বাড়ছে কোটিপতি ও দরিদ্র

অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিকতা এখন বিষ ছড়ালেও মানতেই হবে যে, এর সঙ্গে শুধু বিত্তবানেরাই জড়িয়ে নেই, মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণও যথেষ্ট রয়েছে। বস্তুত, ক্ষমতা ও বিত্তের লোভে মধ্যবিত্তের নস্যাৎ হয়ে যাওয়ার মধ্যে নিহিত রয়েছে এ সময়ের সবচেয়ে কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার বিষয়টি।
বাড়ছে কোটিপতি ও দরিদ্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য জানাচ্ছে যে, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে দেশের ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার ৬২১; অর্থাৎ দেশে প্রতি মাসে গড়ে ৫৪০ জনের বেশি সংখ্যায় নতুন কোটিপতি তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, করোনায় দেশে মানুষের আয় কমেছে ২০ শতাংশ। তবে অন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যে সাধারণ মানুষের আয় কমে যাওয়ার এ হার আরও অনেক বেশি। তো, করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা প্রভৃতি কারণে দেশের মানুষের আয় কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতেও কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াটা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং এমনটি মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে নব্য কোটিপতিদের চাপে পিষ্ট হতে হতে আয়-হারানো মানুষদের মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা দিন দিন আরও বাড়বে। এদিকে বিবিএসেরই তথ্য, ১৯৭২ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ৩৬ বছরে দেশে কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছে ১৯ হাজার ১৫৮ জন, আর ২০০৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ১২ বছরে তা ৭৪ হাজার ১২৭ জন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৮৯০ জনে; অর্থাৎ ৩৬ বছরে যতজন বেড়েছে, ১২ বছরে বেড়েছে তার প্রায় ৫ গুণ।

কোটিপতি হিসাবধারীর উপরিউক্ত সংখ্যা বৃদ্ধির তথ্য উদ্ধৃত করে কেউ কেউ হয়তো বলবেন, দেশ অধিকতর সম্পদশালী হয়ে উঠছে বলেই কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিরই পরিচায়ক। এখন কথা হচ্ছে, ১ লাখ কোটিপতি বা তার কাছাকাছি পর্যায়ের আরও কয়েক লাখ মানুষের আয়-উপার্জনের গড়ে ২০৩১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশ হয়তো হওয়াই যাবে। কিন্তু দেশের ৪২ শতাংশ মানুষকে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থায় রেখে এ অর্জন কি আসলেই উদযাপনযোগ্য হয়ে উঠতে পারবে? উলিস্নখিত কোটিপতি ও তার নিকট-সহযোগীদের আরও বেশি করে সুবিধা ও প্রণোদনাদানের রাষ্ট্রের বর্তমান নীতিমালার আওতায় উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের হারটি হয়তো ঠিকই টিকে যাবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ খেটে খাওয়া কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ তাতে বাঁচবে কেমন করে এবং এতে করে তাদের জীবন-জীবিকা কতটাই-বা নূ্যনতম প্রয়োজন ও মানবিক চাহিদা পূরণ করে চলতে পারবে, স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়ে ওঠা তো পরের কথা!

২২ জুন জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা এবং এর বাইরে আরও ২১ হাজার ৪৬ কোটি টাকা রয়েছে, যা আদালতে মামলা থাকার কারণে খেলাপি ঋণের আওতায় দেখানো যাচ্ছে না, একত্রে যোগ করলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। শেষোক্ত ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকার সিংহভাগই বস্তুত আটকে আছে লেখার শুরুতে উলিস্নখিত ওই কোটিপতিদের কাছে। ওই যে ৪২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ধারেকাছেও যারা নেই। রাষ্ট্রের আর্থিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালার প্রায় পুরোটাই আবর্তিত হচ্ছে ওই কোটিপতি ঋণখেলাপি ও তাদের নিকট-সহযোগীদের ঘিরে।

সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে ২ কোটি মানুষের প্রত্যেকের আয় এখন ১০ হাজার ডলারের ওপরে। তিনি ওই পরিসংখ্যানের কোনো সূত্র উলেস্নখ না করলেও তার এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি কিন্তু একটি বাস্তব সত্যের খুবই কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তার ওই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সম্পদ মেরুকরণের সাম্প্রতিক ধারার চিত্রটিই বস্তুত ফুটে উঠেছে। আসলে ১০ হাজার ডলার আয়ধারী ওই ২ কোটি বা তার কাছাকাছি সংখ্যক মানুষই এখন বাংলাদেশকে নেড়েচেড়ে খাচ্ছেন। আর বাকিরা নিছক বেঁচে থাকার জন্য তাদের আহার-বিহার ও আয়-উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। এ অবস্থায় দেশের নীতিনির্ধারক ও সিদ্ধান্তপ্রণেতাদের উচিত হবে রাষ্ট্রের সিংহভাগ সম্পদকে শুধু ২ কোটি মানুষের প্রবেশযোগ্যতার মধ্যে আটকে না রেখে বাকি ১৫ কোটি মানুষকেও ন্যায় ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে এর অংশীদার হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। আর তার জন্য প্রয়োজন একটি সংশোধিত গণমুখী নীতিকাঠামো, যার প্রায় পুরোটাই বর্তমানে বিত্তবান বণিক ও স্বার্থান্বেষী আমলাদের (সবাইকে বলা হচ্ছে না) হাতে বন্দি।

অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিকতা এখন বিষ ছড়ালেও মানতেই হবে যে, এর সঙ্গে শুধু বিত্তবানেরাই জড়িয়ে নেই, মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণও যথেষ্ট রয়েছে। বস্তুত ক্ষমতা ও বিত্তের লোভে মধ্যবিত্তের নস্যাৎ হয়ে যাওয়ার মধ্যে নিহিত রয়েছে এ সময়ের সবচেয়ে কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার বিষয়টি।

সিদ্ধান্তপ্রণেতাদের বড় অংশ এতে খুশি হলেও বিবেকবান অবশিষ্ট ক্ষুদ্রাংশের সদস্যরা কি এ ক্ষেত্রে তাদের বিবেকের শাসনটুকু কখনো প্রয়োগ করতে উদ্যোগী হয়েছেন? মোটেও না। আর তা করতে উদ্যোগী হননি বলেই সমাজের খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষেরা আজ এতটাই অসংগঠিত যে তারা তাদের নিজেদের অধিকার ও প্রয়োজনের বিষয়টুকুও তুলে ধরতে অক্ষম। আর এ ফাঁকেই রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও পুঁজিমুখী চরিত্রের দুর্বলতার সুযোগে শিক্ষা, মেধা ও বিবেকবিহীন কতিপয় সুবিধাবাদী চালাক-চতুর লোক আজ কোটিপতি এবং এর বিপরীতে শৈথিল্যকাতর পরিশ্রমী কৃষক, শ্রমিক, কেরানি ও নিম্নবিত্তের মানুষ আজ তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখার পরও জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত ও দিশেহারা।

এ অবস্থায় ক্ষমতা, রাজনীতি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কষ্টে থাকা মানুষদের মানবেতর সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে হলেও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা কি তাদের প্রতি আরেকটু মানবিক ও সহানুভূতিশীল হওয়ার নীতি গ্রহণ করতে পারেন না, যাতে করে কোটিপতি ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা সমানতালে না বাড়ে? ১৯৭২-এর সংবিধান কিন্তু রাষ্ট্রের পরিচালনাকারীদের প্রতি সে নির্দেশনাই দিয়ে রেখেছে। এসব সত্ত্বেও তারা যদি তা করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তা হবে সুস্পষ্টভাবেই সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। কিন্তু এত দীর্ঘ সংগ্রাম এবং এত মানুষের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশে সেটি হয় কেমন করে?

\হ

লেখক : পরিচালক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনোভেশন সেন্টার, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে