মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০
walton
বই আলোচনা

মৈনাক ছুঁই নীলমুদ্রায়

মিজান মনির
  ০৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ০০:০০

কবি স্বাধীনতার পূজারি। স্বাধীন পথেই চলতে তার আনন্দ। কবি রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। প্রেম আর হৃদয়ের কোমলতা তাকে আচ্ছন্ন করবই স্বাভাবিক। যে কোনো শৃঙ্খলকে দু'পায়ে দলিত করে সম্মুখে এগিয়ে চলে স্ব-ইচ্ছায়। তাই তো কবি সাইয়ি্যদ মঞ্জু অকুতোভয় কণ্ঠে গেয়ে উঠেন- 'নিজকে খুন করি রোজ কেবল-ই বাঁচার আশায়।'(আত্মহননকাল, পৃষ্ঠা ৪৮)। কবিতার কাছে আশা করা যায় স্নিগ্ধতা, ছন্দ-লয়-তাল-সুর, আবার কখনো কখনো ময়ূরের নৃত্যের চোখ জুড়ানো ঢেউ। কখনো সাগরের ঢেউয়ের স্রোতে ভেসে আসা না বলা কথার গর্জন। আবার কখনো বিল-ঝিলের টলমল পানিতে ফোটে থাকা হরেক রকম পদ্মফুলের মতো শব্দ ও বাক্যের অমিত মূর্ছনা ও সৌন্দর্য। এসব বৈশিষ্ট্য কবিতার বিষয়-মেজাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কবিতাই বলে দেয় তাকে কোন রূপে সাজাতে হবে, নন্দনের কোন কাপড় পরলে তাকে রূপবতী লাগবে। এই রূপের সঙ্গে রসগত গুণও সমানভাবে প্রয়োজনীয়। তবেই কবিতা কবিতা হয়ে উঠে।

'মৈনাক ছুঁই নীলমুদ্রায়' কাব্যগ্রন্থটি হাতে নিলে মন ছুঁয়ে যায়। গ্রন্থটিকে ৬৪টি কবিতা জায়গা পেতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু একজন কবিকে চেনার জন্য তা মোটেও সামান্য নয়। কারণ এর মধ্যেই কবির কাব্যাদর্শ, শিল্পদর্শন, প্রতিভা, প্রবণতা-শিল্পকৃতি প্রভৃতি নির্ধারণ করা সম্ভব।

বর্তমান যেখানে পুঁজিবাদের করাল গ্রাসে নদী হত্যা থেকে শুরু করে বনাঞ্চল উজাড় করে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের নামে পরিবেশ বিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরি করছে সেখানে মানুষকে সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য নিত্য যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে। 'মৈনাক ছুঁই নীলমুদ্রায়' কাব্যগ্রন্থের লেখক এসব প্রতিকূলতার ভেতরেও নিজের অন্তর চক্ষু এবং মনন দ্বারা শব্দের ঝনঝনানির সুরে সুরে বাক্যের অপূর্ব মিলনে আবিষ্কার করেছেন গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা। গ্রন্থটির নামকরণেও যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন কবি সাইয়ি্যদ মঞ্জু। কবি অকপটে স্বীকার করেন এবং নিজের সঠিক পরিচয় জানাতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তিনি একজন মৎস্যজীবী। আমিও একজন পাঠক হিসেবে বলতে সুযোগ পেয়েছি। কবি মৎস্যজীবী পরিবারের একজন হাল ধরা সন্তান। পরিবারের চাপ, তার ওপর জেলা-উপজেলার সাহিত্য-সংস্কৃতির খবরা-খবরের সন্ধানে তার বেশির ভাগ সময় ব্যয় হয় সাগরের স্রোতের মতো। শত ব্যস্ততার মধ্যেও থেমে নেই কলমের জোর, মনন শক্তি। এখানে উলেস্নখ করতে হয়, কবি সাইয়ি্যদ মঞ্জু'র কবিতা পাঠে সহজে আঁচ করা যায় তার লেখার বিষয় নদী-সমুদ্রকেন্দ্রিক জীবনাচরণ ও জেলে সম্প্রদায়ের নানাবিধ কর্মকান্ড। বদ্বীপ তথা পুরো বিশ্বের দীর্ঘ সৈকতখ্যাত কক্সবাজারের তরুণ উদীয়মান সম্ভাবনাময় এক লিখিয়ে। কবি'র কবিতার শিরোনাম চোখে পড়লে পড়ামাত্রই মনে হবে রবীনন্দ্রনাথ ঠাকুরের উত্তরসূরি! কেননা, রবী ঠাকুর জীবনবাদী একজন কবি। তিনি তার জীবনকে সামগ্রিকভাবে প্রকৃতির বিচিত্র রূপ, রং, গন্ধের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন গভীরভাবে। মানুষের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, কান্না-হাসি, দুঃখ-বেদনার বাস্তব চিত্র এঁকেছেন শব্দের তুলিতে। সে কারণেই আমরা লক্ষ্য করি, কবি'র সাহিত্যকর্মে নদী, পালতোলা নৌকা, নদীর দুই ধারে সবুজ ফসল ভরা ক্ষেত, ছেলেদের মাছ ধরা, মাছরাঙা পাখির হঠাৎ করেই নদীর পানিতে লাফিয়ে পড়া, সদ্য কাটা আমন ধানে বোঝাই নৌকা, দুরন্ত কিশোরদের নদীর পানিতে লাফিয়ে পড়া, পলস্নীবধূর লজ্জামিশ্রিত হাসি, নদীর ঘাটে স্নানরত নারী, শিশুর কোলাহল, নৌকার মাঝিদের হাঁকাহাঁকি, বানের পানিতে পস্নাবিত বাংলার গ্রামের চিত্র ও নদী তীরবর্তী নিসর্গ।

কবি সাইয়ি্যদ মঞ্জু পেশায় একজন মৎস্য রপ্তানিকারক। সমুদ্রনগর তার কর্মস্থল। জন্ম বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়িদ্বীপখ্যাত মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের সবুজ প্রকৃতিঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যের ঢেউখেলানো বটতলী গ্রামে। কবিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল কৈতরদিয়া ছোট নদী, কুহেলিয়া নদী, বাঁকখালী, মাতামুহুরী নদী এবং প্রান্তিক মানুষের জলজীবন। জীবনের সঙ্গে নদীর প্রবাহ যেন মানবজীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্যের প্রতিচ্ছবি। এসব নদী বিধৌত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভূমি তথা গ্রামকে শহর বানাবার অপচেষ্টায় তৎপর আজকের সভ্যতা। এ ধারায় ভেসে গেছে কবির সহজ-সরল গরিব জন্মদাগ! শেষরক্ষা হবে কি? নাহ! কবি জন্মদাগ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের ধ্বংসের ছবিটি সুনিপুণভাবে এঁকেছেন 'শহরের মানচিত্র' শিরোনামের কবিতায়-

'নদী হত্যার পর

নগরায়ণের ছবি আঁকে কফিনের উপর....

---তবুও দাঁড়িয়ে থাকে শহর, শহরের ঠিকানায়

সর্বংসহার মতো

ক্ষুধা-অক্ষুধার ভার যত আপন মস্তকে, আমার শহর।'

সাইয়ি্যদ মঞ্জু'র রচনায় ঘুরেফিরেই নদীগুলোর উলেস্নখ পাওয়া যায়, সেগুলো হলো- কৈতরদিয়া, কুহেলিয়া, বাঁকখালী, মাতামুহুরী, কর্ণফুলী এবং বঙ্গোপসাগর। কবির সাহিত্যকর্মের মধ্যে নদীবিষয়ক কবিতা, সংগীত এতটাই বিস্তৃত যে স্বল্প পরিসরে সেগুলোর বর্ণনা মোটেই সম্ভব নয়।

কবি'র যে কাব্যগ্রন্থ নিয়ে ইতিপূর্বে পাঠপ্রতিক্রিয়া শুরু করেছি। ওই গ্রন্থের ৩১ পৃষ্ঠায় 'সোনাবউ' শিরোনামে একটি কবিতা আছে। সেটি পুরোটা উলেস্নখ করতে বাধ্য হলাম-

'ধলপ্রহরে উঠিও নিদ্রালস যত থাক চোখে, রাঁধিও গরমভাত শুঁটকি ভর্তায় দিব মুখে। পান-চুন সুপারিতে পানখিলি যতনে বানিও, ঘুমঘোরে থাকি যদি সোনাবউ আমাকে ডাকিও। কৈতরদিয়ার খালে পুঁতেছি চরজালের খুঁটি, দেরি হয়ে যায় যদি দসু্যদল মাছ নেবে লুটি। রোদে দিও ছুরি মাছ দাঁড়কাকে রাখিও নজর, উঠানেতে ঝাড়ু দিও লক্ষ্ণীবউ না হতে ফজর।

ঘামফুল গায়ে শোভা ভোরসাঁঝে রথের বাগান, বাঁকে বাঁকে রচে যায় অগোচরে জীবনের গান। জলকুল প্রেমফুল ফুটে আছে এ প্রান্ত ধূ ধূ, ভালোবাসা মনঘরে অবিরল প্রিয়তম বধূ।'

এই কবিতায় জীবনযাপনের নানা উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। সোনাদিয়া দ্বীপের কূলঘেঁষা ছোট নদী কৈতরদিয়ার বুকে জীবন রসদ এর জন্য চরজালের খুঁটি পুঁতেছে। তাই প্রাণের প্রিয়তমা ঘরণী, অর্ধাঙ্গিনীকে অত্যন্ত আদরের সঙ্গে ভালোবাসার ভঙ্গিতে আদেশ দেওয়া দেখে সত্যি-ই আশ্চর্য হওয়ার বিষয়। তার ওপর কবিতাটি পয়ার ছন্দে রচিত। কবিতা পড়তে খুবই ভালো লাগে। ছন্দের তালে তালে নৃত্য করে মন।

সোনাদিয়া দ্বীপের তীরবর্তী নিসর্গের এমন জীবন্ত বর্ণনা আর কখনো কোনো শক্তিশালী লেখকের কল্পনায় উঠে আসছে কিনা জানি না। ভালোলাগার দিক থেকে কবিতাটি হুবহু তুলে দিতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছি।

বর্তমানে যে হারে পাহাড় এবং নদী ধ্বংস করা হচ্ছে। হয়ত অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবী বিলীন হয়ে যাবে। পলস্নীকবি জসীমউদ্‌দীনের কবিতার ভাষায় নকশি কাঁথার মাঠ খ্যাত শান্ত, সবুজ প্রকৃতি তথা গ্রামবাংলা কেটে নগর গড়া হচ্ছে, এতে করে পরিবেশ ক্ষয় হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাসা বাঁধছে। এই বিষয়গুলোর দিকে তাকালে গাঁ কেমন জানি করে। কবিও তার প্রতিবাদ ব্যক্ত করেছেন তার কবিতার মাধ্যমে এই ভাবে-

'হাট জমেছে বেশ

বিক্রি হয়ে যাব তোমার-ই রাখা দামে

------

মুছে দিব জন্মঘর সাফ কবলায়।

--------

আসবাব বোঁচকা ভর করে পিঠের উপর

পড়ে থাকে বিরান ভূমে শতবর্ষের আদর

পলায়ন রোদে সান্ধ্য এলে

অশনি ঝুলে যেন চোখের পর্দায়।' (সাফ কবলা, পৃষ্ঠা ৩৭)।

এই ক্ষেত্রে কবির ব্যক্তিক ও মনোসংকটকে আমরা আমাদের আর্থসামাজিক, প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করলে সামগ্রিক সংকটকে চিহ্নিত করতে পারি। তাতে ব্যক্তিক হতাশা সমষ্টি হয়ে পুরো সমাজের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়। এমন প্রত্যয় চৌষট্টিটি কবিতার মধ্যে নানাভাবেই বিস্তার করে আছে।

'সাফ কবলার দিনে-

কাঁদে মৈনাক চোখ

----

সবুজের পসরা মুছে

ঊষর ভূমে নিশ্চিহ্ন হতে হতে অরণ্যশোভা

শূন্য হাত তুলে রাখি প্রজন্মের নামে।' (কবিতাংশ, মৈনাক চোখ, পৃষ্ঠা ৩৩)।

জীবন ও জীবিকার সন্ধানে মানুষ প্রতিনিয়তই ছুটছে দিগ্বিদিক। কবিও এই সমাজেরই একজন সচেতন, ভাবপ্রবণ ও অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ। তিনিও ব্যক্তি জীবনে এই বৃত্তের বাইরে নন। জীবন, মাটি ও মানুষের টানে পুড়ছে কবি হৃদয়!

মা, মাটি ও মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এ চরণগুলো সেই অভিব্যক্তির কথাই জানান দিচ্ছে। পাঠকের বোধের জমিতে কাব্য চাষের সফল ও অনবদ্য পঙ্‌ক্তিমালা। অতি সহজেই পাঠককে পৌঁছে দেবে সাহিত্যের খুব গভীরে। প্রতিটি ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে প্রান্তিক জীবন, প্রকৃতি ও অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বান। সঙ্গত ও যৌক্তিক হয়েছে এ কাব্যগ্রন্থটির নামকরণ। এ নামে বইটি স্বার্থক। প্রযুক্তির সভ্যতায় ব্যস্ত পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যান্ত্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। একটানা ছুটে চলার ঘোর লাগা তাড়নায় পেছন ফিরে তাকাবার সময়টুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে মানুষ। বর্তমান প্রযুক্তি যুগের মানুষ ভাবে যেখানে জীবনযুদ্ধের গঁ্যাড়াকলে জীবন প্রায় অতিষ্ঠ। সেখানে কাব্যচর্চা কিংবা কবিতা পাঠের মানে কী! সাহিত্যের একজন পাঠক হিসেবে নির্দ্বিধায় বলতে সাহস করি, সমাজ বদলাবার জন্য পথে নামবার কোনো বিকল্প নেই এবং কোনোকালেই ছিল না। ইতিহাস সাক্ষী। তবুও কবিতা তার আপন গতিতে স্থির এবং বৈশিষ্ঠ্যে চির ভাস্বর। কারণ, পথে নামবার প্রেরণা আসে কবিতা থেকেই। যে কবি তার কবিতা দিয়ে এ কাজটি করতে পারেন, সে কবি স্বার্থক। এ মাপকাঠিতে 'মৈনাক ছুঁই নীলমুদ্রায়' কাব্যগ্রন্থের কবি সাইয়ি্যদ মঞ্জু সত্যি সফল এবং এ গ্রন্থটি অনন্য সৃষ্টি। জয় হোক কবিতার এবং কবি'র।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে