমাকে সেচের ব্যবস্থা করে দেবে। সেটা করে দেবে তুমি যদি এ ধরনের সমবায় কর। সমবায়ের ফল দিয়ে যে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, তার সুফলটা যেমন পাবে জমির মালিক, তেমনি এটার অংশ পাবে, যারা ভূমিহীন কৃষক, যারা ওখানে শ্রম দেবে তারা। যারা এখানে বিনিয়োগ করবে, তারাও এখানকার একটা অংশ পাবে।' (মৃতু্যঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু, ট্রাজেডি, রাষ্ট্রচিন্তা, উন্নয়ন দর্শন। নূহ-উল আলম লেনিন, পৃষ্ঠা ১০৭)।

সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কৌশল ছিল বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব। তিনি গণতান্ত্রিক পন্থায় সমাজতন্ত্রে উত্তরণের কথা বলেছিলেন। একে আখ্যায়িত করা হয় 'মুজিববাদ' হিসেবে। এখানে তিনি একজন অনন্য জাতীয়তাবাদী নেতা। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে নবগঠিত বাক্‌শালের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, 'এখানে যে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা আমরা বলছি, সে অর্থনীতি আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। কোনো জায়গা থেকে হায়ার করে এনে, ইমপোর্ট করে এনে কোনো ইজম চলে না। এ দেশে কেন, কোনো দেশেই চলে না। আমার মাটির সঙ্গে আমার মানুষের সঙ্গে, আমার কালচারের সঙ্গে, আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে, আমার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেই আমার ইকোনমিক সিস্টেম গড়তে হবে। ফান্ডামেন্টালি আমরা একটা শোষণহীন সমাজ গড়তে চাই, আমরা একটা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চাই।

বঙ্গবন্ধু দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ও বহুমুখী সমবায় প্রতিষ্ঠার বিপস্নবকে একসঙ্গে গ্রথিত করেছেন। একটির সঙ্গে অপরটি সংযুক্ত, একে অপরের পরিপূরক। দেশের গ্রামীণ উন্নয়নকে সফল করার জন্য প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সমতাভিত্তিক উন্নয়ন দর্শনের আওতায় সমবায়কে অন্যতম কৌশল হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশের দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলে গ্রামীণ উন্নয়নের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা পরিচালনার জন্য ২.২ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলেন বগুড়া একাডেমি। পরে ১৯৯০ সালে পলস্নী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়া একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। তিনি সুদমুক্ত ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিলেন। সে উদ্দেশ্যে তিনি পলস্নী সমাজসেবা কার্যক্রম প্রবর্তন করেন। পরে এই কার্যক্রম দেশের সব উপজেলাকে আওতাভুক্ত করে রাজস্ব বাজেটের অধীনে পরিচালিত করা হয়। এভাবে বঙ্গবন্ধু দেশে পলস্নী উন্নয়নের ভিত রচনা করেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি, সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনে রেখে গেছেন অর্থনৈতিক দর্শন। রক্তে ভেজা সংবিধানেই স্থান দিয়েছেন দারিদ্র্য মুক্তির পথ নির্দেশনা। বৈষম্য তাড়াতে ব্যক্ত করেছেন প্রতিশ্রম্নতি। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ছিলেন নির্ভীক। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দারিদ্র্য দূরের লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধু। ভূমি ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার, শিল্প বিকাশে নয়া উদ্যোগ, ক্ষদ্র উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্রদান, কৃষির আধুনিকায়নে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ, সমবায় চেতনা বিকাশে শুরু করেছিলেন কর্মযজ্ঞ। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেয়ো, মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা, নারী জাগরণ কর্মসূচি ছড়িয়ে দিতে সবসময় বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় ছিল সাধারণ জনগণ। পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনতে গ্রহণ করেন নানা পদক্ষেপ। উন্নয়ন ভাবনায় দর্শন বরাবরই প্রভাব বিস্তার করে। আর সেখানেই পরিস্ফূটিত হয় ভবিষ্যৎ বিকাশের রেখা। ১৯৭২ সালে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রশ্ন করেছিলেন 'আপনার শক্তি কোথায়?' বঙ্গবন্ধুর সহজ-সরল ভাষায় উত্তর ছিল 'আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি।

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে কৃষির গুরুত্ব সীমাহীন। আমাদের রয়েছে উর্বর মাটি, প্রকৃতি প্রদত্ত অফুরন্ত সম্পদ, আর পরিশ্রমী জনগণ। এগুলোর সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা অসাধ্য সাধন করে ফেলতে পারি। গড়তে পারব বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা, সুখে থাকবে বাংলার মানুষ, সুখে থাকবে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর আজীবনের লালিত স্বপ্ন ছিল- এ দেশের শোষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো, তাই তিনি কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার প্রদানের পাশাপাশি কৃষি উন্নয়নের সৈনিক কৃষিবিদদের যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। এ জন্য বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে আমরা সবাই বদ্ধপরিকর। দরকার আমাদের সমন্বিত, আন্তরিক এবং কার্যকর পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধু একটি নতুন মানচিত্র চেয়েছিলেন, নতুন ভূ-খন্ড চেয়েছিলেন, নতুন জাতিসত্তা চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন একটি স্বনির্ভর-সুখী মানুষের সোনার দেশ।

লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, হোসেনপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজ, হোসেনপুর, কিশোরগঞ্জ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে