• বুধবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৩ মাঘ ১৪২৭

গাছতলার ভূত

গাছতলার ভূত

রোজন এ বছর জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তার পরীক্ষাও মোটামুটি ভালো দিয়েছে। শুধু ইংরেজি বিষয়টাতে যত গন্ডগোল। কোনোমতে পাস নম্বরের উত্তর লিখে এসেছে। ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষার দিন থেকে তার মনের মাঝে দুশ্চিন্তা ভর করেছে। না জানি পরীক্ষায় ফেল করে বসে। এই টেনশন ভুলে থাকতে রোজন দাদার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য বাবা-মায়ের কাছে বায়না ধরেছে।

রোজনের বাবা মুনিব চৌধুরী ছেলের এমন আবদারে রাজি হয়ে যান। কিন্তু অফিস থেকে ছুটির চেষ্টা করেও ছুটি পাচ্ছেন না। তিনিই অফিসের প্রধান হিসাব কর্মকর্তা। অফিসে বার্ষিক অডিট কার্যক্রম চলছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি বলে কথা। অফিসের বিশেষ মুহূর্তে নিজের জরুরি প্রয়োজনেও ছুটি মিলছে না।

বাবার সম্মতি পেয়ে রোজন খুব খুশি হলো। মুনিব চৌধুরী ছেলের দিকে দু'হাত বাড়িয়ে দেন। রোজন বাবার বুকে মাথাটা রেখে শান্তি খোঁজে। পরদিন রোজনকে অলংকার বাসস্টেশন থেকে গাড়িতে তুলে দিয়ে মুনিব চৌধুরী বাসায় চলে আসেন। রোজনদের গাড়ি দ্রম্নত গতিতে চলছে। এক সময় সে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়ে।

গাড়ি চেয়ারম্যান ঘাট এসে থামলে একেক করে সব যাত্রীর সঙ্গে রোজনও গাড়ি থেকে নেমে গেল। রোজন হাতঘড়িটার দিকে ঘুম ঘুম চোখে তাকায়। রাত এগারোটা বেজে ত্রিশ মিনিট। বাসের যাত্রীরা যে যার গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। রোজন এদিক ওদিক তাকিয়ে কাঙ্ক্ষিত কাউকে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। হঠাৎ তার বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বাবার বলা কথা মনে পড়ে যায়। বাবা বলেছিলেন, নোয়াখালীর চেয়ারম্যান ঘাটে পৌঁছাতে রাত প্রায় সাড়ে ১২টা কিংবা একটা বাজতে পারে। সেখানে তখন তোর দাদা কিংবা ছোট চাচা অপেক্ষা করবে।

আজ আসার পথে রাস্তায় কোনো জ্যাম ছিল না। তাই তাদের গাড়ি অনেক আগে পৌঁছে গেছে। রোজন মোবাইলটা হাতে নিয়ে দাদার নম্বরে কল দেয়। কিন্তু দাদার নম্বরে কল যাচ্ছে না। বারবার বেজে ওঠছে, 'দুঃখিত, এ মুহূর্তে আপনার ডায়াল করা নম্বরে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। 'রোজন মহাচিন্তার মধ্যে পড়ে গেল। রাত যত গভীর হতে থাকে আশপাশের লোকজনের সংখ্যা ততই কমতে থাকে। এক সময় রোজন লক্ষ্য করল কাউন্টার ছাড়া সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।

\হরোজন ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল।

শীতের রাত। পুরো শরীর মোটা কাপড়ে ঢেকে নিয়েছে সে। হাতে হাতমোজা গলায় মাফলার প্যাঁচিয়ে গাঁয়ের সরু মেঠোপথ ধরে একাকী গন্তব্যের পথে ছুটছে। আশপাশে কেউ নেই। চারদিক গাছগাছালিতে ভরা। রাস্তাটির দুইধারে ছোট-বড় গাছের সারি।

\হরোজন শহরে বড় হয়েছে। ভূতপ্রেত নিয়ে তার তেমন কোনো কৌতূহল নেই। তবে শেষবার দাদার কাছে সে ভূতের গল্প শুনেছে। গ্রামে নাকি গভীর রাতে কাউকে একা পেলে ভূতেরা মজা নিতে ভূমিতে নেমে আসে। তাও যদি অন্ধকার রাত হয়। চারপাশে যদি বনজঙ্গলের মতো ভুতুড়ে পরিবেশ থাকে। তাহলে তো কোনো কথাই নেই। দুষ্ট ভূতদের খপ্পরে পড়ে কারো কারো জীবন মৃতু্যর কিনারায় পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

হঠাৎ পুলের ওপর ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রোজনের গা ছমছম করে ওঠে। প্রচন্ড ভয়ে তার হাত পা যেন ঠান্ডা হয়ে আসে। পা চলে না। স্থির দাঁড়িয়ে যায় সে। ভয় ভয় চোখে এদিক ওদিক তাকায়। খালটির ওপরে স্টিলের লম্বা একটি পুল। দেখে মনে হচ্ছে এটি অনেক আগে তৈরি করা হয়েছে। পুলটির পরপর তিনটি রাস্তা তিনদিকে চলে গেছে। রোজন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এক সময় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সোজা হাঁটতে থাকে। কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ তার রাস্তার বামদিকে চোখ পড়তেই সে ঘাবড়ে যায়। হায়! সে একি দেখছে। রাস্তার বাম পাশে সামান্য দূরে একটি রেইনট্রি গাছ। গাছটি দেখে মনে হচ্ছে বেশ পুরনো। আশপাশের পরিবেশ ঝোপঝাড়ে ভরা। হঠাৎ অন্ধকারে ঝোপের ভেতর থেকে কী যেন একটা সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। রোজন ভালো করে তাকায়। বৃদ্ধ বয়সী একটা মহিলা প্রায় কুঁজো হয়ে রেইনট্রি গাছটির নিচে এসে থামল। এরপর বড় বড় চোখ করে রোজনের দিকে তাকিয়ে রইলো। এমন ঘুটঘুটে আঁধারেও মহিলাটির চোখজোড়া ঝলমল করছে। চোখের ভেতর থেকে যেন আগুনের ফুলকি বের হয়ে রোজনের দিকে আসছে। রোজন ভয়ে চোখ অন্যদিকে সরিয়ে বড় বড় পায়ে হাঁটতে থাকে।

হঠাৎ তার চোখের সামনে একটি কালো বিড়াল দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এত বড় বিড়াল রোজন এর আগে কখনও দেখেনি। বিড়ালটি ধীরে ধীরে রোজনের দিকে এগিয়ে আসছে। রোজন কোনো কিছু বোঝে ওঠার আগেই বিড়ালটি হঠাৎ চোখের সামনে সাদা হয়ে যায়। এবার বিড়ালটি অস্বাভাবিক শব্দ করে রোজনের দিকে তেড়ে আসে। নিরুপায় হয়ে রোজন জোরে জোরে দোয়া পড়তে শুরু করে। মুহূর্তে বিড়ালটি অদৃশ্য হয়ে গেল। রোজন মনে মনে চিন্তা করে,

- এসব আমার সঙ্গে কী ঘটছে। আর কি ব্যাপার এত জোরে হাঁটছি কিন্তু পথ শেষ হচ্ছে না কেন? দাদার বাড়ি তো এত দূরে হওয়ার কথা নয়। তবে কী ভুল পথে চলে এসেছি। হঠাৎ পেছন থেকে অস্পষ্ট মেয়েলী স্বরে রোজনের কানে আওয়াজ আসে,

- এই রোজন, তুমি সেদিকে কেন যাচ্ছ? পেছনে ফিরে এসো। তোমার গন্তব্য সেদিকে নয়।

এমন ডাক শুনে রোজন পেছন ফিরে আগন্তুককে খোঁজে। কিন্তু কৈ? আশপাশে তো কোনো জনমানব নেই। তাহলে কে ডাকতে পারে? তবে কী সেই বুড়ি মহিলা!

একথা ভাবতেই রোজনের শরীরের সমস্ত পশম খাড়া হয়ে যায়। এতক্ষণ সাহস দেখালেও এবার তার মনের মধ্যে ভয় জমে যায়।

\হরোজন আবার মনে মনে ভাবলো, এখন ভয় পেলে চলবে না। তাতে ভূতেরা আরো চড়াও হতে পারে। তারচেয়ে ভালো, যতক্ষণ পর্যন্ত পারি লড়ে যাই। দেখি এর মধ্যে কোনো লোকজন চলে আসে কি না।

এই ভেবে রোজন জোরে জোরে চিৎকার করে বলল,

- কে তুমি? আমার নাম ধরে ডাকলে। সাহস থাকলে আমার সামনে এসো। আমি কাউকে ভয় পাই না। আর তুমি আমার নাম জানলে কেমন করে?

\হরোজনের বিপরীত দিক থেকে আওয়াজ আসে,

- আমাকে তুমি চিনবে না। কিন্তু তোমার সবকিছু আমি জানি। তুমি শহরে থাকো। এ বছর জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছ। এখন দাদার বাড়িতে বেড়াতে এসেছ।

- হঁ্যা, তুমি একদম ঠিক কথাই বলেছ। কিন্তু তুমি এসব জানলে কেমন করে?

আগন্তুক হো হো করে হেসে ওঠে বলল,

- আমরা মানুষের সবকিছু জানি। কারণ আমরা অদৃশ্য। হাওয়ায় ভেসে ভেসে ঘুরে বেড়াই।

- আমার সম্পর্কে তুমি আর কি জানো?

- ইংরেজি ছাড়া তোমার সবগুলো পরীক্ষা ভালো হয়েছে। তুমি ইংরেজি বিষয়ে বরাবরই দুর্বল। কিন্তু এর জন্য তুমিই বেশি দায়ী।

\হরোজন মন খারাপ করে বলল,

- ইংরেজিতে ভালো করার জন্য আমি দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আমার দ্বারা ইংরেজি ভালো করা সম্ভব হবে না।

- এ তোমার সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। একটু টেকনিক্যাল হও। দেখবে ইংরেজি তোমার কাছে সবচেয়ে সহজ বিষয় হয়ে গেছে। এখন বলো, জেএসসি পরীক্ষায় ইংরেজি বিষয়ে তোমার এ+ লাগবে কী? আর মাত্র কয়েকদিন পরই তো রেজাল্ট দেবে। তুমি চাইলে আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি।

ওদিকে ছৈয়দ মিয়া নাতিকে না পেয়ে বাড়ির দিকে এগুতে লাগলেন। পুলের ওপর এসে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক একবার দেখে নিলেন। হঠাৎ পাশের রেইনট্রি গাছটির নিচ থেকে গোঙানির শব্দ শুনে হাতের টর্চলাইটের আলো সেদিক নিক্ষেপ করলেন। গাছটির নিচে কাউকে পড়ে থাকতে দেখে তিনি দৌড়ে আসেন। আদরের নাতিকে গাছের নিচে একাকী অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে ছৈয়দ মিয়া অস্থির হয়ে যান। তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। এরপর রোজনকে কাঁধে তুলে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেন।

সদস্য

জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম

\হচট্টগ্রাম

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে