রোববার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
walton

নিত্যদিনের জটিলতা আইনের হাত ধরে যেভাবে সহজ হয়ে যায়

অ্যাডভোকেট আজিজ উলস্নাহ ইমন
  ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

'বুঝলেন হিসাব ভাই! আপনি কোর্টে না যেতে চাইলেও আপনার পরিবারের লোকজনকে কোর্টে যেতেই হবে! সেদিন জজকোর্ট এর কোর্টরুমে ঢুকতে গিয়ে দেখি একজন নামকরা অভিনেত্রী আর তার মেয়ে সাকসেশন কোর্ট থেকে সাক্ষী দিয়ে বের হচ্ছে!' ল' অফিসার আনিস বলল। হিসাব উদ্দিন বেশ বিরক্তি হয়ে আনিসের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

হিসাব উদ্দিন আনিস ছেলেটাকে বেশ স্নেহ করেন। বেশ রসিক এই ছেলেটা! আইনের ওপর অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে কিছুদিন ওকালতি করে এরপর ল' অফিসার হিসেবে এই অফিসে জয়েন করেছে। খুব ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। হিসাব উদ্দিন আনিসকে অনেকবার বলেছে যে, হিসাব ভাই না ডাকতে! কিন্তু, আনিস এক্সাইটেড হয়ে গেলে মাঝে মাঝে এই নামে ডাকে।

'বুঝলেন ভাই! একাউন্ট হোল্ডারের মৃতু্যর পর সাকসেশন সার্টিফিকেট ছাড়া ওয়ারিশদের টাকা তুলতে দেয় না ব্যাংক! আর রাজউকের জমির পস্নট বা ফ্ল্যাট রেখে গেলেও সেটা তার ওয়ারিশদের বরাবর ট্রান্সফার করতেও কোর্টে মামলা করে সাকসেশন সার্টিফিকেট নিতে হয়! নইলে রাজউক পারমিশন দেবে না! অথচ সাকসেশন সার্টিফিকেট তো শুধু উবনঃং ধহফ ঝবপঁৎরঃরবং-এর জন্যই নিতে হয়! জায়গা জমির বণ্টনের জন্য তো লোকাল চেয়ারম্যান/কাউন্সিলরের ওয়ারিশান সনদপত্র হলেই হয়! মানুষকে শুধু শুধুই কোর্টের ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে এখন!'

হিসাব উদ্দিনও চাকরির পাশাপাশি ল' কলেজ থেকে আইন পড়েছেন অনেক বছর আগে। কিন্তু, বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষা দেননি। চাকরি আর দুই বছর আছে। এরপর বার কাউন্সিলের সনদ নিয়ে আইনপেশায় যাওয়ার ইচ্ছা আছে। তার সঙ্গে ল' পড়েছে এমন কয়েকজন বন্ধু কোর্টে বেশ ভালোই ওকালতি করছে। চেম্বারে জুনিয়রও আছে কয়েকজন।

আনিস ছেলেটাও বেশ মেধাবী। কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কিছুদিন প্র্যাক্টিস করে এই অফিসে ল' অফিসার হিসেবে জয়েন করছেন বছর তিনেক আগে। বেশ অমায়িক ছেলেটা।

আনিসের পরামর্শ নিয়ে প্রিলি মাস্টার এমসিকিউ গাইড কিনেছে হিসাব উদ্দিন। সারাদিন অফিস করে জ্যাম পেরিয়ে টায়ার্ড হয়ে বাসায় ফিরে আর পড়ার সময় হয়ে উঠে না। আর ইদানীং কিছু মনেও থাকে না। বয়স হয়েছে। এখন আর কিছু মুখস্থ করতে পারেন না। ছাত্রজীবনে লিখে লিখে পড়তেন। এখন আর লিখতে ইচ্ছা করে না।

আনিস প্রায়ই বলে, 'হিসাব ভাই! না পড়লে কিন্তু ফেল করবেন! প্রতিদিন একটু করে পড়বেন! আর আন্দাজে দাগালে যদি ভুল হলে মার্কস কাটা যাবে। তাই, শিউর না হলে আন্দাজে দাগাবেন না।'

আগে মাঝে মাঝে অফিস ছুটির পর হিসাব উদ্দিন সেগুনবাগিচায় তার বন্ধুর চেম্বারে যেতেন রাতে। সন্ধ্যার পর কিছুটা সময় আড্ডা দিতে। অনেক িেদন বন্ধুর চেম্বারে যাওয়া হয় না। একবার গিয়ে দেখে এক মক্কেল তার আইনজীবী বন্ধুকে বলছে, স্যার! জজকোর্ট তো ইঞ্জেকশন দিলেন না! স্টেটাস কো-ও দিল না! অন হাইকোর্ট যদি ইঞ্জেকশন না দেন তইলে তো হেতেরা আঁর জায়গা দখল করি হালাইবো! হিসাব উদ্দিন বুঝতে পারলেন না হাইকোর্ট কেন ইঞ্জেকশন দেবেন!

পরে মক্কেল চলে যাওয়ার পর আইনজীবী বন্ধু বলল, যে ওহলঁহপঃরড়হ আর ঝঃধঃঁংয়ঁড় বলতে গিয়ে ইঞ্জেকশন আর স্কেটাসকো বলসে!

আনিস বলে, 'ভাই, আমার বন্ধুরা অনেকেই এখন হাইকোর্টে ওকালতি করেন। বেশ ভালোই করছেন তারা। মাঝে মধ্যে দেখি ভ্যাকেশনের পর এবং ব্রেকাপ পার্টিতে জাস্টিসদের সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে ছবি দেন! আমার তো হাইকোর্টের এনরোলমেন্টই নেওয়া হলো না, এই চাকরিতে জয়েন করার পর। হিসাব ভাই, নেক্সট হাইকোর্টে পরীক্ষা দেব ইনশাআলস্নাহ! প্র্যাকটিস না হয় পরে কোন এক সময় করব কিছু টাকা জমা হলে! আর আপনি সিনিয়র মানুষ। আপনার তো চুল দাড়ি সব সাদা। আপনি তো কোর্টে গিয়া ওকালতি শুরু করলেই দেখবেন আপনার মক্কেলের অভাব হবে না! সবাই মনে করবে আপনি অনেক সিনিয়র!

হিসাব উদ্দিন হেসে দিলেন।

'হিসাব ভাই! আপনার তো গ্রিন কার্ড হয়ে গেছে! মেয়ে আর নাতি নাতনিদের কাছে আমেরিকা চলে যাবেন।'

হিসাব উদ্দিনের এক কন্যা স্বামী সন্তানের সঙ্গে আমেরিকার থাকে! হিসাব উদ্দিন দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন! মৃতু্যর পর তার কন্যাকে আমেরিকা থেকে আবার কোর্ট-কাচারি যেতে হবে সাকসেশন সার্টিফিকেট এর জন্য।

হিসাব উদ্দিন ঠিক করলেন একদিন অফিসের ছুটির পর বন্ধুর চেম্বারে যাবেন তার ফ্ল্যাটটা কীভাবে তার মেয়ের নামে লিখে দেওয়া যায়! অবশ্য তার আগে রাজউকের পারমিশন নিতে হবে। এটা ভাবতেই হিসাব উদ্দিনের প্রেশার হাই হয়ে যাচ্ছে।

অ্যাডভোকেট আজিজ উলস্নাহ ইমন: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে