নজরুল ইসলাম পথিকৃৎ এক আইনজীবী

নজরুল ইসলাম পথিকৃৎ এক আইনজীবী

ইভা সুনন্দা চৌধুরী তার বিয়ে বাতিল ঘোষণার জন্য স্বামীর বিরুদ্ধে ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯-এর অধীনে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। বিজ্ঞ জেলা জজ আদালত বিয়ে বাতিল ঘোষণা পূর্বক ডিক্রি কনফারমেশনের জন্য হাইকোর্টে ডিভিশনে ফাইল প্রেরণ করেন। হাইকোর্ট ডিভিশন এই খ্রিষ্টান দম্পতির ডিভোর্স কার্যকর পূর্বক নিজ থেকে রাষ্ট্রকে নির্দেশনা প্রদান করে বলেন, রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য যেন ইউনিফাইড ম্যারিজ অ্যান্ড ডিভোর্স অ্যাক্ট প্রণয়ন করে।

যেহেতু ইসলামী শরিয়া আইনে (কোরআন ও হাদিসে) মুসলমানদের বিয়ে ও তালাকের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। সুতরাং হাইকোর্ট ডিভিশন এ ধরনের কোনো নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন না এবং এটা করা হলে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে মর্মে উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে থার্ড পার্টি হিসেবে ইসলামিক ল' রিসার্চ সেন্টার ও লিগ্যাল এইড বাংলাদেশ মহামান্য আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করেন। আপিলকারীর পক্ষে আইনজীবী হিসেবে সিনিয়র অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলামের সাবমিশন শুনে আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা বাতিল ঘোষণা করেন [২৩ বিএলডি (এডি) ২১]।

আরেকবার হাইকোর্ট ডিভিশন যখন দেশে ফতোয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন তখন এই রায় চ্যালেঞ্জ করে এই নজরুল ইসলাম স্যার মোহাম্মদ তাইয়্যব সাহেবকে পিটিশনার করে থার্ড পার্টি আপিল দায়ের করেন। একই বিষয়ে আরেকটি আপিল দায়ের করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। দুটো আপিলই একসঙ্গে শুনানি হয় এবং হাইকোর্ট বিভাগের রায় বাতিল ঘোষণা করা হয় [২৩ বিএলটি (এডি) ১০, ১২ এডিসি ০১]।

আইনের ছাত্ররা সংক্ষেপে হেফজুর রহমান কেস বললে চিনে যায় এটা কোন বিষয়ক কেস। মুসলিম নারীদের তালাকের পরে তার ভরণপোষণ কি ইদ্দতকালের তিন মাস পাবেন? না সংশ্লিষ্ট তালাকপ্রাপ্ত নারী পুনরায় বিয়ে বা মৃতু্য না হওয়া পর্যন্ত পাবেন? এ নিয়ে হাইকোর্ট ডিভিশন হেফজুর রহমান মামলায় সুরা বাকারার ২৪১নং আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়ে সুয়োমোটু বলেন, তালাকপ্রাপ্ত নারী পুনরায় বিয়ে বা মৃতু্য না হওয়া পর্যন্ত আগের স্বামীর থেকে ভরণপোষণ পাবেন [১৫ বিএলডি ৩৪]।

হেফজুর রহমান উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করেন এবং আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের এই রায় বাতিল পূর্বক একটি বিশদ রায় প্রদান করেন [৫১ ডিএলআর (এডি)১৯২]। নজরুল ইসলাম স্যার এই মামলায়ও ইন্টারভেনার হিসেবে ইসলামিক ল' রিসার্চ সেন্টার ও লিগ্যাল এইড বাংলাদেশের পক্ষে পার্টি হন এবং হাইকোর্টের রায়ের অসঙ্গতি তুলে ধরে সাবমিশন রাখেন। পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল নজরুল ইসলাম স্যারের ইসলামিক পান্ডিত্য দেখে সিনিয়র অ্যাডভোকেটের মর্যাদা প্রদান করেন।

ইসলামী আইনের গবেষণা নিয়ে এই মহাপ্রাণ মানুষটি সবসময় ধ্যানমগ্ন থাকতেন এবং তার ব্রেন চাইল্ড হলো ইসলামিক ল' রিসার্চ সেন্টার ও লিগ্যাল এইড বাংলাদেশ। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে জাতীয় মানের গবেষণা পত্রিকা 'ইসলামী আইন ও বিচার' তিনি বের করতেন। যেখানে আন্তর্জাতিক ও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপকরা লিখে যাচ্ছেন। আমাদের উৎসাহ দিতেন কীভাবে ইসলামী আইনের অপব্যাখ্যা রোধ করা যায় এবং মানুষের মধ্যে ইসলামী আইনের সহজ ব্যাখ্যা তুলে ধরা যায়।

যাকে নিয়ে এত কথা বললাম সেই সিনিয়র অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম স্যার লিভার সিরোসিস ও করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৫ জুলাই ইন্তেকাল করেছেন। স্যারের জন্য সবার নিকট দোয়া চাই, আলস্নাহ যেন নজরুল স্যারকে ক্ষমা করে তার মহান কর্মের প্রতিফল দান করেন।

লেখক, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে