ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা

উপমহাদেশের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দেওয়ানি মোকদ্দমা

হাইকোর্টে শুনানি হয় ১৬৪ দিন। তিনজন বিচারক ছিলেন। ঔঁংঃরপব ঈড়ংঃবষষড়, ঔঁংঃরপব ইরংধিং এবং ঔঁংঃরপব খড়ফমব. এর মধ্যে একজন ( ঈড়ংঃবষষড় ঔ) ছুটিতে ইংল্যান্ড গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে আটকা পড়েন। তিনি ইংল্যান্ডে বসেই রায় লেখেন। তিনজন বিচারকের দুইজন সন্ন্যাসীর পক্ষে রায় দেন। একজন বিপক্ষে রায় দেন (খড়ফমব ঔ)। তার যুক্তি ছিল, সন্ন্যাসী রাজা নিজেকে রাজকুমার প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বাকি দুইজন বিচারক ট্রায়াল কোর্টের বিচারে অসংগতি খুঁজে পাননি। হাইকোর্টেও সন্ন্যাসী রাজা জিতে যান। এই মামলার রায় দেওয়ার কিছুদিন পরেই ট্রায়াল কোর্টের জজ স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যান
উপমহাদেশের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দেওয়ানি মোকদ্দমা

দুনিয়াজুড়ে সেনসেশনাল মামলা হিসেবে যেগুলো আলোচিত হয় তার বেশির ভাগই ক্রিমিনাল মামলা। কিন্তু আমাদের এই অঞ্চলের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর মামলাটি একটি সিভিল মামলা। টাইটেল সু্যট বা সু্যট ফর ডিক্লারেশন।

ঢাকার সাব-ডিস্ট্রিক্ট জজ কোর্টের ১৯৩০ সালের ৭০নং টাইটেল সু্যট। পরবর্তী সময়ে অন্য কোর্টে ট্রান্সফার হলে মামলার নম্বর হয় টাইটেল সু্যট ৩৫/১৯৩৫। মামলাটি ঞযব অষষ ওহফরধহ জবঢ়ড়ৎঃবৎ-এ রিপোর্টে রিপোর্টেড আছে, সাইটেশন অওজ-১৯৪২ ঈধষ ৪৯৮।

মামলার নাম ঝস. ইরনযধনধঃর উবার াং কঁসধৎ জধসবহফৎধ ঘধৎধুধহ জড়ু- ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা বা ভাওয়াল এস্টেট মামলা নামে এটি বেশি পরিচিত। এই মামলার কাহিনী অবলম্বনে দুইটা সিনেমা নির্মিত হয়েছে। একটিতে অভিনয়

করেছেন উত্তম কুমার।

মামলার ফ্যাক্টের সঙ্গে আমরা মোটামুটি সবাই পরিচিত। ভাওয়াল এস্টেটের মেঝো রাজকুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় ১৯০৮ সালের এপ্রিলে দার্জিলিং বেড়াতে যান। সেখানে মে মাসের ৬/৭ তারিখ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ৮ তারিখ মারা যান। রাতেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। পরের তিন বছরের মধ্যে বড়ো এবং ছোট রাজকুমারও মারা যান। তাদের কারো কোনো পুত্র ছিল না। তখন আইন অনুসারে ভাওয়াল এস্টেট -এর মালিকানা চলে যায় সরকারের হাতে- অর্থাৎ 'কোর্ট অব ওডার্স'-এর কাছে। বিধবা রাণী হিসেবে মেঝো কুমারের স্ত্রী বিভাবতী দেবী কিছু ভাতা পেতেন।

এভাবেই চলছিল। মেঝো রাজকুমারের মৃতু্যর কিছুদিন পরেই গুজব ছড়ায় যে রাণী বিভাবতী দেবী ষড়যন্ত্র করে ব্যক্তিগত চিকিৎসকের মাধ্যমে বিষপ্রয়োগ করে স্বামীকে হত্যা করেন। কুমার রামেন্দ্র নারায়ণের নারীদের প্রতি মারাত্মক আসক্তি ছিল এবং ১৯০৫ সালের দিকে তার সিফিলিস ধরা পড়ে। এসব কারণে স্ত্রী তার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু এর সঙ্গে আরও একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে রাজকুমার মারা যাননি। তাকে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে বলে কেউ কেউ দাবি করেন।

১৯২০-২১ সালের দিকে ঢাকার বুড়িগঙ্গার কাছে বকল্যান্ড বাঁধের উপরে এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে। সন্ন্যাসীকে দেখে অনেকেই ভাওয়াল এস্টেট-এর রাজকুমার মনে করেন। তার শারীরিক গড়ন ভাওয়াল রাজার সঙ্গে মিলে যায়। প্রথমে সন্ন্যাসী নিজের পরিচয় নিয়ে নীরব ছিলেন। কিন্তু প্রজারা তাকে এস্টেট-এর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য চাপ দেন। তাকে রাজা মেনে মানুষ নজরানা এবং খাজনাও দিতে শুরু করে।

শেষমেশ সন্ন্যাসী ১৯২১ সালের ৪ মে নিজেকে রাজা রামেন্দ্র নারায়ণ রায় হিসেবে দাবি করেন। কোর্ট অব ওডার্স এই সন্ন্যাসীকে প্রতারক সাব্যস্ত করে ১৯২১ সালের ২৩ জুন নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেয় কেউ তাকে রাজা মেনে তার কাছে কোনো খাজনা পেশ করলে তার দায় দায়িত্ব সেই ব্যক্তির।

তখন সন্ন্যাসী রাজা ঢাকার সাব ডিস্ট্রিক্ট জাজ কোর্টে একটি টাইটেল স্যুট করে তাকে ভাওয়াল এস্টেট এর রাজা ঘোষণার আবেদন করেন এবং কনসেকোয়েনশিয়াল রিলিফ হিসেবে ভাওয়াল এস্টেট এর তিন ভাগের একভাগ এর মালিকানা দাবি করেন।

তখন ভাওয়াল এস্টেট এ ২২৭৪টি মৌজায় ৪,৫৯,১৬৩.৩০ একর জমি ছিল। ঢাকার তেজগাঁও থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাদের জমিদারি। তাদের চেয়ে বড়ো জমিদারি ছিল কেবল ঢাকার নবাব খাজা পরিবারের। নবাবদের জমিদারিও ঋণের দায়ে কোর্ট অব ওডার্সের হাতে চলে যায়।

সন্ন্যাসী রাজা মামলা করেন ২৪ এপ্রিল, ১৯৩০ তারিখ। মামলার ট্রায়াল শুরু হয় ১৯৩৩ সালের ৩০ নভেম্বর। বাদী পক্ষের বক্তব্য ছিল- রাজকুমারের দেহ শ্মশানঘাটে নেওয়ার সময়ে প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। তখন লাশ ফেলে সবাই বিভিন্ন দিকে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে একটি সন্ন্যাসী দল শ্মশানের কাছে শব্দ শুনতে পেয়ে রাজকুমারকে জীবিত দেখতে পায়। তাকে

সন্ন্যাসীরা নিয়ে যায়।

এদিকে লাশ হারিয়ে যাওয়ায় গোপনে মর্গ থেকে একটি বেওয়ারিশ লাশ এনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। রাজকুমার তার অতীত স্মৃতি ভুলে যান। নিজেও সন্ন্যাসী হয়ে সন্ন্যাসীদের সঙ্গে বেনারস থেকে তিব্বত হয়ে ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ান।

১০/১২ বছর পরে সন্ন্যাসীর মনে পড়ে তার বাড়ি ঢাকা। কিন্তু তিনি কে তা মনে করতে পারেন না। প্রায় ১২ বছর পরে ঢাকায় চলে আসেন। সেই ঘটনাবহুল রাতের ২১ বছর পরে নিজের রাজত্ব ফেরত পাওয়ার জন্য মামলা দায়ের করেন।

বিবাদী পক্ষের ডিফেন্স ছিল- এই সন্ন্যাসী রাজকুমার নন। রাজকুমার একুশ বছর আগে মারা গেছেন এবং তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।

বাদী পক্ষ থেকে সন্ন্যাসী রাজা কোর্টে ১০৪২ জন সাক্ষী উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে ২৭ জনকে কমিশনের মাধ্যমে লন্ডনসহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে এক্সামিন করা হয়। বিবাদী পক্ষ থেকে ৪৩৩ জন সাক্ষী পেশ করা হয়। হাইকোর্টে ২৬ ভলিউমের পেপার বুক জমা দেওয়া হয়েছিল। মামলার নথিপত্র হয়েছিল ১১,৩২৭ পৃষ্ঠা। ওইসময়ে আশি হাজার টাকা খরচ হয়েছিল শুধু প্রিন্টের কাজে। ঢাকার ট্রায়াল কোর্টে মোট ৬০৮ দিন শুনানি হয়। আমাদের সুপ্রিম কোর্টের জাদুঘরে এই মামলার কিছু পুরনো নথি রাখা আছে।

ট্রায়াল কোর্টের জজ সন্ন্যাসীকে মেঝো রাজকুমার বলে রায় দেন এবং তাকে জমিদারি ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। জাজমেন্টের মূল বিষয়বস্তু ছিল মেঝো রাজকুমারের শরীরের দাগের সঙ্গে সন্ন্যাসীর সবকিছু মিলে গেছে। দুজনের একই রকম চেহারা হতে পারে কিন্তু এতগুলো একই রকম শারীরিক চিহ্ন মিলতে পারে না। বিমা কোম্পানির এক ডাক্তার মেঝো রাজকুমারের ২১টি শারীরিক চিহ্ন রেকর্ড করেছিলেন। সন্ন্যাসীর সঙ্গে তার মধ্যে ১৯টি হুবহু মিলে গেছে।

লিমিটেশন বা তামাদি প্রশ্নে বিবাদী পক্ষ সুবিধা করতে পারেনি। কারণ, ১৯০৯ সালে রাজকুমার ফেরারি হন। আবার ১৯২০ সালে ফিরে এসে খাজনা নেওয়া শুরু করেন। অর্থাৎ তিনি ১২ বছর বেদখল ছিলেন না। ১২ বছরের আগেই ফিরে এসেছেন। আবার কোর্ট অব ওডার্স ১৯২১ সালে নোটিশ জারি করে যে সন্ন্যাসী রাজা প্রতারক। সুতরাং, ওইদিন থেকে তার মামলার কজ অব একশন শুরু। ১২ বছর হওয়ার আগেই ১৯৩০ সালে এসে তিনি মামলা করেন। সুতরাং মামলাটি তামাদিতে বারিত হয়নি।

ট্রায়াল কোর্টের রায় হয় ১৯৩৬ সালে। সরকার কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করে ১৯৩৬ সালের ০৫ অক্টোবর। বিবাদী পক্ষ আপিলে ৩৩৮টি গ্রাউন্ড উলেস্নখ করে। এর মধ্যে বেশির ভাগই ছিল এভিডেন্স সংক্রান্ত। বিবাদী পক্ষ দাবি করে বাদী পক্ষের বেশিরভাগ সাক্ষী হিয়ারসে এভিডেন্স দিয়েছেন এবং তারা তাদের অপিনিয়ন বলেছেন।

হাইকোর্টে শুনানি হয় ১৬৪ দিন। তিনজন বিচারক ছিলেন। ঔঁংঃরপব ঈড়ংঃবষষড়, ঔঁংঃরপব ইরংধিং এবং ঔঁংঃরপব খড়ফমব. এর মধ্যে একজন ( ঈড়ংঃবষষড় ঔ) ছুটিতে ইংল্যান্ড গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে আটকা পড়েন। তিনি ইংল্যান্ডে বসেই রায় লেখেন। তিনজন বিচারকের দুইজন সন্ন্যাসীর পক্ষে রায় দেন। একজন বিপক্ষে রায় দেন (খড়ফমব ঔ)। তার যুক্তি ছিল, সন্ন্যাসী রাজা নিজেকে রাজকুমার প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বাকি দুইজন বিচারক ট্রায়াল কোর্টের বিচারে অসংগতি খুঁজে পাননি।

হাইকোর্টেও সন্ন্যাসী রাজা জিতে যান। এই মামলার রায় দেওয়ার কিছুদিন পরেই ট্রায়াল কোর্টের জজ স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যান।

বিবাদী পক্ষ প্রিভি কাউন্সিলে আপিল করে। প্রিভি কাউন্সিলে একটানা ২৮ দিন শুনানি হয়। প্রিভি কাউন্সিল ঢাকা কোর্ট এবং কলকাতা হাইকোর্টের প্রসিডিং এ কোনো ইরেগুলারিটি না পেয়ে আপিল ডিসমিস করে দেন। সুতরাং, ৩৭ বছর পরে চূড়ান্তভাবে রাজকুমার ভাওয়াল এস্টেট-এর মালিকানা ফিরে পান।

প্রিভি কাউন্সিল এ বিজয়ের খবরের টেলিগ্রাম কলকাতায় আসে ১৯৪৬ সালের ৩১ জুলাই। খবর শুনে রাজা বিকালে কালি মন্দিরে পুজো দিতে যান। সেখানে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। দুদিন পরে রাজা মারা যান।

রাজার মৃতু্যর প্রতিক্রিয়ায় বিভাবতী দেবী বলেন, আদালতে তিনি (বিভাবতী) হেরে গেছেন কিন্তু ঈশ্বর তাকে ন্যায়বিচার দিয়েছেন।

\হলেখক :শিক্ষানবিশ আইনজীবী; প্রতিষ্ঠাতা, সেন্টার ফর অবসকিউর অ্যান্ড উইয়ার্ড স্টাডিজ (কাউস)

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

ক্যাম্পাস
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
হাট্টি মা টিম টিম
কৃষি ও সম্ভাবনা
রঙ বেরঙ

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে