আদালতে হয়রানি এড়াতে জানতে হবে

আইনজীবী সম্পর্কে যেসব সতর্কতা জরুরি

বাংলাদেশের বিচারপ্রার্থীদের কাছে মামলা-মকদ্দমা যেন ভোগান্তি আর দুর্ভোগের অপর নাম। একান্ত বাধ্য না হলে শান্তিপ্রিয় কোনো মানুষ এখানে মামলা-মকদ্দমায় জড়াতে চান না। আদালত প্রসঙ্গে একটা কথা জনসাধারণ্যে খুব প্রচলিত- কোর্টের ইটও টাকা চায়। বাস্তবতা আরও নির্মম। টাকা-পয়সা খরচ করে সর্বস্বান্ত হয়েও অনেক ক্ষেত্রে ফলাফল পান না বিচারপ্রার্থীরা। বিচারপ্রার্থী মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল আদালতকে জনবান্ধব হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করতে পারার ব্যর্থতার পেছনে রাষ্ট্রের পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব পক্ষেরই কমবেশি দায় আছে। আদালতে বিচারপ্রার্থীরা হয়রানির শিকার হন যতগুলো কারণে তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো- বিচারপ্রার্থীদের অজ্ঞতা ও অসতর্কতা। বিচারপ্রার্থীদের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে অসাধু মহল পদে পদে তাদের বস্ন্যাকমেইল করে থাকে। আদালতের ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা কোন কোন সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেন, আমরা কয়েকটি পর্বে সে-বিষয়গুলে নিয়ে আলোচনা করব।
আইনজীবী সম্পর্কে যেসব সতর্কতা জরুরি

১. ক্লিন ইমেজের আইনজীবী নির্বাচন করুন

এমন আইনজীবী নির্বাচন করুন, আদালতপাড়ায় যিনি ক্লিন ইমেজের অধিকারী হিসেবে সমাদৃত- যিনি অহেতুক মামলা প্রলম্বন করেন না, মক্কেলের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন, নানা বাহানায় টাকা দাবি করেন না এবং অসত্য তথ্য দিয়ে দিনের পর দিন আদালতে টাইম পিটিশন দাখিল করেন না।

মনে রাখবেন, অতি উচ্চমানের আইনজীবী হলেই যে তিনি সবসময় ক্লিন ইমেজের অধিকারী হবেন, তা নয়- মধ্যম মানের আইনজীবী কিংবা ৪-৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া নবীন আইনজীবীদের মধ্যেও চমৎকার প্রতিশ্রম্নতিশীল আইনজীবী আছেন।

আইনজীবী নির্বাচনে মোহরার বা দালালদের মতামতের ওপর নির্ভর করবেন না। আদালতপাড়ার বিচারপ্রার্থী বা আপনার পরিচিতজনদের মতামত নিতে পারেন। প্রয়োজনে যে আদালতে মামলা করবেন, সেই আদালতে কয়েকদিন সরাসরি এসে আইনজীবীদের সাবমিশন, হেয়ারিং ও ক্লায়েন্ট ডিলিং সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন।

২. মামলার প্রকৃতি অনুসারে সঠিক আইনজীবী নিয়োগ করুন

মামলা-মকদ্দমায় ভোগান্তি বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ হলো- সঠিক মামলার জন্য সঠিক আইনজীবী নির্বাচন করতে ব্যর্থ হওয়া। আইনজীবী মানেই যে কোনো ধরনের মামলা পরিচালনায় তার পারদর্শিতা থাকবে- বিষয়টি এমন নয়।

আদালতগুলোতে যত ধরনের মামলা হয় সেগুলোকে মোটাদাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- দেওয়ানি প্রকৃতির মামলা ও ফৌজদারি প্রকৃতির মামলা।

সম্পত্তি তথা জমিজমা এবং পদ-পদবির অধিকার কেন্দ্র করে যেসব মামলা-মকদ্দমা হয় সেসব মামলাকে দেওয়ানি প্রকৃতির মামলা বলে। যেমন সম্পত্তির বাটোয়ারা মামলা, বেদখল হয়ে যাওয়া জমির দখল উদ্ধারের মামলা, রেকর্ড সংশোধনের মামলা, স্কুলের কমিটি নিয়ে মামলা, দলিল সংশোধনের মামলা, দলিল বাতিলের মামলা ইত্যাদি।

অন্যদিকে অপরাধ সংঘটিত হলে সেই অপরাধের শাস্তি বিধানের জন্য যেসব মামলা করা হয় সেগুলোর নাম ফৌজদারি মামলা। যেমন মারামারির মামলা, চুরির মামলা, মাদকের মামলা, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা, চেকের মামলা ইত্যাদি। আপনার মামলাটি দেওয়ানি প্রকৃতির মামলা হলে এমন আইনজীবী নিয়োগ করুন যিনি দেওয়ানি মামলা পরিচালনায় অভিজ্ঞ। অন্যদিকে আপনার মামলাটি ফৌজদারি প্রকৃতির হলে ফৌজদারি মামলা পরিচালনায় অভিজ্ঞ কোনো আইনজীবীকে নিয়োগ করুন।

৩. আইনজীবীর সঙ্গে কিছু বিষয় শুরুতেই

আলোচনা করে নিন

মামলার শুরুতেই আপনার আইনজীবীকে বলে নিন, মামলার আইনানুগ খরচ ও আইনজীবীর যুক্তিসঙ্গত ফি দেবেন আপনি। বিচারক বা কোর্ট স্টাফকে ম্যানেজ করতে কোনো পয়সা দিতে পারবেন না- এটা পরিষ্কার করে নিন। মামলার কোন পর্যায়ে কত টাকা আইনজীবীর ফি-বাবদ পরিশোধ করতে হবে, সে সম্পর্কে তার কাছ থেকে সুস্পষ্ট ধারণা নিন।

৪. আরজি-জবাব দাখিলের আগে অন্য

আইনজীবীকে দিয়ে যাচাই করে নিন

দেওয়ানি মামলার আরজি-জবাব প্রস্তুতের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় কোনো কোনো আইনজীবী দায়সারা গোছের আরজি-জবাব প্রস্তুত করে আদালতে দাখিল করেন এবং পরিকল্পনা রাখেন, প্রয়োজনে পরে কয়েক দফা আরজি-জবাব সংশোধন করবেন। এরকম অবস্থায় আপনার মামলা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আরজি-জবাব দাখিলের আগে সেটির কপি অন্য এক বা একাধিক আইনজীবী দিয়ে যাচাই করে নিন। আরজি-জবাব প্রস্তুতের সময় আপনার আইনজীবীকে আপনার মামলার পূর্ণাঙ্গ ঘটনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিন।

৫. আইনজীবীকে কাগজপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা

আইনজীবীকে মামলার স্বার্থে আপনার মূল্যবান কাগজপত্র দিতে হলে তার কাছ থেকে লিখিত প্রাপ্তি স্বীকারপত্র গ্রহণ করুন। একই সঙ্গে সেগুলোর ফটোকপি নিজের কাছে সংরক্ষণ করুন।

৬. আপনি বিবাদী হলে জবাব দাখিল

হয়েছে কিনা নিশ্চিত করুন

আপনি কোনো দেওয়ানি প্রকৃতির মামলার বিবাদী হয়ে থাকলে নিশ্চিত করুন যে, আপনার আইনজীবী আপনার পক্ষে মামলায় জবাব দাখিল করেছেন কিনা। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো আইনজীবী জবাব দাখিল না করে অন্য বিবাদীদের জবাব দাখিলের জন্য অপেক্ষা করেন। এতে মামলা অহেতুক বিলম্বিত হয়।

৭. আইনজীবীকে অপেশাদার মনে

হলে পরিবর্তন করুন

আইনজীবী মামলা গ্রহণের আগে সদাচরণ আর পরে উল্টো আচরণ করলে কিংবা কাগজপত্র গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা অপেশাদার যে কোনো আচরণ করলে আইনজীবী পরিবর্তন করুন। এক আইনজীবীর কাছে কোনোভাবেই নিজেকে জিম্মি করবেন না।

৮. আইনজীবী প্রতারণা করলে

আইনজীবী আপনার সঙ্গে প্রতারণা করলে বা অপেশাদার আচরণ করলে তার ব্যাপারে স্থানীয় আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করুন। অভিযোগ ডাকযোগেও প্রেরণ করতে পারেন। আপনার অভিযোগের প্রেক্ষিতে বার কাউন্সিল তদন্ত করবে এবং অভিযোগ সত্য প্রমাণ হলে আইনজীবীর সনদ বাতিল হওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি হতে পারে।

৯. মোহরারের কাছে মামলা দেবেন না

যাকে মামলা দিচ্ছেন, সে মোহরার নাকি আইনজীবী সেটা নিশ্চিত হয়ে নিন। মোহরাররা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দেয়। মোহরারকে মামলা দিলেন তো পস্তালেন। এরা আপনার মামলায় একেক তারিখে একেক আইনজীবী নিযুক্ত করে মামলার বারোটা বাজিয়ে দেবে। মোহরারের নিযুক্ত কোনো আইনজীবীই আপনার মামলাটি নিজের মনে করে সঠিক কাজটি করবেন না; দায় সারবেন কেবল। মোহরাররা নানা অছিলায় টাকা-পয়সা নিয়ে আপনার সঙ্গে ছঁ্যাচড়ামি করবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে