বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

আইনের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় বিয়ে এবং একটি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গল্প

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ-১৯৬১ আইনের ধারা ৬ মতে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি পরিষদের কাছ থেকে অনুমতি না নিলে বিয়ে নিবন্ধন হবে না। অনুমতির জন্য ২৫ টাকা ফি দিয়ে সাদা কাগজে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ের অনুমতি প্রদানে যেসব বিষয়ের প্রতি বিবেচনা করা হবে তার মধ্যে অন্যতম হলো: ১) বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যত্ব ২) দৈহিক দৌর্বল্য ৩) দাম্পত্য জীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা এবং ৪) দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য কোনো উন্মত্ততা। কোনো পুরুষ যদি সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন তবে তিনি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে ১ বছর পর্যন্ত জেল ও ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড কিংবা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন।
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
  ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০০:০০

পৃথিবীতে সবচেয়ে মধুর সম্পর্ক হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। কিন্তু কখনো কখনো তা অভিশাপ রূপে দেখা দেয়। সুমির (ছদ্মনাম) জীবনেও এমনটি ঘটেছিল। শহরে নিজের বাড়ি, শিক্ষিত স্বামী শোভন চৌধুরী (ছদ্মনাম) আর তিন সন্তান নিয়ে সুখের পরিবার। প্রত্যাশার চাইতেও যেন অনেক বেশি স্বপ্নবিলাস। হঠাৎ এক ঝটিকা দমকা হাওয়া এসে যেন সবকিছু তছনছ করে দেয় এ দম্পত্তির।

হঠাৎ একদিন রাতে শোভন চৌধুরী দ্বিতীয় বিয়ে করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। যাকে বিয়ে করতে চাচ্ছিলেন, তিনি ছিলেন সদ্য-তালাকপ্রাপ্ত, ৪ সন্তানের মা। শোভন চৌধুরীর ভাষায়, তাদের অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, দুপুর হলে তার বাচ্চার জন্য কোথা থেকে খাবার আসবে সেটাও নাকি তার জানা নেই। সুমির সোজাসাপটা জবাব তুমি বাইরের মানুষ হয়ে কেন অন্য এক লোকের বোঝা টেনে বেড়াতে যাবে? আমি কখনোই দ্বিতীয় একজন স্ত্রীকে মেনে নিতে পারি না। যদি তুমি আরেকজন মহিলাকে বিয়ে করতে চাও, তো করো; কিন্তু মনে রেখো ফিরে এসে তুমি আমাকে আর এখানে দেখতে পাবে না।

আমি সুমির পক্ষে তার স্বামীকে আইনি নোটিশ প্রদান করি। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ-১৯৬১ আইনের ধারা ৬ মতে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি পরিষদের কাছ থেকে অনুমতি না নিলে বিয়ে নিবন্ধন হবে না। অনুমতির জন্য ২৫ টাকা ফি দিয়ে সাদা কাগজে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ের অনুমতি প্রদানে যে সব বিষয়ের প্রতি বিবেচনা করা হবে তার মধ্যে অন্যতম হলো: ১) বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যত্ব ২) দৈহিক দৌর্বল্য ৩) দাম্পত্য জীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা এবং ৪) দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য কোনো উন্মত্ততা।

কোনো পুরুষ যদি সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন তবে তিনি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে ১ বছর পর্যন্ত জেল ও ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড কিংবা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন।

পাশাপাশি পেনাল কোডের ৪৯৪-এর বিধান মতে, স্বামী যা স্ত্রীর জীবনকালে পুনরায় বিয়ে করেন তবে সে ব্যক্তি যে কোনো বর্ণনার কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন- যার মেয়াদ সাত বছর পর্যন্ত হতে পারে; তদুপরি অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে উলেস্নখ করা উচিত, বহু বিবাহের মামলায় বাদীকে সফল হতে হলে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, দ্বিতীয় বিয়ের সময় প্রথম বৈধ বিয়ের অস্তিত্ব ছিল।

অবশেষে সুমির স্বামী আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। নিজের স্বামীকে ধরে রাখতে পারার আনন্দে আত্মহারা সে! কিন্তু সুমি তখনও জানত না তার সুখের সময় খুব শিগগিরই ফুরিয়ে আসছে....

সুমির স্বামী শোভন চৌধুরীর জীবনের শেষ কথাগুলো ছিল- ওর খুব মাথা ধরেছে, আমি একটু ঘুমোতে চাই। সে ঘুম আর ভাঙেনি। সে রাতেই তিনি মারা যান। ওর আচমকা মৃতু্যতে সুমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ে!

শোভন চৌধুরীর মৃতু্যর পর কোনোকিছু দেখাশোনা করে রাখার মতো অবস্থা সুমির ছিল না। অযত্নে অবহেলাতে একে একে সব হারাতে শুরু করে সুমি। প্রথমে তাদের গাড়ি, এরপর দোকান, এরপর বাড়ি ও অন্যান্য ব্যবসায়ীসামগ্রী।

শেষমেশ তিন সন্তানকে নিয়ে অসহায় হয়ে ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠে সুমি। হঠাৎ এতগুলো মানুষের উপস্থিতিতে ওদের বাড়িটা গিজগিজ হয়ে উঠে। সুমির ভাবিও দিনে দিনে বিষিয়ে উঠে। সুমির মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হতো ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। সে সময় সুমির দরকার ছিল একটি চাকরি, কিন্তু ওর তেমন কোন দক্ষতা ছিল না। বয়সও হয়ে গিয়েছে। কিছু শিখে চাকরি করতে পারার মতো বয়সও ছিল না। কিন্তু মানুষের দয়ায় এভাবে কতদিন মাথাগুঁজে পড়ে থাকা যায়? নিজেদের জন্য একটি আলাদা বাসার প্রয়োজন খুব বেশি করে অনুভব করছিল সুমি।

এভাবেই দিন কাটছিল সুমির। হঠাৎ একদিন সুমির ভাই ডেকে তার পরিচিত এক ভাইয়ের কথা বললেন। সেই ভাই নাকি বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজছেন। ভালো মানুষ, চমৎকার আচার ব্যবহার, আর অনেক দ্বীনদার। সুমির জন্য নাকি খুব মানাবে! কিন্তু তিনি চান সুমি তার দ্বিতীয় স্ত্রী হোক। এবার সুমির মাথায় বিনামেঘে বজ্রপাত ঘটল। তার জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো দ্বিতীয় স্ত্রী কথাটি শুনলেন, কিন্তু এবারে পরিস্থিতি কত ভিন্ন!

সত্যি তিনি সুমিকে দেখতে একদিন তার ভাইয়ের বাসায় এলেন। ক্ষণিকের মাঝেই যেন তাদের মধ্যে কী একটা হয়ে গেল! অবিশ্বাস্যভাবে সুমি তারকে খুব পছন্দ হয়ে গেল, তারর প্রতিটা ব্যাপারই খুব ভালো লাগছিল। তিনি সুমিকে বললেন, তার প্রথম স্ত্রী জানেন যে তিনি দ্বিতীয় বিয়েতে আগ্রহী, তবে তিনি রাজি নন।

সে রাতে সুমি তাহাজ্জতের সালাত আদায় করলেন। সুমি পাগলের মতো চাচ্ছিল যেন বিয়েটা ঠিকঠাক হয়ে যায়! কিন্তু তার মনে পড়ল, অনেক বছর আগে আরেকজন নারীর জীবনও ঠিক এরকম করেই তার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছিল। মনে পড়ে গেল, তিনি সেদিন কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার মনে হচ্ছিল তিনি তো জীবনে আরেকজন নারীকে স্থান দেইনি, তাহলে আলস্নাহ কেন তাকে আরেকজন নারীর জীবনে স্থান নেওয়ার সুযোগ দেবেন? নিশ্চয়ই আলস্নাহ তা'আলা তাকে শাস্তি দেবেন।

সুমি বারবার আলস্নাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকলেন।

এবার সুমি দু'আ করতে থাকলেন যেন তারর স্ত্রী তাকে মেনে নেন..। কয়েকদিন পর সুমির হবু স্বামী তাকে ফোন করলেন। বললেন, তার স্ত্রীর এটা মেনে নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে, তবুও তিনি সুমির সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী।

সুমি দেখা করতে গেলেন। হবু সতীনের চোখ দুটি বেদনায় ছলছল করছিল। সে সুমির হাত দুটো ধরে বলল: 'বোন, আমার জন্য এটা মেনে নেওয়া কঠিন! তাও দু'আ করি যেন আমরা দু'জন বোনের মতো থাকতে পারি।'

তার স্ত্রী সুমির জীবনে এমন একজন নারীর দৃষ্টান্ত, যেমন নারী সে নিজে কখনো হতে পারিনি। সুমির ভাষায় আমি তার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকব। এক সময় সুমি ভাবত কেউ কারো স্বামীকে নিশ্চয়ই তার মতো করে এত বেশি ভালোবাসতে পারেনি। কিন্তু তারর স্ত্রীকে দেখে সুমির ধারণাটি বদলে গেল। এই নারীর কাছ থেকেই সুমি শিখতে পারলেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আসল পরিচয়।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা। ই-মেইল: ংবৎধল.ঢ়ৎধসধহরশ@মসধরষ.পড়স

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে