মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ২১ ফাল্গুন ১৪৩০
walton

তারুণ্যের চোখে বর্ষার নান্দনিক সৌন্দর্য

চলছে বর্ষাকাল। বাংলার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ঋতু বর্ষা। সবুজ শ্যামল বাংলার প্রকৃতি নতুন প্রাণের সজীবতায় প্রস্ফুটিত হয় বৃষ্টিময় বর্ষার ছোঁয়ায়। রূপময় বর্ষার বৃষ্টিস্নাত মুহূর্ত নাগরিক মনকে করে সজীব প্রাণবন্ত। বাংলার মাঠ-ঘাট, পাহাড়-নদীসহ সবুজ প্রকৃতির মায়াবী দৃশ্য মুগ্ধ করে সব প্রজন্মকে। বর্ষার স্নিগ্ধ সবুজ লাবণ্যময় দৃশ্য তরুণ হৃদয়ে সৌন্দর্যের পশরা সাজিয়ে দোলা দেয় নতুন উচ্ছ্বাস। বর্ষায় প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আকর্ষিত করে তরুণ প্রকৃতিপ্রেমী মনগুলোকে। তারুণ্যের চোখে বর্ষার সেই নান্দনিক সৌন্দর্যের কথা তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী
মো. মুরাদ হোসেন
  ০৯ জুলাই ২০২২, ০০:০০

'বর্ষা মানেই প্রকৃতির নতুনত্বের ছোঁয়া'

মু. সায়েম আহমাদ

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা

বর্ষাই তো বাংলার প্রকৃতির আসল রূপ। বর্ষাকাল মানেই আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা উপভোগ করার সেরা মুহূর্ত। যখন-তখন এসে পড়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আবার হুট করেই বেড়ে যায় বৃষ্টির তীব্রতা। চলার পথে কাদা-পানি। ঘরে সঁ্যাতসেঁতে ভাব। খাল-বিল-পুকুর-নদী-ডোবা পানিতে একাকার। সবুজ সজীবতায় গাছপালা, বন-বনানী প্রাণ ফিরে পায় প্রকৃতির নতুনত্বের ছোঁয়া। গ্রামের দৃশ্য হয়ে ওঠে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে অতুলনীয়। কত ধরনের ফুল ফোটে এ বর্ষায়, যা চোখে পড়লে চোখ ফেরানো কঠিন। ফোটে কেয়া, কামিনী, হিজল, বকুল, জারুল, করবী ও সোনালুসহ জুঁই-চামেলি। কিন্তু বর্ষার প্রধান ফুল হল কদম। এই জন্যই অনেকেই বলে থাকেন বর্ষা মৌসুমের ফুলের রাজা হচ্ছে কদমফুল। বৃষ্টিভেজা কদমের মনকাড়া সৌরভ ভিজে বাতাসে মিশে ছড়িয়ে পড়ে সারা প্রকৃতিতে। বর্ষা মৌসুমে যখন চারদিক ভিজে ওঠে তখন আমাদের মন হয় আরও সিক্ত, প্রাণে জেগে ওঠে অজানা প্রকৃতির নতুনত্বের ছোঁয়া। বর্ষা মৌসুমের কোনো এক বৃষ্টিভেজা দিনে কাঙ্ক্ষিত সেই প্রিয়জনকে কাছে পেলে বলে দেওয়া যায় হৃদয়ের কোণে জমিয়ে রাখা সব কথা। বর্ষা মানেই গ্রামে কাবাডি খেলার হৈ-হুলেস্নাড় পড়ে যাওয়ার ধুম। যদিও অতীতের মতো এখন আর গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাটি আর নেই। তবুও ঠিক আগের মতো স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। আর তখনি আমরা হয়ে উঠি মন-মননে বর্ষামুখর।

'ফিরে আসুক ক্যাম্পাসের বর্ষা'

শ্যামলী তানজিন অনু

বাংলা বিভাগ, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ঝুম বৃষ্টি, চারদিকে পানিতে থৈ থৈ, গাছে কদম, বকুল, বেলি এই তো বর্ষা। ক্যাম্পাসে আগে সপ্তাহে ৫ দিন যেতাম এখন প্রায় ২ বছরেও একবার যাওয়া জোটে না। জরুরি কোনো প্রয়োজনে গেলেও সেই অনুভূতি আর কাজ করে না। সকাল ৮টার বাসে ক্যাম্পাস যেতাম। দু-একটা ক্লাস করার পরই কিছু কিছু দিন বৃষ্টি শুরু হতো আবার ২টার সময় যখন বাসে বসতাম বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেবো বলে তখন ঝুম বৃষ্টিতে ক্যাম্পাস ভিজে একাকার। এরই মধ্যে বাসের জানালা দিয়ে হাত বের করে বৃষ্টি ছোঁয়ার যে অনুভূতি তা অপরিমেয়। বৃষ্টি জোরে নামলে গান গাওয়া, যে কখনো গান গাইতো না সে-ও ঠোঁট মিলাতো। যে লেখালেখিতে পারদর্শী সে খাতা-কলম নিয়ে কবিতা, গল্প লিখতে শুরু করত। কেউ ছাতা নিয়ে ভিজতো, আবার প্রেমিক যুগল ছাতা ছাড়া সারা ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়াতো, প্রেমিকার আবেগী আবদার তাকে কদম ফুল ছিঁড়ে দিতে হবে, প্রেমিক তার খুশির জন্য কদমফুল এনে দিত। ফুটবল মাঠে নেমে পড়ত একদল যুবক, যাদের নেশা বৃষ্টি দেখলেই ফুটবল নিয়ে মাঠে নামা। খেলা শেষে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে গোসল করা, পানিতে ডুব দিয়ে পানির উপরের বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ শোনার চেষ্টা করাসহ চলত নানান রকম দুষ্টুমি। বৃষ্টি কমলে ঝালমুড়ি খাওয়া, চা খাওয়া, আড্ডা দেওয়া সব যেন বিলীন আজ। ক্লাসে বসে স্যারের উপর বিরক্ত আসা, কখন ক্লাস শেষ হবে আর বৃষ্টিতে ভিজব। বকুল তলায় বকুলফুল কুড়িয়েই নাকে স্পর্শ করে বলা 'বকুল ফুলের ঘ্রাণ আরও সুন্দর হতে পারত'।

ক্যাম্পাসে যেই পিচ্চি ছেলেটা বকুল ফুলের মালা বিক্রি করে ওর থেকে একটা মালা কিনে খোলা চুল খোঁপা করে মালা গুঁজে দিতাম। বৃষ্টি সবার প্রিয় না হয়তো তবে অপ্রিয়দের সংখ্যা খুবই কম। যখন-তখন হুটহাট বৃষ্টি আর ক্যাম্পাসের সব সুন্দর সুন্দর মুহূর্তগুলো মনে পড়ে, ভীষণভাবেই মনে পড়ে।

'নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে আসে বর্ষাঋতু'

ইনজামুল সাফিন

শিক্ষার্থী, সরকারি শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, বরিশাল

আকাশে মেঘের ঘনঘটা, বৃষ্টির শীতল পরশ, নানারঙের ফুল আর বিস্তৃত জলরাশির অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে আসে বর্ষাঋতু। বর্ষা ঋতুর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- 'বাদল দিনের প্রথম কদমফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান/মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে, এই যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান'। বর্ষা ঋতুতে বরিশালের শাতলা বিলে ফুটে থাকা শাপলা-শালুক-পদ্মফুলের সৌন্দর্য সত্যিই নজর কেড়ে নেয়। কদম, কেয়া, বকুল, জুঁই, লিলি, কামিনী, বেলি, চামেলি, অলকানন্দ, দোলনচাঁপা, বান্ধুলি বর্ষাকে দিয়েছে অপার সৌন্দর্য। আরও দেখা যায় ঘাসফুল, পানাফুল, কচুফুল, কলমিফুল, ঝিঙেফুল, কেওড়া, কেন্দার শিয়ালকাঁটা এবং নানা রঙের অর্কিড। ঝালকাঠি-পিরোজপুরের খালে-বিলে বসে ভাসমান পেয়ারার হাট। বৃষ্টির জল গায়ে মেখে, জলে ভেসে ভেসে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা পেয়ারা বাগান ভ্রমণে আসেন। সবুজ পাতার মাঝে থোকা থোকা পেয়ারা দেখতে বড্ড সুন্দর। এ ঋতুতে চাই, ডিস পেতে মাছ ধরার চিত্রও পর্যটকদের নজর কাড়ে। অনেকেই ভরা নদীতে লঞ্চ কিংবা স্টিমারে চড়ে নদীপাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন। বর্ষাকালে প্রকৃতি খুবই সজীব হয়ে ওঠে। শিল্পীর চিত্রপটেও ফুটে ওঠে আবহমান বাংলার বর্ষাকালের সৌন্দর্য।

\হ'প্রকৃতির অপূর্ব রূপ দেখিয়াছি বর্ষায়'

রহমতুলস্নাহ রাফি

শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বর্ষা ঋতুটাই যেন বাংলাদেশের জন্য। এ দেশের পরিবেশ-প্রকৃতির সঙ্গে যেন বর্ষার রয়েছে এক আদিম অকৃত্রিম মিত্রতা। তাই তো কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষা-বন্দনায় মেতেছেন বারবার। গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহ শেষে বর্ষা যেন এক পশলা স্নিগ্ধতা নিয়ে হাজির হয়। তিরিক্ষি জনজীবনে শীতলতার প্রলেপ এঁকে দেয়। জানালার ধারি বেয়ে নেমে আসা জলধারায় হাতের তালু ভিজিয়ে মুক্তি খুঁজে পায় অল্পবয়সি গৃহবধূ। আনন্দাশ্রম্নতে চিকচিক করে ওঠে বৃষ্টির প্রতীক্ষায় থাকা চাতক কৃষকের নয়নযুগল। আর এই বর্ষা যেন আরও রূপবতী হয়ে আবির্ভূত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি বর্ষার অপূর্ব এক রূপ দেখেছি চবি ক্যাম্পাসে। ২১০০ একরের সুবিশাল ক্যাম্পাসটি আপাদমস্তক সবুজে ঘেরা। বর্ষার রিনঝিন বৃষ্টিতে অবগাহন করে সেই শ্যামলতা যেন আরও সজীব হয়ে ওঠে। বৃষ্টিস্নাত পাহাড়গুলো মুহুর্মুহু উজ্জীবিত হয় নবধারায়। মোটকথা, বর্ষার আগমনে আমাদের সবুজ ক্যাম্পাসের নৈসর্গিক সৌন্দর্য সহস্রগুণ বেড়ে যায়। বৃষ্টিভেজা কাটাপাহাড়ের কালো পিচঢালা রোড পরিণত হয় স্বর্গীয় সুড়ঙ্গে। আলো-আঁধারে আচ্ছাদিত ফরেস্টি-রোডকে মনে হয় অপার্থিব ভূখন্ড। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কদমগাছগুলোও সারা বছরের মলিনতা ঝেড়ে হলুদ হয়ে ওঠে। নেয়ে-ধেয়ে নতুন সাজে সজ্জিত হয় বোটানিক্যাল গার্ডেন, বুদ্ধিজীবী চত্বর, সেন্ট্রালফিল্ড। চায়ের টেবিলকে বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে ঝুপড়িতে ঝুপড়িতে গড়ে ওঠে সন্ধ্যাকালীন কনসার্ট। আর এ সবের বাইরে ঝিকঝিক রব তুলে শহর-পানে ছুটে চলা আমাদের শাটলট্রেন তো রয়েছেই।

চবির বর্ষা কিংবা বর্ষার চবি-অন্যদের মতো আমাকেও খুব টানে। মন চায়, প্যানডামিক-সৃষ্ট সব বাধা-বিপত্তিকে পিছনে ফেলে ছুটে যাই আমার প্রিয় ক্যাম্পাসে। তারপর আমিও সর্বাঙ্গে অবগাহন করি এর বর্ষাকালীন রূপসুধায়।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে