রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

শীতের চাদরে মোড়ানো বেরোবির সকাল

ম নিশাত তাসনিম
  ১৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে বিমোহিত বর্ণিল ঋতুর বঙ্গশালার অবারিত সৌন্দর্যের এক নিসর্গ অমৃত লহরী উত্তরবঙ্গের বাতিঘর ও বৃক্ষের জাদুঘরখ্যাত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি ক্যাম্পাস)। সুদূর কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে বয়ে আসা শীতের হাওয়া বেরোবির বুকে নিয়ে আসে কুয়াশার জাল। চাদরে মুড়িয়ে দেয় জাদুঘরের সব বৃক্ষ, সৃষ্টি হয় এক নতুন বেরোবি ক্যাম্পাস। হেমন্তের পৌঢ়ত্বের পর আসে জরাগ্রস্ত শীতের বার্ধক্য। শুষ্কতা, রিক্ততা আর দিগন্তব্যাপী সুদূর বিস্বাদের প্রতিমূর্তি। শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে কণ্টকাকীর্ণ হয়ে ওঠে সবুজ অরণ্য। মাবধীলতা, পত্রশূন্য, ঝুমকোলতার রং ফুরায়, পাতায় পাতায় বয়ে আনে পান্ডুরতা। তবুও শীতের সকালের মাধুর্য সকলের মন স্পর্শ করে। সে শুধু বৈরাগী নয়, চাঞ্চল্যও বটে। কালের আবর্তনে ছয় পার্বণের রূপ-বৈচিত্রে?্যর ভিন্নতা আকৃষ্ট করে অবারিত রঙের স্পর্শ যা রূপকল্পের মূর্ত প্রতীকই নয় বরং নৈসর্গিক রূপ ধারণ করে শিশিরস্নাত প্রভাতবেলা। প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি বলতেই (বেরোবি) সৌন্দর্যমন্ডিত ক্যাম্পাস যা শীতের সকালের অবারিত রসনায় বয়ে আনে তৃপ্তির আস্বাদ। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো পুষ্পশোভিত অপরূপ ক্যাম্পাস যা কাদা ধুলোহীন পরিবেশকে সঙ্গী করে মনোরম হয়ে ওঠে চারপাশ। শিশিরভেজা দূর্বাঘাসের আলতো পরশ, যে কতটা অনূভুতির ছোঁয়া উপলব্ধি করেন বেরোবির শিক্ষার্থীরা তা মুখে প্রকাশ করা কঠিন। সকালে সূয্যি মামা উঁকি দিচ্ছে অসংখ্য অরণ্যের আড়ালে যেন মুখ লুকিয়ে আছে লজ্জায়, অভিমানে। সূর্যের ঝলকিত রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে আলিঙ্গনে মত্ত চারপাশ। কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে যখন সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে গাছপালা ভবন, মাঠ, কানন প্রান্তর, প্রকৃতিপুঞ্জ ঝলমলে হয়ে ওঠে। মায়াবী এই বিদ্যাপীঠকে সবুজ পত্রপলস্নব দিয়ে সারা বছর সাজিয়ে রাখে ফুল, ফল,ঔষধি বিভিন্ন জাতের বাহারি গাছপালা; কিন্তু শীতের রুক্ষতার পাতাঝরা উদ্ভিদ তাদের পাতা ঝরিয়ে জানান দেয় আবার এক নতুনত্ব নিয়ে আসবে বেরোবি ক্যাম্পাসে। এই সবুজায়ন সৌন্দর্যবর্ধনে প্রশাসনের নানা উদ্যোগ নেয়। সম্প্রতি ভবনগুলোর সামনে রোপণ করা হয়েছে নয়নাভিরাম ফুলের বাগান যা উঁচু ভবন থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটুকরো মাটিতে পুষ্পের গালিচা বিছানো। গাছের পাতার ভাঁজে ভাঁজে হেসে ওঠে সবুজ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। ফুলের ঘ্রাণে ক্লাসের ফাঁকে, জমে ওঠে শিক্ষার্থীদের আড্ডা, দুষ্টুমি ও খুনসুটি। এসব মনোমুগ্ধকর পরিবেশ শুধু যে শিক্ষার্থীরাই উপভোগ করে তা নয়- অতিথিদেরও আনাগোনা রয়েছে। ক্যাম্পাসে প্রজাপ্রতির সঙ্গে যেন মেলা বসেছে ফুলপ্রেমীদের। শীতের অলস সকাল-বিকালের আড্ডায় চায়ের কাপে ঝড় ওঠে ক্যাফেটোরিয়া, একাডেমিক ভবন ও প্রশাসনিক ভবনের বাগান ঘিরে। এই স্মৃতিবদ্ধ মুহূর্তগুলো ধরে রাখতে চলে ফটোসেশন। শীতের আবহে এসব দেখে পুলকিত হয় মানবের মন। এ ছাড়া কৃষ্ণচূড়া রোড, বিজয় সড়ক, শেখ রাসেল মিডিয়া চত্বরের বৃক্ষগুলোতে ছুটে আসে অতিথি পাখি। মনে হয় ওরা সেই সাইবেরিয়ার বরফ পড়া এলাকা থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছে উত্তরবঙ্গের বৃক্ষের জাদুঘরে। স্বাধীনতা স্মারক ও বঙ্গবন্ধুর মু্যরালের লাল কংক্রিটে জমে থাকা শিশির বিন্দু পান করে ভোরের পাখি। এমন দৃশ্য শীতের সকালে বেরোবিতে সবার প্রথম দৃষ্টিগোচর হয়। শহীদ মুকতার ইলাহী ও বঙ্গবন্ধু হলের পাশের সরু পথ ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়, দেখে যেন মনে হয় অনন্তকাল কোনো কবি তার কাব্যিক ধারায় এই পথে কবিতা লিখে চলেছেন। গ্যারেজ রোডের শীতের সকালের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, এই যে কুয়াশা ছেঁয়ে যায় দুই পাশের সারি সারি শত-প্রজাতির বৃক্ষ। তারই পাশে বসে রচিত হয় নতুন প্রেম, বৃক্ষ মানবীর সঙ্গে প্রকৃতিপ্রেমীর সখ্যতা। তারপর ভিসি মাঠ, সেন্ট্রাল মাঠ ঘিরে শীতের নতুন পিঠাপুলির উৎসব শিক্ষার্থীদের মনে জাগিয়ে তোলে নতুন আমেজ। শীতকে কেন্দ্র করে পথশিশুদের নিয়ে শীতবস্ত্র বিতরণ আয়োজন যা চোখে পড়ার মতো। তাছাড়া টিচার্স কোয়ার্টারের পাশে লাগানো বকুলের ঘ্রাণে মূর্ত হয়ে ওঠে প্রাণবন্তকর পরিবেশ। সত্যিই! অপরূপ এই শীতের বেরোবি ক্যাম্পাস। যার সৌন্দর্য লিখে প্রকাশ করার নয় বরং স্বচক্ষে দেখে উপলব্ধি করলেই বোঝা যায়। উত্তরবঙ্গের মধ্যে এ যেন আমাজন বনের মতো সবার আকর্ষণের এক অফুরন্ত অক্সিজেন জুগিয়ে চলেছে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে