মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪, ৮ শ্রাবণ ১৪৩১

নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে

উদিসা ইসলাম
  ০৪ জুন ২০২৪, ০০:০০
নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে

বাংলাদেশে সরাসরি কিংবা অনলাইন- দুই ধরনের ব্যবসাতেই নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও তারা বলছেন, নারী হিসেবে ব্যবসা করা, কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বাধাও বাড়ছে। আবার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত নারী উদ্যোক্তা তৈরি হলেও তাদের এক ছাতার মধ্যে আনার কোনো পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। উদ্যোক্তা হিসেবে নিবন্ধিত না হওয়ায় ফেসবুক কেন্দ্রিক অনেক ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা মর্যাদাই পান না। এমনকি নিজেদের অধিকারের জায়গাগুলোও তাদের অজানা। উদ্যোক্তা ও সংগঠনগুলো বলছে, যে যতটুকু পুঁজিরই ব্যবসা করুক না কেন, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা থাকা জরুরি।

এমন পরিস্থিতিতে এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য- 'নারীতে বিনিয়োগ করুন: অগ্রগতি ত্বরান্বিত করুন'। বহুল প্রচারিত ও চেনা উদ্যোক্তা নূরুন্নাহার বেগম। বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদী। তিনি 'জয় বাংলা নারী উন্নয়ন মহিলা সমবায় সমিতি' ও 'এনসিডিপি গ্রাম উন্নয়ন কমিটি'র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করা নূরুন্নাহার এক হাজারের বেশি নারীকে সংগঠিত করে তাদের স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। তার ঝুলিতে এখন অনেক পুরস্কার। নিজে স্বাবলম্বী হয়ে অন্যদের জায়গা করে দেওয়াদের মধ্যে তার নাম বারবার উচ্চারিত হয়। উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করেন যারা, তারা বলছেন- নূরুন্নাহারকে দেখে অনেকে উদ্বুদ্ধ হবে সেটা ঠিক আছে। কিন্তু যারা উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে আনার একটি প্রচেষ্টা কেন্দ্রীয়ভাবে থাকতে হবে।

দেশজুড়ে ছোটবড় নানা উদ্যোগ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন বাংলাদেশের নারীরা। হিসাব বলছে, বাংলাদেশে মোট উদ্যোক্তার শতকরা ৩১ দশমিক ৬১ শতাংশ নারী। নারী উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরো বা বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি পেরিয়ে এক দশকের ব্যবধানে নারী উদ্যোক্তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির 'হোলসেল অ্যান্ড রিটেইল ট্রেড সার্ভে-২০২০'-এর ফল প্রকাশ করে বলা হয়েছিল, ২০১৯-২০ অর্থবছরে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ছিল দুই লাখেরও বেশি- যা ২০০২-০৩ অর্থবছরে ছিল মাত্র ২১ হাজার।

'কেন্দ্র থেকে উদ্যোগ নেই'- এমন দাবি কেউ না করলেও উদ্যোগগুলো সবার কাছে পৌঁছানোর তাগিদ নিয়ে প্রশ্ন করেছেন অনেকে। বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে ২০২৩ সালে সাত বছর মেয়াদি কৌশলপত্র তৈরি করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন ও ইউএনএসকাপ। মোট ১০টি ক্ষেত্রে সহায়তার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কৌশলপত্রে। এই কৌশলপত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি সহায়তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, নারীর সম্ভাবনা কাজে লাগানো, অর্থায়ন বাড়ানো, বাজার সংযোগ, ডিজিটাল ও আইসিটি উন্নয়ন, সঠিক ডাটা ও জ্ঞানের উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বাড়ানো এবং জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ- এই ১০টি ক্ষেত্রে সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের মার্চে দক্ষতা বাড়িয়ে নারীর শোভন কর্মসংস্থান ও শ্রমশক্তির অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ১২৯ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। তৃণমূলে কাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে এই সেবা। বরং যারা কাজ শুরু করেছিলেন, তারা উল্টো এখন নানাভাবে দ্বিধাবিভক্ত হচ্ছেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা মনে করছেন, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না থাকায় সবপক্ষ দুর্ভোগের মধ্যে আছে।

'নারী উদ্যোক্তা বললেই ছোটখাটো কিছু করে' এমন ধরে নেওয়া হয় কিনা- প্রশ্নের জবাবে 'বাইফা'র বর্ষসেরা নারী ব্যবসায়ী তানিয়া তাসলিমা বলেন, 'তেমন হওয়ার কারণ দেখি না। তবে তেমনটা হচ্ছে। আমি মনে করি, ঘর থেকে কাজের ফাঁকে অল্প পুঁজিতে যারা ব্যবসা শুরু করছেন, তাদের কাজকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। তবে একইসঙ্গে কাজটি নিজের মতো করে বাসা থেকে শুরু করলেও নীতি নির্ধারণ থাকা দরকার। প্রত্যেক বিজনেসের কাগজ থাকা উচিত- সেটা ১০ হাজার টাকা মূলধনের ব্যবসা হলেও। তৃণমূলে অনেকে কাজ করছেন। এখন আপনি সেগুলো একসঙ্গে করে উলেস্নখ করতে পারেন যে কত লাখ নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন। সেটার পাশাপাশি তাদের সবাইকে কেন্দ্রীয়ভাবে এক জায়গায় নিতে হবে। অনেক সময় একটা ব্যবসার জন্য কী কী থাকা দরকার, তারা তা জানেন না। সরকার কত শতাংশকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে পেরেছে, বা সবার জন্য উন্মুক্ত কর্মশালার ব্যবস্থা করছে কিনা, সেটা দেখতে হবে।'

অর্থনীতিতে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'ধরেন, বিদেশে কোনো একটা অনুষ্ঠানে ২০০ পাঞ্জাবি পাঠাচ্ছেন কেউ। সেটা হয়তো তিনি কারোর লাগেজে পাঠাচ্ছেন বা কুরিয়ারে, কিন্তু বিনিময়ে যে অর্থ, সেটি কিন্তু অলিখিত থেকে যাচ্ছে। অথচ তার এই অবদান তাকে অন্য অনেক সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে যোগ্য করে তুলতে পারে। যদিও সেই তথ্যই তার কাছে নেই। ঘরে ঘরে উদ্যোক্তা তৈরি হলে সেটা আসলেই গর্বের। এখন সেটাকে একটা কাঠামোতে দাঁড় করানো সরকারের দায়িত্ব।'

উদ্যোক্তাদের নিয়ে অনলাইনে পস্ন্যাটফর্ম তৈরি করেছেন 'হার-ইট্রেড'-এর ওয়ারেসা খানম প্রীতি। উদ্যোক্তাদের কেন্দ্রীয়ভাবে দেখভাল করা দরকার কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, 'এসএমই ফাউন্ডেশন আছে, জয়িতা আছে, এগুলোকে কেন্দ্র বলা যেতে পারে। কিন্তু তাদের উদ্যোগগুলো ছাড়া ছাড়া। উদ্যোক্তা কীভাবে সেখানে যাবেন বা যুক্ত হলে কী পাবেন, তা জানেন না। সমন্বয়টা ছড়ানো। বেসরকারি উদ্যোগে উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স (উই) মনে করে, তাদের লাখ লাখ সদস্য। ফলে কেন্দ্র তারাও হতে পারে। আসলে কিন্তু শেষ বিচারে সবাই ব্যক্তি উদ্যোগে দাঁড়িয়েছেন। যেটা করতে হয়, নিজেকেই করতে হয়। তৃণমূলে কাজ করছেন যারা, তাদের মূল সমস্যা ট্রেড লাইসেন্স না থাকা। ডকুমেন্ট যা যা চাওয়া হয়, তারা সেটা দিতে পারেন না। এগুলো সমন্বয় করা এবং তার উদ্যোগটিকে এগিয়ে নেওয়ার কাজটি হবে- এমন সমন্বিত কেন্দ্রীয় জায়গা থাকতে হবে।'

তবে জয়িতা 'কেন্দ্রীয় উদ্যোগ' হলেও এখনো উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা গেছে খুব সামান্যই। জয়িতা ফাউন্ডেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক (বিপণন ও সম্প্রসারণ শাখা) মো. রুকনুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'জয়িতায় সারাদেশ থেকে ১০ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা নিবন্ধিত হয়েছেন। তারা নিজেদের পণ্য জয়িতার স্টলে ডিসপেস্ন করতে পারেন। ঢাকায় প্রায় আড়াইশ উদ্যোক্তার পণ্য রাখা থাকে। এছাড়া স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা আছে এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।'

সমস্যার জায়গা চিহ্নিত করে 'অরুণিমা'র স্বত্বাধিকারী তোরিফা নাজমিনা মনে করেন, আমাদের নারীদের প্রতিভা আছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে তারা আর এগোতে না পারার দুটো প্রধান কারণ আছে। একটি হলো, তাদের পণ্য সঠিকভাবে বিপণনের অভাব এবং আরেকটি হলো বিনিয়োগের অভাব। ব্যাংক ঋণের সুবিধার কথা বলা হয়ে থাকে, একজন উদ্যোক্তা একটা পর্যায়ে গিয়ে তবেই সেই ঋণটি পাওয়ার যোগ্য হন। তার আগে তিনি কী করবেন সেই প্রশ্নের জবাব মেলে না।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে