শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
walton1

হেমন্তে দেশ হাসে

বারী সুমন
  ২৮ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
'বাড়ি আইলে ইষ্টি কুটুম ওইনা ধানের চিঁড়া কুটুমরে/ পিঠা পায়েস বানাইয়া খামু পাড়াপড়শি লইয়া/ ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া ও ধান ভানিরে। ও ধান ভানিরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া/ ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া ও ধান ভানিরে' এমনি সংগীত শিল্পীর গানের মতো, চিত্রশিল্পীর কল্পনার রংতুলিতে আঁকা বাংলার হেমন্তের এক প্রতিচ্ছবি। কার্তিক-অগ্রহায়ণ এই দুই মাস নিয়ে ঋতুচক্রে আবর্তিত হয় হেমন্তকাল। কার্তিকের শেষে অল্প অল্প শীতে কুয়াশায় যখন সবকিছু ধোঁয়াশার মতো মনে হয়, তখন ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই ছোট্ট বেলায়। হেমন্ত মানেই নতুন প্রাণের স্পন্দন, নতুন আমেজ। হেমন্ত ছাড়া এই আমেজ যেন উপলব্ধি করাই যায় না। কার্তিকের শুরু থেকেই হালকা ঝিরঝিরে বাতাস জানিয়ে দেয় হেমন্তের সূচনা। বেলা ছোট হয়ে আসে। কর্মব্যস্ততা শেষ করার আগেই পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে সূর্য দিনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অস্ত যায়। হিম হিম ঝিরঝিরে শুষ্ক বাতাস শরীরকে আরও শুষ্ক করে তুলে। ত্বক খসখসে হয়ে যায়। পথঘাট আবার ধুলোয় ভরতে থাকে। হেমন্ত মানেই নতুন ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা। হেমন্ত মানেই কিষান-কিষানির ব্যস্ততা। কার্তিকের শেষ দিকে মাঠে মাঠে সোনালি ধান দেখা যায়। পাকতে শুরু করে কৃষকের মাঠের ধান। কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক দেখা যায়। ধান কাটার উপকরণগুলো ধীরে ধীরে প্রস্তুত করতে থাকে। পুরোপুরি ধান পেকে যাওয়ার পর দল বেঁধে মাঠে যায় কৃষকরা। সকালের সূর্য উঠার আগেই কাস্তে হাতে নিয়ে মাঠে চলে যায় কৃষকরা। সকালের খাবার হিসেবে পান্তা ভাত পৌঁছে দেয় কিষান বৌ। বাড়িতে ফুরসত নেই কিষান বৌদেরও। তারাও ধান গোছাতে ব্যস্ত। ধান মাড়াই করা। ঝাড়া মোছা, ধান সেদ্ধ করা, রোদে শুকানো। সব মিলিয়ে খুবই ব্যস্ত সময় পার করে তারা। সেই ধান তুলতে আশপাশের সবাই পাশাপাশি কাজ করে। সে কাজের ফাঁকে কত আনন্দ বেদনার গল্প লুকিয়ে থাকে। কত হাসি কান্নার গল্প জড়িয়ে থাকে তাতে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করার মতো নয়। শীতের দিন রোদ তেমন থাকে না। যতটুকু রোদ পাওয়া যায় তাতেই শুকাতে হয় স্বপ্নের ধান। বহুল আকাঙ্ক্ষিত সে ধান। সে ধানে কত স্বপ্ন জমা থাকে। অনেক ব্যস্ততায় বেশ কিছুদিনের কষ্টের পরে সে ধান ঘরে তুলে। ধান ঘরে তোলার পর শুরু হয় ঘরে ঘরে পিঠা পায়েসের আয়োজন। বাংলার ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব জমে উঠে নতুন করে নতুন রূপে। কিষানের বৌ'রা মনের আনন্দ নিয়ে বানায় নানান রকম পিঠাপুলি। কত রকমের পিঠা যে তৈরি করে তা বলে শেষ করা যাবে না। এ বাড়ি ও বাড়ি বিলায় পিঠা। এ সময় জামাইরা বেড়াতে আসে শ্বশুর বাড়িতে। মেয়ের বাড়িতে পিঠা পায়েস পাঠায় বাবার বাড়ি থেকে। প্রতিবেশীদের নিয়ে তৃপ্তি সহকারে খায় পিঠা পায়েস। সারা বছর অল্প অল্প করে স্বপ্ন জমায় হেমন্তে ধান কাটার পর ধান বিক্রি করে কাপড়-চোপড়, ঘর-গৃহস্থালির টুকিটাকি জিনিস ক্রয় করবে। সাধ্য অনুযায়ী ক্রয়ও করে। সারা বছর বেড়ানোর ফুরসত না পেলেও হেমন্তে নতুন ধান ঘরে তোলার পর নতুন ধানের পিঠা পায়েস বানিয়ে বেড়ানোর ধুম পড়ে গ্রামে। পলস্নীর চিরায়ত রূপে ভরে উঠে বাংলার প্রতিটি ঘর। প্রতিটি ঘরে লেগে থাকে কিষান-কিষানির হাসি। হেমন্তের নবান্নের হাসিতে হেসে উঠে পুরো বাংলা।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে