• সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১১ মাঘ ১৪২৭

শেষ ইচ্ছে

শেষ ইচ্ছে

আর সাথী শুধু দুটি নাম নয়। যেন একটি পরিপূর্ণ সংসারজীবনের গল্প। সংসারজীবনে যেমন সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ত্যাগ-ভালোবাসা থাকে তেমনি তাদের সাংসারিক জীবনের প্রতিটি ধাপ তারা অতিক্রম করেছিল পরম বিশ্বাস আর গভীর ভালোবাসার অটুট বন্ধনে।

সাথী দেখতে অপরূপ সুন্দরী। হরিণীর মতো টানা টানা দুটি চোখ। মায়াবী চেহারা, জীবনও দেখতে খুব সুন্দর। দুজনকে একসঙ্গে দেখলে মনে হয় যেন সোনায় সোহাগা। দুজনেই শিক্ষিত ও বিত্তশালী। পারিবারিক সম্মতিতেই তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের দুই বছর পর তাদের ঘর আলোকিত করে এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। তার নাম চাঁদনী। চাঁদনীকে পেয়ে তারা মনে করে আকাশের চাঁদ যেন তারা হাতে পেয়েছে। চাঁদের আলো যেমন অন্ধকার রাতকে ভেদ করে কিছু আলোর সন্ধান দেয়, তেমনি চাঁদনীর আবির্ভাব তাদের জীবনে কত আশা-আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। তাকে নিয়ে তাদের কত স্বপ্ন। তাদের মেয়ে বড় হয়ে একজন নামকরা ডাক্তার হবে। মানুষের সেবা করবে। তাদের মৃতু্যর পর তাদের মেয়ে গ্রামে একটি কল্যাণ ট্রাস্ট করবে। বিনামূল্যে গরিব মানুষ ওষুধ ও চিকিৎসা পাবে, তাই বাবা-মা আদর-যত্নের পাশাপাশি ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন জ্ঞান ও দক্ষতা যাতে তার মনের মধ্যে লালন করতে পারে সে বিষয়ে তারা সবসময় সচেষ্ট থাকতেন। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি প্রকৃত মানুষ হতে হলে মানুষকে ভালো গুণাবলির অধিকারী হতে হবে। হৃদয়ের চক্ষু দিয়ে মানুষের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করতে হবে। এ শিক্ষাটুকু তাদের সন্তান যেন সারাজীবন মনে রাখতে পারে। বাবা-মা সর্বদা সন্তানের জন্য পরম করুণাময়ের কাছে এ দোয়া করতেন। দেখতে দেখতে চাঁদনী আট বছরে পদার্পণ করে। চাঁদনীর চাল-চলনে, লেখা-পড়ায় বাবা-মায়ের বুকের ভেতর এ আশার সঞ্চার হয়। তাদের সন্তান ইনশালস্নাহ সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখবে।

সাথী তার মেয়েকে কেন্দ্র করে যে স্বপ্ন দেখেছিল সেই স্বপ্ন কতটুকু সফল হবে সেই সময়টুকু সাথীর ভাগ্যে জোঠেনি। আসলে মানুষ মনের ভিতর যে স্বপ্ন দেখে আশা করে যে ফসল বোনে, অনেক সময় ভাগ্যে তা জোঠে না। অনেক সময় স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আশা আর আকাঙ্ক্ষা জীবন থেকে ম্স্নান হয়ে যায়। তবুও টিকে থাকার জন্য মানুষ নিরন্তর সংগ্রাম করে, নতুন করে স্বপ্ন দেখে আর এটাই পৃথিবীর নিয়ম।

সাথী হঠাৎ শরীরে খুব অস্বস্থিবোধ করলে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখে নিশ্চিত হোন সাথীর ক্যান্সার হয়েছে। জীবন রিপোর্ট দেখে তার মনে হয় আকাশ যেন তার মাথায় ভেঙে পড়েছে। যে সাথী তার জীবনের পরম সাথী প্রেরণার উৎস, সে যদি হারিয়ে যায় আমার জীবন থেকে, তাহলে কী হবে আমার।

কার ভালোবাসায় সিক্ত হবে আমার জীবন। কে সুখে-দুঃখে পাশে থেকে মুছে দেবে আমার চোখের জল। কার কাছ থেকে পাবো আমি এ অনুপম ভালোবাসা। কার দৃষ্টি আমার হৃৎপিন্ড ভেদ করে বুঝতে পারবে আমার বুকের ভিতর কতটুকু যন্ত্রণা। সে দুহাত তুলে বিধাতার কাছে প্রার্থনা করে, হে প্রভু সুস্থ করে দাও আমার সাথীকে। সাথী সেই বেদনাবিধূর দৃশ্যটি অবলোকন করে কাছ থেকে খুব নীরবে-নিভৃতে সে জীবনকে ইশারায় ডাকে, জীবন এদিকে এসো। আমাকে লুকিয়ে কোনো লাভ নেই, আমি সব জেনে গেছি। হে প্রিয় তুমি আমার পাশে বসো। তোমার সাথে আমার কিছু মূল্যবান কথা আছে। আমি জানি আমার জীবনপ্রদীপ যে কোনো সময় নিভে যাবে। তাই তোমার ভবিষ্যৎ ও আমার সন্তানের অনাগত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমি তোমাকে অনুরোধ করছি। তুমি আবার বিয়ে করো।

আমার হাতে যে সময়টুকু বাকি আছে, আমি দেখে যেতে চাই, সে তোমাকে কতটুকু ভালোবাসে। আমার বুকের মানিক তোমার আমার ভালোবাসার ধন, আমার চাঁদনীকে সে কতটুকু আপন করে নেয়। বাসররাতে যে সৌন্দর্য সুসময় মুগ্ধ হয়ে সংসারজীবনের যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল গভীর ভালোবাসায় পরম মমতায় আর জীবন খাতার পরিসংখ্যানটুকু আমি দেখে যেতে চাই। তা কতটুকু নির্মল আর তার ভালোবাসা কতটুকু গভীর। সেই স্বপ্নীল ইতিহাসের পাতায় যদি কোনো অসঙ্গতি বা ভুল পরিলক্ষিত হয় আমি তাকে নিজের বোন হিসেবে সাহায্য করতে চাই। আমার মৃতু্যর পর যাতে তোমার আর আমার সন্তানের কোনো অসুবিধা না হয়। আমি তার মনের গভীরে কিছু অমৃতের সুধা পান করাতে চাই। সে যদি আমাকে প্রতিশ্রম্নতি দেয় তাহলে আমি মনের ভিতর অনুপম প্রশান্তি নিয়ে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেবো। সাথীর এ সব কথা শুনে জীবনের চোখ থেকে অঝর ধারায় বৃষ্টির পানির মতো চোখের জল পড়তে থাকে। এ দৃশ্য অবলোকন করলে মনে হবে জীবনের দৃষ্টির ভেতরে যা কিছু ছিল তার সঙ্গে সবাই যেন নীরবে নিভৃতে চোখের জল ফেলছে।

জীবন সাথীকে বলছে, শোনো সাথী- আমি প্রাণপণ চেষ্টা করব, দরকার হয় আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো, তবুও আমি আমার জীবন থেকে তোমাকে হারাতে দেবো না। সাথী তুমি যদি আমার জীবন থেকে হারিযে যাও, তোমার স্থলে আমি অন্য কাউকে তোমার আসনে বসাতে পারব না। আমি প্রয়োজনে আমার সন্তানের মঙ্গলের জন্য মা-বাবার দায়িত্ব পালন করব। তোমার ভালোবাসা আর স্বপ্নের অমর্যাদা হয়, এমন কোনো হীন কাজ আমি করব না যাতে পরকালে মহান আলস্নাহর কাছে জবাবদিহি করতে হয়। জীবনের কথা শুনে সাথী তার পিতার কাছ থেকে প্রাপ্ত দশ লাখ টাকা জীবনের হাতে তুলে দিয়ে বলে আমার মৃতু্যর পর এ টাকা দিয়ে তুমি একটি কল্যাণ ট্রাস্ট করবে। গরিব-দুঃখী অসহায় মানুষের সাহায্যে যাতে এ টাকা ব্যয় হয়। আমার রেখে যাওয়া এ টাকা আমার কথামতো ব্যয় করে যদি তুমি একটি অন্ধকার ঘরে আলো জ্বালাতে পারো। আমার এ অনুদান যদি সঠিক ক্ষেত্রে ব্যয় করে তুমি অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারো তাহলে আমার আত্মা শান্তি পাবে। আমার মৃতু্যর পর আমি যদি অসহায় গরিব-দুঃখী মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হতে পারি তারা যদি আমাদের জন্য দুহাত তুলে মহান আলস্নাহর কাছে দোয়া করে এটাই হবে আমার পরম প্রাপ্তি। হে প্রিয় আমার শেষ ইচ্ছেটুকু যাতে তোমার মাধ্যমে যথাযথভাবে পালন করা হয় এই প্রত্যাশায় আমি তোমার কাছ থেকে একদিন হারিয়ে যাবো চিরদিনের জন্য। আর তখন থেকে তোমার সাথী তোমার জীবন থেকে আড়াল হয়ে যাবে। মহাকালের মহাগর্ভে। স্মৃতিটুকু যদি ধরে রাখতে পারো পবিত্র চিত্তে আমার দেওয়া প্রতিশ্রম্নতির যদি দিতে পারো যথার্থ সম্মান তাহলে বিধাতার অশেষ কৃপায় যদি পরকালে তোমার সাথে আমার দেখা হয় আমি তোমাকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাবো। একজন সৎ নির্লোভ প্রকৃত স্বামী হিসেবে।

সদস্য:জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম

দক্ষিণ সুরমা, সিলেট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে