রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

সাধারণ বীমা কর্পোরেশনই নন-লাইফ বীমায় আস্থা অর্জনের একমাত্র হাতিয়ার

ম সাধারণ বীমাকে স্বাবলম্বী করতে বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোকে সাধারণ বীমার সব পাওনা দ্রম্নত পরিশোধের ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। ম
মীর নাজিম উদ্দিন আহমেদ
  ১৫ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
বীমা শিল্পের আস্থা অর্জন এই বিষয়টি নিয়ে লিখতে গিয়ে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের একটি প্রবাদ মনে পড়ে গেল : "টিকিয়া থাকাই চরম সার্থকতা নয়। অতিকায় হস্তী (সাধারণ বীমা কর্পোরেশন) রূপক অর্থে লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা (বেসরকারি বীমা কোম্পানি) রূপক অর্থে টিকিয়া আছে।" দীর্ঘদিন বীমা পেশায় জড়িত থাকার সুবাদে যা বুঝতে পেরেছি তাহলো- যেহেতু বঙ্গবন্ধু বীমা শিল্পের কর্মী ছিলেন তাই তিনি বীমা শিল্প রক্ষায় জাতীয়করণসহ দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছিলেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় বেসরকারি খাতে বীমা কোম্পানির অনুমোদন দিয়ে সাবেক মহামান্য রাষ্ট্রপতি মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৪ সালে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে জননেত্রী শেখ হাসিনা আরও অনেকগুলো কোম্পানির অনুমোদন দেন এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ও বীমা শিল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় বীমা আইন, ২০১০-এর মাধ্যমে তার পূর্ণতা দান করেন। সাধারণ বীমা কর্পোরেশন স্বীকার করুক বা নাই করুক "তেলাপোকা" অর্থাৎ বেসরকারি নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর অর্জিত প্রিমিয়াম সাপোর্টেই বাংলাদেশের পুনঃবীমাকারী হিসেবে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন বাংলাদেশকে বিশ্বের বীমা বাজারে উপস্থাপন করে। সাধারণ বীমার কর্মকর্তারা ও মন্ত্রণালয়ের অনেকেই এই কারণে বিদেশ ভ্রমণসহ অন্যান্য অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন। দেশীয় ট্রিটি রিনিউয়াল বা অন্যান্য আনুসঙ্গিক কাজে তারা বিদেশি পুনঃবীমাকারীদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও সব বেসরকারি বীমা কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে যোগাযোগ রক্ষা করেন। বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক অবদানের কারণেই দেশীয় বীমা ব্যবসার পোর্টফলিও স্ট্রং হয়, তাই সাধারণ বীমার পুনঃবীমা সংক্রান্ত কর্মকান্ডের ফলে দেশীয় বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলো ভালোভাবে চলার অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা কিন্তু তা না হয়ে দিনে দিনে নন-লাইফ বীমা কোম্পানি ও সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের মধ্যে ব্যাপক দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। তা কোন কারণে বা কে দোষী তা উদঘাটন নয় বরং প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে দ্রম্নত সিদ্ধান্ত নিতে হবে নতুবা তাদের কাছে বিভিন্ন কোম্পানির অভিযোগের পালস্না ভারী হতে থাকবে। যদি বাস্তবে এমন হতো যে, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (অতিশয় হস্তী) বাংলাদেশ মার্কেটে নিজে অন্য আরও বেসরকারি ৪৫টি (তেলাপোকা) কোম্পানির মতো ব্যবসা সংগ্রহ করতো এবং সে তার একক পোর্টফলিও নিয়ে বিদেশ মার্কেটে পুনঃবীমা করতে যেত তাহলে কি সাধারণ বীমা এখন মোট ৪৬টি কোম্পানির পোর্টফলিও নিয়ে গিয়ে বিশ্বের বীমা বাজারে যে সম্মান পাচ্ছে, এককভাবে পুনঃবীমা করতে গেলে সে সম্মানটা পেত? আমি এর পরিবর্তে আমরা এই বাস্তবতা অনুধাবন করার জন্য সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট সবার কাছে অনুরোধ রাখছি। আমিত্বে কোনো অমরত্ব নেই। ঐক্যবদ্ধ আমরা বিরাট শক্তি, যার মাধ্যমে আমাদের বীমা শিল্পে বিপস্নব ঘটিয়ে "আস্থা ও বিশ্বাস" অর্জনের মাধ্যমে বীমা শিল্পের ইমেজ সংকট দূর করা সম্ভব। বেসরকারি ৪৫টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি যদি পুল গঠনের মাধ্যমে নিজেরা বা বিদেশে পুনঃবীমা করে তা হলে সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের অস্থিত্বের কি হবে! তা সহজেই সবার নিকট অনুমেয়। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমানে বিআইএর মিটিংয়ে নতুন পুনঃবীমা কোম্পানি গঠনের বিষয় নিয়ে প্রায়শ আলোচনা হয়। এর একমাত্র কারণ বেসরকারি নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো সাধারণ বীমা থেকে যথাযথ সেবা পাচ্ছে না। তাই এখনই এই মনোকষ্ট দূরীকরণে ব্যবস্থা গ্রহণের সময় এসেছে। বেসরকারি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির প্রিমিয়াম যেন দেশেই থাকে, শ্রমে, ঘামে, কষ্টে অর্জিত মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা যেন পুনঃবীমার প্রিমিয়াম বাবদ দেশের বাইরে চলে না যায় এবং সাধারণ বীমা কর্পোরেশন জাতীয় সরকারি একমাত্র বীমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দক্ষ জনবলের মাধ্যমে উন্নত সেবা প্রদান করে যাতে দেশীয় বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নার্সিং করে বাঁচিয়ে রাখতে পারে এই বাস্তবতায় সাধারণ বীমার জন্ম; কিন্তু বাস্তবে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর নার্সিং না করে প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াতে আজ পূর্ণ মাত্রায় বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলো তাদের বীমা গ্রহীতাদের কাছে "আস্থা ও বিশ্বাস" হারিয়ে ফেলছে এবং বীমায় "ইমেজ সংকট" দেখা দিয়েছে। এমতাবস্থায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের লিখিত পত্র নং ৫৩.০৩.,০০০০.০৫২.১১.০০৭.২২.৪৫ তারিখ ০৮/০৮/২০২২ যা বীমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমরা অনুধাবন করছি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন ও বেসরকারি নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর পারস্পরিক দূরত্বের কারণ বুঝতে পেরেছেন এবং তা দূরীকরণে তৎপর। সে জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না ৪৫টি বেসরকারি বীমা কোম্পানির ব্যবসার পোর্টফলিও ছাড়া শুধুমাত্র সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের একক ব্যবসা দিয়ে বিদেশি মার্কেটে পুনঃবীমা করা সহজ নয়। তাই বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যে সব বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে তা দ্রম্নত মিটিয়ে ফেলে বীমা ব্যবসায় "আস্থা ও বিশ্বাসের" জায়গাটা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সাধারণ বীমা কর্পোরেশনই বীমা শিল্পের "আস্থা ও বিশ্বাস" এবং "ইমেজ সংকট" মোচনের একমাত্র হাতিয়ার তাই : ১। বীমা দাবি দ্রম্নততম সময়ে নিষ্পত্তি করে "বিশ্বাস ও আস্থার" জায়গাটা মজবুত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে "ইমেজ সংকট" দূরীকরণে সকল বাধা পেরিয়ে সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের পরিচালনা পর্ষদকে এগিয়ে আসতে হবে। ২। সবসময় ছোট ছোট দাবিগুলো দ্রম্নত পরিশোধের উদ্যোগ সাধারণ বীমাকে নিতে হবে। এই দাবিগুলোর কারণেই বাজারে বীমা কোম্পানির দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ে। তাই বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার সার্বিক সহযোগিতার উদ্যোগ দ্রম্নত সাধারণ বীমাকে অবশ্যই নিতে হবে। ৩। সাধারণ বীমাকে সর্বজনীন হতে হবে। সব বেসরকারি বীমা কোম্পানির দাবির প্রতি সমান দৃষ্টি দিতে হবে। অতীতের মতো কোনো কোনো কোম্পানিকে গুরুত্ব দিয়ে অন্যদের দাবিগুলো অনিষ্পন্ন রাখা সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ হবে না। ৪। সাধারণ বীমায় চূড়ান্ত জরিপ প্রতিবেদনসহ বীমা কোম্পানিগুলোর দাখিলকৃত ২০২১ সাল পর্যন্ত সব দাবির ফাইল অনুমোদন দিয়ে বেসরকারি কোম্পানিসমূহের আর্থিক অবস্থা উন্নয়নে সহযোগিতা করতে হবে। আমার জানামতে ২০০০ সালে চালু একটি কোম্পানির ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত উত্থাপিত ২৪টি বীমা দাবির চূড়ান্ত জরিপ প্রতিবেদনসহ সব কাগজপত্র সাধারণ বীমায় প্রদান করা হলেও ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি। এটি বীমা শিল্পের জন্য অশনিসংকেত। এই ব্যাপারটি সব পক্ষকেই ভেবে দেখতে হবে। ৫। সাধারণ বীমা বেসরকারি বীমা কোম্পানির দাবিগুলো পরিশোধ না করে বছরের পর বছর এই ঙঁঃংঃধহফরহম দাবিগুলোর বিপরীতে খচঈ বা খড়ংং ঢ়ধৎঃরপরঢ়ধঃরড়হ পষধঁংব ধঢ়ঢ়ষু করে কোম্পানিগুলো দেউলিয়া করে দিচ্ছে। যদি সময় মতো দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা করা হতো তাহলে কোম্পানিগুলো প্রতি বছর খচঈ বাবদ সাধারণ বীমাকে দেয় অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতি থেকে রেহাই পেত ও কোম্পানিগুলোর আর্থিক বুনিয়াদ শক্তিশালী হতো। তাই অতিসত্বর সময় ক্ষেপণ না করে গুরুত্বসহকারে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়টির প্রতি সদয় দৃষ্টিদানের অনুরোধ করছি। ৬। সাধারণ বীমাকে স্বাবলম্বী করতে বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোকে সাধারণ বীমার সব পাওনা দ্রম্নত পরিশোধের ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। ৭। যেসব বীমা কোম্পানি সাধারণ বীমার পাওনা টাকা পরিশোধে গড়িমসি করে তাদের ট্রিটি রিনিউয়াল বন্ধ করার প্রস্তুতিমূলক উদ্যোগ এখনই সাধারণ বীমাকে নিতে হবে। প্রয়োজনে বীমা কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়েও পূর্বাহ্নে সতর্ক করা যেতে পারে। ৮। ট্রিটির শর্তানুযায়ী কোয়ার্টারলি প্রিমিয়াম প্রদান না করলে পরবর্তী কোয়ার্টারলি স্টেটমেন্ট বা বর্ডারেক্স গ্রহণ না করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত সাধারণ বীমাকে নিতে হবে। ৯। বর্তমান বীমা বাজারে অসম প্রতিযোগিতার অন্যতম কারণ সাধারণ বীমার পাওনা পরিশোধ না করে অতিরিক্ত কমিশনের মাধ্যমে বাজার থেকে ব্যবসা সংগ্রহ করা। তা অবশ্যই সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে। বর্তমানে এই ব্যাপারে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পত্র নং-৫৩.০৩.০০০০.০৪৯.৪০.০০৮.২০২২-৬৫ তারিখ ০৭/০৯/২০২২-এর মাধ্যমে বিশেষ উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে, সে জন্য সাধুবাদ জানাই। তাছাড়া টগচ সিস্টেম থেকে মানি রিসিপ্ট ইসু্যর ক্ষেত্রে পেমেন্ট সংক্রান্ত তথ্যাদি পূরণ অত্যাবশ্যক ঘোষণা নির্দেশনার জন্য আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। যা বীমা শিল্পে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি। দীর্ঘ ও স্বল্প মেয়াদি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে বীমা শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটা ফিরিয়ে আনতে বীমা শিল্পের সব মহলকে এগিয়ে আসতে হবে এবং একযোগে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে "প্রত্যেকে ভালো থাকলেই সকলে ভালো থাকা যায়"। গতকাল কিংবা আগামীকাল নয় আজকে কীভাবে ভালো থাকা যায়, তার পথ ও প্রতিকারের উপায় আজই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। তাই সবার আন্তরিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার সম্মিলন সবচেয়ে আগে দরকার। তাই এই মহতী উদ্যোগ সাধারণ বীমা কর্পোরেশন ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে যৌথভাবে নিতে হবে। ম লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্সু্যরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে