বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1
পাবিপ্রবির স্বাধীনতা চত্বর

যেখানে বেঁচে থাকে ক্যাম্পাসের প্রাণ

আবদুলস্নাহ আল মামুন
  ০৮ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
সকালের বাসটা যখন ক্যাম্পাসে ঢুকলো তখন ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৮টা ৪০ মিনিট। মিনিট পাঁচকের মধ্যে এক এক করে সব বাস ক্যাম্পাসে চলে এলো। শিক্ষার্থীদের একদলের গন্তব্য ক্লাসরুম, একদলের গন্তব্য ক্যাফেটোরিয়া, একদলের গন্তব্য ফটোকপির দোকান। এদের মধ্যে আরেকটা দল আছে যাদের প্রথম গন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা চত্বর। ক্যাম্পাস সময়ের রুটিনের মধ্যে স্বাধীনতা চত্বরে আড্ডা দেওয়ার জন্য কিছু সময় এরা বরাদ্দ দিয়ে রাখে। দিনের শুরুতে হোক, মাঝে হোক কিংবা দিনের শেষে হোক ক্যাম্পাস সময়ের ভেতরে যখন এরা সময় পাবে তখন এখানে এসে আড্ডা দিয়ে যাবে। সকালের স্স্নটের ক্লাস শেষ। পরিসংখ্যান বিভাগের সৈকত, তন্ময়, নাবিল, সাইফ, বিশালরা আড্ডা দিতে এসেছেন স্বাধীনতা চত্বরে। প্রতিদিন ক্লাসের আগে কিংবা পরে এদের মতো অনেকেই আসেন এখানে আড্ডা দিতে। আড্ডা বেশ জমে উঠেছে। এ সময় সৈকত বলে উঠল, ক্যাম্পাসে আসার পর প্রথম এই চত্বরেই বসা। তখন ক্যাম্পাসে আড্ডা দেওয়ার মতো তেমন কোনো ভালো জায়গা ছিল না, সবাইকে এখানেই আড্ডা দিতে দেখতাম। তখন থেকে এখানেই সবার সাথে বসি, আড্ডা দিই। ক্যাম্পাসে এলে এখানে আড্ডা দিয়ে না গেলে শান্তি পাই না। একটু দম নিয়ে আবার বলে উঠল, এখন ক্যাম্পাসে আড্ডা দেওয়ার মতো অনেক জায়গা তৈরি হয়েছে। নতুন নতুন স্থাপনা তৈরি হচ্ছে কিন্তু এই স্বাধীনতা চত্বরের মতো আড্ডা অন্য কোথাও জমে না। সৈকতের কথা শেষ হতেই তন্ময় বলে উঠল, এখান থেকে সব জায়গা কাছে। ক্লাসের সময় হলে এক দুই মিনিটের মধ্যেই ক্লাসে যেতে পারি। ক্ষুধা লাগলে পাশেই ক্যাফেটোরিয়া, পড়ার জন্য লাইব্রেরিও পাশে। এখানে বাসের জন্য অপেক্ষা করি। এই জায়গাটা ক্যাম্পাসের একেবারে কেন্দ্রে হওয়ায় যে কোনো জায়গাতে সহজে যাওয়া যায়। ক্লাস শেষ করে গণিত বিভাগের মহিম, জিয়া, আশিক, শোভনরাও এখানে আড্ডা দিতে এসেছে। আশিক জানায়, সবাইকে এখানে পাওয়া যায়। ক্লাসরুম, লাইব্রেরি থেকে এই জায়গাটা কাছে হওয়ায় কাউকে এখানে আসতে বলে বিরক্ত হয় না। চারপাশের পরিবেশটাও সুন্দর। ক্যাম্পাসে আড্ডা দেওয়ার জন্য এটা একটা আদর্শ জায়গা। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) এই জায়গাটার মূল নাম 'স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা'। তবে এটি স্বাধীনতা চত্বর নামেই সবার কাছে পরিচিত। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা তাদের নিত্যকার গল্পগুলো নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন এই স্বাধীনতা চত্বরেই। কখনো হাসির রোল ওঠে, কখনো গিটারের টুংটাং শব্দ কিংবা কখনো কবিতার দুটি লাইন ভেসে আসে এই চত্বর থেকে। ক্লাস, পরীক্ষার ক্লান্তি শেষ করে এখানে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে আসেন শিক্ষার্থীরা। ভাইভা, প্রেজেন্টেশন শেষ করে ছবি তোলার জন্য লাইন দেন সবাই। ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্য প্রফেসর ডক্টর মোজাফফর হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের এই ভাস্কর্যটি তৈরির উদ্যোগ নেন। প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালের ২ ফেব্রম্নয়ারি ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধনের আট মাসের মধ্যে এই স্থাপনাটির কাজ শেষ হয়। অনেকের মতে এই স্থাপনাটিই দেশের মানুষের কাছে পাবিপ্রবিকে পরিচিত করে তুলেছে। এই স্থাপনার ছবি দেখে মানুষ বুঝতে পারে এটি পাবিপ্রবি। ২০২০ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পাসে এটিই একমাত্র উন্মুক্ত স্থাপনা ছিল যেখানে শিক্ষার্থীরা হাসি-গানে মেতে থাকত। দিনভর শিক্ষার্থীদের আড্ডা, বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম। আবৃত্তি, গান, অভিনয়, বিতর্কের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই স্বাধীনতা চত্বর। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মিনার, লেক, মুক্ত মঞ্চ, জনক জ্যোতির্ময়সহ অনেক স্থাপনা তৈরি হলেও এখনো এই চত্বরের গুরুত্ব কোনো অংশেই কমেনি। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো এই চত্বরের সামনেই হয়। ক্লাসের ফাঁকে বাসের জন্য অপেক্ষা করা, বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করা, ছবি তোলা সবকিছু এই স্বাধীনতা চত্বরেই হয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পদচারণায় পাবিপ্রবির এই স্বাধীনতা চত্বর সব সময় জাগ্রত থাকে। শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলেন ক্যাম্পাসের সব প্রাণ এই চত্বরের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে