মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1

কবি রিফাত চৌধুরী এবং আমাদের 'শিল্পতরু' অধ্যায়

সরকার মাসুদ
  ০৪ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
আমি ঢাকা শহর দেখতে এসেছিলাম ১৯৮২ সালের মাঝামাঝি। কিন্তু উন্নত জীবিকার ও লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এই শহরে পা রাখি ১৯৮৬-তে। দুই আড়াই মাস আজিমপুর ও ধানমন্ডি ১৫ নম্বরের মেসে কাটানোর পর আমার থাকার জায়গা হয় গাবতলী। কেননা, উপায় না দেখে আমিনবাজার হাইস্কুলে চাকরি নিয়েছিলাম। ক্লাস এইট থেকে টেন পর্যন্ত ইংরেজি পড়তাম। গাবতলী বাসস্ট্যান্ড ঘেঁষে ছিল 'বিউটি সিনেমা হল। তার পাশ দিয়ে একটু ভেতরে গেলেই পাওয়া যায় বাগবাড়ি। তো ওই মহলস্নারই একটা দোতলা বাড়ির নিজের তলায় এক রুমে আমরা তিনজন থাকতাম। অন্যরা ছিলেন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। স্কুলে ক্লাস নিই, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিউটিটে কামাল লোহানীর তত্ত্বাবধানে অনুবাদের কাজ করি আর ভাবি, কবে একটা ভালো চাকরি হবে আমার। কিন্তু চাকরি খোঁজার জন্য যত-না তৎপরতা ছিল, তার চেয়ে আমি বেশি সচেষ্ট ছিলাম নবীন লেখক হিসেবে নিজেকে তুলে দরার কাজে। কয়েকদিন পরপরই পত্রিকা অফিসগুলোয় ঢু দিতাম। এভাবে চার মাস কেটে গেল। ইতোমধ্যে 'বিচিত্রা'সহ চারটি কাগজে আমার ৪-৫টি কবিতা বেরিয়েছে। কবি আল মুজাহিদী 'ইত্তেফাক'-এ একটা গদ্য ছেপেছেন। আমি রীতিমতো হাওয়ায় উড়ছি। নিউমার্কেটে যেতাম। বইয়ের দোকানগুলো খুব টানতো আমাকে। কখনো কখনো দুয়েকটা বই কেনাও হতো। নানা কারণে 'পাপপু'র আড্ডা পরে আর ভালো লাগছিল না। প্রধান কারণ কোনো কোনো আড্ডাধারীর আত্মম্ভরিতা ও আত্মশ্লাঘা। মুখে সখ্যের ভাব দেখলেও আমার প্রতি তাদের মনোভাবটা ছিল- এ আবার কোত্থেকে এসে জুটলো। আমি মনে মনে বিকল্প আড্ডা খুঁজছিলাম এবং একদিন পেয়েও গেলাম। কে সন্ধান দিয়েছিলেন আজ আর মনে নেই। তবে একটা দৃশ্য খুব মনে আছে। আজিমপুর গোরস্তানের মেইন গেটের কাছাকাছি হালিমের দোকানের সামনে রাখা ছোট বেঞ্চে হালকা-পাতলা এক তরুণ বসে আছে। মেয়েদের মতো লম্বা চুল। পেছনে ঝুঁটি বাধা। তার বা পাশে একটু আগে খেয়ে রাখা হালিমের শূন্য বাটি। তার পায়ে 'বাটা'র হকি সু। তরুণের দৃষ্টি নিবন্ধ দু'তিন হাত দূরের মাটিতে। কেউ একজন বললেন, ওই যে আর এক কবি। পরিচয় করিয়ে দিতেই তিনি উষ্ণ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমার নাম রিফাত চৌধুরী। এভাবেই শুরু। তারপর সপ্তাহের পাঁচ দিনই আমি গাবতলী থেকে কাঠবডি বাসে চেপে আজিমপুর চলে আসতাম। ভাড়া ছিল দেড় টাকা। রাত সাড়ে ১১টার আগে মেসে ফেরা হতো না। আজিমপুর, শেখসাহেব বাজার, কামরাঙিরচর কত জায়গায় যে আমরা ঘুরেছি। নেশার টানে নানা আড্ডায়-আখড়ায়, টানেলে, গুপচি ঘরে কেটেছে আমাদের অজস্র বিকাল, সন্ধ্যা রাত। নিষিদ্ধ 'বস্তু'র স্বাদ আমি আগেই পেয়েছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেনই। কিন্তু সত্যি বলতে, ওই জিনিসে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম রিফাত চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার পরেই। এদিক থেকে তিনি আমার গুরু। তার গুরু কে আমি তা জানি না। একদিন আমরা ফুলবাড়িয়া এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। রিফাত বললেন, চলেন, (তখনো আমরা তুমি সম্বোধন শুরু করেনি) আমার এক প্রিয় কবির সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিই। হাঁটতে হাঁটতে দিলকুশার দিকে গেলাম। এক ভবনের ২-৩ তলায় চির আবিদ আজাদের অফিস। আমার পরিচয় পাওয়ার পর আবিদ একটা বই বের করে নাম লিখে উপহার দিলেন। বইটা ছিল 'বন তরুদের মর্ম।' পরে তো উনার অনুজ প্রিয় লেখকদের একটা হয়েছিলাম আমিও। বন তরুদের মর্ম আমার মতে আবিদ আজাদের শ্রেষ্ঠতম কাব্যগ্রন্থ। এই বইয়েই 'চাদ বিমানবালা' প্রভৃতি আসাধারণ কবিতা আছে। থিমের ব্যতিক্রমিতা ও উপস্থাপন রীতি- উভয় দিক থেকেই অসাধারণ। পরের বছর আবিদ আজাদ কাঁঠালবাগানের ঢালে বসালেন প্রেস ও প্রকাশনার অফিস। শিল্পতরু প্রেস। 'শিল্পতরু' নামে ত্রৈমাসিক পত্রিকাও বেরুতে শুরু করল অচিরেই। আমরাও নিয়মিত যাওয়া আরম্ভ করলাম ওখানে। রিফাত ছাড়া অন্যরা ছিলেন রাজু আলাউদ্দিন, অমিতাভ পাল, কাজল শাহনেওয়াজ, ....ইবনে দিলওয়ার শশী হক। আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু অকাল প্রয়াত কবি আহমেদ মুজিব 'শিল্পতরু প্রেস' এই কাজ করত। প্রায়ই দেখতাম ঘাড় গুঁজে প্রম্নফ দেখছে। আমাদের দেখে নিশ্চয় আড্ডা দেয়ার জন্য ওর মনটা আনচান করত। কিন্তু উপায় ছিল না। আবিদ আজাদ কেবল সুকবি ছিলেন না, অফিস চালানোর ক্ষেত্রেও দক্ষ ছিলেন। ওই শিল্পতরুর অফিসেই আমার আলাপ হয় আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে। মাঝে মাঝে আসতেন কবি-গল্পকার আল মাহমুদ। এসেই হাঁক-ডাক ফেলে দিতেন। আর আবিদও তার জন্য চা-সিগারেট আনাতে দেরি করতেন না। আমাদের প্রিয় কবি মুস্তাফা আনোয়ারও ওখানে আসতেন। মুস্তফা ছিলেন মান্নান সৈয়দ ও আবিদের খুবই ঘনিষ্ঠ। কিন্তু ষাটের অন্য বিখ্যাত কবিরা যেমন রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ বা সিকদার আমিনুল হক- এদের কাউকে ওই জায়গায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না। গুণ-মহাদেবরা আড্ডা মারতেন 'ইত্যাদি প্রিন্টার্স'-এ। 'ইত্যাদি' ছিল কবি অসীম সাহার প্রেস। বাবুপুরা-নীলক্ষেত রোডের পাশে। বাবুপুরা জায়গাটা এক সময় আমাদেরও প্রিয় হয়ে ওঠেছিল। ওখানে একটা বস্তি ছিল। সেই বস্তির এক গলির মুখে আমরা ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম। প্রধানত পানি আর তামাক খাওয়ার জন্যই। লিডার ছিলেন যথারীতি রিফাত চৌধুরী। ওই ঘরে নিয়মিত আসতেন কাজল শাহনেওয়াজ, অমিতাভ পাল। মুস্তফা আনোয়ারও বেশ কয়েকবার গিয়েছিলেন ওখানে। ও হঁ্যা! কথা বলা হলো না। ১৯৮৮-৮৯-৯০-৯১ এই বছরগুলোতে 'নিভৃতি চর্চা' নামে একটা ছোট কাগজ বের করতাম আমরা, রিফাতেরই পরিকল্পনায়। চারটা সংখ্যা বেরিয়েছিল। তো বাবুপুরা বস্তির ওই বেড়ার ঘর 'নিভৃতি চর্চা'র অলিখিত অফিসও ছিল। একটা বিষয় লক্ষণীয়, আমার ঘনিষ্ঠ লেখক বন্ধুদের প্রায় সবাই লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন। 'ছোট কাগজের মলাট'-এর সম্পাদক ছিলেন রিফাত চৌধুরী। অমিতাভ পাল বের করেছেন 'ব্রহ্মপূত্র'। কাজল শাহনেওয়াজের সম্পাদনায় বেরুতো 'ফ্রি স্কুল স্ট্রিট'। পুলক হাসান বহু আগে থেকেই বের করে আসছিলেন 'খেয়া'। 'খেয়া' তো এখনো বের হয়। পুলকেরই সম্পাদনায় এখন নিয়মিত বেরুচ্ছে 'প্রতিস্বর' নামের কাগজটি। মজার ব্যাপার, এদের সবার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এক সময় আমিও উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম লিটল ম্যাগাজিন করতে। ১৯৯০-৯১ সালে আমি পলাশ শিল্পাঞ্চল কলেজের ইংরেজির শিক্ষক। ঘোড়াশাল রেলস্টেশনের অনতিদূরে ওই পলাশ উপজেলা সদর। ওই কলেজেই ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলাম আজাদ নামে একটি ছেলেকে। আজাদ ওবায়দুর। শিল্পপ্রাণ যুবক। এখন সে ঘোড়াশাল পাইলট হাইস্কুলের হেড মাস্টার। তো আমার ইচ্ছার কথা শুনে সে উপর্যুপরি তাগাদা দিতে থাকে। তার তাগাদার চাপে এক সময় লেখা সংগ্রহ করি। কাগজের নাম হয় 'চশমা'। একটি সংখ্যাই বেরিয়েছিল। কেননা, ১৯৯২-এর শেষ দিকে আমি পলাশ ত্যাগ করে নাসিরনগর কলেজে যোগ দিই। ফলে আজাদও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ঘনিষ্ঠ লেখক-বন্ধুদের মধ্যে 'চশমা'য় অংশগ্রহণ ছিল মোহাম্মদ কামাল, জুয়েল মাজহার ও সানোয়ার মনির। আমার ও আজাদের একগুচ্ছ করে কবিতা ছিল। চব্বিশ পৃষ্ঠার চটি কাগজটি সম্পাদকতার প্রথম প্রয়াস। কিছুটা বুদ্‌বুদ তুলে হারিয়ে গেছে। আমার প্রথম উলেস্নখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ 'আবহমান উলুধ্বনি'র প্রকাশকাল ১৯৮৭। পরের বছর বেরিয়েছিল রিফাত চৌধুরীর কবিতার বই 'মেঘের প্রতিভা।' সম্ভবত ১৯৮৯-এ প্রকাশিত হয় কাজল শাহনেওয়াজের 'জলমগ্ন পাঠশালা'। আহমেদ মুজিবের কাব্যগ্রন্থ 'প্রেমের কবিতা' আমরা হাতে পেলাম ১৯৯০ সাল। রিফাত, কাজল ও মুজিবের বইয়ের প্রকাশক ছিলেন আবিদ আজাদ। তিনি শুধু মানুষ রিফাতকেই নয়, তার কবিতাও পছন্দ করতেন। আবদুল মান্নান সৈয়দও রিফাতের কাব্যের অনুরাগী ছিলেন। ক্রমশ আমরাও তার কবিতার মনোযোগী পাঠকে পরিণত হলাম। সমকালীনদের ভেতর তিনি যথেষ্ট প্রিয় হয়ে উঠলেন আমাদের। এই প্রীতির কারণ কি? প্রধান কারণ সাবলীল ভাব-কল্পনা ও তার প্রকাশ উপযোগী সহজ ভাষা। রিফাতের কবিতার আরেকটা বড় গুণ সারল্য যা এখনো বর্তমান। এই সারল্য প্রকাশরীতির। তার কবিতার থিম কিন্তু সরল নয়। মানব মনের অসংখ্য জটিল ও অব্যাখ্যেয় অনুভবকে তিনি ধরতে চেয়েছেন যতদূর সম্ভব যোগাযোগ সক্ষম ভাষায়। আজ এ কথা বলতে আমার কার্পণ্য নেই, রিফাত চৌধুরী আশির প্রজন্মের প্রধান কবিদের একজন। তাকে কেন্দ্রে রেখে সহজ কবিতার একটা অপ্রকাশ্য আন্দোলন আমরা চালিয়ে গেছি আশির দশকের শেষ থেকে পুরো নব্বই দশক জুড়ে। \হযেমন নির্মলেন্দু গুণের 'প্রেমাংশুর রক্ত চাই', ভাস্কর চক্রবর্তীর 'শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা' কিংবা মঞ্জুরে মওলার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'নিমগ্ন, কি করে পারো?' তেমনি রিফাতের প্রথম কবিতা বই 'মেঘের প্রতিভা' ও লেখকের প্রায় সবখানি প্রতিভা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল। উত্তরকালে, একটা পর্যায়ে রিফাত বিষয়বস্তু নিয়ে নানা কিছু ভেবেছেন, আঙ্গিক চিন্তাও ভর করেছিল তার মধ্যে, ডায়ালগ ধর্মী কবিতাও লিখেছেন কয়েকটা। 'আমি একজন ভূগোলবিদ'সহ একাধিক দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন। ভালো করে পড়লে চোখে পড়ে, চিন্তার ক্ষেত্রেও রিফাত পরবর্তী ১৫/২০ বছরে অনেকখানি বদলে গেছেন। কিন্তু আমার এখনো মনে হয় কবিতার মূলসুর ও প্যাটার্নের দিক থেকে তিনি ওই 'মেঘের প্রতিভা'র দীপ্তিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। এই না-পারাকে আমি ব্যর্থতা বলব না। এটাও কবিত্বের একটা টাইপ। পৃথিবীতে এরকম কবি অসংখ্য আছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, শহীদ কাদরী এরাও মোটামুটি এই ধরনের। আধুনিক কবিতায় বড় জায়গা জুড়ে আছে নগর। যে সব কৃতী কবির কাব্যে নগরের প্রাধান্য নেই, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির গ্রাম্যতা আক্রান্ত নয়। শহরের ছবি, আরও পরিষ্কার করে বললে শহরের নেগেটিভ ছবি, রিফাত চৌধুরীর কবিতায় বারবার এসেছে। তার প্রায় অনিকেত, বোহেমিয়ান লাইফস্টাইলের প্রভাবও আছে তাতে। 'মানসিক দ্বন্দ্ব' কবিতায় নগরের ছবি ধরা পড়েছে এভাবে- 'আকাশ ছোঁয়া কংক্রিটের বাক্সেও কুৎসিত চেহারা/আর দেশলাই বাক্সের মতো ঘরগুলি ঘিরে থাকে তাদের-/রাস্তাগুলো বেহুঁশ জ্বোরো রোগীর মতো শুয়ে থাকে।/গলিগুলো পোলিও রোগীর পায়ের মতো ব্যাকা চোরা।' আবার দেখুন 'অন্ধকার' শব্দটির প্রতীকে লেখক জীবনের নিরাশাজর্জরিত অনুভব মূর্ত করে তুলেছেন কীভাবে- 'ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস আসছে। বেলা সত্যিই পড়ে এসেছে।/ সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মাঠে গভীর অন্ধকার।/আমাদের বাড়িতেও ওই অন্ধকার ঢুকছে। /অন্ধকার এস পড়েছে আমার বিছানায়।/আমার মুখে অন্ধকার'(ঘরান্ধা)। ওই একই কবিতায় রিফাত যখন বলেন, 'অন্ধকার আমার এই ঘরে গোত্তা মেরে ঢুকে পড়েছে' তখন তার কবি কল্পনার বিশিষ্ট ধরনটি আমরা বুঝে নিতে পারি। আজ থেকে ৩০/৩২ বছর আগে রিফাত আমাকে তার এক পঙক্তির একটি কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলেন। সেটা হচ্ছে- 'একটা সবুজ শাড়ি পরা মহিলা তারে একটা সবুজ শাড়ি মেলে দিচ্ছে।' শুনে তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়েছিল পাউন্ডকে। চিত্রকল্পবাদী আন্দোলনের নেতা এজরা পাউন্ড ও তার সতীর্থ এমি লোয়েল, হিলডা ডুলিটল প্রমুখ কবি তাদের মানসপ্রতিক্রিয়া এক/দুই/তিন লাইনের মাধ্যমেই সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। এখন ভাবি, স্বভাবকবিত্বের শক্তিসম্পন্ন একজন অদীক্ষিত কবিও যুগধর্মের প্রভাবে ওই ধরনের কবিতা লিখতেই পারেন। আশির প্রজন্মের আরেকজন শক্তিমান কবি মিজান রহমানের ক্ষেত্রেও আমরা একই জিনিস দেখেছি। আশির প্রজন্মের কবিরা বিকশিত হয়েছেন পুরো নব্বইয়ের দশকজুড়ে; কেউ কেউ তারও পরে। রিফাত চৌধুরীর আশি শতাংশ কবিতাই ছয় থেকে বারো পঙক্তির ভেতর সীমাবদ্ধ। মিজান রহমানের কবিতাও তাই। নব্বইয়ের দশকে, এমনকি পঞ্চাশোর্ধ বয়সেও রিফাত তার কবিতার ওই আঁটোসাঁটো চেহারাকে ছাড়িয়ে গিয়ে ৫০/৬০ লাইনের কবিতা লিখেছেন। আত্মায় না হলেও তার কাব্যের শরীরে অন্তত এই পরিবর্তনটা ঘটেছে। কিন্তু আমার গোড়া থেকেই পছন্দ তার ছোট ছোট কবিতাগুলো। ওইসব লেখায় তুলে আনা জগতছবির দৃশ্যমানতাকে ছাড়িয়ে গেছে তাদের ভাবমগ্ন অন্তঃস্থল। সেই জিনিস তার পরে বিশেষ করে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের, কবিতায় আমরা সেভাবে পাই না। নিছক জীবিকার জন্য তাকে যে ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়েছে সেই কাজের পরিমন্ডল ও শিল্প নিরপেক্ষ সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানো- পুরো ব্যাপারটা কবিতার মতো সূক্ষ্ণ শিল্পের পরিপন্থি বলেই মনে হয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস কবি রিফাতের ভাবাতুর অন্তর্মুখিতার সঙ্গে তা খুবই সাংঘর্ষিক। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। রিফাত হারিয়ে ফেলেছেন। তার কবিতার ওই স্বোপার্জিত পথটি তার এখনকার লেখায় মাঝেমধ্যে কবিত্ব ঝলক দিয়ে উঠলেও পুরো লেখাটা পড়ার পর আমি আর সেই পরিতৃপ্তি পাই না। গভীর গাঢ় কবিতা- যা আমাদের দিয়ে এসেছে চিরকাল। বিষয়টিকে এখন আমি এভাবে দেখি, দশ/বারো বছর আগে রিফাত আমাদের ছেড়ে চলে যেতে পারতেন এবং তা হলেও কবি হিসেবে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না। কারণ কবির যে ইমেজ (তা যেমনই হোক) তিনি গড়ে তুলতে পেরেছিলেন অনূর্ধ্ব পঞ্চাশ বয়সেই সেটাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে; ভবিষ্যতেও হয়তো রাখবে। তাছাড়া সারা জীবন কবিতা লিখতেই হবে এমন তো কথা নেই। পৃথিবীর অনেক মহারথীই পঞ্চাশের পর আর কাব্য চর্চা করেননি। অন্য কিছু লিখেছেন বা কিছুই লেখেননি।র্ যাবো অনেক বছর বেঁচে ছিলেন। কবিতা লিখেছেন মাত্র কয়েক বছর। আমাদের সময় সেনও একটা পর্যায়ে কবিত ছেড়ে দিয়েছিলেন। আশির প্রজন্মেও কনিষ্ঠ লেখকরাও আজ সাতান্ন পেরিয়েছে। অধিকাংশেরই বয়স ৬০/৬১। কারও কারও তার চেয়েও বেশি। এরা সবাই জীবনের অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। ভাবতে ভালো লাগে; কবি, কথাসাহিত্যিক, গদ্যকার ও সব্যসাচি লেখক মিলে আমাদের বেশ ক'জন সাহিত্যিক আছেন যাদের রচনা উচ্চাশী নবীন লেখকদের বারবার পড়তে হবে। এই দলে আছেন রাজু আলাউদ্দিনের মতো শক্তিমন্ত কবি ও প্রাবন্ধিক, অমিতাভ পালের মতো ব্যতিক্রমী গল্পকার কবি, জুয়েল মাজহারের মতো ভিন্ন আকাঙ্ক্ষী কবি-অনুবাদক, পুলক হাসানের মতো কবি-সম্পাদক। মিজান রহমান, আহমেদ মুজিব, কাজল শাহনেওয়াজ, শামসেত তাবরেজী, শরীফ শাহরিয়ারের মতো অন্য স্বাদের কবিরাও আছেন। বাদ দিতে পারব না মোহাম্মদ কামাল, বদরুল হায়দার, শশী হক, মারুফ রায়হান, রেজাউদ্দীন স্টালিন, শাহীন রেজা প্রমুখকেও। তবে শুধু কবিতা লিখে এবং স্রোতের বিপরীতে নৌকা বেয়ে রিফাত চৌধুরী যে ভাবমূর্তিটি অর্জন করেছেন তাকে আমাদের আলাদাভাবে সম্মান করতে হবে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে