logo
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৬

  সালাম সালেহ উদদীন   ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

গড়ল ভালোবাসা সরল উপলব্ধি

গড়ল ভালোবাসা সরল উপলব্ধি
মমতার জন্মদিন ও বিয়েবার্ষিকীতে শহরের সবচেয়ে বড় ও দামি ফুলের তোড়া উপহার দেন আশরাফ আলী আকন্দ। এই দুটো বিশেষ দিনে তিনি ভোরবেলা বাসা থেকে বের হয়ে অন্তত পাঁচটি ফুলের দোকানে যাবেন। যে দোকানে সবচেয়ে বড় ও দৃষ্টিনন্দন ফুলের তোড়া পাওয়া যাবে, দাম যতই হোক- এ ক্ষেত্রে তিনি কৃপণতা করবেন না। বিয়ের ৩৬ বছর ধরেই আকন্দ সাহেব একাজ করে আসছেন। বছরে দুবার এ কাজ তাকে করতে হয় প্রাণের তাগিদে। এ কারণে ৫ মার্চ ও ৬ অক্টোবর তার জীবনে স্মরণীয় দিন। আকন্দ সাহেব মনে করেন তিনি অতি সাধারণ মানুষ, তার জন্মদিন করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু মমতা ৩৬ বছর সংসারকে আগলে রেখেছেন। ছেলেমেয়েকে মানুষ করার পেছনে তার ভূমিকাই অগ্রগণ্য। সুতরাং এই বিবেচনায় সে একজন মহীয়সী নারী। তার জন্মদিন পালিত হওয়া উচিত।

আকন্দ পরিবারে ইদানীং একটা রেওয়াজ চালু হয়েছে। এসব ঘরোয়া বিশেষ অনুষ্ঠানে আত্মীয়স্বজন বা বাইরের কাউকে ডাকে না। পরিবারের চার সদস্যই সবকিছু উপভোগ করে। দামি মুখরোচক সব খাবারের আয়োজন করে। নিজেরাই মজা করে খায়। অবশ্য প্রথম ২০ বছর আত্মীয়বন্ধুদের দাওয়াত দেয়া হতো। জীবনযাত্রার মান বেড়ে যাওয়ার কারণে এবং মেহমানদের উপস্থিতির হার কমে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান একেবারেই পরিবারমুখী হয়ে পড়ে।

বিশেষ দিনে ফুলের তোড়া নিয়ে আকন্দ সাহেব রিকশা করে বাসায় ফিরবেন তখন পথচারীদের দৃষ্টি থাকবে ফুলের তোড়ার ওপর। সকালবেলা এত বড় তোড়া কেন তিনি বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন তা অনেকেরই মাথায় ধরে না। বিয়ের প্রথম দিকে তরুণ বয়সে তিনি যখন ফুলের তোড়া কিনতেন তখন এতটা বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু প্রবীণ বয়সে এসে তার ভীষণ বেগ পেতে হয় ফুলের তোড়া নিয়ে পাঁচ তলায় উঠতে। তিনি বিরতি দিয়ে উঠে আসেন আর হাঁপাতে থাকেন। আকন্দ সাহেব মনে করেন, এটা তার নিতান্ত ব্যক্তিগত কাজ। এর সঙ্গে আবেগ অনুভূতি ভালোবাসা জড়িত। যত কষ্টই হোক এটা তিনি নিজেই করতে চান।

কলবেল টিপে ফুলের তোড়াটা যখন মমতার হাতে দেবেন তখন মমতা রহস্যময় মুচকি হাসবে। তারপর বলবে, ভোরবেলা বের হয়ে যে তুমি এই পুরনো কাজটি করবে, তা আমি জানি। বহু বছর তো ফুলের তোড়া উপহার দিলে, এখন বয়স হয়েছে, বিরতি দাও। জবাবে আকন্দ সাহেব বলবেন, তুমি তো বলেছ, ভালোবাসার পরীক্ষা প্রতিমুহূর্তে সারা জীবন দিতে হয়। অনেকেই পরীক্ষা দেয় অনিচ্ছায়, আর আমি দিই আনন্দে স্বইচ্ছায় ভালোলাগা থেকে প্রাণের তাগিদে। আকন্দ সাহেবের কথায় মমতা উত্তর করে না স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অন্য ঘরে চলে যায়।

স্ত্রীকে ভালোবাসা কঠিন কাজ এটা আকন্দ সাহেব জানেন। কারণ স্ত্রী যদি হয় রুক্ষ বদমেজাজি ঝগড়াটে পরনিন্দা পরচর্চায় মনোযোগী, লোভী এবং সংসারবিমুখ তাকে একজন স্বামী কী করে ভালোবাসবে। এই ধরনের স্ত্রীরা সংসারে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামী যদি অত্যন্ত বিনয়ী সহনশীল ভদ্র এবং স্ত্রৈণ হয়ে থাকেন সে ক্ষেত্রে তিনি হয়তো স্ত্রীকে ছাড় দেবেন, সংসার ও ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে নীরব থাকবেন। একইভাবে স্বামী যদি সংসারের প্রতি উদাসীন থাকেন, থাকেন অন্য নারীর প্রতি আসক্ত তা হলে ত্যাগী ধৈর্যশীল স্ত্রীরা সংসার ও সন্তানের প্রতি তাকিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেন। উভয় ধরনের স্বামী-স্ত্রীই সংসারে রয়েছে। আকন্দ সাহেবের বাবা আবুল কাশেম আকন্দও তার স্ত্রীকে ভালোবাসতেন। তিনি মনে করতেন 'উত্তম' স্ত্রী পাওয়া আলস্নাহর দান, পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। তিনি ছেলেকে এই উপদেশও দিতেন, পৃথিবীতে দুজন নারীকে সব সময় ক্ষমা করে দিতে হয়, তারা যত অন্যায় করুক না কেন, একজন মা, অন্যজন স্ত্রী। বাবার কথাটা তাকে ভাবিয়ে তোলে। কেবল তাই নয়, জীবন ও সংসারের ক্ষেত্রে তিনি এটা অনুসরণও করেন।

মায়ের মৃতু্যর পর বাবাকে তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকা আসতে বলেছিলেন। বাবা রাজি হননি। তিনি বলেছেন, 'আশরাফ যতদিন জীবিত আছি, তোর মায়ের কবর ছেড়ে কোনোদিন অন্য কোথাও যাব না। তোর মা একা থাকতে পারবে না।' স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন রেখে গেছেন মোগল সম্রাট শাহজাহান। তিনি তো স্ত্রী মমতাজের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখার জন্য তাজমহল নির্মাণ করে গেলেন। যা সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। তাজমহলের আদলে এখন দেশে দেশে তাজমহল তৈরি হচ্ছে দর্শনার্থীদের ইচ্ছা পূরণের জন্য। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার এমন উদাহরণ হয়তো পৃথিবীতে আরো আছে, সেগুলো অজানা। আকন্দ সাহেবের এক বন্ধুর বিয়ের দুই বছরের মাথায় স্ত্রীর অকাল মৃতু্য হয়। এরপর আর তিনি বিয়ে করেননি, পরিবার আত্মীয়স্বজনের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও। স্ত্রীর প্রতি নিবেদিত স্বামীর সংখ্যা এ সমাজে কম নয়।

আকন্দ সাহেব বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেন, সমাজ দ্রম্নত বদলে গেছে। মানবিকতা প্রেম ভালোবাসা ত্যাগের পরিবর্তে মানুষের মধ্যে বিপজ্জনকভাবে বিস্তার করেছে অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা পৈশাচিকতা। স্বামী-স্ত্রী যে গভীর বন্ধন ভালোবাসা জীবন ও সংসারের অনিবার্য অংশ এটা এখন আর সমাজ সংসারে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। সামান্য যৌতুকের কারণে স্ত্রীকে অবলীলায় হত্যা করা হচ্ছে। স্ত্রী ব্যভিচারী বা পরকীয়ার অভিযোগ তুলে কখনো কখনো হত্যা করা হচ্ছে। কেবল স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে না, স্ত্রীও স্বামীকে হত্যা করছে। এ ধরনের খবর প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় উঠে আসছে। যেসব দম্পতি এসব কাজ করছে- তারা কি সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করছে এমন এক প্রশ্ন আকন্দ সাহেবের সামনে বড় করে উঠে এলো। তিনি যে স্ত্রীর জন্মদিনে এবং বিয়েবার্ষিকীতে শহরের সবচেয়ে বড় ফুলের তোড়া উপহার দেন এর উপযোগিতা হারাচ্ছে এসব পারিবারিক নিষ্ঠুর সহিংস ঘটনায়। আকন্দ সাহেব মনে করেন, স্ত্রীকে ভালোবাসা তার কর্তব্য। কেবল শরীরী আনন্দ দেয়ার কারণে নয়, স্ত্রী তার সুখ-দুঃখের সঙ্গী। সংসার ও সন্তান আগলে রেখেছেন তিনিই। একজন পুরুষ হিসেবে তাকে অমর্যাদা করার সুযোগ নেই। তার এই কথার সঙ্গে একমত নন, তার বন্ধু একরাম সাহেব। তার মত হচ্ছে, সব স্ত্রী একরকম নয়; স্ত্রী ব্যভিচারী হতে পারে, ঝগড়াটে, মারমুখো ও হিংস্র হতে পারে। যিনি অতিথি ও স্বামীপক্ষের আত্মীয়স্বজনদের দেখলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। এমন স্ত্রী যদি কারো ভাগ্যে জোটে তখন একজন স্বামীর পক্ষে তাকে ভালোবাসা, তার জন্য ত্যাগ স্বীকার করা কতখানি সম্ভব? এ ক্ষেত্রে আকন্দ সাহেবের বক্তব্য হচ্ছে ভালোমন্দ মিলিয়েই সংসার। প্রত্যেকেরই ভালোবাসার ও ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা থাকতে হবে।

একরাম সাহেব আরো বললেন, স্ত্রী দিনের পর দিন অপরাধ করে যাবে আর স্বামী তা নীরবে সহ্য করবে কেন? একইভাবে স্বামী অপরাধ করলেও স্ত্রীর সহ্য করা উচিত নয়। সংসারের সুখ এমনি এমনি আসে না। উভয়ের ত্যাগ পরিশ্রম আর ভালোবাসার ফসল হচ্ছে সুন্দর সংসার। এ ক্ষেত্রে আকন্দ সাহেবের বক্তব্য হচ্ছে 'আমার কর্তব্য স্ত্রী-সন্তানকে ভালোবেসে যাওয়া। তাদের ভুল শুধরে সঠিক পথে আনা। গৃহকর্তা হিসেবে এটা প্রত্যেকেরই উচিত। কিন্তু আমরা সে জায়গায় নেই। ভালোবাসা, কর্তব্য ঔচিত্যবোধের জায়গায় আমাদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে নিষ্ঠুরতা অমানবিকতা।'

আকন্দ সাহেব ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছেন, 'যার যার কর্তব্য তার তার করা উচিত।' এটা অনেকটা নীতি কথার মতো শোনালেও এর উপযোগিতা সমাজে নেই। পারিবারিক ক্ষেত্রে তিনি যেভাবে কর্তব্যনিষ্ঠ, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কি তেমন। এমন এক প্রশ্ন তার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। যেমন মমতাজ বেগমের কথাই ধরা যাক। বিয়ের পর থেকে মমতা যা বলেছেন তিনি একান্ত বাধ্যগত বালকের মতো তাই শুনেছেন। ওর ইচ্ছাপূরণের জায়গাটা অপূর্ণ রাখেননি তিনি। আকন্দ সাহেব স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে অনেক টাকা ঋণ করেছেন। প্রথম দিকে তিনি তার অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কথা বললেও মমতা সেটাকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি। এ ক্ষেত্রে মমতার স্পষ্ট কথা হচ্ছে, ব্যক্তিগত ও সাংসারিক যে কোনো প্রয়োজন তাকে মেটাতে হবে। আকন্দ সাহেব টাকা কীভাবে জোগাড় করবেন এটা মমতার জানার বিষয় নয়। বিয়ের পর মমতা এ ধরনের কঠিন কথা উচ্চারণ করেছে বহুবার। স্ত্রী যতবার একথা বলেছেন, ততবারই আকন্দ সাহেব আহত হয়েছেন। তিনি শুনেছেন ইচ্ছাপূরণের বা চাহিদার জায়গায় সব স্ত্রী নাকি একই। স্বামীর যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার দিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। কথাটা সর্বাংশে সত্য না হলে চারদিকে সংসারে এত অশান্তি কেন, কেনই বা এত সহিংসতা। 'সংসারে অভাব থাকলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়'- এ সনাতন কথাটি তিনি বহু বছর ধরে শুনে আসছেন। অর্থই প্রধান, অর্থই সব। সবকিছুর নিয়ন্ত্রক, প্রভাবক এখন অর্থ। অর্থের অবাধ প্রবাহ যে সংসারে রয়েছে সে সংসারে অশান্তি কম। এমন কথা এখন চারদিক থেকে উচ্চারিত হচ্ছে।

আকন্দ সাহেবের জীবনে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, তিনি সংসারে কখনই পুরোপুরি সচ্ছলতা আনতে পারেননি। তিনি সামান্য সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। যে সময়ে তিনি চাকরিতে ঢুকেছিলেন তখন বেতন খুবই কম ছিল। তার নুন আনতে পানতা ফুরোনো অবস্থা। এখনকার মতো তখন সরকারি চাকরিতে এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। আকন্দ সাহেব বেতন যা পেতেন তার ৬০ ভাগ টাকাই বাসাভাড়া দিতেন। সঙ্গে থাকত দুই বোন। এই টানাপড়েনের সংসারে নতুন বউ হিসেবে মমতার প্রবেশ সঙ্গত কারণেই সুখকর হওয়ার কথা নয়। সরকারি চাকরি মানে স্থায়ী একটা বন্দোবস্ত। ভবিষ্যতে সুযোগ-সুবিধাও বাড়বে এই বিবেচনায় মমতার বাবা একলাল ভূঁইয়া মেয়েকে পাত্রস্থ করলেন। মমতা বরাবরই লাজুক প্রকৃতির মেয়ে। পুরুষদের ব্যাপারে সে উচ্ছ্বসিত ও মনোযোগী নয়। আকন্দ সাহেবের আগে তাকে আরো চারজন পাত্র দেখানো হয়েছে, পছন্দ হয়নি একজনও। আকন্দ সাহেবের চোখ ও হাসি তাকে আকৃষ্ট করেছে। তিনি নাকি বাঁকা চোখে মৃদু হেসে মমতাজের দিকে তাকিয়েছিল। এর ফলে অন্য রকম মাদকতা এনে দিয়েছিল ওর জীবনে। সব ধরনের ক্লান্তি, একগুঁয়েমি আর জড়তা ভুলে মুহূর্তে সম্পূর্ণ এক নতুন জগতে প্রবেশ করেছিল সে। মা রহিমা খাতুন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আশরাফ সম্পর্কে। মমতা মায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে নীরব ছিল। অথচ আগের পাত্রদের সম্পর্কে তার ছিল সরাসরি 'না' সুলভ মন্তব্য। কোনো পুরুষ যে তাকে আকৃষ্ট করতে পারে, এটাই সে বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না। আশরাফকে আরেকবার দেখতে ইচ্ছা করল তার। ঠিকানা জোগাড় করে ওর এক বান্ধবীকে নিয়ে আশরাফের সেগুনবাগিচার অফিসে গিয়ে একদিন হাজির হলো মমতা। একজন কলেজ পড়ুয়া মেয়ে প্রেমিকের নয়, রীতিমতো পাত্রের দ্বিতীয়বার মুখদর্শনে হাজির। আশরাফ মমতাকে দেখে অবাক। সেদিন দুজনের মুখ থেকেই কোনো কথা বের হচ্ছিল না। নীরব দর্শকের মতো মুগ্ধ দৃষ্টিতে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ছিল। এই তাকানোর মধ্যে দুজনেই অপার আনন্দ খুঁজে পেয়েছিল। আশরাফের অফিসের সামনে একটি গোলাপের বাগান ছিল। বাগানে ফুটেছিল আকর্ষণীয় বেশ কয়েকটি গোলাপ, যা কেবল গন্ধ স্নিগ্ধতাই ছড়ায় না, এই গোলাপ ছিঁড়ে কোনো একান্ত পছন্দের মানুষকেও দেয়া যায়।

সবচেয়ে বড় লাল গোলাপটি ছিঁড়ে মমতার হাতে দিল সে। মমতা অত্যন্ত লাজুক ভঙ্গিতে তা গ্রহণ করল। তার জীবনে প্রথম কোনো পুরুষ তাকে ফুল দিল। আশরাফের মনে হলো, মমতা নিজেকে সমর্পণ করার জন্যই আজ তার কাছে এসেছে। এটা তার জীবনে পরমপ্রাপ্তি এই কারণে যে, এভাবে কখনো কেউ তার কাছে আসেনি। সম্ভবত মমতা এটাই জানান দিয়ে গেল যে, সে তাকে স্বামী হিসেবে, জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চায়। মমতার প্রতি আশরাফের দুর্বলতার এটাও একটা প্রধান কারণ। সামান্য দেখা ও কথার মাধ্যমে যে সম্পর্ক দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠার চেষ্টা করছে, এই সম্পর্কের দৌড়ে সম্ভবত মমতাই এগিয়ে ছিল। কারণ আশরাফ মমতাকে পেতে চেয়েছে, হৃদয়ে এক ধরনের রোমান্টিক আবহকে ধারণ করে। মমতা তার চেয়েও এগিয়ে। আশরাফ তাকে যে গোলাপ উপহার দিয়েছিল, তা সে বাসায় এনে ব্যক্তিগত ড্রয়ারে রেখে দিয়েছে। আশরাফের কথা মনে হলেই, সে শুকনো পাপড়িগুলো নাড়াচাড়া করে। পাপড়ি শুকিয়ে শুকনো পাতার মতো হয়ে যাচ্ছে, অথচ এখনো আশরাফের সঙ্গে তার বিয়ের নামগন্ধ নেই। আশরাফের ব্যাপারে তার বাবার আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে মমতাও বিষয়টি নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারছে না। মমতা চেয়েছিল ফুলের পাপড়ির অস্তিত্ব থাকতে থাকতেই আশরাফের সঙ্গে তার বিয়ে হোক। এখন তার মনে হচ্ছে, সে আশায় গুড়ে বালি। বিয়ে নিয়ে কোথায় যেন একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি তাকে জানতে হবে।

অবশেষে মায়ের মাধ্যমে সে জানতে পারে ব্যবসায়ী পাত্রই তার বাবার পছন্দ। এ কথা জানার পর মমতা এই প্রথম বাবার মতামতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। স্পষ্ট বলল আশরাফকেই সে বিয়ে করবে। মেয়ের এই ধরনের মতামতে বিস্মিত হলো তার বাবা-মা। মেয়ের মতামতকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই শেষে আশরাফের সঙ্গে বিয়ে হলো তার। যৌতুকের ব্যাপারে তার কোনো লোভ নেই। অন্যদিকে মমতাদের পরিবারেরও দেয়ার সামর্থ্য নেই। ফলে টিভি, ফ্রিজ ছাড়াই সংসার শুরু করল মমতা। নতুন সংসারে ঢুকেই অনেকটা যৌথ পরিবারের আমেজ পেল সে, পাশাপাশি অনুভব করল সাংসারিক টানাপড়েনের বিষয়টিও। দুই ননদ, স্বামীসহ চারজনের সংসার। আশরাফ সরকারি কর্মকর্তা হলেও ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে সে জড়িত নয়। কেবল এই শক্তিশালী কারণেই মমতার বাবা এই বিয়েতে রাজি হলো। আশরাফের বাড়তি আয় না থাকার কারণে নতুন সংসার চলছে অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। মমতা বাবার সংসারে দেখেছে টানাপড়েন আবার স্বামীর সংসারে এসেও একই অবস্থা দেখতে পাচ্ছে। জীবনযাপনের এই ধারাবাহিকতাটাকে সে নেতিবাচক হিসেবে দেখছে। সে এও বুঝতে পারছে যে, তার জীবনে সচ্ছলতার প্রশ্নে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে না। এক বছর সংসার করার পর সে নিশ্চিত হলো, অর্থের ব্যাপারে স্বামীর কোনো বিশেষ মোহ বা আগ্রহ নেই। অল্পতেই তুষ্ট থাকতে চায় সে। তখন সে এও নিশ্চিত হলো যে, এ ক্ষেত্রে তার বাবার সঙ্গে আশরাফের কোনো পার্থক্য নেই। মমতাও চায় না তার স্বামী অসৎপথে চলুক। সে চায় আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে উদ্যোগী হোক সে।

মমতা যতই বলুক, এ ব্যাপারে আশরাফের কোনো মনোযোগ নেই। সে নিয়মিত অফিস করে এবং বাকি সময় মমতাকেই নিয়েই মেতে থাকে। আশরাফের আচরণ এমন যে, সে মমতাকে ছাড়া জীবনে কোনো মেয়ে দেখেনি। সংসার জীবনে প্রবেশের পর, সংসারের নানা টানাপড়েন দেখে মমতার ভেতরে যেটুকু আবেগ ও রোমান্টিকতা ছিল, তা ধীরে ধীরে উধাও হয়ে গেছে। টাকা-পয়সা নিয়ে প্রায়ই আশরাফের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়, কখনো কখনো তা ঝগড়ায়ও রূপান্তরিত হয়। সীমিত আয়ের মধ্যেও আশরাফ স্ত্রীর চাহিদাকেই প্রাধান্য দেয় এবং তা পূরণ করার চেষ্টা করে।

সংসারে দুই সন্তান, মাহতাব ও অনিকার আগমনের পর থেকে আকন্দ সাহেব নিজের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটান। মমতা রেগে গিয়ে স্বামীকে দশ কথা শোনালেও তিনি প্রায় সময়েই নীরব থাকেন। তিনি মনে করেন ছেলেমেয়ে বড় হচ্ছে, তাদের সামনে মমতার সঙ্গে কোনো অশোভন আচরণ করতে চান না। তবে কখনো কখনো মমতার আচরণ সহ্যের সীমার বাইরে চলে যায়। তার পরেও ছেলেমেয়েদের কারণে তিনি সব কিছু সহ্য করেন, নীরব থাকেন। মমতা যদি ঝগড়ার ক্ষেত্রে তুঙ্গে চলে যায়, তখন তিনি বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাঁটতে থাকেন। কখনো কখনো দুপুর পর্যন্ত রাস্তায়ই কাটিয়ে দেন। বিশেষ করে অবসরে যাওয়ার পর থেকে তিনি এ কাজ করেন। ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার করেছে। বাবা-মায়ের খোঁজ-খবর রাখে না বললেই চলে। যে দুই বোনকে নিজের কাছে রেখে লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়েছেন অতি কষ্টে, তারাও আকন্দ সাহেবের খোঁজ রাখেন না। এসব বিষয়েও মমতা ছাড় দিয়ে কথা বলে না। তিনি মনে করেন, এটাই তার নিয়তি। একমাত্র মেয়ে অনিকা তাদের সঙ্গে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে মাস্টার্স শেষ বর্ষে পড়ছে। বাবাকে কেন্দ্র করে মায়ের আচরণ তার পছন্দ নয়। অনিকা মনে করে, বাবা যতটা মাকে ভালোবাসে মা ঠিক ততটা নন। কেবল তাই নয়, বাবা অনিকাকে যতটুকু ভালোবাসেন, মা ততটা নয়। ক্যাম্পাস থেকে দেরি করে ফিরলে মা ঘ্যানর ঘ্যানর করতে থাকবে, অথচ বাবা তাকে কিছুই বলবেন না।

আকন্দ সাহেব চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর সামনের দিনগুলোতে পেনশনের টাকাই একমাত্র ভরসা। ছেলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা, বেতন ভালো, ইচ্ছা করলে সে বাবা-মাকে আর্থিক সাহায্য করতে পারে। কিন্তু তা করে না। আজকালকার ছেলেরা নাকি এমনই হয়। তরুণরা কি তা হলে আগের মতো নেই, তারা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে- এমন কথা ভেবে আহত হন তিনি। শেষ বয়সে এসে তিনি অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে গেলেন। এটা তার জন্য প্রত্যাশিত নয়। অনিকাকে বিয়ে দিতে হবে, চালাতে হবে সংসারও। সব মিলিয়ে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। ইদানীং তার ঘুম হয় না। ঘুম না হওয়ার পেছনে এসব সমস্যা-সংকট তার মধ্যে কাজ করছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আকন্দ সাহেব নিজেকে একজন ব্যর্থ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। তবে তার সান্ত্বনা এই যে, তিনি স্ত্রী, সন্তান ও সংসারকে ভালোবেসেছেন। এর প্রতিদান তিনি কারো কাছে কখনো চাননি, কখনো প্রত্যাশাও করেননি। তার জীবনে প্রশান্তি ও সান্ত্বনার জায়গা এটি-ই। এটি-ই তার জীবনের একমাত্র উজ্জ্বল দিক।

ইদানীং তিনি বেশিরভাগ সময় মন খারাপ করে থাকেন। এই মন খারাপের বিষয়টি স্ত্রী-কন্যাকে বুঝতে দেন না। দীর্ঘ বিরতির পর অনিকা পৃথিবীতে না এলে, এতদিনে হয়তো ও সংসার করত, সন্তানের জননী হয়ে যেত। মমতাজ তাকে কতটুকু ভালোবাসে কিংবা আদৌ ভালোবাসে কি না তা তিনি জানেন না। স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় চার দশকের সম্পর্ক তার কাছে আলো-আঁধারির মতো মনে হয়। তার এও মনে হয় কেবল অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে তিনি মমতাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন, নানা সময়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে ফেলে দিয়েছেন। এ জন্য তার অনুশোচনা হয়। এসব ভেবে যখন তিনি মমতার দিকে তাকান, তখন তার হৃদয়ে ক্ষরণ হয়। মমতা এর অর্থ বুঝতে পারে না।

শ্রাবনের শেষ সপ্তায় আকাশ কাঁপিয়ে সারা রাতই বৃষ্টি হলো। এমন বৃষ্টিমুখর সময়ে আকন্দ সাহেব মমতাকে কতবার বারান্দায় ছাদে নিতে চেয়েছেন, তার উদ্যোগ সফল হয়নি। আজ বৃষ্টি অঝর ধারায় ঝরলেও তার ইচ্ছা হয় না, মমতাকেও ডাকে না। জীবন সংগ্রামে তিনি আজ পরাজিত। আজ শ্রাবনের বৃষ্টিতে তিনি আগেভাগেই শুয়ে পড়লেন। বাড়ির অন্য দুই সদস্যও তাই করল। বৃষ্টির কারণে সবারই ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলো, আকন্দ সাহেব উঠতে পারলেন না। মমতা তাকে ডাকতে গিয়ে প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করল এবং পরে ডুকরে কেঁদে উঠল। টানা বৃষ্টির মধ্যে কোনো এক সময় তিনি মারা গেছেন।

লাশের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে দেখা গেল, তার মৃতু্য হয়েছে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এবং ঘুমোতে যাওয়ার পর পরই। অর্থাৎ আকন্দ সাহেব মারা যাওয়ার ৮ ঘণ্টা পর মমতা ঘুম থেকে উঠেছে। সময় হিসাব করতে গিয়ে মমতাজের সামনে একটি প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিল। তাহলে কি সে এই দীর্ঘ সময় একটি লাশের পাশে শুয়েছিল?
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে