বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

বিদায় বেলায় স্মৃতির মেলায়

বিদায়ী ছায়া পড়েছে এই অঙ্গনে, অশ্রম্নসিক্ত লোচনে স্মৃতির ভাঙনে। ক্যাম্পাসের সব স্মৃতিবিজড়িত জায়গায় অনুভূতিরা সব বন্দি হয়ে গেছে। তারা কখনো খেলা করবে আনন্দ সরোবরের ঢেউয়ে, কখনো বা নেচে উঠবে মুক্তমঞ্চের নৃত্যে- রয়ে যাবে আমৃতু্য সরব। বলছি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবম ব্যাচ 'সংশপ্তক-১৭'-এর বিদায়ী মুহূর্তে সেই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের আবেগ-অনুভূতির কথা। চলুন পড়ে নেওয়া যাক বিদায়ীদের মনের আকুতি মেশানো অভিব্যক্তিগুলো।
লিখেছেন নাজমুল ইসলাম
  ১৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
'ভালো থেক পদ্ম, ভালো থেক পাবিপ্রবি' রাজিব কুমার নয়ন পূরকৌশল বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আনন্দ আর বেদনা এখানে মিলে-মিশে এক হয়ে যাবে, তা কিছু দিন আগেও ভাবতে পারিনি। সেশন জটে, যখন নিজের পায়ে ভারী শিকল নিয়ে হেঁটেছি, মন চাইতো মুক্তি। আর এখন যখন মুক্ত হবো হবো, তখন মন বলে সময়টাকে একটু ধীরগতি করা গেলে কতই না ভালো হতো। চোখ বন্ধ করলে পাবিপ্রবির প্রথম দিনটা চোখের সামনে আজও ভাসে। সেদিন সকালে দেখেছিলাম, কিছু উঁচু দালান যেন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে- তাদের প্রাণ নেই, তারা হাসে না। একটু বেলা বাড়লে দেখলাম কত রঙের মানুষ। তাদের হাসি-গানে বালু-প্রান্তরের উঁচু দালানগুলো জীবিত হয়ে ওঠে। কালান্তরে অনেক কিছু বদলে গেছে। আজ আমাদের আনন্দ সরোবর আছে, ক্যাম্পাসজুড়ে সবুজের স্নেহ আছে। কিন্তু আমাদের এখানে সময় ফুরিয়ে গেছে। এই বিদ্যাপীঠ আমায় পুঁথিগত শিক্ষা নয়, শিক্ষা দিয়েছে- শ্রদ্ধা, স্নেহ আর ভালোবাসার। যা হোক, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে চাই জীবন সিঁড়ির নতুন ধাপে যে পা বাড়াতে হবে। স্বাধীনতা চত্বরের পাশে আগে পদ্ম ফুটতো, পদ্মগুলো আর এখন ফোটে না। কিন্তু রোজ স্বপ্নে আমায় ডাকে, আগামী দিনগুলোতেও হয়তো ডাকবে। ভালো থেকো পদ্ম, ভালো থেকো পাবিপ্রবি। 'গেটের টং দোকানের অনুভূতিটা আর পাব না' নিজাম উদ্দিন ইমন ফার্মেসি বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় \হ আমি পাবনার সন্তান। নিজ জেলার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলাম যেদিন, সেদিন থেকে যেন এক নতুন জীবনের শুরু। নিজ এলাকা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যেন এক ভিন্ন জগৎ পেতাম। ক্যাম্পাসের শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধবী, সিনিয়র-জুনিয়র এক মধুর সম্পর্কে অন্যরকম এক অনুভূতি; যাদের ছেড়ে যেতে হবে ভাবতেই অসম্ভব মনে হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যা পেয়েছি, দিতে পেরেছি খুব অল্পই। অনেক কিছু জেনেছি, শিখেছি। বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতির অনেক চড়াই-উতরাই-এর সাক্ষী হয়েছি। ক্যাম্পাসের আড্ডার জায়গাগুলো মিস করব অনেক। এখন তো শহীদ মিনার, মুক্তমঞ্চ, লেকের পাড় হয়েছে। আমাদের সময় একমাত্র আড্ডার জায়গা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় স্বাধীনতা চত্বর আর গেটের টং দোকান। সকাল-সন্ধ্যা সেখানে জমতো আড্ডা। চা হয়তো অনেক খাওয়া হবে, কিন্তু গেটের টং দোকানের অনুভূতিটা আর পাওয়া হবে না। ভালো থেকো প্রিয় ক্যাম্পাস। ভালোবাসার পাবিপ্রবি ক্যাম্পাস সবসময়ই ভালোবাসাতেই থেকো। 'ভালো থাকুক প্রিয় শিক্ষাঙ্গন' তাবাসসুম সুলতানা মীম ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পাবিপ্রবি এক ভালোবাসার নাম, পাবিপ্রবি আমার পরিচয়। জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টা এই পাবিপ্রবিতেই রচিত। এই চারটা বছর জীবনের সব থেকে তাজা স্মৃতি মাখা পর্যায়; যেখানে রয়েছে আমার সব থেকে কাছের বন্ধুমহল, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণটা আমার জন্য এক জগতের মতো। যেখানে নানান মতবাদের মানুষ এক রংধনু রাঙা আকাশ তৈরি করে। এ জগৎটা আমায় মানুষ চিনতে শিখিয়েছে, জীবন বুঝতে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে কীভাবে অটুট সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। আর এই তো, বিদায়বেলা চলে এলো, অনেকটা পথ হাঁটলাম এখানে, তবুও যেন মনে হয়-এই তো সেদিন এলাম। সময় ফুরিয়ে এসেছে, চলে যেতেই হবে। তবে সঙ্গে রয়ে যাবে হাজারো স্মৃতির ভান্ডার। পাবিপ্রবি বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াক, ভালো থাকুক প্রিয় শিক্ষাঙ্গণ। 'ক্যাম্পাসের স্মৃতিগুলোই আমার শক্তি' তারেক হাসান বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম সেমিস্টারটা বেশ অদ্ভুত গিয়েছে। ক্লাস শুরুর প্রায় বিশ দিন পর আমি ক্লাস শুরু করি। ক্যাম্পাসে এসেও কেমন যেন সব ম্স্নান। যেদিন বাসা থেকে বের হলাম, একদম ভোরে। বাসায় সবাইকে বলে বের হতেই কেমন যেন শূন্যতা ভর করল। কখনো বাসার বাইরে থাকিনি। তাই ওটা স্বাভাবিক ধরেই সব চলছিল। কিন্তু সবকিছু যেন খুব নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে থাকে ঠিক যেদিন ক্যাম্পাসের ডিবেটিং সোসাইটিতে জয়েন করি। নতুন সংগঠন, আমার যাত্রাও নতুন। তবে সেখানে উতরে যাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বিতর্ক প্রতিযোগিতায়। হুট করে হয়ে যাই রাইজিং স্টার অফ দা টুর্নামেন্ট। তারপর একরকম হুট করেই অনিরুদ্ধ নাট্যদলের সেশনে বসে যাই। নাট্যদলের কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মজার স্মৃতি, আমাদের সিরিজ মূকাভিনয়। এরপর শুরু করি গানের দল 'জবাফুল'। সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে আমার হাজারো স্মৃতি। ক্যাম্পাসের এই স্মৃতিগুলোই আমার শক্তি। 'ভালো থেক রঙিন স্বপ্ন নিয়ে নিরন্তর ছুটে চলা সাদা-খয়েরি বাস' ইসরাত ইমু ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুত্ব, সম্মান, ভালোবাসা, আন্তরিকতা, বন্ধুসুলভ শিক্ষকদের ভালোবাসা শব্দগুলোর সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা ত্রিশ একরের পাবিপ্রবি। এই ছোট্ট গন্ডির ভেতর আশ্রয় পেয়ে হতাশা অনুভব করলেও আজ ছেড়ে যেতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। একটা সময় ক্যাম্পাস মাঠে কেবল স্বাধীনতা চত্বরের স্থাপনাটুকু ছিল। প্রথম বর্ষে সিনিয়ররা বলে দিয়েছিলেন, একবছরের আগে চত্বরে ওঠা নিষেধ। মনে মনে বলতাম একদিন সিনিয়র হবো, এখানে বসে আড্ডা দেবো। একসময় একের পর এক জুনিয়র ব্যাচের আনাগোনা শুরু হলো, কিন্তু মাথার ওপর থেকে সেই অবিভাবকসুলভ সিনিয়ররাও বিদায় নিতে থাকলেন। যেদিকে তাকাই সেদিকে আজ কেবল নতুন মুখ। স্মৃতি হয়ে থাকবে বিকেলবেলা ঘুরতে যাওয়া, গলা ছেড়ে সমস্বরে গেয়ে ওঠা গান, ক্যাফেটোরিয়ার শিঙাড়া, চায়ের কাপে চুমুক, আড্ডাবাজি, মাঠের ক্রিকেট-ফুটবল খেলা, ডিপার্টমেন্টের টি-শার্ট, রঙিন র?্যাগ ডে, বনভোজন। বেজে উঠেছে বিদায়ের ঘণ্টা। ভালো থেকো পাবিপ্রবি, ভালো থেকো স্বাধীনতা চত্বর, ভালো থেকো রঙিন স্বপ্ন নিয়ে নিরন্তর ছুটে চলা সাদা-খয়েরি বাস।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে