অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা

ম মনে রাখতে হবে, আমাদের অর্থনীতি যেমন বড় হয়েছে, তেমনি আমাদের অভিঘাত সহ্য করা এবং প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলার সক্ষমতাও বেড়েছে। ম
অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা

কোভিড-১৯ মহামারিতে স্থবির বিশ্ব যখন কিছুটা স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসার পথে, তখনই বিশ্ব পরিস্থিতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধ লকডাউন-পরবর্তী মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে আরও বেগবান করেছে। অস্থির এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নানামুখী চাপ অনুভূত হচ্ছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে অনেক, তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিষয় আলোচনা না করে চটকদার শিরোনাম বা অযৌক্তিক আতঙ্ক ছড়ানোর মনোভাব দেখা যাচ্ছে।

শ্রীলংকার অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে বিগত কয়েক মাসে অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। তাদের অর্থনৈতিক সংকটের কারণ, দেউলিয়াত্বের ঘোষণা ও জনগণের দুর্ভোগে সবকিছুই যুক্তিযুক্ত আলোচনার দাবিদার এবং সেই আলোচনা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ প্রয়োজন; কিন্তু অযাচিতভাবে শ্রীলংকার তুলনা এনে, বাংলাদেশও দেউলিয়া হয়ে যাবে ও চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পতিত হবে- এ ধরনের আতঙ্ক ছড়ানোর প্রচেষ্টা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এর মাধ্যমে অর্থনীতি নিয়ে তথ্য-উপাত্তনির্ভর আলোচনা এড়িয়ে এক ধরনের চবৎপবঢ়ঃরড়হ ইঁরষফরহম-এর প্রতি অতি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এ আতঙ্কবাদী মনোভাব প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্রকে আড়াল করে।

বাংলাদেশের সামষ্টিক ঋণ ব্যবস্থাপনার চিত্র আমাদের মোট ঋণের পরিমাণ, ঋণের ধরন এবং গ্রহণ করা ঋণের সুদের হার ও মেয়াদের তথ্য থেকে বোঝা যাবে। বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের উবনঃ ঝঁংঃধরহধনরষরঃু অহধষুংরং-গধৎপয ২০২২- রিপোর্টে বাংলাদেশকে ঋণ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকির নিরিখে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে উলেস্নখ করা হয়েছে। আমাদের বৈদেশিক ঋণ জিডিপির ১২ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় আমাদের বৈদেশিক ঋণের ৮০ শতাংশই দীর্ঘমেয়াদি। পক্ষান্তরে শ্রীলংকার বৈদেশিক ঋণ তাদের জিডিপির ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। শ্রীলংকার বৈদেশিক ঋণের ৪৭ শতাংশ গ্রহণ করা হয়েছে সভরেন বন্ড ও অন্যান্য বেসরকারি খাত থেকে যার গড় সুদের হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমাদের গড় সুদের হার ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং আমাদের বৈদেশিক ঋণের ৬১ দশমিক ১ শতাংশ বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া। মোট বৈদেশিক ঋণের পুরোটুকু সরকারের নয়, ৭৫ শতাংশ সরকারের এবং ২৫ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেওয়া। পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের ঋণের চিত্র সহনীয় এবং বাংলাদেশের কোনো ধরনের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির এই অস্থির পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও চাপ পড়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্যিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। এই বাণিজ্য ঘাটতির প্রভাব পড়েছে মুদ্রাবাজারে। আমাদের রপ্তানি আয় ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারা ছিল নিম্নগামী। রেমিট্যান্স এসেছে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম, ২১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এ পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ- মোটা দাগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য ঘাটতি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় আনা এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ। কারণ চ্যালেঞ্জের প্রতিটি ক্ষেত্র একটি অপরটির সঙ্গে জড়িত।

মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জটি বিশ্বব্যাপী সব সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। বাংলাদেশে একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কম হলেও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের জন্য সুখকর নয় মোটেই। মূল্যস্ফীতিকে মাথায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সতর্ক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। তবে এখনও দেশে ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ৯ শতাংশে স্থির করা। যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশেই মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বৃদ্ধি করছে। এমন সময়ে ঋণের সুদের উচ্চসীমা স্থির করে রাখার সিদ্ধান্ত সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে না। ঋণের সুদের হারের উচ্চসীমা পুরোপুরি উঠিয়ে দেওয়া উচিত অথবা খাতভিত্তিক ঝুঁকি বিবেচনায় উচ্চসীমা ১৪ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে স্থির করা যেতে পারে।

ঋণের সুদের হারের বর্তমান উচ্চসীমা প্রত্যাহার করা হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হতে পারে- এ ধরনের দাবি দেশের ব্যবসায়ীমহল থেকে উঠবে। দাবিটি অমূলক নয়। তবে স্বল্পমেয়াদি চাপ মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার স্বার্থে কিছুটা শ্লথ প্রবৃদ্ধি গ্রহণযোগ্য। পাশাপাশি এই সময়ে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের তারল্য সংকট যাতে তীব্র আকার ধারণ না করে সেজন্য আমানতকারীদের প্রাপ্ত সুদের হার মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় সন্তোষজনক হওয়া প্রয়োজন।

টাকার মানের বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে যৌক্তিক অবমূল্যায়ন প্রয়োজন। বর্তমানে খোলাবাজারে এক ডলার ১০৩ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত আন্তঃব্যাংক ডলারের রেট ৯৪ দশমিক ৪৫ টাকা। খোলা বাজারের সঙ্গে এই বড় পার্থক্য মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতার পথে অন্তরায়। টাকার অবমূল্যায়ন বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে পৃথিবীর সব মুদ্রারই অবমূল্যায়ন হয়েছে। টাকার মান কৃত্রিমভাবে ধরে রাখতে চাইলে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা দূর হবে না। আর মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা যেকোনো বিদেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে যেমন বিলম্বিত করে তেমনি বৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের হার কমিয়ে দেয়। বাজারে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ডলারের দাম নির্ধারিত থেকে দেওয়া হোক। এতে বহির্বিশ্বে পর্যটন ও চিকিৎসা ভ্রমণের চাহিদা যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি বিলাস পণ্যের আমদানিও নিরুৎসাহিত হবে।

রেমিট্যান্স প্রবাহের হার বাড়ানো বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি কার্যকর পথ। পূর্বে উলিস্নখিত সুদের হারের বর্তমান উচ্চসীমা প্রত্যাহার এবং ডলারের দাম বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া এ প্রবাহকে বাড়াতে পারে। বর্তমানে ব্যাংক ঘোষিত ও খোলা বাজারের রেটে টাকার আরো অবমূল্যায়ন হবে- এই প্রত্যাশায় অনেকে তাদের রেমিট্যান্স ধরে রেখেছেন, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসমূহও তাদের রপ্তানি আয় দেশে আনায় ধীর গতির অবলম্বন করছে। আমানতের সুদের হার সন্তোষজনক না হওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলেও অর্থ সঞ্চয়ের উৎসাহে ভাটা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খোলাবাজারের রেটের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত রেটের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু প্রণোদনার অর্থ বা বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে ভালো রেট এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন দেশের সব ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে নিয়ে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ।

ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে- এ কথা বলাই বাহুল্য। তবে আমাদের বর্তমান অগ্রাধিকার হিসেবে কৃষিকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকার ভর্তুকি দিয়ে আসছে। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশেও দাম বাড়ানোর প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। এ ক্ষেত্রে ভর্তুকি বাড়ানোর চিন্তা সর্বপ্রথম আসে। তবে বিপিসির আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার করেও দাম বাড়ানোর চাপ কমানো সম্ভব।

সরকার সংকট মোকাবিলায় আগাম পদক্ষেপ হিসেবে সরকারি খরচ কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি, বিশেষ করে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিয়ন্ত্রিত লোড ম্যানেজমেন্টের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি বিলাসীপণ্য আমদানির নিরুৎসাহিতকরণও করা হয়েছে। সর্বশেষ মে-জুন মাসের এশিয়ান কিয়ারিং ইউনিয়নের বিল ছিল ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা আমদানির নিম্নমুখী ধারাকে নির্দেশ করে। তবে এ সিদ্ধান্তসমূহের প্রভাব সঠিকভাবে নির্ণয়ে অন্তত তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে। ভোজ্যতেলের দাম বর্তমানে কমতির দিকে, জ্বালানি তেলের দামও জুনে ১১৬ ডলার প্রতি ব্যারেল থেকে বর্তমানে ১০০-১০৫ ডলার প্রতি ব্যারেলে নেমে এসেছে। সামনে আশা করা যায়, দাম কিছুটা পড়তির দিকে থাকবে। বিশেষ করে ভারত ও চীন রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি দিন দিন বৃদ্ধি করার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক দ্বিমুখী কাঠামো তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব জ্বালানি মূল্যে কেমন হবে তা আগামী দুই-তিন মাসে স্পষ্ট হবে। এ সময় আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে সংস্কার প্রক্রিয়া আরও দ্রম্নত করা প্রয়োজন।

মনে রাখতে হবে, আমাদের অর্থনীতি যেমন বড় হয়েছে, তেমনি আমাদের অভিঘাত সহ্য করা এবং প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলার সক্ষমতাও বেড়েছে।

গত এক যুগের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে আমাদের রিজার্ভ ২০০৭-০৮ অর্থবছরের ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২১ সালে ৪৮ বিলিয়নে উন্নীত হয়। বর্তমান এই অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে উচ্চ আমদানি ব্যয়ের ফলে রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়নে, যা আমাদের পাঁচ মাসের আমদানি দায় মেটাতে সক্ষম। অভিঘাত মোকাবিলার এই সক্ষমতায় তাই আতঙ্কবাদী না হয়ে যৌক্তিক পর্যালোচনার নিরিখে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

লেখক : ভাইস চ্যান্সেলর, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে