মহামারির কবি শেক্সপিয়ার আসাদুল ইসলাম

মহামারির কবি শেক্সপিয়ার আসাদুল ইসলাম

শেক্সপিয়ার হলেন মহামারির কবি, মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি যদি ঘরে উঠে না যেতেন তাহলে কবিতা লিখতেন কিনা সন্দেহ। তিনি কোয়ারেন্টিনের অবসরে কলম গুটিয়ে না রেখে কবিতা লিখতে শুরু করলেন, দশটি চুম্বন হোক একটি চুম্বনের মতো সংক্ষিপ্ত, একটি চুম্বন হোক বিশটির মতো দীর্ঘায়িত....। প্রথমবার তিনি নাট্যকার থেকে কবি হতে শুরু করলেন। শেক্সপিয়ার যদি থিয়েটারের মাঝখানে ছুটি না পেতেন তাহলে তিনি কবি হতে পারতেন না, মানে কবি হওয়ার ভাবনা, অবসর বা সুযোগ আসত না। থিয়েটার একটা নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া, এখান থেকে ছুটি মেলা ভার। শেক্সপিয়ারকে থিয়েটারে শুধু নাটকই লিখতে হতো না, অভিনয় এবং মালিকানা নিয়েও ব্যস্ত থাকতে হতো। এই ব্যস্ততার মধ্যে আবার কবিতা লিখবেন কখন! কিন্তু হঠাৎই তিনি অবসর পেয়ে যান। মহামারি তাকে থিয়েটার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তার হাতে চলে আসে অনভিপ্রেত এবং দীর্ঘ ছুটি। নাটক লেখার কোনো ব্যস্ততা বা তাগিদ যেহেতু নেই, তিনি প্রথমবারের মতো কবিতার প্রতি আগ্রহী হলেন এবং শুরু করলেন কবিতা লেখা। কবিতা শুরুর পর তিনি কবিতার প্রেমে পড়ে যান এবং এই প্রেম দশকব্যাপী অতিবাহিত হয়। তিনি কবি হয়ে উঠলেন। নাটকের সঙ্গে কবিতাকে যুক্ত করে নিলেন। থিয়েটারের পাশাপাশি কবিতায়ও তিনি বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রেমের রহস্যঘন আবেগ ও অস্থিরতার বিস্তার ঘটাতে থাকেন। তিনি বিকশিত হতে থাকলেন মধুরতম প্রেমের কবি হিসেবে। এবং পরিণত হলেন বার্ড অফ অ্যাভন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম। কবি হওয়ার পূর্বাপর পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যাবে মহামারিই তাকে কবিতার পথে টেনে আনল এবং তাকে কবি করে তুলল। শেক্সপিয়ার হয়ে উঠলেন মহামারির কবি। শেক্সপিয়ার যখন কবি হয়ে উঠছেন ইতিহাসের সেই কালপর্বটা হলো ১৫৯২।  যমজ সন্তান জন্মানোর দীর্ঘ সাত বছর পর শেক্সপিয়ারকে প্রথমবার দেখা যাচ্ছে লন্ডনের থিয়েটারে। ইতিমধ্যে তার কয়েকটি নাটক লেখা হয়ে গেছে, কিছু নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে লন্ডনে। তিনি লিখে ফেলেছেন হেনরি সিক্সথ, কমেডি অফ এররস, টেমিং অব দ্যা শ্রিউ, টু জেন্টেলম্যান অফ ভেরোনা, কিং জন। উলেস্নখযোগ্য হয়ে না উঠলেও নাট্যকার হিসেবে অল্পবিস্তর নাম ছড়াতে শুরু করেছে। সেই সুবাদে তার সময়কার লেখক রবার্ট গ্রিন তাকে ঈর্ষাবশত গালিও দিয়ে ফেলেছেন 'ভুঁইফোড় দাঁড়কাক' বলে। শুধু শেক্সপিয়ারকে গালি দিয়েও যে বিখ্যাত হওয়া যায় তার উদাহরণ রবার্ট গ্রিন। গ্রিনের সব কর্ম গ্রে স্যাডোর নিচে ঢাকা পড়ে গেছে কিন্তু তিনি ইতিহাস জায়গা করে নিয়েছেন এক গালিতেই। মফস্বল থেকে আসা সত্ত্বেও শুধু থিয়েটারের কল্যাণে লন্ডনের অভিজাতদের সঙ্গে শেক্সপিয়ারের একটা সখ্য গড়ে উঠছে। এমন একটা সম্ভাব্য সুখের সময়ে নেমে এলো মহামারি, বিউবেনিক পেস্নগ। সে সময় পেস্নগে আক্রান্ত হওয়া মানে নিশ্চিত মৃতু্য।

এমন না যে এটাই শেক্সপিয়ারের জীবনে প্রথম পেস্নগ। সারা জীবনই তাকে পেস্নগ তাড়া করে ফিরেছে এবং মৃতু্যর ভিড়ের মধ্যেই তাকে বেঁচে থাকতে হয়েছিল। পেস্নগে তার মৃতু্য হয়নি, তার মৃতু্য অন্য রহস্যাবৃত্তে ঢাকা। কিন্তু পেস্নগে তার ভাই, বোনসহ অনেক নিকটাত্মীয়ের বিয়োগ ঘটে। তার একমাত্র পুত্র হ্যামনেট মারা যায় পেস্নগে। তিনি নিজে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে থাকেন পেস্নগের হাত থেকে। ১৫৬৪ সালের এপ্রিলে যখন তার জন্ম, সেবার পেস্নগ আসে আগের চেয়ে চারগুণ প্রকোপ নিয়ে। তখন লন্ডনে প্রতি পাঁচজনের একজনের মৃতু্য হচ্ছে। যদিও তার জন্ম লন্ডন থেকে ১০০ মাইল দূরে স্টার্ডফোর্ড আপন অ্যাভনে। ভাগ্যান্বেষণে একদিন তাকে লন্ডনেই আসতে হয়। সংক্রামক রোগের দিক থেকে বিবেচনা করলে শেক্সপিয়ারের দুর্ভাগ্য এই যে ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়ে সবচেয়ে খারাপ স্থানে তাকে বাস করতে হয়েছিল। তখন লন্ডনের অবস্থা ছিল ভয়াবহ, থেমস ছিল রোগ-জীবাণুর জলজ্যান্ত ভাগাড়।

১৫৯২ সাল, লন্ডনে পেস্নগের সংক্রমণ শুরু হলো। মানুষ প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে লন্ডন ছেড়ে। অনিবার্যভাবে থিয়েটারগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো। শেক্সপিয়ার থিয়েটার ছেড়ে চলে গেলেন হোম কোয়ারেন্টিনে। লন্ডনে কার বাড়িতে তিনি কোয়ারেন্টিন নিলেন এটা একটা ঐতিহাসিক প্রশ্ন। কারণ তার তো কোনো বাড়ি ছিল না লন্ডনে। এমনকি থিয়েটারের বাইরে তার কোনো সম্পত্তিও হয়নি লন্ডনে। 

শেক্সপিয়ার এই প্রথম তার পেশাদার লেখক জীবনে এবং লন্ডনে পেস্নগের মুখোমুখি হলেন। ধারণা করা হয় সেই সময় তিনি এক অভিজাত বাড়িতে উঠে গেলেন। বাড়ির কর্তাকে হয়তো সন্তুষ্ট করতে তিনি কবিতা শুরু করলেন। থিয়েটারহীন দিনগুলোতে পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল তার, সে কারণেই কবিতাকে বেছে নেওয়া। যে বিবেচনাতেই হোক শেক্সপিয়ার তো কবিতায় ঝুঁকলেন। পরের দশ বছর তিনি ধারাবাহিক বা বিচ্ছিন্নভাবে কবিতার সঙ্গে যুক্ত থাকলেন।

তার প্রধান কবিতার মধ্যে দুটি দীর্ঘ আখ্যান এবং সনেটগুচ্ছ। আখ্যান দুটি হলো 'ভেনাস অ্যান্ড অ্যাডোনিস' ও 'রেপ অব লুক্রেস'। কবি হিসেবে শেক্সপিয়ারের শ্রেষ্ঠকীর্তি তার সনেটগুচ্ছ। কবি শেক্সপিয়ার সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন তার প্রেমময় ও রহস্যাবৃত্ত সনেটগুচ্ছ নিয়ে। তার সনেটের সংখ্যা ১৫৪। ধরা যায় দশকজুড়েই তিনি হয়তো সনেটগুলো লিখেছিলেন। কিন্তু শুরুটা ওই গৃহবন্দির সময়। ১৫৪টি সনেটে কী আছে যে এত তুলকালাম।

১২৬টি সনেট লেখেন তার একজন ভালোবাসার বন্ধুকে নিবেদন করে, যিনি হ্যান্ডসাম ও অভিজাত যুবক। মাত্র ২৬টি সনেট লেখেন এক আকর্ষণীয় কালোকেশী, কৃষ্ণ-নয়না, স্পষ্টত বহুবলস্নভা, রমণীর উদ্দেশ্যে যাকে তিনি ডেকেছেন 'ডার্ক লেডি' নামে। বাকি সনেট দুটো নিষ্কাম নিষ্কলুষ মামুলি কাব্য মাত্র।

 তিনি কবিতা লিখতে বসে কেন আবার সনেটে গেলেন। সে সময় সনেট লেখার খুব চল ছিল। ষোড়শ শতকের শেষ দশকে সনেটের জোয়ার বয়ে যাচ্ছিল। শেক্সপিয়ার যখন কবিতায় এলেন, সেই জোয়ার তাকেও ভাসিয়ে নিল। তিনি আপন খুশিতে সনেটের পর সনেট লিখে চললেন। সনেটগুলো ছিল তার একেবারেই ব্যক্তিগত লেখা। নাটকের মতো সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। যে কারণে শেক্সপিয়ারের কবি পরিচয় গুটিকয় প্রাইভেট ফ্রেন্ডদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই সীমারেখা একদিন ভেঙে পড়ে যখন সনেটগুলো প্রকাশ পায়। ১৬০৯ সালে ১৫৪টি সনেটই প্রকাশ করেন টমাস থর্প। ইতিহাসে তার প্রকাশনাটিই শেক্সপিয়ার সনেটের মূল পাঠ হিসাবে গণ্য। থর্প যেহেতু কবির অনুমতি ব্যতিরেকে এটি প্রকাশ করলেন, তাই অচিরেই মার্কেট থেকে এটি তুলে নিতে হলো। এর পেছনে হয়তো কবির নিজের অথবা অন্য কোনো প্রভাবশালী পুরুষ বা নারীর আপত্তি ছিল, যে আপত্তি থর্পের পক্ষে সম্ভব হয়নি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার। এরপর ১৬৪০ সালে জন বেনসন নতুন করে ভিন্নমাত্রায় শেক্সপিয়ারের সনেট প্রকাশ করেন। শেক্সপিয়ার যে কোনো একজন নিজস্ব পুরুষকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখতে পারেন, বেনসন সাহেব সেটা মানতেই পারলেন না। তিনি সব ঐব কে ঝযব করে দিলেন। এবং নিজের মনের মতো করে ক্রম সাজালেন। বেনসন সাহেবের অশুদ্ধ ও রূপান্তরিত প্রকাশনাটাই দীর্ঘদিন মার্কেটে ছিল, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই ১৪০ বছর। ১৭৮০ সালে অ্যাডমন্ড মেলোন এসে সনেটগুচ্ছকে মূল পাঠে ফিরিয়ে নিয়ে যান, শেক্সপিয়ারের ঐব কে ঐব করেন এবং থর্প অনুসৃত ক্রমেই পুনর্বিন্যাস করেন। আমরা এখন শেক্সপিয়ার যে সনেটগুলো পড়তে পারছি, সেটাকে মূল পাঠ বলেই ধরে নেওয়া যায়। কী আছে এই মূল পাঠে যে বারবার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে? প্রধান প্রশ্ন, ১২৬টি সনেট শেক্সপিয়ার যার উদ্দেশ্যে, যার মনোরঞ্জনে এবং অনিঃশেষ ভালোবাসায় অর্পণ করলেন, সেই অনিন্দ্য কান্তি যুবক কে? নারীর প্রতি পুরুষের প্রেম থাকবেই, তাই ডার্ক লেডিকে নিয়ে তার প্রেমের পঙ্‌ক্তিমালায় কোনো বিষোদগার তৈরি হচ্ছে না। কিন্তু পুরুষের প্রতি পুরুষের প্রেম, চমকে উঠছে অনেকেই। খড়ৎফ ড়ভ সু ষড়াব, হে আমার  প্রেমের প্রভু বলে শেক্সপিয়ার যখনই নিবেদিত হচ্ছেন, তখনই খটকা লাগছে। ১৮নং সনেটে শেক্সপিয়ার লিখলেন, তোমার তুলনা কি বসন্তের দিন? তুমি যে আরও সুন্দর, আরও মধুর। এই পাঠ শেষে চারদিকে আগুন জ্বলে উঠল, কে, কে, কে সেই পুরুষ? কে সেই রূপবান, রমণীসুলভ কমনীয়তায় শেক্সপিয়ারকে গ্রাস করছে, যার স্বরে আছে সংগীত, যার স্বভাবে এক বাসন্তী মৃদুলতা? কে এই যুবা, কে এই বিশাল পুরুষ, যার পদপ্রান্তে মোহভিখারির মতো শায়িত থেকে শেক্সপিয়ার পরম আনন্দিত? এই নিয়ে গবেষকরা যে পরিমাণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন, তার চেয়ে বোধহয় কম আলোচিত হয়েছে কাব্যের কুসুম কানন নিয়ে, সনেটের সৌন্দর্য নিয়ে।

শেক্সপিয়ারের অপরিশোধ্য ভালোবাসা প্রকাশের সঠিক ও আকাঙ্ক্ষিত 'ফেয়ার লর্ড' বা 'ফেয়ার ইউথ' নামে সম্ভাষিত পুরুষটিকে নির্ভুল নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষকরা ঘুরেছেন, মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন কে হতে পারে, কে তিনি? তাদের হাজিরও করা হয়েছে সামনে। এদের একজন উইলিয়াম হার্বাট, পেমব্রম্নকের আর্ল। অপরজন সাউথ্যাম্পটেনের আর্ল, হেনরি রিয়োথেসলি। শেক্সপিয়ারের দুই পৃষ্ঠপোষক, এই দুজনেই তাদের যৌবনে সুদর্র্শন ছিলেন।

এ দুজনের মধ্যে গবেষকদের পালস্নাটা আবার হেনরি রিয়োথেসলির দিকে বেশি ঝুঁকেছে কারণ হেনরি সাহেবকেই শেক্সপিয়ার তার দীর্ঘ কবিতার গ্রন্থ দুটি উৎসর্গ করেছিলেন। আরও ধারণা করা হয় মহামারির সময়কালে তিনি তার প্রাসাদেই ছিলেন। সে সময় হেনরির বয়স ছিল ১৮ এবং শেক্সপিয়ারের ২৮। ধরে নিই, ১৮ বছর বয়সি এক সুদর্শনকে শেক্সপিয়ার মহামারির মধ্যে লিখছেন, তোমার হৃদয় একজন নারীর মতো কোমল, অথচ তুমি নারীদের মতো আনচান করো না, তাদের চেয়েও তোমার চোখ দুটি অতু্যজ্জ্বল ও সৎ, যে বস্তুর দিকে তাকাও তাকেও তুমি তোমার দৃষ্টি দিয়ে আলোকময় করে তোলো।

ভালোবাসা এমনই, সব আড়াল ভেঙে আবেগের আলোকধারায় নেমে আসতে চায় এবং পৃথিবীতে শুধু শেক্সপিয়ারের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে তাকে ভাষা দিয়ে প্রকাশ করার। প্রথাবিরোধী প্রেমের এমন তর্জমা পৃথিবীর আর কারও পক্ষে কোনোদিন সম্ভব নয়। গত ৪০০ বছরের অধিক সময় শেক্সপিয়ারের সনেটগুচ্ছ মানুষকে ক্রমাগত আঘাত ও অভিভূত করে চলেছে। শেক্সপিয়ারকে যথার্থ প্রশংসার জন্য অভিধানের কোনো শব্দই যথেষ্ট নয়।

এই পৃথিবী ভাগ্যবান যে আমরা একজন পরিপূর্ণ শেক্সপিয়ারকে পেয়েছিলাম, মহামারি যাকে কেড়ে নেয়নি। বরং মহামারি তাকে কবি করে তুলেছিল, আমরা পেয়েছিলাম দ্য বার্ড অফ অ্যাভনকে। আমাদের মহামারির কবি শেক্সপিয়ার, ভালোবেসে যাকে আমরা ডাকি 'দ্য বার্ড'।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে