রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

স্মৃতির পাতায় স্কুল

ম অমিত হাসান
  ১৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে কিছু দিন হলো হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছি। উপজেলার সবচেয়ে নামকরা স্কুল। প্রতিবছর ভালো ফলাফল ছাড়াও স্কুলটির আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে স্কুলটির মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। শীতলক্ষ্যা নদীর কোলঘেঁষে অবস্থিত এই স্কুলটি নির্মিত হয়েছে সেই ব্রিটিশদের শাসনামলে। তারপর থেকে কত গুণীজনের বিদ্যাপীঠই না ছিল এই প্রতিষ্ঠান। কালের প্রবাহে আমারও সুযোগ হয় স্কুলটিতে অধ্যয়নের। ২০১২ সাল। ক্লাস সিক্সে পড়ি। স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মূলপর্বে বিভিন্ন ইভেন্টের খেলা চলমান। শিক্ষার্থীরা ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে একের পর এক বিভিন্ন ইভেন্টে নিজেদের মুন্সিয়ানা দেখিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে এলো আমার পালা। ১০০ মিটার স্প্রিন্টে (একক) দৌড়াতে হবে আমায়। সবাই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু আমার বুকের ভেতর চাপা ভয়। আমি কি পারব? আর না পারলে আমায় নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে না তো? নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু-বান্ধব। ভয় আর উৎকণ্ঠায় আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি পালাবো। খেলায় হারের আগেই হার মেনে নিতে যাচ্ছিলাম। আর নিজেকে এই ভেবে সান্ত্বনা দিলাম, প্রতিযোগিতায় জিততে পারলে যা পুরস্কার পেতে পারতাম তার জন্য মন খারাপও করব না। বরং বাসায় গিয়ে মাকে বলব বিজয়ীরা যে পুরস্কার পায় তা দোকান থেকে কিনে দিতে। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রতিযোগিতার ট্র্যাক থেকে পালিয়ে বাড়ি গিয়ে একটা ঘুম দিতে আমি এগিয়ে চলেছি। স্কুলের পেছন দিকটার ওয়াল টপকে পালানোর ক্ষেত্রে অন্যদিন হলে বন্ধুরাই সাহায্য করত। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সেদিন বন্ধুরাই আমার বিপক্ষে। আজকাল দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ইভেন্টে খেলার নাম করে পিকনিক ফেরত কর্মকর্তারা যেমন বলে- 'জয়-পরাজয় বড় নয়, অংশগ্রহণটাই বড়' বন্ধুরাও তেমনটাই বলল। তারপর কী আর করা! সহপাঠী, বন্ধু সবার জোরাজুরিতে অগত্যা ১০০ মিটারের স্প্রিন্টে দাঁড়ালাম। কিন্তু আমার দুষ্ট বুদ্ধিগুলো তখনো মাথায় ঘুরপাক করছিল। মনে মনে ঠিক করেছি হুইসেল বাজার পর একটু দৌড়ে ইচ্ছে করেই মাটিতে পড়ে যাবো। মনে হচ্ছিল পারব তো না এমনিতেই-আর এই ভাণটা করলে হয়তো অন্তত ইনজুট অজুহাত দিয়ে লোকেদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য থেকে বেঁচে যেতে পারি। তারপর প্রতিযোগিতা শুরুর পর এই পরিকল্পনাটাও অন্য পরিকল্পনাগুলোর মতো শুধু পরিকল্পনাই রয়ে গেল। ইসেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে পায়ে অপ্রত্যাশিত কিছু একটার স্পর্শ অনুভব করলাম। সঙ্গে সঙ্গে এক বন্ধু খানিকটা দূরে থেকে চিৎকার করে বলল, 'সাপ, সাপ, অমিত দেখ তর পায়ের কাছে সাপ'! আমি আর পিছনে ফিরে তাকানোর সাহস করতে না পেরে সোজা দৌড়। তখন সবাই দৌড়াচ্ছে প্রথম হতে, আর আমি দৌড়াচ্ছি সাপের ভয়ে। তারপর ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। সেরা সেরা দৌড়বিদরা আমার জীবন বাঁচানো দৌড়ের কাছে হেরেই গেল। যে আমি কিছুক্ষণ আগে প্রতিযোগিতার মঞ্চ থেকে পালাতে চাচ্ছিলাম সেই আমিই প্রথম হয়েছি। এ অভাবনীয় ফলাফলে বিস্মিত আমি মনে মনে আরেকটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাদের জন্য আমি প্রথম হয়েছি পুরস্কার পেয়ে তাদেরই দিয়ে দেবো। কারণ এই প্রথম হওয়ার পেছনে আমার নিজের অবদান একেবারে নেই বললেই চলে। কিন্তু এই ভাবনার মধ্যেও ঘটে যায় নতুন আরেক বিপত্তি। আমার প্রথম হওয়ার পেছনে কার অবদান বেশি এই নিয়ে অন ফিল্ড বন্ধুরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করতে থাকে। এতে আসল ঘটনাটাও মুহূর্তের মধ্যে পুরো স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে। দায়িত্বশীল স্যাররাও কিছুক্ষণের মধ্যে সবটা জানতে পেরে যায় এবং আমাকে শাস্তি হিসেবে ডিস কোয়ালিফাই ঘোষণা করে যে দ্বিতীয় হয় তাকে প্রথম ঘোষণা করে। এতে আমার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ না থাকলেও একটা প্রশ্ন এখনো আছে। পুরনো স্মৃতি মনে পড়লে আমি এখনো ভাবী সেদিন আমার প্রথম হওয়ার পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল? যে বন্ধু গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করেছে তার? নাকি যারা পালাতে দেয়নি তাদের? নাকি যে বন্ধু খেলনা সাপ আনার পরিকল্পনা করেছে সে বন্ধুর? নাকি যে বন্ধু খেলনা সাপ ঠিক জায়গামতো মারতে পেরেছে সে বন্ধুর? নাকি যে বন্ধু শেষ মুহূর্তে আমাকে সতর্ক করেছে সেই বন্ধুটার?
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে