মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1

যার ছায়া পড়েছে

জোবায়ের রাজু
  ০৪ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
রাকিবরা শহুরে জীবনের ইতি টেনে সপরিবারে গ্রামের বাড়ি ধন্যপুরে চলে এসেছে। গ্রামীণ জীবন প্রথমে একটু আনকোরা মনে হলেও ধন্যপুর গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রাকিবকে অনায়াসে টানতে থাকে। রাকিবদের পাশের বাড়ির মেয়ে শান্তা। সুন্দরী মেয়ে হিসেবে সারা গ্রামে শান্তার সুনাম। উঠতি বয়সের শুরুতেই অনেক প্রেম প্রস্তাব পায়। কিন্তু রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে বলে সব প্রস্তাবকে সবিনয়ে ফিরিয়ে দেয়। প্রেম ভালোবাসা বিষয়গুলোর সঙ্গে সহসা পরিচিত হতে না চাইলেও রাকিবকে দেখে শান্তার ধ্যান জ্ঞান বদলে যায়। তার হৃদয়ের আয়নাতে অবলীলায় রাকিবের ছায়া পড়ে। ফলে তার মনের গোপন আকাশে ভালোবাসার তেজী সূর্য আলো ছড়াতে থাকে। সবচেয়ে অবাক করা কান্ড হলো রাকিবের প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার তিন দিনের মাথায় শান্তা রাকিবকে ফেসবুকে পেয়ে যায়। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবার ১০ মিনিটের মধ্যে রাকিব শান্তাকে অ্যাকসেপ্ট করে নেয়। ইনবক্সে গিয়ে রাকিবকে নিজের পরিচয় জানায় শান্তা। শান্তাকে অবাক করিয়ে দিয়ে রাকিব লিখে, 'তোমাকে চিনি শান্তা। ছোটবেলায় আমরা গ্রামে এলে তোমাদের বাড়ি যেতাম। খুব ছোট ছিলে তুমি। একবার তোমাকে চকলেট কিনে দিয়েছি। মনে নেই সম্ভবত।' শান্তার ঠিকই এই স্মৃতি মনে নেই। শৈশবের সব স্মৃতি তো মনে থাকার নয়। রাকির ফেসবুকে ভালোই সময় কাটায়। দিনে দিনে শান্তা আর রাকিব লম্বা লম্বা মেসেজ বিনিময় করতে করতে অনেকটা আপন হয়ে ওঠে। শান্তা একদিন রাকিবকে বিকালের চায়ের আড্ডায় বাড়ি আসার আহ্বান জানায়। কিন্তু লাজুক প্রকৃতির ছেলে রাকিব সে আহ্বানে সাড়া না দিয়ে চুপ থাকে। ২. রাকিব ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে, 'চলে এসেছে হেমন্ত। হেমন্তে এই গ্রামে অনেক ফুল ফোটেছে। কিন্তু আমার প্রিয় শিউলি ফুল নেই। কেউ কী আমায় একটি শিউলিমালা দেবে এই রূপসী হেমন্তে?' রাকিবের স্ট্যাটাস পড়ে শান্তা ভাবে-শিউলিফুলকে কেন্দ্র করে রাকিবের খুব কাছাকাছি যাওয়ার একটি সুযোগ হলো। ফলে সে হন্য হয়ে সারা গ্রামে শিউলিফুল খোঁজে। না, কোথাও শিউলিফুল নেই। মেজাজ খারাপ হয়। তবে কী শিউলিফুলের অজুহাতে সে রাকিবের কাছে যেতে পারবে না! হঠাৎ শান্তার মনে পড়ে তাদের উঠোনের পাশেও তো একটি শিউলিফুল গাছ আছে। কিন্তু গাছটি এখনো ছোট বলে ফুল আসেনি। উপযুক্ত পরিচর্চা পেলে গাছটি অল্প দিনে বড় হবে। রাতে শান্তা রাকিবকে মেসেজ লিখে, 'কেউ শিউলি মালা এনে দেয়নি?' রাকিব লিখে, 'না। তুমি দেবে?' শান্তার বুক ধক করে ওঠে। রাকিবের মেসেজের জবাব লিখে, 'দেবো। তবে আগামী বছর।' রাকিব লিখে, 'হা হা হা। ওকে, প্রতীক্ষায় রইলাম আগামী হেমন্তের।' ৩. শান্তা কেবলই অবুঝ বালিকা হয়ে ওঠে। তার কেন জানি মন বলছে বাড়ির উঠোনের পাশের শিউলি গাছটির যথাযোগ্য পরিচর্চা করলে সে দ্রম্নত বড় হবে এবং আগামী হেমন্তে গাছে ফুলও আসবে। ফলে সে শিউলি গাছটির যত্নে মন দিতে থাকে। রোজ সকালে গাছের গোড়ায় পানি ঢালে, আগাছা দমন করে। গাছের গোড়ায় সার দিতেও মরিয়া হয়ে ওঠে। বাড়ির লোকরা চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করে, 'হঠাৎ এই গাছটির এত সেবা কেন?' শান্তা জবাব দেয় না। শুধু শিউলি গাছের সেবায় মগ্ন, যাতে আগামী হেমন্তে এই গাছে ফুল আসে। সেই ফুলে শিউলিমালা গেঁথে রাকিবকে দেবে। ৪. দুপুরে ফেসবুকে ঢুকে শান্তা দেখে রাকিব বিমানবন্দর থেকে ছবি আপলোড করে ক্যাপশনে লিখেছে, 'গুডবাই বাংলাদেশ। উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডন যাচ্ছি।' এমন একটা সংবাদে কিছুটা দুঃখ পেল শান্তা। পড়ালেখার জন্য লন্ডনে গেলে আগের মতো কী ফেসবুকে সময় দিতে পারবে রাকিব? সে যাই হোক, শান্তা কিন্তু ঠিকই শিউলি গাছটির সেবায় এক পায়ে খাড়া। আগামী হেমন্তে যদি গাছে শিউলি ফোটে, তখন কী রাকিব দেশে থাকবে! হয়তো থাকবে। শান্তার মন বলছে। ঠিক সাতদিন পরের ঘটনা। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতেই মায়ের কাছে একটি দুঃসংবাদ শোনে শান্তা। মনোয়ারা বেগম মেয়েকে বলেন, 'জানিস পাশের বাড়ির রাকিব ছেলেটা যে ওইদিন লন্ডন পাড়ি দিল, সে আজ ওখানে রাস্তা পার হতে গাড়ির তলে চাপা পড়ে জায়গাতেই মারা গেল।' মায়ের কথা শোনে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না শান্তা। রাকিব মারা গেছে! ৫. আজ রাকিবের লাশ বাংলাদেশে আসছে। সারা গ্রামে এক ধরনের শোক। সবার মুখে রাকিবের গুন গান। রাকিবের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছাঁয়া। কিছুক্ষণ পর পর তার মা জ্ঞান হারাচ্ছেন। বিকালে অ্যাম্বুলেন্সের হর্ণ পুরো গ্রাম কাঁপিয়ে তুলল। শান্তার কানে যতই অ্যাম্বুলেন্সের হর্ণ আসছে, ততই তার বুক ফেটে কান্না আসছে। একটি দা নিয়ে সে বের হলো উঠোনে। তারপর শিউলি গাছটির পাশে যায়। অনর্গল কোপাতে থাকে গাছটির গোড়া। এক সময় গাছটি আলাদা হয়ে যায়। এই ছাড়া যে শান্তার আর উপায় ছিল না। কারণ গাছটির অপরিমেয় সেবায় আগামী হেমন্তে যদি শিউলিফুল ফোটে, তখন রাকিবের জন্য তার বুকটা ভাঙতে থাকবে। তাই গাছটিকে এখনই শেষ করে দেয়া ছাড়া আর কী বা করার ছিল। রাস্তা থেকে অ্যাম্বুলেন্সের হর্ণ কেবল বাজছে আর শান্তার দু চোখ জলে ভিজে যাচ্ছে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে