বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

জাদুবাস্তবতা সাহিত্যে এর প্রয়োগ

জাদুবাস্তবতা সাহিত্যে এর প্রয়োগ

বর্তমান বিশ্বসাহিত্যে জাদুবাস্তবতা ভীষণ জনপ্রিয়, বলতে গেলে তুমুল আলোচিত একটি বিষয়। বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যে এর সফল প্রয়োগ ঘটেছে। ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার নিপুণ কারিগর গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের কয়েকজন লেখক তাদের গল্প উপন্যাসে জাদুবাস্তবতার সফল প্রয়োগ ঘটান, তবে তারা মার্কেজ দ্বারা প্রভাবিত। তাদের বিশেষত্ব হচ্ছে, তারা দেশজ পটভূমিতে এর প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। সৈয়দ শামসুল হক ও শহীদুল জহিরের লেখায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস 'ইহা মানুষ' 'চোখবাজি', শহীদুল জহিরের উপন্যাস 'জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা', 'সে রাতে পূর্ণিমা ছিল' কিংবা গল্প 'কাঠুরিয়া ও দাঁড়কাক', 'আমাদের কুটির শিল্প' এর উজ্জ্বল উদাহরণ।

শহীদুল জহির ছিলেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে স্বতন্ত্র ধারার লেখক। তার সাহিত্য প্রথাগত ধারার বাইরে হওয়ায় একশ্রেণির পাঠকের কাছে তা বিস্ময়করভাবে সমাদৃত হয়েছে, আবার অন্য শ্রেণির পাঠক ল্যাটিন আমেরিকার নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত বলে গুরুতর অভিযোগ করেছেন। ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যে যে জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ এবং যার সার্থকরূপকার হচ্ছেন মার্কেজ। মার্কেজের লেখা দ্বারা তিনি কেন প্রভাবিত হয়েছিলেন, আর কেনই বা গতানুগতিক ধারায় গল্প উপন্যাস লেখেননি- এসব প্রশ্নের যথাযথ মীমাংসায় উপনীত হওয়া সত্যিই জটিল। তবে সাক্ষাতে তিনি আমাকে বলেছিলেন- মার্কেজের 'ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচু্যড' যখন তিনি প্রথম পাঠ করেন তখন তিনি ঘোরের মধ্যে পড়ে যান। জাদুবাস্তবতার এমন সফল প্রয়োগে তিনি বিস্মিত হন। তখন তার এও মনে হয়, ল্যাটিন আমেরিকার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নয়, এদেশীয় প্রেক্ষাপটে সাহিত্যের এ নতুন মতবাদের প্রয়োগ ঘটানো যায় কিনা। তিনি তার গল্প ও উপন্যাসে তার সফল প্রয়োগ ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। মূলত তিনি সময়কে ভাঙতে চেয়েছেন। সাহিত্যে এ জাদুবাস্তবতার প্রায়োগিক দিক বিবেচনায় আনলে আমরা দেখতে পাই, মার্কেজ তার শত বছরের নিঃসঙ্গতা থেকে শুরু করে কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না, একটি অপহরণ সংবাদ, কলেরার দিনগুলোতে প্রেম, সরলা এরেন্দিরা এবং তার নিষ্ঠুর দাদিমার গল্প, প্রতিটি লেখাতেই কি বিষয় বৈচিত্র্যে, কি চরিত্র সৃষ্টিতে কি চিত্রকল্প তৈরিতে স্বতন্ত্রপ্রয়াসী অভিনবত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন এবং তিনি ঈর্ষণীয়ভাবে সফল হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে শহীদুল জহির বৃত্তের চক্করে আবর্তিত হয়েছে বলে মনে হয়েছে। তার উপন্যাস জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে শুরু করে 'মুখে দিকে দেখি' কিংবা 'ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প' এবং 'ডুলো নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্পে' এ আবর্তন অভিন্ন এবং বৈচিত্র্যহীন।

জাদুবাস্তবতা বাস্তবতাবহির্ভূত কোনো মতবাদ নয়, যেমন নয় পরাবাস্তববাদও। বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে বা আশ্রয় করেই এর শাখা-প্রশাখায় ভ্রমণ করতে হয় কল্পনাকে সঙ্গে নিয়ে। পাঠক যা কল্পনায় আনতে পারেন না লেখক তা লেখায় প্রয়োগ করেন। তবে জাদুবাস্তবতা সাহিত্যে প্রয়োগ ঘটার ফলে পাঠক তা পাঠ করে মহাঘোরের মধ্যে পড়ে যায় এবং এ ঘোর কাটতে তার দীর্ঘ সময় লাগে। ঘোরের মধ্যে ফেলানোর কৃতিত্ব হচ্ছে লেখকের। অর্থাৎ লেখক কত গুছিয়ে, কত ঢঙে, কত বিচিত্র ভঙ্গিতে গল্প বলতে পারেন। পাশাপাশি লেখকের অসাধারণ ভাষাক্ষমতাও থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে মার্কেজ সফল হয়েছেন বলে তাকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ 'স্টোরিটেলার' বলা হয়ে থাকে।

তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলা কথাসাহিত্য যখন একঘেয়েমি গতানুগতিকতা ও নাকি কান্নার বলয় থেকে বের হতে পারছিল না, যারা নিরীক্ষাপ্রবণতার দিকে ঝুঁকেছিলেন, তারাও যখন হতাশ তখন শহীদুল জহির নতুন ধারার কথাসাহিত্য নিয়ে হাজির হলেন। সর্বপ্রথম নব্বই দশকের শুরুতে যখন তার 'কাঠুরিয়া ও দাঁড়কাক' এবং 'আমাদের কুটিরশিল্প' গল্প দুটো পাঠ করি তখন আমি অভিভূত হই। তার প্রথম 'জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা' উপন্যাসটি আকারে ছোট হলেও মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমনভাবে চিত্রিত হয়েছে- যা সত্যিই অভিনব। মহলস্নায় রাজাকারের দাপটে অবশেষে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে বাড়ি বিক্রি করে মহলস্না থেকে চলে যেতে হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধার যে নৈতিক ও ভৌগোলিক পরাজয় এটা এক সময়ের বাংলাদেশেরই প্রকৃত চিত্র। প্রায় অভিন্নভাবে বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে 'সে রাতে পূর্ণিমা ছিল' উপন্যাসেও। তবে এ দুটো উপন্যাসের কোথাও কোথাও জাদুবাস্তবতার অতিমাত্রায় প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে ঘটনাকে অবিশ্বাস্য করে তোলা হয়েছে। যেমন- 'জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা' উপন্যাসে ছাদে মাংস ছিটানোর দৃশ্য এবং 'সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসে' নৌকার মধ্যে বেশ্যা কর্তৃক অতিরিক্ত যৌনাচারের মাধ্যমে বেশ কজনের মৃতু্যর ঘটনা। এমন পারস্পর্যহীন অবাস্তব ঘটনা শহীদুল জহিরের লেখায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। জাদুবাস্তবতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে লেখকের যে পরিণিতিবোধের ব্যাপার তা অতিরঞ্জনে পূর্ণ হয়েছে। এ পরিমিতি বোধকে মার্কেজ অতিক্রম বা অতিরঞ্জন করেছে বলে মনে হয় না। গল্পের বা উপন্যাসের কোনো চরিত্র ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলে সত্য কিংবা মিথ্যা, বাস্তবতা বা অতিবাস্তবতা অথবা জাদুবাস্তবতা কোনোটারই হিসাব রাখা সম্ভব নয়। তিনি আহার গ্রহণ করেছেন কি করেননি, ঘুমিয়েছেন কি ঘুমাননি, তিনি জীবিত না মৃত এসব হিসাব করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এর ফলে চরিত্রগুলো কখনই নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না।

এসব চরিত্রের ব্যঞ্জনাদীপ্ত দিক অনেক সময় অমীমাংসিত থাকে। ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যেও এ দিকটি উজ্জ্বলভাবে উঠে এসেছে। এমনকি জেম জয়েস 'ব্যক্তির চৈতন্য প্রবাহের' সফল প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে এ ঘোর লাগা দিকটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রেও চরিত্র জীবিত কি মৃত, চেতন কি অবচেতন, তা নিজেই চিহ্নিত করতে পারে না। কিন্তু এসবের প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে লেখক যদি পুনরাবৃত্তির আশ্রয় নেন, কিংবা লেখক নিজেই ঘোরের মধ্যে পড়ে যান- তবে তা পাঠককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শহীদুল জহির এ দোষে দুষ্ট ছিলেন। যার কারণে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার তাবৎ রচনা বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে পৌঁছতে পারলেও চরিত্রগুলো যেন একই পরিমন্ডলে বৈচিত্র্যহীনভাবে আবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশের কথা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার ব্যবহার অনেক আগে থেকেই কমবেশি ছিল। যেমন সৈয়দ শামসুল হকের অনেক গল্প উপন্যাসেই জাদুবাস্তবতার সফল প্রয়োগ ঘটেছে। সৈয়দ ওয়ালিউলস্নাহর চাঁদের অমাবস্যা উপন্যাসেও এর প্রভাব স্পষ্ট।

আশি ও নব্বই দশকের, এমনকি শূন্যদশকের অনেক লেখকের গল্প-উপন্যাসে এ প্রয়োগ লক্ষণীয়। এটা মনে রাখা উচিত, ইচ্ছেমতো কল্পনার জগতে বিচরণ কিন্তু জাদুবাস্তবতা নয়। বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে যখন কোনো মতবাদের ঢেউ ওঠে বা জাগরণ ঘটে তখন তার ছিটেফোঁটা বাংলাসাহিত্যে এসেও লাগে। যেমন জ্যাপল সাঁত্রের অস্তিত্ববাদী মতবাদের ওপর ভিত্তি করে সৈয়দ ওয়ালিউলস্নাহ, মার্কসবাদকে উপলক্ষ করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য সাহিত্য রচনা করেছেন। আবদুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে কবিতা লিখেছেন। স্যামুয়েলবেকেট প্রবর্তিত অধিবাস্তববাদকে (অ্যাবসার্ডইসম) সামনে রেখে সাঈদ আহমদ নাটক রচনা করেছেন। এসব মতবাদ পাশ্চাত্য থেকে ধার করা। ঠিক তেমনিভাবে ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যে প্রয়োগকৃত জাদুবাস্তবতা যদি বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা সফলভাবে প্রয়োগ ঘটাতে পারেন তার কৃতিত্ব কিন্তু শহীদুল জহিরেরই। কেবল গল্প-উপন্যাসেই নয়, কবিতায়ও এর সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন অনেক কবি।

তবে এটা সত্য, বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক জাদুবাস্তবতার নিপুণ কারিগর বিশ্বসেরা গল্পকথক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। তার নিষ্ঠা আর সাধনার মাধ্যমে শুধু স্প্যানিশ ভাষা নয়, বিশ্ব সাহিত্যে শ্রেষ্ঠতম লেখকদের তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছেন এ মহান কথাশিল্পী। শৈশবেই মার্কেজের মধ্যে চিত্রশিল্পী গায়ক ও লেখক হওয়ার মতো প্রতিভার আভাস দেখা যায়। এর যে কোনো একটিকে তিনি পেশা হিসেবে নিতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি হলেন সাংবাদিক ও কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক। তিনি কল্পনাকে বাস্তবতার মোড়কে আবদ্ধ করে কোটি কোটি পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন। তিনি সামান্য বিষয়কে অসামান্য করে ফুটিয়ে তুলেছেন তার অসাধারণ মেধা ও দক্ষতা দিয়ে। এ অসীম ক্ষমতা বিশ্বের খুব কম লেখকের মধ্যেই রয়েছে। তাই তিনি হচ্ছেন লেখকদের লেখক।

১৯৮২ সালে তার হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচু্যড বা শত বছরের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। এ উপন্যাসটি আড়াই কোটি কপি বিক্রি হয়েছে এবং বাংলা ইংরেজিসহ ৩০টি ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে। এ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে।

নিঃসঙ্গতা কখনো কখনো মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে। মার্কেজের মতো নিঃসঙ্গতা সম্ভবত আর কোনো লেখক এমনভাবে উপলব্ধি করেননি। তার জাদুকরি কলমের ছোঁয়ার নিঃসঙ্গতা পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। নিঃসঙ্গ হৃদয়ের শত বছরের আকুতি ফুটে উঠেছে এ উপন্যাসে।

একটি পরিবারের কাহিনীকে অবলম্বন করে এ উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্র গড়ে উঠেছে। সঠিকভাবে বললে পরিবারটির ছয় প্রজন্মের কাহিনী। এ 'বুয়েন্দিয়া' পরিবারেরই একজনের নেতৃত্বে একদল দুঃসাহসী অভিযাত্রী দক্ষিণ আফ্রিকার গহীন এক জঙ্গলে বসতি স্থাপন করে। সূত্রপাত ঘটে এক মহাকাব্যিক জগতের। নিয়তির আশীর্বাদপুষ্ট অথবা অভিশাপগ্রস্ত আর খামখেয়ালিপনা এবং নানা ঘটনা দুর্ঘটনার অসহায় শিকার এই পরিবারের মানুষ। উপন্যাসটির অসংখ্য পাত্রপাত্রীর মধ্যে রয়েছে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার মতো অসাধারণ কৌতূহলী উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন দুঃসাহসী ও বুদ্ধিমান চরিত্র, যে নিজের জ্ঞানবুদ্ধি খাটিয়েই আবিষ্কার করে ফেলে পৃথিবী গোল। রয়েছে তার স্ত্রী উরসুলা ইগুয়ারান নামের কর্মঠ সর্বব্যাপিনী শতায়ু নিঃসঙ্গ এক নারী। যাকে সারা জীবন তাড়া করে ফেরে তার বংশে শুয়োরের লেজবিশিষ্ট কারও জন্মের আশঙ্কা। রয়েছে পায়ের তলায় শর্ষে নিয়ে সারা দুনিয়া চষে বেড়ানো বিদগ্ধ রহস্যময় বেদে মেলকিয়াদেস। রয়েছে সুন্দরী রেমেদিওস নামের সৃষ্টি ছাড়া সৌন্দর্যের অধিকারিণী এক অপার্থিব রমণী। যার প্রণয়পিপাসুরা একের পর এক বৃথাই আত্মাহুতি দিয়ে চলে তার রূপের অনলে। আরও রয়েছে কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিরা। যিনি ৩২টি সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটিত করে সব কয়টিতেই হেরে যান। এড়িয়ে গিয়েছিলেন তার ওপর চালানো ১৪টি হামলা, ৭৩টি অ্যামবুশ আর একটি ফায়ারিং স্কোয়াড। যুদ্ধের পর তাকে দেয়া আমরণ অবসর ভাতা তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং শেষ জীবনে জীবিকা নির্বাহ করে তার কামারশালায় ছোট ছোট সোনার মাছ বানিয়ে। এসব ঘটনা দুর্ঘটনা লৌকিক-অলৌকিকের কেন্দ্রবিন্দু মাকোন্দো নামের গ্রামটি। যে গ্রামটিকে ঘিরেই আবর্তিত হয় উপন্যাসের কাহিনী। যা পাঠে পাঠক এক আশ্চর্য জগতে চলে যায়, বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারে না। এটা যেন মানব ইতিহাসের এক সুনিপুণ আখ্যান ও পুনর্বয়ন। কলম্বিয়ার সাহিত্যের ইতিহাসে একটি সামাজিক সাংস্কৃতিক দর্পণ বলে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত এ উপন্যাস।

ঔপনিবেশিক এবং নব্য ঔপনিবেশিক সামাজিক বাস্তবতা শোষণ নির্যাতন বৈষম্য এবং ল্যাটিন আমেরিকার পর্যুদস্ত ও অস্থির অর্থনৈতিক রাজনৈতিক চিত্র মানবিক দলিল হিসেবে উঠে এসেছে তার গল্প উপন্যাসে। যা চিরায়ত বিশ্বমাত্রা অর্জন করেছে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বৈরী স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ল্যাটিন আমেরিকার যে কয়েকজন সাহিত্যিক বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছেন মার্কেজ তাদের অন্যতম। তার গল্প বলার ভঙ্গি অসাধারণ। তিনি অনায়াসে গল্পের ভেতরে গল্প তৈরি করেন। বাস্তবতা আর কল্পনার মিশেল দিয়ে তিনি তার লেখার মধ্যে এমন এক মায়াবী জাল বিস্তার করেছেন যা পাঠককে একদিকে যেমন ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায় অন্যদিকে তারা অনায়াসে আবিষ্কার করতে পারেন ভিন্ন এক রহস্যময় জগৎ। স্বপ্ন বাস্তব আর নিঃসঙ্গতার চাদরে মোড়া জাদুবাস্তবতার গল্পে তিনি পাঠককে আবিষ্ট করে রাখতেন সব সময়। কথাসাহিত্যে জাদুবাস্ততার প্রয়োগ তিনি সফলভাবে ঘটিয়েছেন। যদিও এর প্রয়োগ আগেও সাহিত্যে হয়েছে। তার অন্যান্য উলেস্নখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে, লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা বা কলেরার দিনগুলোও প্রেম, নো ওয়ান রাইটস টু কর্নেল বা কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখেনি, ইননোসেন্ট এরেন্দিরা অ্যান্ড আদারস স্টোরি বা সরলা এরেন্দিরা ও অন্যান্য গল্প ইত্যাদি।

\হতিনি প্রথম জীবনেই লেখালেখি শুরু করেন এবং আঞ্চলিক সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। যার কারণে তিনি যেখানে অধ্যয়ন করতেন ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লেখালেখির অনেক কাজই তাকে দিয়ে করানো হতো। ফলে তিনি বিরক্তও হতেন। তিনি স্প্যানিশ ভাষায় সাহিত্যচর্চা করতেন। ছাত্রাবস্থায় ২১ বছর বয়সে ১৯৪৮ সাল থেকেই তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে তিনি একটি সাময়িকপত্রের মালিক হন। কলম্বিয়ার রাজনৈতিক অবস্থা অস্থির থাকার কারণে তাকে নানা ঘাতপ্রতিঘাত সহ্য করতে হয়। তিনি ছাত্রাবস্থাতেই জড়িয়ে পড়েছিলেন উদারপন্থী বাম রাজনীতির সঙ্গে। ফলে কলম্বিয়ার স্বৈরশাসকদের বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন তিনি। নিজ দেশেই পরবাসী হতে হয় তাকে। কিন্তু কোনো কিছুতেই তার সাংবাদিকতা আর সাহিত্যচর্চাকে দমাতে পারেননি। পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ থাকার কারণে তিনি প্রথম জীবনে গল্প বিক্রি করতেন। তবে তার প্রথম বই প্রকাশ করতে বেশ বেগ পেতে হয়। প্রকাশকের পেছনে সাত বছর ঘুরতে হয় তাকে। সে জন্য তিনি দমে বা থেমে যাননি। অবশেষে প্রথম গল্পের বই লিফ স্টর্ম বা পাতা ঝড় প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে।

প্রথম জীবনে তিনি গতানুগতিক ধারায় গল্প লিখলেও ফ্রান্‌জ কাফকার গল্প ম্যাটামরফসিস পড়ে তার ধারণা দ্রম্নত পরিবর্তন হয়ে যায়। ওই গল্পের শুরুটা ছিল এমন- 'গ্রেসর সামসার ঘুম ভাঙল অস্বস্তিকর একটি স্বপ্ন দেখে, একটি অদ্ভুত পতঙ্গে পরিণত হয়ে সকালে সে বিছানায় শুয়ে আছে।' এ ধরনের লেখা অতীতে তিনি কখনো পড়েননি। এই একটি লাইনই তার চিন্তার জগৎকে নতুনভাবে নাড়া দেয়। জাদু বাস্তবতার ধারণাটি সম্ভবত তিনি কাফকার গল্প থেকেই পেয়েছেন। পরে তিনি তার গল্প উপন্যাসে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। কলম্বিয়ার মানুষ এবং সামাজিক জীবনের নানা অনুষঙ্গকে তিনি তার গল্প উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন। মার্কেজের লেখার প্রেক্ষাপট ছিল দারিদ্র্যপীড়িত এবং প্রায় নিয়মিত সামাজিক ও রাজনৈতিক সহিংসতায়পূর্ণ নিজ দেশ কলম্বিয়া। সেখানে গণতন্ত্রের শেকড় আসলে কখনই গভীরে পৌঁছতে পারেনি। কলম্বিয়ার নানা সঙ্কটকালে তিনি অভিভাবকের মতো দায়িত্ব পালন করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিভৃতচারী বন্ধুবৎসল মানুষ। বন্ধুরা তাকে ভালোবেসে ডাকতেন 'গাবো' বলে। তার বাবা ছিলেন একজন টেলিগ্রাফ অপারেটর, দাদা কর্নেল। দাদা-দাদি চাচা-চাচির কাছে ক্রান্তীয় সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠেন তিনি। স্পেনীয় বসতি স্থাপনকারী, দেশীয় লোকজন ও কৃষ্ণকায় কলম্বীয়দের বেশ প্রভাব ছিল এ সংস্কৃতিতে। তার রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে উঠেছিল দাদার কাছ থেকে গল্প শুনতে শুনতে। দাদির গল্প বলার ধরনেও তিনি মুগ্ধ হতেন। পরে এসব ঘটনা ও অনুষঙ্গ তার লেখালেখিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে জেমস জয়েসের গল্পের প্রভাব তার গল্পে রয়েছে বলেও কেউ কেউ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন- 'জীবন নিজেই প্রেরণার একটি বিশাল উৎস। আর স্বপ্ন জীবনস্রোতের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সাধারণভাবে স্বপ্নকে আমি জীবনের অংশ হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা স্বপ্নের চেয়ে বেশি উন্নত উৎস।' পুরুষের চেয়ে নারীকেই তিনি বেশি প্রাধান্য দিতেন। তার ভাষায়, 'আমি নারীসংঘকে বেশি নিরাপদ বোধ করি।' মার্কেজের বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীতে কিছুলোক জন্মগ্রহণ করে সময়জ্ঞান ও প্রকৃত ঘটনাগুলো বিন্যস্ত করার জন্য। তিনি মনে করতেন, সঠিকভাবে লিখতে শেখার জন্য কিছু কৌশল আয়ত্ত করতে হবে এবং অভিজ্ঞতার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষমতা থাকতে হবে। দর্শন ও সাহিত্যের প্রতিই তার উৎসাহ বেশি ছিল। যারা বিখ্যাত লেখক, তারা প্রতিদিন লিখতেন, মার্কেজ তাদের অন্যতম। তিনি প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা লিখতেন।

তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, লেখা ভয়াবহরকম কঠিন কাজ। আমার কাছে তো সবসময়েই কঠিন, কেউ কল্পনাও করতে পারবে না, একটা লেখা শেষ করতে কতটুকু দুর্বল হতে হয় আমাকে। তিনি বরাবরই মানবতার মুক্তির পক্ষে কাজ করেছেন, কলম ধরেছেন। নিজ দেশ ল্যাটিন আমেরিকার ব্যাপারে তিনি বলেন, সাহিত্যে আমাদের মৌলিকত্ব অতি সহজেই গৃহীত হয়েছে। অথচ সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজনে গৃহীত উদ্যোগগুলোকে অবিশ্বাস্যরূপে অস্বীকার করা হয়েছে। তিনি একজন সফল সাংবাদিক ছিলেন। কিন্তু কখনই সাহিত্যকে সাংবাদিকতার সঙ্গে একাকার করে ফেলেননি। তিনি আরও বলেছেন, সাহিত্যের বাস্তবতাকে দেখি ও উপলব্ধি করি, সাংবাদিকতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। একটি ঘটনার বিষয়বস্তুতে আমরা যেভাবে দেখি অন্যরা সেভাবে দেখে না। লেখকের কাজ কোনো ঘোষণা দেয়া নয়, ঘটনা ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানা। মার্কেজের আগে কলম্বিয়ার কোনো লেখক এত বুদ্ধিবৃত্তির গল্প লিখতেন না।

সাংবাদিকতা সম্পর্কে তিনি বলেন, সাংবাদিকতার সব কর্মটাই হলো একটি সত্য ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কৃত্রিম পক্ষপাতিত্ব করে যাওয়া। বিপরীতক্রমে ফিকশন একটি একক ঘটনা, যা সত্য সমগ্র কাজটার বৈধতা দান করে। আর এটা নির্ভর করে লেখকের প্রতিশ্রম্নতি আর দায়বদ্ধতার ওপর। একজন ঔপন্যাসিক যা খুশি তাই করতে পারেন, যতক্ষণ পাঠকের বিশ্বাস এর মাধ্যমে ধরে রাখা যায়।

তিনি তার গল্প উপন্যাসের মাধ্যমে এক মহাজীবন রচনা করেন, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবনের সমাহারে। নোবেল ভাষণে তিনি বলেছেন, 'আমাদের সামনে তেমন কোনো পুরনো পথরেখা ছিল না- যার মাধ্যমে কল্পলোকের জীবনটাকে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে ল্যাটিন আমেরিকায় অর্থনীতি আর মূল্যবোধের সমান্তরাল যে ভাঙাগড়া চলছিল তার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। জাদুবাস্তবতার সফল উপস্থাপক ও রূপকার হওয়ার কারণে তিনি বিশ্বসাহিত্যে এতটা আলোচিত ও প্রভাবসৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি চলচ্চিত্র সমালোচকও ছিলেন। তিনি তার সমালোচক ও পাঠক উভয়ের কাছেই সমাদৃত ছিলেন। বিষয়বস্তু আর প্রকরণশৈলীর দিক থেকে ভিন্ন এক মাত্রা দিয়েছেন ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যিকরা, যাদের মধ্যে মার্কেজ অন্যতম। এ কথা অনস্বীকার্য যে ইউরোপকে ছাপিয়ে ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য দ্রম্নত বিশ্ববাসীর নজর কাড়ে তার ভিন্ন বিষয়বস্তু ও নতুন আঙ্গিকের কারণে। বিশেষ করে মার্কেজের গল্প উপন্যাস নতুন জোয়ার এনে দেয়। তিনি অদ্ভুত দক্ষতায় কল্পনাকে বাস্তবের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। তার সৃষ্ট সাহিত্যই একটি আলাদা দুনিয়া, এক জাদুকরি জগৎ। জাদুবাস্তবতার মাধ্যমে তিনি ল্যাটিন আমেরিকার লোকায়ত জীবনকে সফলভাবে সাহিত্যে তুলে এনেছেন। তার 'শত বছরের নিঃসঙ্গতা' উপন্যাসটি বিশ্বসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2020

Design and developed by Orangebd


উপরে