বাজেট নিয়ে শিক্ষকদের ভাবনা

জাতীয় সংসদে গত ৩ জুন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ৩৫ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা বেশি। বাজেটের এই অর্থ জোগান দিতে রাজস্ব, অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণের শরণাপন্ন হবে সরকার। এবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে ১১ হাজার কোটি টাকা বেশি। এত এত টাকার বাজেট পেশ হয় প্রতি বছর। আর এই বাজেট নিয়ে আগ্রহ নেই দেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। তেমনি আমাদের শিক্ষক সমাজেরও থাকে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও বিশ্লেষণ। কিন্তু যে মানুষ জাতি গড়ার কারিগর সে শিক্ষক সমাজই সবসময় থাকে অবহেলিত-উপেক্ষিত। কী ভাবছেন আমাদের শিক্ষকরা এবারের বাজেট নিয়ে? এ বিষয়ে শিক্ষকদের ভাবনা তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন
বাজেট নিয়ে শিক্ষকদের ভাবনা

সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি

মাইনুল হাসান চৌধুরী

অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়. প্রভোস্ট, সোহরাওয়ার্দী হল।

অর্থমন্ত্রীর এবারের বাজেটের আকার বেড়েছে যা বিগত বাজেটের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বরাদ্দও বেড়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্র বিশেষে। সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের জন্য বরাদ্দ অনেক বেড়েছে। এটা একটা ভালো দিক। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা সম্মানজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, এটা আর একটি ভালো দিক। কালো টাকা সাদা করার ব্যাপারে সরাসরি কিছু বলা হয়নি, আশা করি ভেতরে ভেতরেও কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দও বেড়েছে, তবে কীভাবে ব্যয় করা হবে তার পরিষ্কার ধারণা দেওয়া দরকার। তবে বাজেট দিলেই কর কমানো হোক কি বাড়ানো হোক জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এটা বন্ধ করা না গেলে, যতই বলি ব্যবসাবান্ধব (এফবিসিসিআই) বা গরিবের বাজেট, সাধারণ মধ্যবিত্তের কোনো লাভ হবে না। বাজেটের আকার বাড়ছে বলে যতই গর্ব করি না কেন, প্রয়োগ যথাযথ না হলে সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের কয়েক শত কোটি টাকার বাজেট আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছয় লক্ষাধিক কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে কী? তবে এটা ঠিক, গত দশ-বারো বছরে জীবনমানের যে উন্নতি ঘটেছে, করোনার প্রভাবে সেটা ধরে রাখা যে কোনো সরকারের জন্যই কঠিন।

নৈতিক ঘাটতি নিবারণ করতে হবে

ডক্টর মোহাম্মদ রোকন উদ্দীন

অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

নতুন অর্থবছরে (২০২১-২২) প্রস্তাবিত বাজেট নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এটি বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট; দ্বিতীয়ত, এমন এক সময়ে এই বাজেট ঘোষিত হলো যখন বাংলাদেশসহ পুরো পৃথিবী করোনার জীবনসংহারী আঘাতে বিপর্যস্ত; তৃতীয়ত, সম্প্রতি বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কাকে কারেন্সি সোয়াপ বা মুদ্রা বিনিময়ের আওতায় রিজার্ভ থেকে ২০ হাজার কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের বলিষ্ঠ প্রমাণ ও যৌক্তিকতা দেখিয়েছে। এসব বিবেচনা করলে এবারের বাজেট নিঃসন্দেহে একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। যেহেতু অর্থনীতি আমার অধীত বিষয় নয় তাই বাজেটের নিগূঢ়-রহস্যভেদী একাডেমিক বিশ্লেষণ আমার পক্ষে অসম্ভব। তবে দেশের একজন নাগরিক ও শিক্ষক হিসেবে বাজেট নিয়ে কিছু চিন্তা অবশ্যই আছে। শিক্ষক হিসেবে আমার প্রত্যাশা ছিল, শিক্ষা খাতে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বরাদ্দ বেশি দেওয়া হবে। বরাদ্দ সামান্য বেড়েছে বটে তবে তা দিয়ে বড় কোনো সুফল আসবে বলে মনে হচ্ছে না। গতবার বরাদ্দ ছিল বাজেটের ১১.৬৯ শতাংশ যা এবারে বেড়ে হয়েছে ১১.৯১ শতাংশ। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় যেখানে জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনের ৬ শতাংশের অধিক বরাদ্দ রাখা হয় শিক্ষা খাতে, সেখানে এই বাজেটে বরাদ্দ হয়েছে জিডিপির ২.০৮ শতাংশ যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এই টাকায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তো দূর কি বাত, আশপাশের দেশগুলোর শিক্ষার সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে না।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ যথেষ্ট নয়

মুহাম্মদ মহিউদ্দীন

ডক্টরাল গবেষক, ফেরারা বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালি;

সহকারী অধ্যাপক, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এবছর বাংলাদেশ সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। ২০২১-এর বাজেট বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী মানে ৫০তম বাজেট। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব এগিয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে দাঁড়ানোর সাহস দেখাচ্ছে। দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক বিবর্তন হয়েছে। একটি ধারণা আমাদের মধ্যে আছে, সমাজ যে পরিবর্তন হয়েছে এটা আপনা-আপনি হয়েছে। মূলত সরকারের নীতির বাইরে কিছুই হয় না। সরকার পলিসি নেয় বলেই সমাজ পরিবর্তন হয়। সরকার এসে কারও ঘর নির্মাণ করে না দিলেও, সে ব্যবস্থা করে দেয় সরকার। দেশ যত এগিছে, মানুষের মধ্যে বৈষম্যও তেমন বেড়েছে। দুটো জ্যামিতিক হারে না হলেও গাণিতিক হারে অবশ্যই হবে। দেশে কিছু মানুষ দ্রম্নত বড়লোক হয়ে উঠছে। অন্যদিকে দেশের অনেক মানুষ দারিদ্র্যের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। আমেরিকার ওয়েল্‌দ এক্সের মতে বাংলাদেশ বড়লোক তৈরিতে বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ গতিতে ছুটছে। পক্ষান্তরে, দারিদ্র্যের হার বাড়ছে হু হু করে। কোভিড-১৯ সময়ে দেশে মোট গরিবের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি যার শতকরা হার ২৯.৫ (বিআইডিএস)। তার মানে মহামারি যে কারও জন্য আশীর্বাদ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এবারের বাজেটে এই ৫ কোটি মানুষের জন্য আলাদা করে তেমন কিছু নেই। কিন্তু দেশের শিল্পের প্রসার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বৃদ্ধির জন্য করপোরেট কর কমানোসহ নানা প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। মহামারিতে তারা যে ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন, তা পুষিয়ে নিতে পারবেন। কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়িয়েছে, তা এ বাজেটের ইতিবাচক দিক। বরাবরের মতো শিক্ষা খাত উপেক্ষিত থেকেছে। এ খাতে বাজেট হলো ৭২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি যা মূল বাজেটের ১২ ভাগ প্রায় আর জিডিপির দুই ভাগের চেয়ে একটু বেশি। শিক্ষা খাতে এত কম বাজেট রেখে কোনো দেশ শিক্ষায় উন্নতি করতে পারে না। জিডিপির ৪ ভাগের নিচে বাজেট রেখে শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য-চিকিৎসায় অগ্রাধিকার প্রয়োজন

এনামুল হক

সহকারী অধ্যাপক, ব্যাংকিং ও ইন্সু্যরেন্স বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালীন সময়ে দ্বিতীয় বাজেট উত্থাপিত হয়েছে যা অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার দায়িত্বকালের তৃতীয় বাজেট, আওয়ামী লীগ সরকারের ২১তম এবং বাংলাদেশের ৫০তম। সীমিত সঞ্চয় ও করোনায় বিপর্যস্ত আয় নিয়ে এই মুহূর্তে অধিকাংশ মানুষের করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করার মতো সক্ষমতা নেই।

উপরন্তু, বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ অতি দ্রম্নত করোনাকালীন সময়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নতুন করে অবস্থান করছে। দারিদ্র্যসীমার পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হতে পারে যদি আমরা দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ঢেউ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হই। তাই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও অর্থমন্ত্রী ঘোষিত 'মানুষের জন্য' 'জীবন ও জীবিকার প্রাধান্যের' বাজেটকে ঘিরেই এইবার জনগণের বিপুল আকাঙ্ক্ষা ছিল। বাংলাদেশের করোনাকালীন দ্বিতীয় বাজেট সংকোচন নীতি অনুসরণ করেছেন। যদিও এই নীতির আড়ালে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী (চাপ সৃষ্টিকারী দল) লাভবান হচ্ছেন। জীবন ও জীবিকা উন্নয়নে সর্বজনস্বীকৃত সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে প্রকৃত বরাদ্দ আগের চেয়ে কমেছে। করপোরেট কর কমলেও সাধারণ মানুষের করের হার কমেনি যেটি উল্টো হওয়া উচিত ছিল। এখনো পর্যন্ত জনপ্রশাসন খাত বাজেটের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার এবং নতুন দারিদ্র্যগ্রস্ত মানুষের জন্য আরও বেশি পরিমাণ বরাদ্দের দরকার।

তাছাড়া সামাজিক সুরক্ষার বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বিশাল একটি চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য-বিষয়ক দায়দায়িত্ব সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। অর্থনীতিকে পুনরায় গতিশীল করার উদ্দেশ্যে অধিকাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু টিকা নিয়ে অচলাবস্থার এখনো পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান পাওয়া যায়নি। বিশাল ঘাটতি বাজেট অনুসরণ করার কারণে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ বাড়লেও করোনায় নাজেহাল শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া হবে এটার ব্যাপারে কোনো স্পষ্টত পরিকল্পনা এই বাজেটে দেখা যায়নি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে