শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
walton
গল্প

অলস হাতির কান্ড

হালিমা রিমা
  ২৬ নভেম্বর ২০২৩, ০০:০০

মা হাতিটার মনে বেজায় কষ্ট। তারই বা কি দোষ বল। তার বাচ্চাটা হয়েছে খুবই অলস প্রকৃতির। এই ধর, সবাই মিলে যখন ঠিক করে তারা দূরের জঙ্গলে যাবে খাবার সংগ্রহ করতে; তার বাচ্চাটা তখন শুঁড় ফুলিয়ে ঘুমায়। মা হাতি যতই বলে, 'বাচ্চা আমার, হাতিমনি, আমার জাদুহাতি চল আমরা হেঁটে হেঁটে দূরের কোনো জায়গায় যাই। সেখানে অনেক খাবার। ও বাছা আর কত ঘুমাবে? এবার উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও।'

বাচ্চা হাতি আড়মোড়া ভেঙে একপাশ থেকে আরেকপাশ ফিরে শোয় আর বলে, 'মা আমাকে ঘুমাতে দাও তো। এত বিরক্ত কর কেন?'

মা হাতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাল ছেড়ে একাই চলে যান। যাওয়ার আগে বলেন, 'আমরা সবাই যাচ্ছি দল বেঁধে তুমি একা নিজের খেয়াল রেখ বাছাধন।'

সবাই যখন ফিরে আসে তাদের বাসস্থানে তখনও মা হাতি দেখেন তার বাচ্চা অলসের মতো ঘাসের উপর শুয়ে ঘাস চিবুচ্ছে। মাকে দেখেই সে অভিযোগের সুরে বলে, 'তোমার এত দেরি হলো কেন? আমি সেই কখন খেয়েছি। আমার বুঝি ক্ষিধে লাগে না।'

মা হাতি ক্লান্ত হয়ে তার পিঠে করে নিয়ে আসা কলার ছড়াটা এগিয়ে দেয় তার বাচ্চার দিকে। বাচ্চা হাতি খাবার দেখেই চোখ চকচক করে উঠে। সে গোগ্রাসে ঝটপট অনেকগুলো কলা খেয়ে ফেলে। মা হাতি দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর ভাবে কবে তার বাচ্চাসোনা কাজ করতে শিখবে।

মা হাতি ঠিক করল তার বাচ্চাটাকে সে আজ হাতির জীবনকাল নিয়ে গল্প শোনাবে। সে রাতে তার বাচ্চার শুঁড়ে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, 'তুমি আমার পেটে ছিলে দীর্ঘ ২২ মাস। এই ২২ মাস তুমি আমার পেটে বড় হয়েছ। আমি যা খাবার খেতাম তাই থেকেই তুমি পুষ্টি পেতে। তারপর তোমার জন্ম হলো কোনো এক সুন্দর সোনালি সকালে।'

বাচ্চা হাতি তন্ময় হয়ে শুনে আর ভাবে, 'মা তুমি কষ্ট পাওনি? মা হাতি হেসে বলে, 'না বাছা! সব কষ্ট আমার দূর হলো যখন তোমার এই চাঁদ মুখখানা দেখলাম। তুমি যে আমার সবচাইতে প্রিয়।'

-এবার বাচ্চা হাতি তার মাকে ছুঁয়ে বলে, 'তুমিও আমার সবচাইতে আপন। আমি তোমাকে ছাড়া একদিন ও থাকব না।'

\হ- তা কি হয় বাছা। মা বলেন, 'আমরা হাতিরা বাঁচি ৬০ থেকে ৭০ বছর। সেই হিসেবে আমি আর বেশি দিন বাঁচবনা। তাছাড়া আমার এবার নিয়ে ছয়বার দাঁত গজাল। তুমি শুনে রাখ হাতিদের মোট ছয়বার কষদাঁত বের হয়, আবার চিবিয়ে চিবিয়ে ক্ষয় হয়ে যায়- কষদাঁতের শেষ সেট ষষ্ঠম দশকে গজায়- যা ক্ষয়ে যাওয়ার পর অনাহারে মৃতু্য অনিবার্য।'

-'এর মানে কি মা? আমিতো দেখছি তোমার কি সুন্দর শক্ত গজদন্ত আছে। তুমি দলের অনেকের চাইতেই বেশি শক্তিশালী। তাই তোমার কিচ্ছু হবে না। আমি হতেই দেব না। কক্ষনো না না না না না।'

- 'শোন বাছা, আমরা মরে গেলে হাতি দলের সবাই মিলে গর্ত করে তারপর সেই গর্তে সবাই মিলে মৃতকে রাখে তারপর লতাপাতা, গুল্ম দিয়ে ঢেকে দেয়। যারা আপনজন তারা কিছুদিন সেই গর্তের আশপাশে দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশ করে।'

- বাচ্চা হাতি অভিমানের সুরে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে, 'মা, আমি তোমাকে ছাড়া থাকতেই পারব না।'

- মা হাতি বলে, 'শোন তোমাকে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে হবে। তোমাকে একদিন নিজের খাবার নিজেই সংগ্রহ করা শিখতে হবে। আর তোমার বয়স ১০ হলে তোমাকে তোমার সঙ্গী খুঁজে নিয়ে তার সঙ্গেই নতুন পরিবারে থাকতে হবে। এটাই নিয়ম। বুঝলে বাছা।'

- বাচ্চা হাতি তার শুঁড় মুখে নিয়ে চুষতে থাকে আর বলে, 'মা আমি কীভাবে খাবার সংগ্রহ করব? আমার কাজ করতে একটুও যে ভালো লাগে না।'

- মা তার বাচ্চাকে চুমু দিয়ে বলে আমি সব শিখিয়ে দেব তোমায়। তোমার বয়স দুই বছর হয়ে গেছে। দেখ তোমার কি সুন্দর গজদাঁত বের হচ্ছে। এই দাঁত আর শুঁড় দিয়ে তুমি প্রথমে নরম গাছ যেমন কলাগাছ বা অন্য গাছের ছাল শেকড় তুলে খেতে শিখ। একদিন দেখবে তুমি কত বড় বড় গাছ এক টানে তুলে ফেলতে পারবে।'

- 'মা আমি বড় হলে কতটুকু খাবার খাব? '

- মা হেসে বলেন, 'তা বাছা তুমি বড় হলে প্রায় ১৫০ কেজি খাবার প্রতিদিন তোমার লাগবে- তা না হলে শক্তি কোথায় পাবে। আমাদের যত বড় শরীর তত বেশি খাবার দরকার।

তোমাকে আরও শিখতে হবে পানিতে কীভাবে শুঁড় উঁচু রেখে সাঁতার কাটতে হয়। আর এই শুঁড় দিয়ে তুমি একসঙ্গে ১৪ লিটার পানি তুলে স্নান করতে পারবে। গ্রীষ্মকালে যে গরম তুমি স্নান না করলে অস্থির হয়ে যাবে।'

মায়ের কথা শুনতে শুনতে বাচ্চাহাতিটি ঘুমিয়ে গেল।

সকালে মা হাতি যতই ডাকেন বাচ্চা হাতি উঠবেই না। মা হাতির দুঃখে চোখে পানি চলে এলো। মনে মনে ভাবল, এত বুঝালাম অথচ আমার বাচ্চাটা সব ভুলে গেল।

মা হাতি মনের কষ্টে নিজেই বের হয়ে গেলেন তার নিজের জন্য আর তার বাচ্চাটার জন্য খাবার জোগাড় করতে। মা হাতির দাঁত অনেক ক্ষয়ে গেছে। এখন বড় বড় গাছ তুলে নিতে তার মুখে ব্যথা করে। মা হাতির হঠাৎ কি হলো- মাথা ঘুরে এত্ত বড় শরীর নিয়ে গেল হুড়মুড় করে পড়ে। তারপর আর তার কিছু মনে নেই।

এদিকে বাচ্চা হাতি ঘুমেই কাদা। অন্য হাতিরা তাকে অনেক কষ্টে ডেকে যখন বলল, 'তোমার মা মরে গেছে।'

বাচ্চা হাতি কোনো কথা বলতে পারল না। তার শুধু মায়ের গত রাতের সব কথা মনে হতে লাগল।

বাচ্চা হাতি তার মায়ের কাছে গিয়ে কত ডাকল কিন্তু তার মা কোনো সাড়া দিল না। কীভাবে দেবে? সে তো মরে গেছে।

এবার বাচ্চা হাতি শুঁড় মুখে পুরে কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর নিজেই মাটি খুঁড়তে শুরু করে দিল। তার ছোট্ট শুঁড়ে কি আর এত শক্তি আছে। তবুও হাল ছাড়ল না। সবাই দেখল, সেই অলস হাতি কি পরিশ্রমী। এরপর হাতির দলনেতার নির্দেশে বাকিরাও বাচ্চা হাতির সফঙ্গ গর্ত করতে লাগল।

বাচ্চা হাতি সারারাত মায়ের কবরের কাছে বসে রইল। তার শুঁড় ফুলে গেছে, কিছু জায়গায় ছিঁলে রক্তও বের হচ্ছে। তার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। তার মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল। তাকে মা বলেছিল, বাছা তোমাকে অনেক কিছু শিখতে হবে। সাঁতার কাটা, খাবার জোগাড়। আর এত ঘুমালেও চলবে না। মা বলেছিল, হাতিদের মাত্র ৪ ঘণ্টা ঘুমালেই চলে।

বাচ্চা হাতি তার ছোট্ট শুড় দিয়ে মায়ের কবর ছুয়ে প্রতিজ্ঞা করল, সে আর কোনোদিন কাজ করতে অলসতা করবে না। তাকে যে তার মায়ের কথা রাখতেই হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে