স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে তালাক প্রদানের আইনি প্রক্রিয়া ও প্রচলিত ভুল ধারণা

যে পক্ষ থেকেই তালাকের নোটিশ দেওয়া হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান বা মেয়র নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষের মনোনীত প্রতিনিধি নিয়ে সালিশি পরিষদ গঠনের জন্য প্রতিনিধির নাম চেয়ে উভয়ের কাছে লিখিত চিঠি পাঠিয়ে থাকেন। প্রথম নোটিশে কোনো পক্ষ হাজির না হলে পরবর্তী দুই মাসে আরও দুটি নোটিশ পাঠিয়ে থাকেন। সমঝোতার চেষ্টা সফলও হতে পারে, ব্যর্থও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সালিশি পরিষদের কাজ হলো আপসের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, না সফল হয়েছে, তা তাদের রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা। তবে চেয়ারম্যান বা মেয়র মহোদয় আপনাদের কাছে চিঠি পাঠাতে কিংবা সালিশি পরিষদ গঠনে বাধ্য নয়। কারণ, আইনে তাদের এ বিষয়ে বাধ্য করা হয়নি
স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে তালাক প্রদানের আইনি প্রক্রিয়া ও প্রচলিত ভুল ধারণা

তালাকের কয়টি নোটিশ পাঠাতে হয়- একটি, দু'টি না তিনটি- তা নিয়ে আমাদের সমাজে বেশ ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে বলে থাকে তিন মাসে তিনটি নোটিশ পাঠাতে হয়। প্রকৃতপক্ষে তালাকের একটি নোটিশ একবারই পাঠাতে হয়। আর এই নোটিশ কীভাবে পাঠাবেন, পাঠানোর নিয়মাবলি কী, যথাযথ নিয়ম মেনে না পাঠালে আইনে কি শাস্তির বিধান রয়েছে- এসব বিষয়ে আইনি আলোচনা জানুন:

যে কোনো যুক্তিসংগত কারণে মুসলিম স্বামী বা স্ত্রী একে অপরকে তালাক প্রদান করতে পারেন। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(১) ধারা অনুযায়ী, আপনি তালাক দিতে চাইলে, তালাকের নোটিশ নিজেই তৈরি করে কিংবা কারো মাধ্যমে তৈরি করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাকে তালাক দিচ্ছেন, তিনি যদি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় বসবাস করেন, তাহলে সেই ইউপি চেয়ারম্যানকে ওই তালাকের নোটিশ দিতে হবে। আর তিনি যদি পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবাস করেন তাহলে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে লিখিত নোটিশ পাঠাতে হবে। ওই একই নোটিশের একটি কপি যাকে তালাক দিচ্ছেন অর্থাৎ তালাক গ্রহীতাকে পাঠাতে হবে। আর মনে রাখবেন তালাকের নোটিশে দু'জন উপযুক্ত সাক্ষীর কলাম রাখবেন এবং তাদের স্বাক্ষর নেবেন। অনেকেই মনে করেন তালাকের নোটিশ কাজির মাধ্যমে না পাঠালে তা কার্যকর হয় না। এটি ভুল ধারণা। তালাকের নোটিশ স্বামী বা স্ত্রী যিনি তালাক দেবেন, তিনি নিজে নিজেই কিংবা কারো মাধ্যমে লিখিত আকারে পাঠিয়ে দিলেই হবে।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে তালাকের নোটিশ পাঠাতে কাজীর কাছে যেতে হবে- এমন কোনো কথা লেখা নেই। এখন জানার দরকার, আপনি নোটিশটি কীভাবে চেয়ারম্যান মহোদয় ও তালাক গ্রহীতার কাছে পাঠাবেন। আপনি দুটি উপায়ে স্ব-স্ব ব্যক্তির কাছে তালাকের নোটিশ পাঠাতে পারেন।

১। সরাসরি তালাকের নোটিশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিয়ে রিসিভ কপিতে স্বাক্ষর করিয়ে নিতে পারেন। ২। সরকারি ডাকযোগে অর্থাৎ পোস্ট অফিসের মাধ্যমে প্রাপ্তি স্বীকারসহ রেজিস্ট্রি করে চিঠি সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় পাঠাতে পারেন। এতে সুবিধা বেশি এবং আইনি জটিলতা কম। কারণ সংশ্লিষ্ট ঠিকানার ব্যক্তিদ্বয় চিঠি গ্রহণের পর প্রাপ্তি স্বীকার ডকুমেন্টস আপনার কাছে ফিরে আসে।

অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন, তালাকের নোটিশ গ্রহণ না করলে তালাক কার্যকর হবে কিনা। আপনি এই নিয়মে তালাকের নোটিশ পাঠালে তালাক গ্রহীতা নোটিশ গ্রহণ না করলে কেন গ্রহণ করেননি তা পোস্ট অফিসের মন্তব্য সংবলিত নোটিশটি আপনার কাছে ফেরত আসবে। চিঠির খামের উপর লেখা থাকে 'প্রাপক চিঠি গ্রহণ না করায় ফেরত' অথবা 'গ্রহণে অস্বীকৃতি' অথবা 'খুঁজে পাওয়া গেল না' ইত্যাদি। যেদিন চিঠিখানা আপনার কাছে ফিরে আসবে, সেদিন থেকে ৯০ দিন পার হয়ে গেলে তালাক আপনা আপনিই কার্যকর হয়ে যাবে। অনেকে নোটিশ গ্রহণ না করে মিথ্যা বলে থাকে যে তালাকের নোটিশ পায়নি। তারা নিছক বোকার মতো কাজ করে থাকে।

যে পক্ষ থেকেই তালাকের নোটিশ দেওয়া হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান বা মেয়র নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষের মনোনীত প্রতিনিধি নিয়ে সালিসি পরিষদ গঠনের জন্য প্রতিনিধির নাম চেয়ে উভয়ের কাছে লিখিত চিঠি পাঠিয়ে থাকেন। প্রথম নোটিশে কোনো পক্ষ হাজির না হলে পরবর্তী দুই মাসে আরও দুটি নোটিশ পাঠিয়ে থাকেন। সমঝোতার চেষ্টা সফলও হতে পারে, ব্যর্থও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সালিশি পরিষদের কাজ হলো আপসের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, না সফল হয়েছে, তা তাদের রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা। তবে চেয়ারম্যান বা মেয়র মহোদয় আপনাদের কাছে চিঠি পাঠাতে কিংবা সালিশি পরিষদ গঠনে বাধ্য নয়। কারণ, আইনে তাদের এ বিষয়ে বাধ্য করা হয়নি। সে কারণ দেখা যায়, চেয়ারম্যান বা মেয়র মহোদয় তালাকের নোটিশ প্রাপ্তির পর কোনো সালিশি পরিষদ গঠন কিংবা কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। ফলে নোটিশ প্রাপ্তির ৯০ দিন পার হলেই তালাক আপনা আপনিই কার্যকর হয়ে যায়। তবে স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে গর্ভকাল শেষ হওয়ার পর তালাক কার্যকর হবে।

এরপর রয়েছে তালাক রেজিস্ট্রি বিষয়। যিনি তালাক দিয়েছেন, তিনি ৯০ দিন পর তালাকের নোটিশ, নোটিশ পাঠানোর ডাক রশিদ, প্রাপ্তি স্বীকার পত্র, আর যদি নোটিশ গ্রহণ না করে সেক্ষেত্রে ফেরত সংবলিত নোটিশ এগুলো সংগ্রহ করে আপনার এলাকার কাজী অফিসে যাবেন তালাকটি নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন করতে। মুসলিম বিবাহ ও তালাক বিধিমালা ২০০৯-এর ২১ বিধি অনুযায়ী তালাক নিবন্ধনের জন্য ৫০০ টাকা ফি গ্রহণ করতে পারবেন তালাক রেজিস্ট্রার। নকল প্রাপ্তি ফি বাবদ নেবেন মাত্র ৫০ টাকা। বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার কাজী যদি আপনার বাড়িতে গিয়ে তালাক রেজিস্ট্রি করেন, তাহলে যাতায়াত বাবদ প্রতি কিলোমিটার ফি নেবেন ১০ টাকা আর পরবর্তীতে তালাক রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত সার্টিফাই কপি নিতে গেলে তলস্নাশি ফি বাবদ নেবেন মাত্র ১০ টাকা।

কোনো কারণে কাজী মহোদয় তালাক নিবন্ধন অস্বীকার করলে অস্বীকারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা রেজিস্ট্রার অফিসারের কাছে আপিল করার বিধান আছে। তবে আনন্দের সংবাদ এই যে, বিয়ে রেজিস্ট্রি না করলে যেমন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে, এক্ষেত্রে তালাক রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক কিংবা শাস্তির কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। কাজেই নিয়ম মেনে তালাকের নোটিশ পাঠানো ও ওই ডকুমেন্টসগুলো সংগ্রহে রাখলেই তালাক কার্যকরে আইনত কোনো বাধা নেই।

আবার ১৯৬১ এর ৭(১) নং ধারার বিধান অনুযায়ী তালাকদাতা যদি চেয়ারম্যান ও তালাক গ্রহীতাকে তালাকের নোটিশ প্রদান না করে তাহলে ৭ (২) ধারা অনুযায়ী তালাকদাতা শাস্তি পাবে ঠিকই, কিন্তু তালাক বাতিল হবে না। ওই তালাক কার্যকর হবে।

আরেকটি বিষয় আপনাদের জানিয়ে রাখি, নোটিশ পাঠালেই কিন্তু তালাক কার্যকর হয়ে যায় না। নোটিশ পাঠানোর পরে ৯০ দিন পার হওয়ার আগেই যদি আপনাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির অবসান হয়, তাহলে আপনি একই নিয়ম অনুসরণ করে তালাক প্রত্যাহার করে নিতে পারেন এবং একই স্ত্রীর সঙ্গে হিলস্না বিয়ে বাদেই ঘর-সংসার করতে পারেন, এতে আইন ও ধর্মের কোথাও বাধা নেই। আর যদি ৯০ দিন অতিক্রান্ত এমনকি কয়েক বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও আপস হয়ে যায়, তাতেও একই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘর-সংসারে আইন ও ধর্মের কোথাও বাধা নেই। এক্ষেত্রে শুধু ব্যতিক্রম রয়েছে যে, পুনরায় বিয়ে করে নিতে হবে।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইনগবেষক।

ইমেইল: ংবৎধল.ঢ়ৎধসধহরশ@মসধরষ.পড়স,

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

ক্যাম্পাস
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
হাট্টি মা টিম টিম
কৃষি ও সম্ভাবনা
রঙ বেরঙ

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে