বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪, ৮ শ্রাবণ ১৪৩১

নূর জাহানের বিতর্কিত প্রেম উপাখ্যান

আহমেদ তেপান্তর
  ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০০:০০
নূর জাহানের বিতর্কিত প্রেম উপাখ্যান

বিশ্বব্যাপী সঙ্গীত পিপাসুরা তাকে চেনেন মালিকা-ই-তারান্নুম, ইংরেজিতে কুইন অব মেলোডি বা সুরের রানী হিসেবে। যিনি সুরের মায়াজাল আর সৌন্দর্যের ছটায় পৃথিবীর আলো বা নূর জাহান নামে দু্যতি ছড়িয়েছেন। দেশের গন্ডি পেরিয়ে এই ছটায় আলোকিত হয়েছেন কোটি কোটি সঙ্গীতভক্ত। ছয় দশকের কর্মজীবনে গান ছাড়াও, অভিনয় আর পরিচালনাতে হাত পাকিয়েছেন। ব্রিটিশ ভারতে জন্ম নেওয়া এই গায়িকা থিতু হন পাকিস্তানের লাহোরে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী সঙ্গীতশিল্পীও বলা হয় তাকে।

একই সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণেও তিনি সবমহলে আলোচিত! পঞ্চাশ ও ষাট দশকজুড়ে ঘরে ঘরে চর্চিত বিষয়বস্তুর নাম 'নূর জাহান'। এমন কথা পাঠকমাত্রই সাদত হাসান মান্টোর গাঞ্জে ফারিস্তে গ্রন্থে পাবেন। সুরের মায়াজালে দুর্নিবার নূর জাহান নিজেকে শরাবের ন্যায় সমর্পণ করতেন, তেমনি প্রেমে এক রত্তি কম যাননি! সুর আর সৌন্দর্যের কলায় কুপোকাত করেছেন বহু বেগানাকে, তবে তাদের সৃষ্টির উলস্নাস আর পুরুষত্বই তাকে আকর্ষণ করত। এমনই এক উদাহরণ খ্যাতিমান পাক ক্রিকেটার নজর মুহাম্মদ। ভারতের বিপক্ষে ১৯৫২ সালে ৫১৫ মিনিট ক্রিজে থেকে দলের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম অপরাজিত সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জনের কারণে ক্রিকেটীয় ইতিহাসে সুপরিচিত। কিন্তু নজর মুহাম্মদের কর্মজীবনের যেমন একটি উত্তাল সূচনা হয়েছিল, আবার নূর জাহানের সঙ্গে জড়িয়ে নাটকীয়ভাবে শেষ হয়েছিল!

এ নিয়ে পাকিস্তানের প্রভাবশালী ডন, দি পাকিস্তান টুডে, ক্যাচনিউজ বিভিন্ন সময় প্রতিবেদন প্রকাশ করে- যার ভাবানুবাদ এ লেখায় তুলে ধরা হলো- 'নূর জাহানের বিতর্কিত প্রেম উপাখ্যান' শিরোনামে। ২১ সেপ্টেম্বর কণ্ঠশিল্পীর ৯৮তম জন্মবার্ষিকী।

বিভিন্ন লেখায় ও সাক্ষাৎকারে এটি নিশ্চিত নজর মুহাম্মদের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কারণেই প্রথম স্বামীর সঙ্গে তালাক হয় নূর জাহানের। যদিও ফিল্মিক বোদ্ধাদের দাবি একাধিক নারীর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন স্বামী পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভী। এখানে 'নজর' কেবল একটা উছিলা মাত্র। সুযোগ খুঁজছিলেন এবং হাতেনাতে পেয়ে সুযোগ কাজে লাগিয়েছিলেন।

অপরদিকে, ক্রিকেটের বাইবেল উইজডেন অনুসারে নজর মুহাম্মদের ক্যারিয়ার শেষ হয়েছিল একটি ব্যক্তিগত দুর্ঘটনার কারণে। প্রকৃত সত্য অনেক পর প্রকাশ হয় তিনজনের জবানিতেই!

মৃতু্যর পাঁচ বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে নূর জাহান নজর মুহাম্মদের সঙ্গে গভীর প্রণয়ের কথা স্বীকার করেন। ওই সময় সাবেক স্বামী শওকতও প্রসঙ্গটি সামনে আনেন। তাদের এই সাক্ষাৎকারে নজর মুহাম্মদের সঙ্গে প্রেমের মুগ্ধতা প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে নজরের ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার নেপথ্য কারণও!

নব্বইয়ের দশকে লেখা ক্রিকেট বই 'প্রাইড অ্যান্ড প্যাশন'-এ লেখক উমর নওমান লিখেছেন- বিবাহিত নূর জাহানের সঙ্গে অন্তরঙ্গ থাকা অবস্থায় নজর মুহাম্মদ শওকতের ফিরে আসা টের পেয়ে তাড়াহুড়ো করে ঝাঁপ দিয়ে পালানোর পথে আহত হন। এ ঘটনায় আর কখনোই ক্রিকেটে ফিরতে পারেননি নজর মুহাম্মদ।

সাংবাদিক ওয়াসিম আকবর সত্তরের দশকে সাপ্তাহিক 'পিমন'-এর জন্য নূর জাহানের খোলামেলা জীবন নিয়ে বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন। ওই সাক্ষাৎকারে নূর জাহান প্রথম স্বীকার করেন নজরের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কথা। সঙ্গে এও বলেন, একজন উঁচুদরের ক্রিকেটার বলে নয়, সম্পর্ক জড়িয়েছি মূলত তার অসাধারণ গায়কীর কারণে। তার জীবনে আসা প্রথম পুরুষ নজর।

নূর জাহানের মতে, তিনি প্রথম নজর মুহাম্মদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন যখন তিনি খুব ছোট ছিলেন এবং তার বড় ভাই সঙ্গীতশিল্পী ফিরোজ নিজামীর কাছে গান শিখতেন। তার মতে, গান শেখার ক্লাসে প্রথমবারের মতো নজরের বাঁকা চোখে বিদ্ধ হয়েছিলেন। যদিও পরিস্থিতি এড়াতে কিছুটা বকা নজরকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যখন জানতে পারেন নজরের গান রেডিওতে বাজে তখন বাঁকা চোখে আত্মসমর্পণ করেন নূর জাহান।

ওই সাক্ষাৎকারে ম্যাডামের দাবি ছিল সম্পর্কটা দুই পরিবারের সবাই জানত- তবে নজরের পরিবার রাজি না হওয়াতে বিয়ে হয়নি, ফলে আশাহত হয়েই নূর জাহান শওকত হোসেন রিজভীকে বিয়ে করেন। কিন্তু কথায় বলে প্রথম প্রেম কখনো বিস্মৃত হয় না, তেমনি হয়েছিল নজর-নূর প্রেম। দু'জনেই গোপনে সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। স্বামীর অনুপস্থিতিতে প্রেমের সাগরের ফেনায় গা ভাসিয়ে স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু এটি যে একটা সময় কাল হতে পারে দু'জনের জন্য তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে চাননি প্রেমকাতর এই যুগল!

ওদিকে স্বামী শওকতকে জড়িয়ে দুই অভিনেত্রীর গরম খবর বাজার সয়লাব। সংসার জীবনে তিন সন্তানের জননী নূর জাহান কিছুটা আহত হলেও প্রলেপের জন্য হিতাহিতজ্ঞান ভুলে নজর মুহাম্মদের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন আরও নিবিড়ভাবে। এর মধ্যেই একদিন হুট করে গৃহে প্রবেশ করেন শওকত। টের পেয়ে দৌড়ে পালাতে গিয়ে দেয়াল থেকে পড়ে হাত ভাঙেন নজর মুহাম্মদ। এক সাক্ষাৎকারে শওকতের দাবি বিশ-পঁচিশ ফুট ওপর থেকে লাফ দিয়ে কেবল হাতই ভাঙেননি, জ্ঞান হারিয়ে ছিলেন নজর।

অপরদিকে, এই লাফ দেওয়া ঘটনার বর্ণনায় নজর বলেন, আমি শুনেছিলাম বন্দুক হাতে আমাকে মারতে খোঁজ করছিলেন শওকত। সেই ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে এমন ঝুঁকি নিয়েছিলাম। নজরের এমন দাবিকে অস্বীকার করেননি শওকত। বলেন, সেদিন যদি বন্দুক থাকতো তাহলে সত্যি তিনি গুলি চালাতেন!

তবে স্থান নিয়ে তারতম্য থাকলেও নূর জাহান তার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তিনি নজর মুহাম্মদের সঙ্গে তার বাড়িতে নয়, অন্য কোথাও দেখা করেছিলেন। ওইদিনের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন একজন অভিনেত্রীকে ঘিরে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া প্রসঙ্গে নজরের কাছে কেবল সান্ত্বনা পেতেই এসেছিলেন। কিন্তু শওকতের হাতে পিস্তল আছে এমন ভাবনা থেকেই নজরকে তাড়িয়ে দেন, আর নজরও প্রাণ বাঁচাতে দেয়াল থেকে লাফ দেয়। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি। বেচারাকে চিরদিনের জন্য ক্রিকেট ছেড়ে দিতে হয়!

পরবর্তী সময়ে যখন নূর জাহানের সাক্ষাৎকারের বিষয়গুলো জানতে পারেন তখন সেও সাংবাদিক মুনির এ মুনিরের সহায়তায় 'নূর জাহান অর মে' গ্রন্থে বিয়ে বিচ্ছেদের ২৭ বছর পর এই গোপনীয়তাগুলো প্রকাশ করেছিলেন।

তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে শওকত দাবি করেন, নজর-নূরজাহান প্রেমের বাতায়ন এতটাই হাওয়া বইছিল যে গৃহভৃত্যরাও এ নিয়ে বিব্রত ছিল।

শওকত হুসেন রিজভির মতে, সেদিন তিনি লাহোরের ইসলামিয়া পার্কের কাছের বাড়িতে পৌঁছান যেখানে বারান্দায় বিছানায় এক সঙ্গে শুয়ে ছিলেন নজর মুহম্মদ এবং নূর জাহান, তার কাছে পিস্তল ছিল না, যদি থাকত তবে সে দুজনকেই গুলি করতেন।

শওকত হুসেইন রিজভী বলেন, ঘটনার এক পর্যায়ে নজরের প্রতি তার ভালোবাসার কথা স্বীকার করেন নূর জাহান। আর এর পরপরই বিচ্ছেদ ঘটে তাদের।

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নজর মুহাম্মদ সম্পর্ক নিয়ে মৌন থাকলেও জীবনের শেষভাগে সাংবাদিক ইবনে ইউনিসকে একটি সাক্ষাৎকারে ঘটনার কিছু বিবরণ বলেছিলেন, যা প্রকাশিত হয়েছিল। তুফায়েল আখতারের 'নূর জাহান ফিতুর জাহান' বইতে।

ওই সাক্ষাৎকারে, তিনি স্বীকার করেছেন- নূর জাহান জাতীয় দলের ক্রিকেটার হওয়ায় তার প্রতি আকৃষ্ট হননি, বরং পুরুষত্ব, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং রাগ জ্ঞানের কারণে কাছে এসেছিলেন।

নজর মুহাম্মদ বলেন, আমি নূর জাহানের ভালোবাসার জন্য আমার হাত বিসর্জন দেওয়ার পাশাপাশি আমার টেস্ট ক্যারিয়ারও শেষ করে দিয়েছিলাম এবং এই ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে শওকত হোসেন রিজভী নূর জাহানকে তালাক দেন।

তার মতে, তিনি যদি কুমারী হতেন তবে তিনি নূর জাহানকে বিয়ে করতেন, কিন্তু সন্তানের কারণে তিনি তা করতে পারেননি এবং নূর জাহান তাদের প্রতি হতাশ হয়ে পরবর্তী সময়ে বয়সে ছোট অভিনেতা ও প্রযোজক ইজাজ দুররানীকে বিয়ে করেন।

নজর মুহাম্মদ বলেন, মানুষ আমাকে যখন বলে সে নূর জাহানের প্রেমিকা তখন আমি তাদের বলি আমি নূর জাহানের প্রেমিকা নই, আমি প্রেমিক।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে