নারীবাদ নয়, পুরুষবিদ্বেষ

নারীবাদ নয়, পুরুষবিদ্বেষ

অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধান অনুযায়ী ১৮৫২ সালে প্রথম নারীবাদী শব্দের উৎপত্তি হয়। তবে যে অর্থ নিয়ে এই শব্দের উৎপত্তি তা আজকাল আমরা বাঙালিরা প্রায় ভুলতেই বসেছি। কেননা আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায়, নারীবাদ নিয়ে নানারকম কথাবার্তা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর ভুল ব্যাখা চোখে পড়ে। বিশেষ করে এক শ্রেণির পুরুষ নারীবাদকে উঁচুমানের গালি হিসেবে ব্যবহার করেছে। শুধু পুরুষ নয়, গোড়া শ্রেণির কিছু নারীরও আচরণ যথেষ্ট বেখেয়ালি। আসলে আমরা সত্যিই জানি তো নারীবাদ কি?

নারীবাদ হলো নারীর অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করা। নারীবাদের উদ্দেশ্য জাতীকে পুরুষবিদ্বেষী করে তোলা নয়, নারীবাদের উদ্দেশ্য নারী যেন সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার পায়। যেমন- শিক্ষার অধিকার, ভোটাধিকার, চাকরির অধিকার, কিংবা পুরুষের সমান কাজ করে যেন সমান হারেই বেতন পান তার জন্য লড়ে নারীবাদ।

তাছাড়া চারদিকে চোখ রাখলেই দেখা যায়, নারীনির্যাতন, বাল্যবিয়ে, কখনো যৌতুকের জন্য, কখনো অন্যান্য কারণে। নারীবাদ নারীনির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করে। নির্যাতিত নারীর পাশে খুঁটি হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া ধর্ষণ শব্দটা শুনতে শুনতে আমাদের সমাজে আজকাল ডাল-ভাতের মতো হয়ে গেছে। পত্রপত্রিকায় চোখ রাখলেই চারদিকে ধর্ষণের খবর সবার আগে চোখে পড়ে। যৌন হয়রানির খবর চোখে পড়ে নারীবাদ এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। পাশে দাঁড়ায় সেই সব নির্যাতিতার। আবার নারীর সর্বোচ্চ ত্যাগের স্থান হলো সন্তানের জন্ম দেওয়া। কর্মজীবী মায়েরা যেন তাদের এই ত্যাগের সামান্যতম সম্মান পায়, এসময়ে যেন তারা মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা পায় নারীবাদের এটাই লক্ষ্য। আবার আমাদের দেশের গৃহিণীরা নানাভাবে লাঞ্ছিত হয়। তাদের কাজকে কাজ বলে গণ্য করা হয় না। কিন্তু কেউ কখনো খতিয়ে দেখে না তাদের ত্যাগেই যুগ যুগ ধরে টিকে আছে প্রতিটা পরিবার। তাছাড়া তাদের কাজের অর্থমূল্যও কম নয়। নারীবাদ তাদের সম্মানের পক্ষে লড়ে। লিঙ্গ বৈষম্য, আমাদের সমাজের মস্ত বড় ব্যাধি। নারীবাদ এই বৈষম্য নিরসনে কাজ করে। বাল্যবিয়ের মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

সর্বোপরি নারীবাদ নারীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে লড়ে, কোথাও পুরুষের বিপক্ষে নয়। তাহলে কেন আমাদের সমাজের পুরুষরা নারীবাদকে পুরুষবিদ্বেষী ভাবে? তবে কি আমাদের সমাজের সুব্যবস্থাপনার ঘাটতি এজন্য দায়ী? নাকি পুরুষ পিছনে ভয় পায়, নারীকে এত দমিয়ে রাখার পরেও নারী আজ দেশ জয় করছে, বিশ্ব জয় করছে। সমান অধিকার পেলে জীবনের ধাপ যদি আরও এগিয়ে যায়, তবে তো সমস্যা।

না! আসলে এটা আপনাদের ভ্রান্ত ধারণা মাত্র। নারী সমান অধিকার পেলে প্রতিযোগিতা নয় বরং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবে সমাজ, দেশ এবং বিশ্বকে। নারী তো সে-ই, যিনি ত্যাগের প্রতীক। তার ত্যাগেই যত পুরুষ, মহাপুরুষ অথবা নারীবিদ্বেষী সেই পুরুষের জন্ম।

তবে হঁ্যা আমাদের সমাজের নারীবাদের আড়ালে কিছু মুখোশধারী মানুষ আছে, যারা নারীসেবার নাম করে নারীদের ভুল পথে চালনা করছে। কোথাও কোথাও নারীদের পাশে দাঁড়ানোর নাম করে তাদের সামনে রেখে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। কেউ কেউ সরকারি বা কারোর ব্যক্তিগত অনুদান নিজেদের পকেটে পুরছে, কেউবা দরিদ্র অসহায় মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নানান রকম অপকর্মে লিপ্ত করছে। সর্বোপরি বলা যায় নারীবাদ কোনো অংশেই পুরুষবিদ্বেষী কোনো পন্থা নয়, বরং বলা যায় এটা সমবাদিতায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু হঁ্যা নারীবাদের আসল ব্যাখ্যাকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে ও এর উদ্দেশ্যকে সফল করতে নারীবাদের মুখোশ লাগিয়ে অপকর্ম করা মানুষকে চিহ্নিত করতে হবে। তাহলেই নারীবাদ তার আপন শোভা ফিরে পাবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে