শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
walton1

অসময়

নতুনধারা
  ০১ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
রাসেলের নামে সুমনার অভিযোগের অন্ত নেই। রাসেল অনেকটা ছন্নছাড়া স্বভাবের। সংসারের দিকে তার বিশেষ কোনো সুনজর নেই। সারাদিন নেট দুনিয়ায় পড়ে থাকার এই পুরনো স্বভাবে সুমনা খুব বিরক্ত। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে এই সংসার ছেড়ে সে চলে যাবে যেদিকে দু'চোখ যায়। কিন্তু রাসেলের মিষ্টি মুখটার দিকে তাকালে তার সব অভিমান ম্স্নান হতে সময় লাগে না। রাসেল কি আর স্ত্রীর সেই মর্ম বোঝে! সে তো সারাদিন ফেসবুকে পড়ে থাকে। একটা ছবি পোস্ট করলেই শত শত লাইক-কমেন্টের বন্যা বয়ে যায়। ফলোয়ারেরা তার চেহারার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে মন্তব্য করে থাকে। কে কোন কমেন্টে কি লিখেছে এবং কয়টা লাইক পড়েছে, কিছুক্ষণ পর পর এগুলো গণনা করতে আলসেমি আসে না রাসেলের। সারাক্ষণ এই ডিউটি পালন করে বলে স্ত্রী সুমনার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্বের অভাব রাসেলের মধ্যে। তাছাড়া আজকাল ফেসবুক লাইভে যখন-তখন যুক্ত হয়ে যাওয়াটাও রাসেলের নতুন একটা অভ্যাসে দাঁড়ায়। শত শত ফলোয়ার তার লাইভ শোতে জয়েন করে, বিষয়টা রাসেলের জন্য যথেষ্ট বিনোদনের হলেও সুমনার জন্য বিরক্তের। ইতোমধ্যে নেটের এই অভিনব রীতিগুলো সুমনার সঙ্গে যেন রাসেলের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে দিচ্ছে। স্ত্রীর প্রতি রাসেল তার ব্যক্তিগত দায় দায়িত্ব পালন না করে সারাক্ষণ ফেসবুকের ভার্চুয়াল জগতের ওইসব অচেনা-অজানা মানুষের সঙ্গে কাল্পনিক সম্পর্কের আদান-প্রদান করে। অথচ ঘরে সুমনার মতো সুন্দরী একজন স্ত্রী থাকার পরও ভালোবাসার দৃষ্টিকোণ নেই তার। এই নিয়ে দু'জনের প্রায়ই বাগবিতন্ডা হলে রাসেল রাগের চোটে বলে ফেলে, 'ফেসবুকে আমার হাজার হাজার ফলোয়ার। আমি কোনো কিছু পোস্ট করলে তারা দারুণ সাড়া দেয়। এর চেয়ে আর কি আছে ভালোবাসা!' অভিমানী সুমনাও তখন রেগে বলে, 'ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাক। আমাকে সময় দেওয়ার দরকার নেই। মনে রেখ, এসব ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড জীবনে কোনো উপকারে আসবে না।' রাসেল সুমনার এই অভিযোগ পরোয়া না করে পরের লাইভের জন্য প্রস্তুতি নেয়। ফলে রাগ করে বাবার বাসা মিরপুরে চলে আসে সুমনা। রাসেল হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। গতকাল রাস্তা পার হতেই বেপরোয়া প্রাইভেটকার তাকে ধাক্কা মারে?ডান পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। ডাক্তার সাজ্জাদের ট্রিটমেন্ট নিয়ে হাসপাতালের ৩০৬ নাম্বার কেবিনে শুয়েও ফেসবুকে বিনোদনের লোভে মত্ত রাসেল। একটা স্ট্যাটাস দিয়ে রাসেল লিখে, 'প্রাইম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছি, তোমরা কেউ আমাকে দেখতে আসবে না বন্ধু?' স্ট্যাটাস দেওয়ার আধা ঘণ্টা পরও আশানুরূপ মন্তব্য আসে না। কার হাতে এত অফুরান সময় আছে যে, ফেসবুকের স্ট্যাটাস দেখে সব ছেড়েছুড়ে রাসেলকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে আসবে। রাসেল ফেসবুকের অনেককে শুভাকাঙ্ক্ষী ভাবে। সেসব তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষীকে ফেসবুকে একটিভ দেখা যাচ্ছে, অথচ রাসেল কেন হাসপাতালে এসেছে, কেউ জানতে চাচ্ছে না। মনে মনে বিরক্ত হয় রাসেল। বিকালে নীল শাড়ি পরা অপূর্ব এক রূপবতী নারী আসে হাসপাতালের ৩০৬ নাম্বার কেবিনে। রাসেল তাকিয়ে দেখে সেই নারী আর কেউ নয়, সুমনা। স্ত্রীর দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে রাসেল। সুমনার হাতে একটি শিউলি মালা। হেমন্তের এই পড়ন্ত বিকালে সে রাসেলের জন্য শিউলি ফুলের মালা গেঁথে এনেছে। ভীষণ তরল গলায় সুমনা বলল, 'আমার বান্ধবী তানিয়া ফেসবুকে তোমার স্ট্যাটাস পড়ে আমাকে ফোন করেছে। আমি ব্যাকুল হয়ে ছুটে আসার সময় দেখি আমাদের বাসার নিচে যে শিউলি গাছটি, তার তলায় এই হেমন্তে ঝরা শিউলি পড়ে আছে। তাই ভাবলাম তোমার জন্য একটা শিউলি মালা গেঁথে আনি। এই নাও।' রাসেলের চোখে পানি চলে আসে। এই ধরনের গভীর ভালোবাসা সে জীবনে কম পেয়েছে। সারা জীবন যাদের নিঃস্বার্থভাবে উপকার করে গেছে, জীবনের দুর্দিনে তাদের কোনো খবর নেই। ফেসবুকেও অনেক মানুষের উপকার করেছে। কিন্তু কেউ সেটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে না। রাত বাড়ছে। হাসপাতালের জানালা ধরে সুমনা আর রাসেল রাতের আকাশ দেখছে। হেমন্তের আকাশে জ্বলজ্বল করছে রাতের নক্ষত্র। কোথা থেকে ছাতিম ফুলের সুঘ্রাণ এসে নাকে লাগে রাসেলের। রাসেলের ইচ্ছে করছে সমুনাকে একগুচ্ছ ছাতিম ফুল দিয়ে পরম ভালোবাসায় বুকে আগলে নিতে। \হম জোবায়ের রাজু
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে