শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

গেঁটেবাত প্রতিরোধে করণীয়

বয়স বৃদ্ধি ও রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে। মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের ইউরিক এসিডের মাত্রা বেশি থাকে- তবে বয়স ও ওজন বাড়লে রক্তে ইউরিক এসিডও বাড়বে। সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া ও মেটাবলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার হার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সমান্তরালভাবে গেঁটেবাত বা গাউটে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
নতুনধারা
  ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

গেঁটেবাত বা গাউট এক ধরনের প্রদাহজনিত রোগ, এতে সাইনোভিয়াল অস্থিসন্ধি ও এর আশপাশের টিসু্যতে মনোসোডিয়াম ইউরেট মনোহাইড্রেট ক্রিস্টাল জমা হয়। এটি পুরুষ ও বৃদ্ধা মহিলাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে লক্ষণীয় প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিস। পুরুষরা সাধারণত ৩০ বছরের পর এবং মহিলারা মেনোপজের পরে বেশি আক্রান্ত হয়। বয়স বৃদ্ধি ও রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে। মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের ইউরিক এসিডের মাত্রা বেশি থাকে- তবে বয়স ও ওজন বাড়লে রক্তে ইউরিক এসিডও বাড়বে। সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া ও মেটাবলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার হার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সমান্তরালভাবে গাউটে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। ঐতিহাসিকভাবে এটাকে 'রাজাদের রোগ' বা ধনীদের রোগ বলে।

গেঁটেবাত যেভাবে হয়

মানব শরীরের মোট ইউরিক এসিডের এক তৃতীয়াংশ আসে খাবারের মাধ্যমে এবং দুই তৃতীয়াংশ অভ্যন্তরীণ পিউরিন বিপাকের ফলে উৎপন্ন হয়।

ইউরিক এসিড সংশ্লেষণ

মানব শরীরে পিউরিন বিপাকের সর্বশেষ দুটি ধাপ হচ্ছে : হাইপোজ্যানথিন থেকে জ্যানথিন এবং পরবর্তী সময়ে জ্যানথিন থেকে ইউরিক এসিড। এই দুটি প্রক্রিয়ায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জ্যানথিন অক্সিডেজ এনজাইম। মানব শরীরে ইউরিকেজ এনজাইম থাকে না।

ইউরিক এসিড নিষ্কাশন

কিডনির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশ এবং অন্ত্রের মাধ্যমে এক তৃতীয়াংশ ইউরিক এসিড শরীর থেক বের হয়ে যায়। কিডনি দিয়ে নিষ্কাশন প্রক্রিয়া একটু জটিল। প্রায় ৯০ শতাংশ গেঁটেবাত বা গাউট রোগীর ক্ষেত্রে ইউরিক এসিড নিষ্কাশনে সমস্যা থাকে, ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে শরীরে বেশি তৈরি হয় এবং ১ শতাংশের কম ক্ষেত্রে পিউরিন বিপাকের জন্মগত ত্রম্নটি থাকে।

কারণ

রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অস্থিসন্ধিতে মনোসোডিয়াম ইউরেট মনোহাইড্রেট ক্রিস্টাল জমা হয়ে গাউট রোগ সৃষ্টি করে। হাইপারইউরিসেমিয়ার কারণ নিম্নরূপ:

বৃক্কীয় নিষ্কাশন কমে যাওয়া

বৃক্কীয় নালিকায় পুনঃশোষণ বৃদ্ধি, রেনাল ফেইলিউর, সিসা বিষক্রিয়া, ল্যাকটিক এসিডোসিস, অ্যালকোহল, হাইপারকিটোএসিডেমিয়া, ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস, বার্টার সিনড্রোম।

ওষুধ : থিয়াজাইড ও লুপ, ডাইউরেটিকস, স্বল্পমাত্রার অ্যাসপিরিন, সাইক্লোসপরিন, পাইরাজিনামাইড

ইউরিক এসিড উৎপাদন বৃদ্ধি

হ মায়েলোপ্রলিফারেটিভ ও লিম্ফপ্রলিফারেটিভ ডিজিজ (লিউকেমিয়া রোগে কেমোথেরাপি নেওয়ার সময় ইউরিক এসিড লেভেল অনেক বেড়ে যায়।) হ সোরিয়াসিস, হ অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ গ্রহণ, হ গস্নাইকোজেন স্টোরেজ ডিজিজ, হ বংশগত রোগ: লেস নাইহান সিনড্রোম, হ ক্রনিক হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া, হ ক্যানসার, হ সাইটোটক্সিক ড্রাগস

উপসর্গ

সাধারণত একটি জয়েন্টে তীব্র ব্যথা হয়। তবে এক সঙ্গে একাধিক জয়েন্ট আক্রান্ত হতে পারে। ৫০% ক্ষেত্রে এটি পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিকে আক্রান্ত করে। অন্যান্য যেসব জয়েন্ট আক্রান্ত হতে পারে তা হলো: পায়ের গোড়ালি, হাঁটু, কবজির সন্ধি, কনুই, হাতের ছোট জয়েন্টগুলো। এটি হঠাৎ করে বাহ্যিক কোন কারণ ছাড়াই হতে পারে এবং সাধারণত রাতে বেশি হয়।

প্রধান উপসর্গসমূহ নিম্নরূপ

খুব দ্রম্নত ব্যথা শুরু হয়ে ২-৬ ঘণ্টার মধ্যে তীব্র আকার ধারণ করে। প্রায়শই ভোরবেলা রোগীর ঘুম ভেঙে যায়। ব্যথা এতই তীব্র হয় যে, রোগী পায়ে মোজা পরতেও পারে না, আক্রান্ত জয়েন্ট অনেক ফুলে যায়, চামড়া চকচকে লাল হয়ে যায়। ৫-৬ দিন পর এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। এর সঙ্গে জ্বর ও অবসাদগ্রস্ততা থাকতে পারে। ব্যথা কমে গেলে আক্রান্ত স্থান চুলকায় ও চামড়া উঠে যেতে পারে। কেউ কেউ একবার আক্রান্ত হওয়ার পর দ্বিতীয়বার আর আক্রান্ত হয় না। তবে অনেকেই কয়েক বছরের মধ্যে আবার আক্রান্ত হতে পারে। কেউ কেউ এক বছরের মধ্যে দুইবার আক্রান্ত হতে পারে। এতে করে জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জয়েন্ট ও এর আশপাশের টিসু্যতে ক্রিস্টাল জমা হয়ে নডিউল বা দলা তৈরি করতে পারে- যাকে টোফাস বলে। টোফাসে ঘা হতে পারে, সংক্রমণ হতে পারে, প্রদাহ হয়ে পুঁজ বের হতে পারে। ক্রনিক রেনাল ফেইলিউর রোগীদের ক্ষেত্রে এক বছরের মধ্যে টোফাস হতে পারে। দীর্ঘদিন রক্তে ইউরিক এসিড লেভেল বেশি থাকলে কিডনিতে পাথর হতে পারে।

প্রতিরোধে করণীয়

ওজন কমাতে হবে তবে খাওয়া দাওয়া একদম ছেড়ে দিয়ে নয়। কম চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া উপকারী। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলতে হবে। বেশি পিউরিন আছে এমন খাবার কম খাওয়া ভালো যেমন : বিভিন্ন ধরনের ডাল বিশেষ করে মসুর ডাল ও মোটর ডাল। শিম, শিমের বিচি, বরবটি, মোটরশুঁটি, কড়াইশুঁটি, পুঁইশাক, পালংশাক, অ্যাসপ্যারাগাস, ফুলকপি, মাশরুম, কচু, ইস্ট, লাল মাংস যেমন গরু, খাসি, ভেড়া, হরিণ, সব ধরনের হাঁসের মাংস যেমন- রাজহাঁস, জংলি হাঁস ও পাতিহাঁস; শূকর ও খরগোসের মাংস, বড় পাখির বা তুর্কি মোরগের মাংস, কবুতর ও তিতির পাখির মাংস। মগজ, কলিজা, বৃক্ক, যকৃৎ, অগ্ন্যাশয়, জিহ্বা, বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ ও মাছের ডিম, সামুদ্রিক খাবার, কাঁকড়া, চিংড়ি, শামুক ইত্যাদি।

ফলমূল, অন্যান্য শাকসবজি প্রচুর খেতে হবে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন পেয়ারা, বাতাবী লেবু, কামরাঙা, কমলা, আমড়া, বাঁধাকপি, টমেটো, আনারস,কাঁচা মরিচ, আমলকী, তাজা শাকসবজি ইত্যাদি প্রচুর খেতে হবে।

এছাড়া কম পিউরিন সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে আরো আছে দুধ ও দুধজাত খাবার, যেমন- দৈ, ঘি, মাখন, ডিম, চীনাবাদাম, লেটুস, পাস্তা, সাগু, ময়দা ইত্যাদি। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে যেন প্রতিদিন ২ লিটার বা তার বেশি প্রস্রাব হয় এতে অতিরিক্ত ইউরিক এসিড শরীর থেকে বের হয়ে যেতে সাহায্য করবে এবং ইউরিনারি ট্রাক্টে ইউরেট জমা হয়ে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করতে হবে। যে সব ওষুধ ইউরিক এসিড লেভেল বাড়ায় যেমন- থিয়াজাইড ডাইউরেটিকস্‌, অ্যাসপিরিন, নিয়াসিন ইত্যাদি পরিহার করতে হবে।

ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা

নীলফামারী সদর, নীলফামারী।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে