ফৌজদারি মামলার ট্রায়াল

আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে কার দুর্বলতায়?

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গায়ে-গতরে, অস্ত্রশস্ত্রে, প্রযুক্তিতে শক্তিশালী হচ্ছে কিন্তু এখনো বেসিকে দুর্বল রয়ে গেছে। সঙ্গে রয়েছে দুর্বল প্রসিকিউশন। যার যে দায়িত্ব সেটা পেশাদারি মানসিকতা নিয়ে পালন করলেই সার্বিক পরিস্থিতি ব্যালেন্সে থাকে। কেউ কেউ মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ফল এটা। তাদের কাজ হওয়া উচিত আসামি গ্রেপ্তার করা, আলামত জব্দ করা পর্যন্ত। এরপরে সেই এভিডেন্স বা ঘটনা দেখে রিপোর্ট রেডি করা উচিত একজন প্রসিকিউটরের- যিনি আইন বিশেষজ্ঞ
আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে কার দুর্বলতায়?

আদালত-আইনজীবীদের প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটা সাধারণ অভিযোগ হলো, 'আমরা এত কষ্ট করে আসামি ধরে নিয়ে আসি অথচ সাজা করাতে পারি না।' অভিযোগের আঙুল বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উকিলদের দিকে থাকে।

এতে দায়টা কার? তা বিচার করার আগে দুটো প্রাসঙ্গিক কথা না বললেই নয়। ধরুন, একটি ধর্ষণ চেষ্টা মামলা প্রমাণ করতে হলে সেখানে প্রমাণ করতে হবে ওই ঘটনায় জোরপূর্বক পেনিট্রেশনের চেষ্টা অথবা পেনিট্রেশনের চেষ্টা সংঘটিত হয়েছে। যে ঘটনায় পেনিট্রেশন ঘটেনি সেখানে ধর্ষণ প্রমাণ করা সম্ভব নয়। আর যেখানে পেনিট্রেশনের চেষ্টা হয়নি সেখানে ধর্ষণের চেষ্টাও হয়নি।

হতে পারে ভিক্টিমের কাপড়চোপড় ছেঁড়া হয়েছে, তার শরীরে আঁচড় পড়েছে, স্পর্শকাতর স্থানে নিপীড়নের ঘটনাও ঘটেছে কিন্তু ধর্ষণ সংঘটনের চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে সে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতাই তাকে এই ধারায় অভিযুক্ত করবে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা যৌন পীড়নকে ধর্ষণ চেষ্টা বলে চালিয়ে দেন কখনো জেনে-বুঝে। কখনো বা না বুঝে মামলাকে অযথা শক্ত করার উদ্দেশ্যে। এতে কিন্তু মামলার ক্ষতি হলো।

তদন্ত প্রতিবেদনই সব নয়। মামলার ট্রায়ালে এসে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে একজন ঝানু আইনজীবী আইনের সূত্রের প্রয়োগ ঘটিয়ে সত্য খোলাসা করে নিয়ে আসেন। সঠিক আইনে মামলা দায়েরের দায়িত্ব নিশ্চয়ই ডিফেন্স ল'ইয়ারের নয়।

আবার কাউকে অভ্যাসগত চোরাইমালের ক্রয়-বিক্রয়ের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অথচ সেই ব্যক্তি একজন বৈধ কাগজপত্র ধারী ব্যবসায়ী এবং তার বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে এধরনের কোনো অভিযোগ নেই কিংবা উদ্ধারকৃত মালামাল যে চোরাইমাল এধরনের কাট্টা প্রমাণ তদন্তকারী কর্মকর্তা হাজির করতে পারেনি- তবে সেই ব্যক্তিকে সাজা দেয়া হবে কিসের ওপর ভিত্তি করে!

ইদানীং সংঘবদ্ধ অপরাধ বেশি সংঘটিত হচ্ছে। এধরনের চক্রের অপরাধ উদ্ঘাটন করা বেশ মুশকিল। এর রুট অনেক ডিপে থাকে এবং মাস্টার মাইন্ড আড়ালে থাকে। এখানে তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, মূল ঘটনা থেকে অনেক দূরে চলে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি করিয়ে নিচ্ছে।

হয়তো সে কয়টাদিন বেশি জেলহাজতে থাকবে। কিন্তু ঝানু প্রকৃতির উকিল তাকে জামিনেও মুক্ত করবেন আবার ট্রায়ালে গিয়ে খালাসও করবেন।

এরকম আরও অসংখ্য বিষয়ে ফাঁকফোকর রয়েছে- যা নিয়ে আলোচনা শেষ করা সম্ভব না। আলোচনা করা সমীচীন হবে না পেশাগত স্বার্থে।

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গায়ে-গতরে, অস্ত্রশস্ত্রে, প্রযুক্তিতে শক্তিশালী হচ্ছে কিন্তু এখনো বেসিকে দুর্বল রয়ে গেছে। সঙ্গে রয়েছে দুর্বল প্রসিকিউশন। যার যে দায়িত্ব সেটা পেশাদারি মানসিকতা নিয়ে পালন করলেই সার্বিক পরিস্থিতি ব্যালেন্সে থাকে।

কেউ কেউ মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ফল এটা।

তাদের কাজ হওয়া উচিত আসামি গ্রেপ্তার করা, আলামত জব্দ করা পর্যন্ত। এরপরে সেই এভিডেন্স বা ঘটনা দেখে রিপোর্ট রেডি করা উচিত একজন প্রসিকিউটরের- যিনি আইন বিশেষজ্ঞ।

পুলিশের নিজের দায়িত্ব পালনের জন্য একটা নির্দিষ্ট মাত্রার আইনি জ্ঞানের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তাদের আইন বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ হলে দেশের ভালো।

বিশ্বের বহু আইনি ব্যবস্থায় পুলিশ এবং প্রসিকিউটরের যৌথ প্রচেষ্টায় সঠিক ধারার অধীনে চার্জ করা হচ্ছে। ট্রায়াল হচ্ছে। আমাদের দেশে তো নিম্নমানের তদন্তের জন্য ট্রায়ালই হয় না ঠিকমতো। তাই ট্রায়ালের চেয়ে বেইল হিয়ারিং অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আমাদের বিচার ব্যবস্থায়- যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের সংস্কারের জন্য একটা মানসম্মত প্রসিকিউশন বিভাগ খোলা এখন সময়ের দাবি।

আবার কেউ কেউ মনে করেন, প্রসিকিউশন সার্ভিস শুরু হওয়া জরুরি। তবে পুলিশকে অতিরিক্ত ক্ষমতা বা দায়িত্ব প্রদানের একটা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এখানে এসে কোনো সরকারই আর আন্তরিক থাকে না।

উদয় তাসমির : তরুণ আইনজীবী।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে